| 4 মার্চ 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

টেড হিউজ’র গল্প মাথা

আনুমানিক পঠনকাল: 9 মিনিট

অনুবাদকঃ কামাল রাহমান


 

জানি, আমার স্ত্রী এক আশ্চর্য মেয়েমানুষ, আর এরকম মানুষের সঙ্গে বাস করে আমিও এক উদ্ভট চিড়িয়ায় পরিণত হয়েছি। এটারও ব্যাখ্যা দেয়া যেতে পারে।

কোনো এক সময় আমার ভাই ও আমি শিকারে যেতাম। শিকারের মাথা ও চামড়া সংগ্রহ করে ঐসব পর্যটকদের কাছে বিক্রি করে দিতাম যারা ঘরে ফিরে যেতে চাইতো একটা নিদর্শন নিয়ে। স্যাং নদীর মুখে গড়ে ওঠা তেমাথা নামের এক পুরোনো গ্রামে একেবারে অবিশ্বাস্য এক শিকার খেলার আয়োজনের সংবাদ এসেছিলো আমাদের কানে। সব ধরনের, এবং অসংখ্য শিকার সংগ্রহের ইচ্ছে নিয়ে ঠিক সময়েই বেরিয়ে পড়ি, যা করে থাকি সচরাচর।

ঐ গ্রামের লোকজন, স্থানীয় ইন্ডিয়ানরা যাচ্ছেতাই নোংরা, ছিদ্রান্বেষী, ও কোপন স্বভাবের আদিম অধিবাসী, কিন্তু শিকারে উন্মত্ত, গাইড হিসেবেও একেবারে প্রথম শ্রেণির। ওদের ভেতর থেকে একজনকে বেছে নেই, শুরুতেই প্রথম সতর্ক সঙ্কেতটা জানিয়ে দেয় সে। খুব পরিষ্কারভাবে ওরা বুঝিয়ে দেয় যে, কোনো সাহায্যই করতে চায় না আমাদের। কানগুলো বধির না হওয়া পর্যন্ত বকবক করা শেষ করে সামনে এগিয়ে আসে ওদের গ্রাম-প্রধান। পৃথক করার মতো কোনো বৈশিষ্ট্য নেই ওর ভেতর। অন্যদের মতোই অপরিচ্ছন্ন, ও অশ্লীল। ওরা আমাদের জানিয়ে দেয় যে ঐ অনুরোধটা মোটেও পছন্দ নয় ওদের। ভুল সময়ে এসে পড়েছি, জঙ্গলের অবিচ্ছিন্নতা লংঘন করতে চাইছি এবং প্রাণীদের পবিত্র মুহূর্ত নষ্ট করতে যাচ্ছি। বছরের এসময়টায় বনের সকল প্রাণী একত্রিত হয় প্রভুর হিসেবের জন্য। যদিও প্রতি ত্রিশ বছরে একবার ঘটে এটা। ভুল করে এ সপ্তাহটাকেই বেছে নিয়েছি আমরা, এই বিশেষ চাঁদের প্রথম পক্ষটাকে। অতএব ঐ প্রধান ও তার অনুচরেরা আমাদের বিরত থাকতে ও অন্য কোথাও যেতে পরামর্শ দেয়।

কুসংস্কারাচ্ছন্ন এসব ফালতু কথায় বিশ্বাস ছিল না আমাদের। একত্র হওয়া পশুগুলো যেনো কোনো কারণে আবার ছড়িয়ে ছিটিয়ে যেতে না পারে সেদিকে বরং বেশি মনোযোগ ছিল আমাদের, আবশ্যিকভাবে একজন গাইডেরও প্রয়োজন ছিল। ঝোলা থেকে সামান্য একটা বস্তু বাইরে পাচার করে আমার ভাই। যুদ্ধের সময় ব্যবহার করা জ্বালানী-পাত্রের অংশ থেকে বানানো সুদর্শন একটা ভোজালি। মিশরীয় ঐ ভোজালিটার হাতল রঙিন কাচে কারুকাজ করা। বৃদ্ধ গ্রাম-প্রধানকে ওটা পরখ করতে দিলে ভাবনায় পড়ে যায় সে। কিছুক্ষণ ভেবে ব্যাখ্যা করতে শুরু করে, একজন স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে এ সময়ে জঙ্গলে ঢোকা সত্যি অসম্ভব। জঙ্গলের দেবতা পিটিয়ে মেরে ফেলবে ওকে, মাথা কেটে ছাল ছাড়িয়ে নেবে, তারপর বাড়ি পাঠিয়ে দেবে ঠিক ওভাবেই। পাগলকরা, ও সবরকম যাতনা-দেয়া সব ঘটনা ঘটতে থাকবে। কিন্তু এখন সে দেখতে পাচ্ছে একেবারে অপ্রকৃতিস্থ আমরা, এবং ভয় ও বেদনার উর্ধে। অতএব এগিয়ে যেতে পারি আমরা, এবং যা-খুশি করতে পারি। জঙ্গলের দেবতার কর্তৃত্ব ফলবে না আমাদের উপর। একজন গাইডও সে দিতে পারে, যে আমাদের মতোই আর এক পাগল, অথবা আরো বেশি। জঙ্গলের মধ্যে আমাদের মতোই নিরাপদ সে। মিশরীয় ভোজালিটা ভালোভাবে আঁকড়ে ধরে সে, কথিত ঐ পাগল লোকটাকে ডাকে। কোনোভাবেই পাগল ছিল না সে, অপরিণত বুদ্ধির, সাদাসিধা এক ইন্ডিয়ান। অদ্ভুত নাম ওর, হতবুদ্ধি বাজ। অতএব জঙ্গলে ঢুকে পড়ি আমরা।

নতুন এক সমস্যা এবার, বেঁকে বসে হতবুদ্ধি বাজ, পথ-প্রদর্শক হতে অস্বীকৃতি জানায়। অর্ধেকটা মস্তিষ্ক ভালো ছিল ওর, পাগল হতে চায় নি পুরোপুরি। পশুদের প্রভুর হাতে মরে যাওয়ার কোনো ইচ্ছে নেই ওর, সটান শুয়ে পড়ে রাস্তার উপর। সেফটি-ক্যাচ উপরে তুলে রাইফেলের নল সরাসরি হতবুদ্ধি বাজের নাকে ঠেকায় আমার ভাই, ওর মাথা গুড়িয়ে দেবার হুমকি দেয়। হাউমাউ কান্না জুড়ে উঠে দাড়ায় সে, হাত দুটো ঝাঁকিয়ে ঘাড় গোঁজ করে দাঁড়িয়ে থাকে। অথর্ব, এক করুণ সৃষ্টিতে পাল্টে যায় সে হঠাৎ, বনের পশুর চামড়ায় জড়ানো কদাকার একটা স্তুপের মতো দেখায় ওকে, ভয়ঙ্কর, দৃষ্টিকটু ও কিম্ভুতকিমাকার, আমার ভাইয়ের প্রতি ভয়ার্ত হয়ে ওঠে সে। আমিও ভাবনায় পড়ি আমার ভাইকে নিয়ে, হাড়ে হাড়ে বদমাশ ও, চোখ দুটো প্রসারিত ওর, দুষ্ট-বুদ্ধিতে ছলকে ওঠা, দাঁতগুলো অস্বাভাবিক, হায়েনার দাঁতের সঙ্গে তুলনা দেয়া যায় ওগুলোর।

অনায়াসে খুন করতে পারে সে, এটা বুঝতে পেরে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া অসহায় মানুষের মতো বনের পথে পা বাড়ায় হতবুদ্ধি বাজ, পেছনে ধরা থাকে রাইফেলের নির্মম নল। স্যাং নামের ঐ নদীটা পেয়ে যাই আমরা। শিকারের আশ্চর্য জগত দেখা দেয় আমাদের সামনে। প্রতি একশ’ গজের ভেতর অসংখ্য ভালুক। আমাদের সঙ্গে আনা খচ্চর, খাবার-দাবার, রসদ, ও যাবতীয় অন্য সবকিছুর গন্ধ পরখ করে বুনো সন্দিগ্ধতা নিয়ে। কান্নাভেজা চোখের চিতাবাঘ, খাড়া-কান বনবেড়াল, হরিণ, উল্লুক প্রভৃতি অগুনতি প্রাণী খুব সাবধানে লক্ষ্য করে আমাদের। তখনই গুলি ছোঁড়া থেকে বিরত থাকি, স্থির করি, ভোরের দিকে শুরু করবো, হত্যাযজ্ঞ।

নদী ও জঙ্গলের মাঝখানে বুনো ব্ল্যাকবেরির ঝোপের কাছে আমাদের তাবু খাটাই সন্ধ্যার আগে। উত্তরের সাগর দেখা যায় ওখান থেকে। উত্তেজনায় শরীরে কাঁপুনি এসে যায় আমাদের। খচ্চরের পিঠ থেকে বোঝা নামানোর সময় আমাদের পা মাড়িয়ে যায় বুনো বেজির দল।  স্নিগ্ধ বাতাস, শুক্লপক্ষের চাঁদ বুনো প্রকৃতিতে আলো ছায়ার নৈসর্গিক পরিবেশ নিয়ে আসে। বন-মর্মর, কুয়াশার মিষ্টি প্রহেলিকা, নদীতে মাছের লাফিয়ে ওঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, প্রভৃতি, প্রকৃতির মধ্যে এক অবর্ণনীয় মাতালতা সৃষ্টি করে। অজানা ভয় মিশে আছে এটার সঙ্গে, মাঝে মাঝে অন্ধকার ও কুয়াশায় ঢেকে যায় রাতের রহস্যমাখা প্রকৃতির কোনো কোনো অংশ। তখন মনে হয় পর্বতের উঁচু উঁচু শিখরগুলো চারদিক থেকে এগিয়ে আসছে গ্রাস করে নিতে আমাদের।  স্নায়ুর উপর আশ্চর্য এক চাপ সৃষ্টি করে এসব। কথা বলি চোরের মতো ফিসফিসিয়ে, নড়াচড়া করি খুব ধীরে। সামনে ও পেছনে, যত দূর চোখ যায়, চারদিকে, গলা বাড়িয়ে, কান খাড়া করে বুনো গাই, হরিণ, ভালুক, চিতা সহ সব ধরনের ভয়-জাগানো পশু অবাক চোখে খুঁটিয়ে দেখে আমাদের।

ধৈর্যের প্রায় চূড়োয় পৌঁছে যায় হতবুদ্ধি বাজ। পাহাড়ের একটা গর্তে ঢুকে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করে শাস্তি পাওয়া অবুঝ এক বালকের মতো, কোনো কিছুই শুনতে চায় না। রেগে ওঠে আমার ভাই, লাথি দেয়া শুরু করে, কান্নাকাটি থামিয়ে আগুন জ্বালাতে আদেশ দেয়। বাধ্য বালকের মতো কান্না থামায়, কিন্তু আঘাত পাওয়া কুকুরের মতো মাটিতে লুটিয়ে চোখ উল্টে পড়ে থাকে মরার মতো। ওখানেই ছেড়ে দেই ওকে।

মাংস খেয়ে খেয়ে ক্লান্ত হয়ে মাছের জন্য উদগ্রীব হয়ে রয়েছি দুজনেই। মাছ ধরতে নেমে পড়ি রাতের আলো-আঁধারি নদীতে। আমাদের চাহিদা শুধু ভালো মাছ। প্রতিটা আঘাতে বড় বড় সব মাছ আটকাতে থাকে। উজ্জ্বল আলো-দেয়া চাঁদ পাহাড়ের ওপাশে চলে না যাওয়া পর্যন্ত চালিয়ে যাই মাছ ধরা। বিশ্বাস করা কঠিন যে এতো বড় একটা স্তুপ হতে পারে শুধু মাছ দিয়ে। আন্দাজ করে বড় একটা মাছ নিয়ে তাঁবুতে ফিরে আসি, ভালো করে ঝলসে নেই। হতবুদ্ধি বাজকে কোনোভাবেই স্পর্শ করাতে পারি না ঐ মাছ। তাঁবুর ভেতর ঘুমাতেও আসে নি সে। শেয়ালের ধারালো থাবার নাগালে ওকে ফেলে রেখে তাঁবুতে ঢুকি।

ভোর না হতেই ভোজবাজির মতো মিলিয়ে যায় সে। মাছের বিশাল স্তুপটা নিঃশেষ করে রেখেছে ভালুকগুলো। সন্দেহ পুরোপুরি কেটে যায় আমাদের। ঝোপের কাছাকাছি আটটা ভালুক চোখে পড়ে, গুলিও ঠিক আটটা। প্রথম দিনের সাধ-মেটানো খেলা শুরু হয়ে যায়। পাহাড়ের সমান একটা স্তুপ গড়ে ওঠে পশুর মৃতদেহে। এক আশ্চর্য তাড়ণায় প্রাণ বিসর্জণ দিতে দলে দলে এসে জড়ো হয় ওরা, বন্দুকের নলও ঘোরাতে হয় না এমনকি। ম্যাগাজিনে গুলি ঢোকানোর জন্য হাত নামাতে হয় শুধু। সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে এমন তাণ্ডব। তীব্র ভয়-জাগানো, অভূতপূর্ব শিহরণ-দেয়া এক অতিলৌকিক দৃশ্য ফুটে ওঠে সন্ধ্যার রহস্য-আলোয়। বোকা ও বোবা খচ্চরগুলোও অভিভূত হয়ে পড়ে নৃশংস এমন হত্যাকাণ্ডে! দিনের শেষে শরীরে ব্যথা ও তালা লাগানো কান নিয়ে ফিরে আসি তাঁবুতে। হতবুদ্ধি বাজকে খুঁজে পাওয়া যায় না কোথাও। ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ি রাত আসার সঙ্গে সঙ্গে। অদ্ভুত এক স্বপ্নজালে জড়িয়ে পড়ি। তাঁবুর ভেতর ঢোকে হতবুদ্ধি বাজ। রক্তাক্ত, ও চামড়া ছাড়ানো ওর পুরো শরীর। পেঁচার মতো ভয়ঙ্কর এক জন্তুর রূপ ধরে তাঁবুর ভেতর জ্বলতে থাকা আগুনটা নিভিয়ে দেয় লাথি দিয়ে। কয়লাগুলো ছড়িয়ে দেয় ঘর জুড়ে। আমার ভাইয়ের বুকের উপর ঝুঁকে ওর মুখের মাংস খেতে থাকে ঠুকরিয়ে। উঠে বসি স্বপ্নের ভেতর, প্রাণপণে চিৎকার দিয়ে উঠি। মাথা ওঠায় সে, ভয়-জাগানো অদ্ভুত এক দৃষ্টি নিয়ে তাকায় আমার দিকে, তারপর খুব ধীরে ধীরে এগোতে থাকে। এতো ধীরে যে ওর ঠোঁট-কেটে-ফেলা দাঁতের সারি, পাতাহীন চোখ, চামড়া ছাড়ানো খুলিতে লেগে থাকা রক্তের ছোপ, এসবকিছুই স্পষ্ট দেখা যায়। একটু পড়ে, ওখান থেকে চলে যেতে থাকে, মনে হয়, কেউ আমার হৃৎপিণ্ডটা খুলে নিয়ে যাচ্ছে। নিঃশ্বাস প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম। আমার দিক থেকে চোখ না সরিয়ে ধীরে ধীরে অন্ধকারে মিলিয়ে যায় সে। রাতের ভৌতিক পাহাড়গুলোর ফাঁকে চাঁদের আলোয় হিংস্র দাঁত-দেখানো নেকড়ের মতো অদৃশ্য হয়ে যায় ছায়ার ভেতর। প্রবল ঝাঁকুনি খেয়ে জেগে উঠি, শুয়ে থেকে শুনি ভয়ঙ্কর সব অজাগতিক শব্দ ভেসে আসছে চারদিক থেকে। ধেয়ে আসা শত শত নেকড়ের বিকট চিৎকারের মধ্যে অন্য একটা শব্দ পৃথকভাবে কানে আসে। কোনো নারীর বিলাপধ্বনির মতো, সারা রাত ধরে দূরে ও কাছে থেকে বারবার শোনা যায় এটা।

সকালে ঘুম ভাঙ্গার সঙ্গে সঙ্গে রাতের স্বপ্নটা নিয়ে ভাবি। আমার ভাইকে বলি না কিছুই। আগের দিনের মতো নদীর উজানে একজন, এবং ভাটিতে অন্যজন, ঘটিয়ে চলি নির্মম হত্যাযজ্ঞ। কত অবর্ণনীয় দুর্ধর্ষতা চাপানো হয়েছে পশুদের উপর, তা শুধু কল্পনা করা যায়। পশুরাজ্যের এই করুণ পরিণতির ভেতর যে অমানবিকতার জন্ম নিয়েছিল, তার ব্যাখ্যা কোনোভাবেই দেয়া সম্ভব না। পুরোপুরি বর্বর ও অর্থহীন এটা। সামান্য চামড়ার জন্য এতো অমূল্য প্রাণের নির্বিচার সংহার কোনো কিছুর বিনিময়েই মেনে নেয়া যায় না।

নিধনযজ্ঞের পর, ঐ রাতে, অন্যরকম কিছু দৃশ্য দেখাতে বাইরে ডেকে নিয়ে যায় আমার ভাই। সব কিছু দেখার পর নিশ্চিত হই যে হতবুদ্ধি বাজের মাথা কাটা পড়েছে কারো হাতে, খুলে নেয়া হয়েছে ওটার চামড়া। নারকীয় এই সব ঘটনার মধ্য দিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ি। শিকারের কোনো ইচ্ছা আর অবশিষ্ট নেই আমার। একাই দুজনের শিকার চালিয়ে যাবে বলে ঘোষণা দেয় আমার ভাই। অর্থহীন এই হত্যাযজ্ঞ অনুষ্ঠানের সকল নারকীয়তা বয়ে যায় শরীর ও মনের ভেতর দিয়ে। এর সবটুকু বেদনা নিদারুণ মুষড়ে তোলে আমাকে। তাঁবু থেকে বেরিয়ে আশ্চর্য এক দৃশ্যে বাকহারা হয়ে পড়ি। চামড়া ছাড়ানো মৃতের স্তুপের পাশে হাঁটু গেড়ে নুয়ে আছে লোমশ এক নারী। যেমন থাকে বেদীর সামনে কোনো পূজারী। দমকে দমকে কান্নার রোল কাঁপিয়ে তোলে ওর শরীর। উঠে যায় এক সময়, পাগলের মতো আলিঙ্গন করতে থাকে মৃতদেহগুলো। এগিয়ে আসে আমাকে দেখে। তাঁবুর ভেতর থেকে বন্দুকটা বের করে নিয়ে আসে, একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে, নীরবে অপেক্ষা করি শেষ পরিণতির জন্য। কিছু সময় পর বন্দুকটা নিয়ে নদীতে অদৃশ্য হয়ে যায়। তাঁবুতে ফিরে আসি আমি।

কিছুক্ষণ পর ফিরে আসে আমার ভাই। বিপুল পরিমান শিকারের বর্ণনা দিতে থাকে। একটা লালচে শেয়াল রঙের চামড়া সামনে মেলে ধরে জানতে চায় ওটা কিসের। বলতে না পারায় পা দিয়ে গড়িয়ে একটা মৃতদেহ কাছে নিয়ে আসে। চমকে উঠি। সে বলে, না, এটা মানুষের না। হাত দুটো ওর আমাদের হাতের দ্বিগুণ লম্বা। নারী না পুরুষ দেখার জন্য চোখ ঘোরালে হেসে ওঠে ও। বলে, না এটা নারীর না। তারপর বলে নদী থেকে উঠে আসছিল ওটা, প্রথমে মনে হয়েছিল একটা বুনো মানুষ। পরে বুঝতে পারি, নতুন প্রজাতির এক গরিলা আবিষ্কার করেছি। মেরে ফেলা ছাড়া কিছুই করার ছিল না। বিশাল দুহাত বাড়িয়ে যেভাবে এগিয়ে আসছিল সে, ভয় না পাওয়ার কোনো কারণ ছিল না। ছোট্ট একটা বানরের শক্তি সম্পর্কেও ধারণা ছিল ওর। ঐ সময় জীববিদ্যার প্রতি পক্ষাপাতিত্ব দেখাতে পারে না সে।

প্রথম বুলেটটা গলার মাঝখানে একটা ছিদ্র করে দেয় ওর, মুহূর্তমাত্র থামানো ছাড়া আর কোনো কাজে আসে না ওটা, ছিদ্রটায় আঙ্গুল দিয়ে হাঁ করে সে, দ্বিতীয় বুলেটটা সেখানে ঢোকায় মুখ বন্ধ করে আবার হেঁটে আসতে থাকে ওর দিকে, হাত দুটো আগের মতো প্রসারিত। তৃতীয় গুলিটা প্রথম ছিদ্রে, চতুর্থটা বাম বুকের ঠিক মধ্যখানে, পঞ্চমটা দু’ভ্রুর মাঝখানের খাঁজটাতে। ওর জীবনের সবচেয়ে খারাপ সময়টা আসে যখন দেখতে পায় এভাবেই এগিয়ে আসতে থাকে প্রাণীটা।

এভাবে অনবরত গুলি ছুঁড়তে থাকে সে, যে-পর্যন্ত-না প্রাণীটা ওর হাত থেকে শান্তভাবে বন্দুকটা নিয়ে পাশে রেখে দেয়। বিশাল হাতদুটো দিয়ে আলিঙ্গন করে ওকে, অত্যন্ত শক্তিমত্তায়, অথচ পুরোপুরি ভদ্রজনোচিতভাবে। খয়েরি চোখ দুটো দিয়ে কিছু বলতে চায়। মুখে ও মাথায় রক্ত উঠে আসে ওর। শিথিল শরীরে ধীরে ধীরে লুটিয়ে পড়ে ওর দু’পায়ের মাঝখানে, রক্ত ধুয়ে দিয়ে যায় পায়ের পাতা দুটো।

নীরবে ওর কথা শুনি আর মৃতের চামড়াটা দেখি, মনে পড়ে কিছু সময় আগে দেখা ওর প্রণয়ীর বুক উজাড় করা কান্নার দৃশ্য। অনেক আগে লবণ ফুরিয়ে যাওয়ায় একটা ভালুকের চামড়ার সঙ্গে উল্টো করে লেপ্টে জড়িয়ে নেয় ওটা। ওকে বলি, আমার জীবনের শেষ শিকারটা করা হয়ে গেছে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে সে, এলোমেলো ও উদ্ভট সব আচরণ করতে থাকে, অকারণে গুলি ছুঁড়তে থাকে। ভয়ে পালিয়ে আসি, জঙ্গলের ভেতর ঢুকে ঘুমিয়ে পড়ি, সারা রাত কেটে যায় দুঃস্বপ্নের ভেতর। সকালে দেখি আমার ভাইয়ের রক্তাক্ত সার্ট, তাঁবুর ভেতর বিক্ষিপ্তভাবে ছড়ানো রক্ত ও হাড়ের কুঁচি। মনে হয় ওসব আমার ভাইয়েরই। ওর বন্দুক অথবা মাথার খুলির কোনো হাড় ছিল না ওসবের ভেতর। আরো একটা অদ্ভুত বিষয়: পুরোপুরি শূন্য হয়ে গেছে বন, একটা প্রাণীও নেই, এমনকি মৃতদেহগুলোও নেই। যার যার চামড়া গায়ে জড়িয়ে কোথাও হারিয়ে গেছে যেন ওরা। রক্তে ভেজা ঘাস পেরিয়ে যেতে যেতে দেখি আমার ভাইয়ের হাড়ের টুকরোগুলো ছাড়া মৃতের আর কোনো চিহ্ণ নেই। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই ভুতুরে জঙ্গল ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। ফেরার পথে পা বাড়াতেই কেউ যেনো পিছু ডাকে। আমি নিশ্চিত, ওটা আমার ভাইয়ের গলার স্বর। নাম ধরে ডাকছে সে আমাকে, মাথার খুলি ওটা। সারা পথ পিছু পিছু আসে আমার, কোনোভাবেই ছেড়ে আসতে পারি না ওকে। চামড়া ছাড়ানো খোলা মাড়ি দিয়ে কামড়ে আহত করে আমাকে। অবশেষে ঘুমানোর ভান করে একটা শেয়ালের গর্তে ঢুকে চোখ মুদে থাকলে সেও ঘুমিয়ে পড়ে ওখানে ঢুকে। সুযোগ বুঝে ওটাকে ভালোভাবে মাটিচাপা দিয়ে পথ চলা শুরু করি আবার।

সন্ধ্যার দিকে ফিরে আসি ঐ ইন্ডিয়ান গ্রামটাতে। গোত্র-প্রধান অভ্যর্থনা জানায় আমাকে। পুরো গ্রামের মানুষ এসে চারদিকে ভিড় করে। অলৌকিক ও অতিভয়াল ঐ সব স্মৃতির ভেতর ভেসে বেড়ায় আমার ভাই ও হতবুদ্ধি বাজের মৃত্যুর কাল্পনিক দৃশ্য। ভৌতিক একটা শোঁ শোঁ শব্দ ওঠার সঙ্গে সঙ্গে চারদিক একেবাারে ফাঁকা হয়ে যায়, একদম একা হয়ে পড়েছি, যে যে-দিকে পারে পালিয়ে গেছে। ভয়ংকর ঐ দুর্যোগের ভেতর দেখি আমার ভাইয়ের খুলিটা এরিমধ্যে বিশাল দুটো পাখা ও ধারালো নখ লাগানো পা সংগ্রহ করে নিয়েছে, বিশাল এক পেঁচার রূপ ধরে হিংস্রভাবে তাড়া করে চলেছে ঐ মানুষগুলোকে। ওদের একজনকে হত্যা করে জঙ্গলে ফিরে যায় আবার। আমাকে দায়ী করে এজন্য ওদের গ্রাম-প্রধান। ওরা মনে করে জঙ্গলের আইন ভঙ্গ করায় আমাকে হত্যা করতে এসেছিল ঐ খুলি-পাখিটা। আলোর স্বল্পতায় ভুল করে অন্য একজনকে হত্যা করে ফিরে গেছে। আগামী সন্ধ্যায় দৈত্যটা আবার এলে আমাকে লড়তে হবে ওর সঙ্গে। একটা তরবারি দেয়া হয় আমাকে, হয় ওটাকে হত্যা করতে হবে, নয়তো প্রাণ দিতে হবে আমাকে।

ওদের সিদ্ধান্ত মেনে নেয়া ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই আমার হাতে। ঐ খুলিটা যে আমার ভাইয়ের তা বলা যায় না ওদের কাছে। পরের সন্ধ্যায় ভৌতিক সব আয়োজনের ভেতর হঠাৎ মনে হয় আকাশের চারদিক থেকে আগুনের চাবুক পেটানো শুরু হয়েছে। জঙ্গলের ভেতর ঠেলে পাঠায় আমাকে গ্রামের ঐ মানুষগুলো। ভয়ঙ্কর আক্রমণ শুরু হয় হঠাৎ, ক্রুদ্ধ চাপা গর্জন করে পশুটা ঝাঁপিয়ে পড়ে আমার বাঁদিক থেকে। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে আঘাত করি, অথচ কোনো কিছুই স্পর্শ করে নি আমার ঐ অস্ত্র! মনে হয়, ধাতব একটা স্ক্রু খুলি ফুটো করে ঢুকে যাচ্ছে মাথার ভেতর। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে ওটা থেকে মুক্ত হওয়ার পর দেখি নারকীয় একটা পিণ্ড আছড়ে পড়েছে আমার সামনে। তরবারিটাকে কুঠারের মতো ধরে সোজাসুজি আঘাত করি ওটাকে। এবার দুদিক থেকে আসতে থাকে গর্জনটা। তরবারি চালাতে থাকি পাগলের মতো। দুটা থেকে চারটা, চারটা থেকে আটটা, এভাবে অসংখ্য ক্রুদ্ধ স্বর চারদিক থেকে জড়িয়ে ধরে ক্ষতবিক্ষত করতে থাকে আমাকে, মনে হয় শেষ হয়ে যাচ্ছি।

হঠাৎ স্তিমিত হয়ে পড়ে আক্রমণ, এবং সেই সঙ্গে প্রাণীটাও নির্জীব হয়ে পড়ে, অসংখ্যে পরিণত হওয়া দানবটা যেনো বাধাগ্রস্থ হয়ে পড়েছে অন্য কারো আক্রমণের শিকার হয়ে। শুরুর ঐ গর্জনের মতো একটা গর্জন শুনতে পাই আবার। বিদ্যুৎ গতিতে লাফিয়ে উঠে প্রচণ্ড শক্তিতে আঘাত করতে থাকি ওটাকে লক্ষ্য করে। মনে হয় জয়ী হতে চলেছি। অবশেষে থেমে যায় ঐ বিদঘুটে গর্জন, অবাক হয়ে লক্ষ্য করি খুব কাছে থেকে একটা চাপা গোঙানির শব্দ ভেসে আসছে। কোনো নারীর কষ্ঠ মনে হয় ওটা। অর্ধমৃত অবস্থায় পাই ওকে, মনে হয়, ঐ দানবটাকে পরাভূত করেছে সে, আর আমার অস্ত্রের আঘাতে আহত হয়েছে নিজে। কোলে তুলে নিলে গোঙানি বন্ধ করে সে, মৃত ভেবে ওকে কাঁধে নিয়ে গ্রামে ফিরে আসি। শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ণ খুঁজে পাই না। গ্রামের মানুষেরা বলে যে ওকে চেনে না ওরা, ঐ দানবটাই আমার অস্ত্রের আঘাত থেকে রক্ষা পেতে এ রূপ ধারণ করেছে।

মেয়েটার মুখে দানবের কোনো ছায়া আছে কিনা লক্ষ্য করি। কিছুই বুঝতে পারি না। ঘরে বয়ে নিয়ে আসি, শুশ্র“ষা দিয়ে সুস্থ করে তুলি। ও ছিল খুব সবল, প্রখর বুদ্ধিমতি ও চটপটে, কিন্তু নীরব। কোনো কিছু লিখতে, পড়তে, এমনকি বলতেও শেখানো যায় নি ওকে। ওর বিষয়ে, এটা খুব আশ্চর্যের, আজীবন সে গোপনই রয়ে গেছে। অবশেষে ওকেই বিয়ে করি। জীবনে আর কখনো শিকারে যাই নি।

এই হচ্ছে আমার আশ্চর্য, অলৌকিক স্ত্রী; যাকে নিয়ে ঘর করছি এখন।

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত