| 3 মার্চ 2024
Categories
ধারাবাহিক সাহিত্য

ইরাবতীর কথা (পর্ব-২)

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

নারীর নিজের মুক্তির জন্য, নিজের স্বাধীনতার জন্য নিজের উপর নিজেকে আস্থা রাখতে হবে, লড়াইটা নিজেকেই করতে হবে। নারীবাদ বলি কী নারী স্বাধীনতা বা নারী মুক্তি- অর্জন না করলে পাওয়া যাবে না। নরওয়ে নারী-পুরুষের সমতার জন্য একটি পারফেক্ট দেশ বলা চলে। তারপরও এই দেশেও তেমন নারীর সাক্ষাৎ মেলে যে নিজে ডাক্তার হয়েও ডাক্তার স্বামীর ভয়ে তটস্ত থাকে।স্বামী শুধু স্যান্ডউইচ দিয়ে লাঞ্চ করতে চায় না বলে স্ত্রীকে সাথে স্যুপও বানাতে হয়। আর এই স্যুপ বানানোটা ভালোবেসে বানানো না রীতিমতো আতঙ্কিত হয়ে বানানো। এর জন্য নিজের অফিসিয়াল কাজ শেষ কোথাও বসে দু’দণ্ড জিরায় না, পাছে বাসার কাজে দেরী হয়ে যায়। অথচ নরওয়ের সমাজে স্বামী-স্ত্রী সপ্তাহের দিনগুলো ভাগাভাগি করে রান্নাসহ ঘরের যাবতীয় কাজ করার নিয়ম। দেখা যাচ্ছে, আইন থাকলেও সব নারী তা যথাযথ নিতে পারছে না। এমন শিক্ষিত নারীকে কে নারী-স্বাধীনতা এনে দেবে বা তার কাছে নারী স্বাধীনতা বা নারীমুক্তির সংজ্ঞা কী কে জানে! ’ইরাবতীর কথা’ ধারাবাহিকে ইরাবতীকে নারীর অনেক না বলতে পারা কথায় ও রূপে সাজিয়েছেন বিতস্তা ঘোষাল আজ থাকছে ইরাবতীর কথা ধারাবাহিকটির ২য় পর্ব।


পালাবি? চল পালাই।

কোথায় পালাবি? কতদূর যাবি! 

জানি না। শুধু ইচ্ছে করে অনেকদূর কোথাও চলে যেতে, যেখানে কেউ কোনোদিন খুঁজে পাবে না। 

তুই মাঝে মাঝে এমন কথা বলিস বুঝে উঠতে পারি না তোকে। 

সব কথা বোঝার কী দরকার! 

তোর মাথাটা আবার বিগড়েছে। এবার ডাক্তার দেখাতেই হবে।

আছে তো আমার ডাক্তার । তুই জানিস না! সারাদিন সারারাত তার সঙ্গে কত কথা বলি, সে মন দিয়ে সব শোনে। জানিস, কাল রাতে সেই আমাকে বলেছে, পালিয়ে যেতে।

এই তুই কোন ডাক্তার দেখাস? সে তোকে পালাতে বলেছে? বলছি দাড়া কাকুকে।

বল, প্লিজ বলে দে। এই চারদেওয়ালের বন্দী জীবন, আমার আর ভাল লাগছে না। আমার দমবন্ধ হয়ে আসছে।

কেউ জানো ইরাবতীকে ডাকছে গভীর স্বরে, আয় আমার সঙ্গে পালাবি। আমি অপেক্ষা করছি তোর জন্য সেই কবে থেকে।

সে এক ঘোরের মধ্যে বলে উঠল, আসছি, দাঁড়াও।   

ওমা মা, কী হয়েছে তোমার! কার সঙ্গে কথা বলছ? ও মা, ওঠ মা। মা কোথায় পালাচ্ছিলে তুমি আমাকে একা রেখে? প্রান্তির গলা। সে মাকে বিস্মিত হয়ে ডাকছে।

প্রান্তির ঝাঁকুনিতে ইরাবতীর ঘুম ভেঙে গেল। প্রান্তি তার একমাত্র মেয়ে। কলেজে পড়ে। ঘোর কাটিয়ে তাকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে বলল, কিছু হয়নি সোনা। ঘুমোও। বলে হাত দুটো ঠোঁটে নিয়ে চুমু খেল।

প্রান্তি ইরাবতীকে শক্ত ভাবে জড়িয়ে ধরল।

ইরাবতীর ঘুম এল না আর। ঘন অন্ধকার ঘিরে রয়েছে পুরো ঘরকে। বুকের ওপর হাত রেখে আবার ঘুমিয়ে গেছে প্রান্তি।

সে বুঝে উঠতে পারছে না একটু আগে কে তাকে ডাকল! মাথাটা ভারী লাগছে। কাকে বলছিল সে পালাবার কথা! কার সঙ্গে পালাতে চাই! কেন একটা মেয়ে বারবার মা মা বলে ডেকে সামনে এসে দাঁড়ায়! সেই মেয়েটা তো প্রান্তি নয়।   

এই মেয়েটা কী তবে সেই? তিনমাস পেটের মধ্যে বাড়ার পর চলে গেল। ওর কী হাত পা মুখ চোখ গড়ে উঠেছিল? না- না তা কী করে সম্ভব! সেতো নিজে থেকেই চলে গেছিল। কিন্তু সে কী মেয়ে ছিল? কিছু বুঝে ওঠার আগেই চলে গেল সে। ছেলে না মেয়ে তাও জানা হয় নি। 

আদৌ কী সেটা কোনো ভ্রূণ ছিল! ইরাবতী চোখ বন্ধ করে মনে করার চেষ্টা করল । পুরুষ ছাড়া কী সন্তান আসতে পারে? ঐহিকের সঙ্গে তেমন কোনো সম্পর্ক আর অবশিষ্ট ছিল না। সে তখন অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে গেছিল। ইরাবতী বা প্রান্তি কাউকেই সে আর মেনে নিতে পারছিল না। ইরাবতী বালিশটা আকঁড়ে ধরল।

 বিছানার উপর ঐহিকের পাশে . . . ।

অফিস থেকে ফিরে প্রতিদিনের মতই নিজের বেডরুমে ঢুকতে গিয়ে হোঁচট খেয়েছিল ইরাবতী। তার ঘরে তার বিছানায় ঐহিকের সেক্রেটারি। তাকে দেখেও দুজনের কোনো হেলদেল হল না। 

ঘেন্নায়, অপমানে সেদিন মরে যেতে চেয়েছিল। পারল না। বড় পিছুটান। মেয়ে, আর বাবা। দুদিন বাদেই ঐহিক ইউরোপ চলে গেল, সঙ্গে সেই মেয়েটি। তাও মেনে নিচ্ছিল সে। এমন তো কতই হয়! পারল না আর যখন ফিরে এসে ঐহিক বলল, তুমি নোংরা, তাই আমাকে সন্দেহ করছ।

ইরাবতী সেদিন আর মেনে নিতে পারেনি। প্রান্তিকে নিয়ে বাড়ি ছাড়ল। আর তার কদিনের মধ্যেই জানা গেল ঐহিকের সঙ্গে শেষ মিলনের সময়…

চলে গেছিল সে। কদিনের অতিথি । চায়নি ইরাবতীকে আর যন্ত্রনা দিতে।

কিন্তু …চোখ খুলে ফেলল ইরাবতী। ফুল স্পিডে এসির মধ্যেও ঘামছে সে। বিছানা ছেড়ে উঠে বাথরুমে গেল। চোখে মুখে ঘাড়ে জল দিল। খানিকটা জল মুখে চালান করে ফিরে এল বিছানায় ।

একটাই সান্তনায়, ঐহিকের কোনো সেক্রেটারি আর এই বিছানায় শোয় না। এই বিছানা, খাট শুধু তার, আর প্রান্তির।

আমি যদি পারতাম নষ্ট মেয়ে হতে, কেমন হত! আমি নষ্ট হতে চাই। ভালো মেয়ে  ভালো বৌ়য়ের  ইমেজ ছেড়ে কাউকে তীব্র ভাবে চাই। শরীর দিয়ে চাই। মন দিয়ে চাই। মেধা দিয়ে চাই। কেন যে পারি না! কেন আমি নষ্ট হতে পারি না! নিজের মনে বলতে বলতে ইরাবতী কাদঁতে লাগল। তারপর প্রান্তিকে নিজের বুকের মধ্যে তীব্রভাবে জড়িয়ে ধরল।

খবরে প্রকাশ সে বছর ইরাবতীর জল ফুলে ফেঁপে ভাসিয়ে দিয়েছিল দিগ্বিদিক। 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত