| 22 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
ধারাবাহিক সাহিত্য

ইন্দু বিন্দু (পর্ব ৫)

আনুমানিক পঠনকাল: 8 মিনিট
শ্রীচৈতন্যের জীবনী নিয়ে মধ্যযুগেই কয়েকটি গ্রন্থ লেখা হয়েছিল। তবে বাংলা সাহিত্য-আসরে আত্মজীবনী সাহিত্য এসেছিল বেশ চমক দিয়ে। চমক এ জন্য যে, আধুনিক যুগ ইংরেজ এবং ইংরেজি সাহিত্যনির্ভর হয়ে উঠেছিল। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিতরাই সমাজ-সাহিত্য-রাজনীতিতে অবদান রেখেছিলেন। কিন্তু বাংলায় ‘আত্মজীবনী’ লেখার ইতিহাস একেবারেই ভিন্নভাবে এসেছে। কোনো ইংরেজ প্রভাবিত বা কোনো শিক্ষিত লোক আত্মজীবনী লেখেননি। লিখেছেন অজপাড়াগাঁয়ের প্রায় অশিক্ষিত এক মেয়ে। তাঁর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, কেউ তাঁকে পড়তে বা লিখতে শেখাননি। লেখাপড়া অর্জন করেছিলেন তিনি নিজে, সম্পূর্ণ একাকী। তাই সাহিত্যের আঙ্গিনায় তিনি একটি বিস্ময়। তাঁর নাম রাসসুন্দরী। তাঁর বইয়ের নাম ‘আমার জীবন’। তারপরে আত্মজীবনী অনেক পেয়েছে বাংলা সাহিত্য ও বাংলা সাহিত্যের পাঠক।

আরও একটি আত্মজীবনী ইন্দু বিন্দু’র সাক্ষী হতে যাচ্ছেন আপনি। আদরের নৌকা,শব্দের মিছিল-এ বিক্ষিপ্তভাবে নিজের জীবন নিয়ে লিখেছেন, ইরাবতীর পাঠকদের জন্য ধারাবাহিকভাবে নিজের জন্মতিথিতে নিজের আত্মজীবনী লেখা শুরু করলেন ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়। আজ রইলো আত্মজীবনী ইন্দু বিন্দুর পঞ্চম পর্ব।



শীত  বিলাসী
  

উত্তুরে হাওয়ায় ভাসতে শুরু হয়েই ফুরিয়ে যায় আদরের শীতের পৌষের ডাক। লেপ বালাপোষের ওম নিতে নিতেই উধাও হয় অমৃত কমলার মিষ্টি দুপুর। তবে শীতের মিঠে রোদে পিঠ দিয়ে বসে চষি পাকানো, মোয়া গড়া কিম্বা পুলিপিঠে গড়তে গড়তে মেয়েলি গল্প? তা কিন্তু ফুরোয়না। বছরের পর বছর জিইয়ে থাকে বাংলার গৃহিণীদের হাতের যাদুতে আর জয়নগরের মোয়ার শীতের প্যাকেজে।  কথায় বলে “মাঘের শীত বাঘের গায়’  আর পোষের শীত ? খেজুরের গুড়ে, পিঠেপুলিতে, নলেনগুড়ের পায়েসে আর পাটালীতে।
 
“পৌষ পার্বণে পিঠা খেতে বসি খুশিতে বিষম খেয়ে
আরো উল্লাস বাড়িয়াছে মনে মায়ের বকুনি পেয়ে।”

কবি সুফিয়া কামাল ‘পল্লী মায়ের কোল’ কবিতায় গ্রাম বাংলার পৌষ পার্বণে পিঠে খাওয়ার চিরন্তন রূপটি এঁকেছেন এভাবেই।আবহমান কাল ধরে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী খাদ্য তালিকায় পিঠের উল্লেখ এপার, ওপার দুই বাংলারই লোকজ ও নান্দনিক সংস্কৃতিরই বহিঃপ্রকাশ। বাংলা সাহিত্যেও এর উল্লেখ রয়েছে। কৃত্তিবাসের ‘রামায়ণ’-এ যেমন বাঙালির খাদ্য তালিকায় ‘দধি পরে পরমান্ন পিষ্টকাদি যত’ আছে তেমনি মহাভারতে দময়ন্তীর বিবাহভোজের বিবরণেও ‘সুমিষ্ট পিষ্টক এবং দই’-এর কথা রয়েছে। ময়মনসিংহ গীতিকায় ‘কাজলরেখা’-য় পিঠা হয়ে উঠে অমৃত সমান।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মশাই তো শীতের পিঠে খেতে একবার গ্রামের বাড়িতে যেতে না পেরে আক্ষেপ করে বলেই ফেলেছিলেন, “এবার বছরকার দিনেরে ভাই জুটলো নাকো পুলি পিঠে।”
এমনকি রবিঠাকুরের সেই বিখ্যাত কবিতা? অঞ্জনি নদী তীরে চন্দনী গাঁয়ে তেও পাই  

“চিঁড়ে মুড়কিতে তার ভরি দেন ঝুলি,
পৌষে খাওয়ান ডেকে মিঠে পিঠে-পুলি”

আমাদের দুই বাংলাতেই অপর্যাপ্ত খেজুর গাছ আর তার হাত ধরে কুয়াশার পরত ছিঁড়ে খুঁড়ে  ঘুম ভাঙে কোলকাতায় । হ্যালোজেন নিভে যায় । বাঙালী কান পেতে রয় । উশখুশ প্রাণ বলে, খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো মন । মফস্বলের দিকে কাকভোরে ঘন কুয়াশার আঁধারেই  “চাই রস’  বলে সেই বিখ্যাত হাঁক? এখন আর শুনি কই?  রোদ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই খেজুর রস গেঁজে তাড়ি হয় । সেই খেজুর রস জাল দিয়ে প্রথম দফায় পয়রা বা পয়লা গুড় আমাদের বড্ড প্রাণের। এ যেন অল্পদিনের অতিথি। একে ছেড়ে দিলে আর পাবনা সারাটি বছর তাই যতই  দাম হোক গেরস্থ তার সাধ্যমত একটি ছোট্ট মাটির নাগরী খড়ের বিঁড়ের ওপর বসিয়ে বাড়ি বয়ে আনবেই। রান্নাবান্নার ঝুটঝামেলা নেই। রুটি, লুচি, পরোটা দিয়ে দিব্য চলবে পয়লাগুড়। বিদেশের মেপল সিরাপ যেন। ওরা খায় প্যানকেক, ওয়েফল দিয়ে। আর শেষ পাতে যদি থাকে পিঠে।

সেই খেজুর রস জাল দিয়ে ঘন করে মাটির সরার মধ্যে থরে থরে পাটালি গুড় তৈরী হয়। কিছুটা আধাঘন গুড় বিক্রী হয় খেজুরের গুড় হিসেবে। সেটা বেশ অনেকদিন রেখে খাওয়া যায়। মূলতঃ পৌষমাসের সেরা উত্সব মকরসংক্রান্তিতে সেই খেজুরের গুড় দিয়েই পিঠেপুলি বানানো হয়। মোয়া তৈরী হয় হরেক কিসিমের। নবান্নের নতুন ধানের গন্ধ তখনো লেগে থাকে চিঁড়ে, মুড়ি আর খইয়ের গায়ে। নতুন ধান আর নতুন গুড়ের সুঘ্রাণে পরতে পরতে শীতের রূপ হয় খোলতাই।  পৌষলক্ষীর বরণডালা উপচোয়  সোনার ফসলে। আনন্দে কবি বললেন, মরি হায় হায় হায়। এতে মরার একটাই কারণ কাজের চাপে শীত ফুরায়। আর শীত ফুরোলে কি আর থাকে বাঙালীর কপালে? চলে যায় মরি হায় নলেন গুড় আর চালের গুঁড়ির জম্পেশ কেমিষ্ট্রি।  
আমাদের ঘটিবাড়ি খুলনা জেলার সাতক্ষীরার ঐতিহ্য মেনে এখনো পৌষসংক্রান্তিতে নতুন ধান দিয়ে পৌষলক্ষীর পুজো করে। আর সেই পুজোয় মুখ্য ভোগ হল নতুন গোবিন্দভোগ চাল দিয়ে  নলেন গুড়ের পায়েস আর তার মধ্যে হাবুডুবু খাওয়া তুলতুলে নরম দুধপুলি। মা লক্ষী কৃপা করলে সারাজীবন ধরে বংশ পরম্পরায় যেন এই ভোগ নিবেদন করা যায়, এমনি বিশ্বাস ছিল আমাদের ঠাকুমার। নতুন গুড়ের পায়েসের গন্ধে শিকেয় উঠত জ্যামিতি পরিমিতি ।
পুলিপিঠে বানাতে বসে ঠাকুমা বলতেন রিভেঞ্জ নেবার এক গল্প।  
এক দজ্জাল শাশুড়ি তার নিরীহ বৌমাটিকে অত্যাচার করত। দাপুটে শীতে গাদা গাদা পিঠে বানাতেই হত। একদিকে সংসারের সমস্ত কাজ, তায় আবার একাধিক কাচ্চাবাচ্চা সামলিয়ে নিদারুণ শীতে নিজের পিঠে পিঠে রাঁধার চাপ নিতে হত। বৌটি মুখে প্রতিবাদ করতে পারতনা। এক শীতে সে ঠিক করল দুধ ঘন করে, পাটালী দিয়ে ফুটিয়ে নিয়ে এক জব্বর দুধপুলি বানিয়ে শাশুড়িকে খাইয়েই ছাড়বে। রান্নাঘর, ভাঁড়ার ঘরের আশপাশ থেকে ছোট্ট ছোট্ট দুধসাদা নেংটি ইঁদুর ধরে এনে সেই ফুটন্ত দুধের পায়েসের মধ্যে ফেলে দিল ইঁদুরগুলিকে। অন্ধ শাশুড়িকে শীতের রাতে জামবাটি ভরে সেই দুধপুলি খেতে দিল। শাশুড়ি হাত ডুবিয়ে সেই নরম তুলতুলে পুলি খায় আর ইঁদুরের লেজগুলি ছুঁয়ে বলতে থাকল,
‘ কালে কালে কতই হল, পুলিপিঠের লেজ গজালো ‘  
এমন কাহিনী আজ হয়ত অচল । বদলেছে শাশুড়ি-বৌয়ের গল্প অন্য আঙ্গিকে। তবে পিঠেপুলি বানাতে বানাতে এমন মুখরোচক গল্প শোনাটাও ছিল আমাদের উপরি পাওনা। আর এইসব কাহিনীর জন্যেই বুঝি লোকমুখে ছড়িয়ে গেল
 “কারও পোষ মাস, কারও সব্বনাশ ” এর মতন প্রবাদ।

ধান-চালের সঙ্গে বাঙ্গালির সম্পর্ক বহুদিনের। ধান চাষের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের প্রমাণও মিলেছে। পান্ডুরাজার ঢিবিতে পাওয়া প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে আমরা জানা যায় আনুমানিক  দু’হাজার বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষরা ধানের আবাদ করত। সেই ধানের বীজ মৃৎপাত্রে তারা সংরক্ষণ করত। পৌষমাস হল লক্ষ্মী মাস। তাই চৈত্র আর ভাদ্রের মতোই পৌষমাসের লক্ষ্মী পুজোর চল বাংলার ঘরে ঘরে।
 
‘বুড়ি চাঁদ গেছে বুঝি বেনো জলে ভেসে, চমত্কার!
ধরা যাক দু-একটা ইঁদুর এবার।’

জীবনানন্দ দাসের লেখা কবিতা। উপরে উল্লিখিত সেই বুড়ি শাশুড়ি বুঝি তাই পুলির মধ্যে হাত ডুবিয়ে ইঁদুর ধরতে যেতেন।
পৌষ মাসে ঘরে ঘরে নতুন চালের সেই উত্‍সব বঙ্গদেশে এভাবেই রূপ পায় ‘পিঠে সংক্রান্তি’-র। অগ্রহায়ণ-পৌষের সোনালী উৎসব যেন ধানের শীষের ডগায় সেই বার্তা বয়ে আনে… ‘নতুন ধান্যে হবে নবান্ন’- যেখানে পিঠেপুলিই প্রধান উপকরণ।
পৌষ বা মকর সংক্রান্তিতে সূর্য ধনু রাশি থেকে মকরে সঞ্চারিত হয়, তাই এর নাম ‘মকর সংক্রান্তি’। একে ‘উত্তরায়ণ সংক্রান্তি’-ও বলে, কারণ এই দিন থেকে সূর্য উত্তরায়ণের দিকে যাত্রা শুরু করে।
এই সংক্রান্তির ব্রাহ্মমুহূর্তে যমুনা নদীতে মকর-স্নান করলে আয়ুবৃদ্ধি হয় এই বিশ্বাসে মাতা যশোমতী বালক কৃষ্ণকে স্নান করাতে নদীতে নিয়ে যান। পরে এদিনেই যমুনায় স্নান সেরে শ্রীকৃষ্ণ শ্রীমতি রাধিকার সঙ্গে ‘মকর-পাতায়’। এ হল আত্মার সঙ্গে আত্মার দৃঢ় বন্ধন স্থাপন।
বাংলার অনেক স্থানে একসময় কুমারী মেয়েরা এইদিন থেকে কনকনে ঠান্ডার ভোরে একমাস ব্যাপী মকরস্নান-ব্রত শুরু করতো। আলস্য, নিদ্রা, তন্দ্রা, জড়তা-তামসিকতার রিপুগুলিকে জয় করার এ ছিল এক সংগ্রামী মনোবৃত্তি।
সেসময় ছড়া গেয়ে পাঁচ ডুব দেওয়ার নিয়ম ছিল:

“এক ডুবিতে আই-ঢাই
দুই ডুবিতে তারা পাই।
তিন ডুবিতে মকরের স্নান
চার ডুবিতে সূর্যের স্নান।
পাঁচ ডুবিতে গঙ্গাস্নান।”

এছাড়া সূর্যের উত্তরায়ণের শুরু মানে শীতের শুষ্কতা, দাপট কাটিয়ে প্রকৃতির আবার শস্যশ্যামলা হয়ে ওঠা। লোকমতে সূর্যের উত্তরায়ণ শুরু হতেই খুলে যায় স্বর্গদ্বার। টানা ছ’মাস বিশ্রাম নেওয়ার পর দেবতাদের শক্তিতে নাকি ‘মরচে’ পড়ে। তাঁদের শক্তি ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অশুভ শক্তির বিনাশ করে শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজন হয় যজ্ঞ, পূজার্চনার। আর সেই পুজো সুস্বাদু মিষ্টান্ন প্রসাদ ছাড়া অসম্পূর্ণ।তাই পৃথিবীবাসী দেবতাদের তুষ্ট করতে প্রস্তুত করে থাকেন নানা আকারের সুস্বাদু পিঠেপুলি।

পৌষ সংক্রান্তিতে পৌষ লক্ষ্মীর পুজো বাংলার ঘরে ঘরে প্রচলিত।
মকর সংক্রান্তিতে কেউ ওড়ায় ঘুড়ি। আটপৌরে বাঙালীর নতুন ধানে, নতুন খেজুরের গুড়ে  পিঠে সংস্কৃতি যেন তাদের বাৎসরিক সংস্কার। আর যাঁদের পৌষলক্ষ্মীর পুজো আছে তাঁরা সেই পিঠে মা লক্ষ্মীকে নিবেদন করে তবেই মুখে তোলেন ।

সদ্য ওঠা ধানের বেদীতে লক্ষ্মীর আসন। তার হাতের সিঁদুর কৌটো, পায়ের পাশে উপবিষ্ট পেঁচা, কুনকে ভরা ধান,  সবকিছুই পাতা নতুন ধানের বিছানায়। লক্ষ্মীর হাঁড়ির সারা বছরের ধান বদল করে নতুন ধান দিয়ে পূর্ণ করা হয়।  একটি জলপূর্ণ ঘটে স্বস্তিকা এঁকে  সিঁদুর ফোঁটা দিয়ে আমশাখা, কলা অথবা ডাব রেখে লক্ষ্মীর ঘট পাতা হয়  বাকী আর সব লক্ষ্মী পুজোর মত। বাকী সব উপচার অর্থাত পিটুলি গোলার আলপনায় লক্ষ্মীর চরণ ফুটে ওঠে বাড়ির আনাচেকানাচে। লক্ষ্মী, কুবের, নারায়ণ এবং ইন্দ্রের জন্য আতপচালের চারটি নৈবেদ্য দিতে হয়।  ইনি হলেন পৌষলক্ষ্মী, ঘটিদের কুললক্ষ্মী বা সর্বজনীন কৃষি লক্ষ্মী। কেউ আবার এই কৃষিজ লক্ষ্মীকে লাঙ্গল চালনার ফলে উত্পন্না সীতার অবতার বলে মনে করেন। আর হলকর্ষণের ফলে উত্পন্ন হয় সোনার ধান। তাই তো পৌষলক্ষ্মীর পুজো।  পৌষমাসের শুক্লপক্ষের বৃহষ্পতিবারে অথবা সংক্রন্তির দিনে এই লক্ষ্মীপুজো হয় । নতুন চাল এবং নতুন গুড় দিয়ে পিঠেপায়েস বানিয়ে নিবেদন করা হয়।
মকরসংক্রান্তির পুণ্যলগ্নে গঙ্গায় মকর স্নান করে পিতৃপুরুষের রসনা তৃপ্ত করতেও তাঁদের অনেকে পিঠেপুলি নিবেদন করে থাকেন।
পৌষসংক্রান্তির আগের দিন থেকে পরের দিন অর্থাত মোট তিনদিন ধরে চলে আমবাঙালীর পিঠে-উত্সব। দুধ, নারকেল আর নতুনগুড়ের বিক্রিবাটরায় হৈ হৈ  তলা লেগে যাওয়া ঘন দুধের গন্ধে ম ম করা ঘরবাড়ি আর বার্কোশ পেতে কুরুনিতে নারকেল কোরার খসখস শব্দ?

পিঠে-পুলি মানেই আদরের, স্নেহের আর ভালবাসার স্পর্শ। মামারবাড়িতে দিদিমার সে এক হৈ হৈ জগ্যি পৌষসংক্রান্তির দিনে। বিশাল রান্নাঘরের মধ্যে কয়লার উনুন জ্বলছে গাঁকগাঁক করে। দুটো  ষন্ডামার্কা লোক বড়বড় কাঠের বার্কোশে কলাপাতা বিছিয়ে নারকেল কুরছে। উনুনে কালো লোহার কড়াইতে দুধ ঘন হচ্ছে।  আগের রাতে ভেজানো নতুন চাল শিলে বাটছে দুজন মেয়ে। এবার সেই চালের গুঁড়ি ঠাণ্ডা জলে মসৃণ করে গুলে ঘি দিয়ে উনুনে বসিয়ে নাড়া । এবার সোনার মত চকচকে করে মাজা পেতলের পরাতে ঘি মাখিয়ে সেই চালের মণ্ড ঢেলে দিলেন দিদিমা । সঙ্গে সঙ্গে ঠাণ্ডা হাতে গরমের ওম মেখে, ময়দা মাখার মত ঠেসে নিলেন সেই চালের মণ্ড। ছোট ছোট লেচি বানিয়ে ভেজা মসলিন কাপড়ে ঢেকে রাখলেন তা। ততক্ষণে কালো লোহার কড়াইতে খেজুরের গুড় জাল দিয়ে নারকেল মিশিয়ে ছেঁই প্রস্তুত। বাড়ীর কচিকাঁচাদের হাতে নারকেল নাড়ু সম সেই ছেঁই চাখার জন্য একটু করে দেওয়াও হল । এই ছেঁই হল পিঠের পুর। এই বানিয়ে রাখা হল। চলবে একমাস ধরে। ছেঁই ঠাণ্ডা হতেই চালের মণ্ডের লেচি হাতের তেলোয় নিয়ে একটু করে ছেঁই ভরে পুলিপিঠের মুখ বন্ধ করার পালা। ফিডিং বোতলের আকারে আলতো হাতে ছোট্ট ছোট্ট পুলি গড়ে ফেললেন দিদিমা তাঁর শৈল্পিক অনুভূতিতে। আধাঘন ফুটন্ত দুধে সেই  পুলিগুলো ছাড়লেন  ধীরে ধীরে । আর হাতা দিয়ে  আলতো করে মাঝেমাঝে নেড়ে দিলেন ।  কি সুন্দর হেঁশেল পারিপাট্য! খেজুরের গুড় ভর্তি বয়াম থেকে পরিমাণ মত গুড় দুধে ফেলে সমান ভাবে মিশিয়ে দিলেন ।  সারাবাড়ি ম ম করছে দুধপুলির আগাম আগমনীবার্তায় । ক্ষীরসমুদ্রে ভাসমান পুলি নিয়ে তখনো সংশয়ে দিদিমা। পুলি ফেটে গেলে চূড়ান্ত ডিস্ক্রেডিট।  সেই দুজন ষন্ডামার্কা লোক এসে পেল্লায় লোহার কড়াইটাকে নামিয়ে দিল মাটিতে।

কিছু পুলিপিঠে  গড়ে রাখা হল সেদ্ধ বা ভাপানো হবে বলে। সেদ্ধপুলি হল বাঙালীর মিষ্টি মোমো। পেল্লায় হাঁড়ির মুখে জল ফুটবে। আর সাদা নরম কাপড়ে পুলিগুলোকে বেঁধে হাঁড়ির মুখে স্টীমারে ভাপানো  হবে। তারপর সেদ্ধপুলি খাওয়া হবে বাটি ভর্তি করে পাতলা পয়রাগুড়ে চুবিয়ে।  

কিছুটা চালবাটা আর কলাইয়ের ডালবাটা মিশিয়ে রাখা হল একটি গামলায়। তা দিয়ে বানানো হবে সরুচাকলি। দক্ষিণী দোসার অনুরূপে পাতলা পাতলা সেই দোসা বা বিদেশের ক্রেপ খাওয়া হবে পৌষসংক্রান্তির রাতে। আবারো পয়রাগুড়ে চুবিয়ে। তবে পিঠে উত্সবের মধ্যমনি হল পাটিসাপটা। ঐ যে নারকোল আর খেজুর গুড়ের ছেঁই বানিয়ে রাখা হল সেই ছেঁইতে একটু খোয়া ক্ষীর মিশিয়ে মসৃণ করে আরেকটা রাজকীয় কেমিষ্ট্রি তৈরী হল । সেটি হল পাটিসাপটার পুর। এবার পাটিসাপটার ব্যাটার বা গোলা তৈরীর পালা।  আমাদের ঘটিবাড়ির পাটিসাপটা এতটাই নরম ও তুলতুলে হয় যে তা পরেরদিনও দিব্যি গরম করে নিয়ে খাওয়া যায়। আর এখন ফ্রিজের দৌলতে গোলা বানিয়ে ঠান্ডায় রেখে দিলে রোজ বানিয়ে খাওয়া যেতেই পারে গরমাগরম এই পিঠে। গোলার কেমিষ্ট্রি তৈরী হয়  ঠান্ডা দুধ, সম পরিমাণ সুজি-ময়দার মসৃণ মিশ্রণে সামান্য চালের গুঁড়ো, একটু পাতলা খেজুর গুড় আর অল্প ঘি দিয়ে ।  ঠিক ভাজার পূর্ব মূহুর্তে গোলায় ছড়িয়ে দাও বড়দানার সামান্য চিনি।  কারণ  গোলারুটিতে একটা ফুটোফুটো ভাব আনার জন্য। এখন ছুটছি সকলে। তাই টেফলনই ভরসা। বেশ করে ননস্টিক তাতিয়ে নিয়ে বেগুনের বোঁটায় করে ঘি মাখিয়ে নেওয়া আর হাতায় করে গোল দেওয়ার পর দেশলাই বাক্সের খোলের ভেতরটা  দিয়ে সেটিকে ডিম্বাকৃতি রুটির আকার দেওয়া। এবার পাতলা সেই গোলারুটির ধার দিয়ে সামান্য ঘিয়ের ছিটে দিয়ে কম আঁচে ভেজে নিয়ে  আগে থেকে বানিয়ে রাখা রাজকীয় পুর চালান হল। তারপর কাঠের তাড়ু দিয়ে হাতের কৌশলে পাশবালিশের আকারে পাটিসাপটা মুড়ে নিতে পারলেই হল বাঙালীর মিষ্টি প্যানকেক।  আজকাল বাজারে যে পাটিসাপটা বিক্রি হয় সেগুলি ঠান্ডায় শক্ত হয়ে যায়। এর কারণ হল ময়দা বা সুজির পরিবর্তে জলে গোলা চালের গুঁড়ি।  

পোষমাসে কখনো খাও ক্ষীর সাঁতারে ডুব দেওয়া দুধপুলি। কখনো কামড় বসাও পাটিসাপটায় অথবা হালকা মিস্টির স্বাদ নিতে সরুচাকলিতে। আর হয় রসবড়া। বিউলির ডাল বাটার ঘন ব্যাটারে, মৌরী আর সামান্য চিনি ছড়িয়ে ( ফাঁপা করার জন্য) সরষের তেলে ভেজে নিতেন বাদামী রংয়ের টোপা টোপা রসবড়া। এটা হল ভাজার গুণ। কম আঁচে মুচমুচে করে ভাজতে হবে, যাতে খেজুরগুড়ের পাতলা রসে ফেললে বড়া আরামে না নেতিয়ে পড়ে । এবার খাও কে কত খাবে।
আরেকটি পিঠে ঘটিবাড়ির স্পেশ্যাল পিঠে হল মুগসামালী। শুকনো খোলায় ভাজা সোনামুগ ডাল সেদ্ধ করতে হবে এমনভাবে যাতে ডাল গলে ঘ্যাঁট না হয় আর শুকনো শুকনো সেই ডালসেদ্ধ ঘিয়ের হাতে আলতো চাপে সামান্য ময়দা আর চালের গুঁড়ো মাখিয়ে নিয়ে গড়তে হবে পুলির আকারে। মধ্যে দিতে হবে সেই আদি, অকৃত্রিম খেঁজুর গুড় আর নারকেলের ছেঁই। এবার পুলির মুখ বন্ধ করে গরম সর্ষের তেলে ভেজে নিতে হবে। পয়রা গুড়ে চুবিয়ে কিম্বা এমনি এমনি‌ ই খাওয়া যায় এই মুগসামালী। অনেক পিঠের মাঝখানে একটু মুখ বদল করতে ময়ান দিয়ে মাখা ময়দার খোলে ঐ ছেঁই চালান করে বানানো হত সিঙাড়া পিঠে।  কেউ মনের আনন্দে পরিপাটি করে গড়েই চলত এই সিঙাড়া পিঠে আর কেউ ভাজত গরম খোলা চাপিয়ে। একই অঙ্গে কত রূপ পিঠের! সৃষ্টিসুখে সামিল হওয়া বাংলার ঘরণীদের কত আইডিয়া মাথায়! অফুরন্ত সময় ছিল তাদের। সংসার ছিল যৌথ। পরিবারের সকলকে নিজের হাতে খাওয়ানো ছিল নেশা।

গ্রামবাংলার মেয়েরা আউনি বাউনি বাঁধতে বাঁধতে ছড়া কেটে পৌষ বন্দনা করেন,
“পৌষ পৌষ, সোনার পৌষ, এস পৌষ যেয়ো না, জন্ম জন্ম ছেড়োনা।
না যেয়ো ছাড়িয়ে পৌষ, সোনার পৌষ যেয়ো না।”

আটপৌরে বাঙালীর এই পিঠে সংস্কৃতি যেন তাদের বাৎসরিক সংস্কার। এজন্য চাল কোটা হয় আগের দিন। চালের গুঁড়ো, ভেজা চাল পাত্রে ঢেকে, তুলসি পাতা আর শুকনো লঙ্কা দিয়ে নিয়ে ঘরে বাইরে যেতে হয়, নইলে তা ভূতে পায়।
মকরসংক্রান্তির কনকনে শীতের ভোরে স্নান সেরে পাটভাঙা শাড়িতে পুজো সেরে ষোড়শোপচারে পৌষ আগলাতেন বাড়ির মহিলারা।কোনও আচার বিচারের ত্রুটি হবেনা আয়োজনে। কোথাও মহিলারা গাইতেন
‘পৌষ মাস লক্ষী মাস না যাইও ছড়িয়া, ছেলেপিলেকে ভাত দেব খান্দা ভরিয়া’। যদিও এমন ছবি এখন ধূসর।তবুও পিঠেপুলির চাহিদা বাংলায় আবহমান কাল ধরে ছিল, আছে এবং থাকবে। শীতকলের খদ্যমেলা, বস্ত্রমেলা, শিল্পমেলা, বইমেলার পাশাপাশি পিঠেপুলির মেলাও তাই দিব্যি স্বমহিমায় আজো বাংলার মাঠেমাঠে।  
কথাতেই বলে একসময় ছিল “মুখ ভরা পিঠেপুলি, আর আকাশ ভরা ঘুড়ি” আজো কোথাও কোথাও মকরসংক্রান্তির দিনে পৌষপার্বণের অন্যতম অঙ্গ হল ঘুড়ি ওড়ানো। শহরে এই ঘুড়ি ওড়ানোর দৃশ্য বিরল হলেও মুখ ভরা পিঠের স্বাদ নিতে পিছিয়ে যায় না বাঙালী।  
আজকাল বিশ্ব উষ্ণায়নের দাপটে শীত আসতে না আসতেই পালিয়ে যায়। ঘরে বাইরে মেয়েদের ব্যস্ততার কারণে মিষ্টির দোকানের ওপর অনেকে ভরসা করেন। বাড়িতে কে আবার পিঠেপুলি বানানোর হ্যাপা সামলায়? তবে দোকানের পিঠের স্বাদ আর বাড়িতে বানানো পিঠের স্বাদে প্রচুর ফারাক। দুধের স্বাদ কি ঘোলে মেটে?
কবি ভাস্কর চক্রবর্তী বেঁচে থাকলে আবারো বুঝি লিখতেন “কবে পিঠে বানাবে সুপর্ণা?”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত