| 3 মার্চ 2024
Categories
প্রবন্ধ সাহিত্য

হুমায়ুন কবিরের কাব্য

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

ম.মীজানুর রহমান 

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি লক্ষ্যযোগ্য বিষয় হচ্ছে- কাব্য দিয়েই তার কারুকার্য আর তার শিল্পকর্ম। বিষয়টি ঐতিহাসিকও বটে। বাংলা সাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত বইতে ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় শুরুতেই ভারি চমৎকার লিখেছেন, ‘পূর্বভারতের একটি বিশিষ্ট ঐতিহ্যমণ্ডিত ভৌগোলিক সহাবস্থানের মধ্যে এক-ভাষাভাষী সংহত নৃগোষ্ঠীর মধ্যে প্রায় সহস্রাধিক বছর ধরে যে জীবনাদর্শ, আদিমানসিক স্বরূপ ও শিল্পসমুৎকর্ষ বিকাশ লাভ করেছে তার শ্রেষ্ঠ প্রতীকের নাম বাংলা সাহিত্য।
এই কথার নির্যাসটুকুতে আমরা পাই বাঙালির কাব্যাশ্রিত সাহিত্যের স্বরূপ। কারণ পুঁথিসাহিত্য সম্পূর্ণভাবেই কাব্যিক। আর এই কাব্য-মানসিকতা নিয়েই বাঙালি কবি-সাহিত্যিকের সাহিত্যজীবন শুরু। সেই কবেকার মহাপ্রাচীনকালের সাথে যে আধুনিক বাংলা কাব্য সাহিত্যের যোগসাজশ রয়েই গেছে তার ব্যতিক্রম তো আর খুঁজে পাইনে।
হুমায়ুন কবিরের সাহিত্যজীবন শুরু হয়েছে গান আর কবিতা লিখে। তা হয়তো তার কালে রবীন্দ্রধারাশ্রয়ী; কিন্তু যথার্থ মৌলিকত্বে রোমান্টিকতায় তিনি ছিলেন ভরপুর। তার গান প্রকাশিত হয় ১৯২৬ সালে। কবিতার বই ‘স্বপ্নসাধ’ প্রকাশিত হয় ১৯২৭ সালে প্রথম সংস্করণ, দ্বিতীয় সংস্করণ ১৯৪০ সালে এবং তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৫৫ সালে। এর মধ্যে তার আরেকটি কাব্যগ্রন্থ সাথী প্রকাশিত হয়েছে ১৯৩১ সালে। তিনি ইংরেজি ভাষায়ও লেখেন পোয়েমস প্রকাশিত হয় ১৯৩২ সালে। তার শেষ কাব্যগ্রন্থ অষ্টাদশী প্রকাশিত হয় ১৯৩৬ সালে। ১৩৬১ সালের মাসিক বসুমতিতে প্রকাশিত হুমায়ুন কবিরের গ্রন্থপঞ্জির অন্তর্গত পদ্মা কাব্যগ্রন্থের উল্লেখ ছিল। যা-ই হোক, হুমায়ুন কবির যে আজীবন কাব্যমনস্ক ছিলেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তার লেখা দেশী-বিদেশী ভাষায় রচিত কাব্যবিষয়ক প্রবন্ধাবলি তারই ইঙ্গিত বহন করে। এ দু’টি ভাষায় যে তার অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল তার বিভিন্ন রচনা ও বক্তৃতা সঙ্কলন তার সাক্ষ্য দেয়।
আবেগের উচ্ছ্বাসে উচ্ছ্বসিত বাঙালি কবি-প্রাণের দিশা তার মনের মধ্যে যে আপনজন হয়ে বাস করছিল, তা তিনি অকপটে বলেছেন বাঙলার কাব্যে (প্রথম সংস্করণ ১৯৪৫)। বইটির বহু সংস্করণ আজো বাঙালিপ্রাণকে যে হিল্লোলিত করে এতে কোনো অত্যুক্তি নেই। আর কবি হুমায়ুন কবিরকে এখানে আবিষ্কার করা কোনো দুঃসাধ্য ব্যাপার নয়। বাংলার কবি হুমায়ুন কবির নিঃসংশয়েই বলছেন, ‘বাঙলা চিরদিনই কবিতার দেশ। একমাত্র প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বৈচিত্র্যই বাঙালিকে কবি করেনি- তার কবি প্রতিভার মূলে মননরীতির বৈশিষ্ট্যও সমানই পরিস্ফুট।’
বাংলার প্রাকৃতিক লীলাবৈচিত্র্য, আবহাওয়া আর তার সাথে সাথে মানুষের স্বভাবের বৈচিত্র্য লক্ষযোগ্য। হুমায়ুন কবিরের আপন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে যে কবিমনস্কতা বিরাজমান ছিল তা যেমন সব কবির মধ্যে সমভাবালুতায় পর্যবসিত নয়, তেমনি বাংলার সব মানুষও ঠিক কবিদের অন্তর্গত নন। তবে পরিবেশ পরম্পরায় কবিদের প্রতি আনুকূল্য প্রদর্শনেও সবাই যে সমদর্শী হবেন তা-ও এ সমাজে আশা করার নয়।
সমাজ বিপ্লবের ধারায় রাষ্ট্রীয় বিপ্লব যুগে যুগে কার্যকর হয়েছে, উত্থান-পতন ঘটে আসছে মানুষের শাস্ত্রীয় সঙ্ঘাতে, শাসনের সঙ্ঘাতে, ন্যায়-অন্যায়ের তারতম্যে আর তার সাথে সম্পর্কযুক্ত হয়ে আসছে যুগের সাহিত্য, শুধু তা কাল্পনিক আকাশে বসবাসের নয়, বাস্তবের অভিঘাত। হুমায়ুন কবির ঐতিহাসিক পরম্পরায় বাংলার কাব্যধারার মূল্যায়ন করে গেছেন, আর্য-অনার্য রক্তমিশ্রণ বাঙালির চারিত্রিক অসামঞ্জস্য তার সাহিত্যভাবের অনুকূলে কিংবা প্রতিকূলে প্রবাহিত হয়েছে, হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ প্রভৃতি ধর্মীয় কৌলীন্যের ভেদ-বিভেদ সাহিত্যকেও সংক্রমণ করতে ছাড়েনি, তা ভুলে হোক কিংবা ঠিক হোক, মানবতা জাতপাতের আড়ালে হয়েছে ভূলুণ্ঠিত, রক্তাক্ত।
হুমায়ুন কবির ইতিহাস ও দর্শন পাশাপাশি দেখেছেন বাংলার কাব্যে; তাই তার প্রসঙ্গান্তরে মূল্যায়ন ছিল নানা সমাজ বিপ্লবের ভাষা। তার হিন্দু, বৌদ্ধ ও ইসলাম ধর্মের আনুষঙ্গিক বাংলার প্রতিক্রিয়াও লক্ষযোগ্য এখানে। হিন্দু অভ্যুত্থানের প্রাবল্যের যুগে কালপ্রবাহকে ফেরানোর চেষ্টা হয়েছিল, সংস্কৃতির পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে বাঙলার মানসকে সংস্কৃতের মধ্য দিয়ে প্রকাশের চেষ্টাও প্রবলতর হলো, কিন্তু বিপ্লবী পূর্ব বাঙলায় বৌদ্ধমানস জনসাধারণের অবচেতনার মধ্যে মজ্জাগত, সেই প্রচ্ছন্ন চিত্তসংগঠন বদলাতে হলে যতখানি সময়, যতখানি সুযোগ ও যতখানি সুবিধার প্রয়োজন, বাঙলার হিন্দু অভ্যুত্থান তা পায়নি। জয়দেবের গীতিগোবিন্দ তাই স্ফুলিঙ্গই রয়ে গেল, দাবানল হয়ে জ্বলে ওঠার অবকাশ পেল না। সংস্কৃত ভাষাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টাও তাই মোসলেম বিজয়ের সাথে সাথে আবার পরাজিত হলো, বাঙালির চিত্তও প্রাচীন সংস্কার ও শাস্ত্রশাসনের বন্ধন থেকে মুক্তি পেল। বাঙলার কাব্যসৃষ্টির প্রথম প্রকাশ তাই বৌদ্ধ দোঁহায়- তারই মধ্যে উত্তর ভারতীয় সংস্কৃতির বিরুদ্ধে বাঙালির বিদ্রোহ আপনাকে প্রথম প্রতিষ্ঠা করল।
এরই মধ্যে ইসলামের সাম্যবাদ অসম-সমাজমনস্ক অভিজাতদের কাল হয়ে দাঁড়াল। সুবিধাবঞ্চিত জনসাধারণ ইসলামের আদর্শের প্রতি আকর্ষিত হলো, শুরু হয়ে গেল ধর্মান্তরণ। হিন্দুসমাজে জাতপাত বিচারে মানুষকে মানুষ হেয়প্রতিপন্ন করত, তা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব শুধু ইসলাম ধর্মে। এই অভিজ্ঞানে হিন্দু ধর্মের বিনাশ লক্ষ করে আরেক ধর্মরক্ষক সমাজ এলো হিন্দুদের অবহেলিতজনদের মধ্য থেকে। আর তারই নেতৃত্ব দিলেন চৈতন্য দেব আর তার ধর্ম বৈষ্ণব, সেই সাথে তার গান ও কাব্য। চণ্ডিদাসের আবির্ভাব। আর তাতে অস্পৃশ্য মুসলমানের যোগদানে কোনো বাধা নেই। মেতে উঠল অন্তজ শ্রেণী ব্যাপকভাবে। শাস্ত্রীয় জটিলতা অতিক্রম করে সাধারণ মানুষ লৌকিক সহজিয়ায় গা ভাসাতেই বরং আগ্রহী, বৈষ্ণব প্রক্রিয়া তাই দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়ে গেল। বাংলায় বৈষ্ণব কবিতা বাংলা সাহিত্যে নতুন ও চিরায়ত রূপ পরিগ্রহ করল। আর তা ছিল অতি সাধারণ।

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত