| 22 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
গদ্য সাহিত্য

আমার মায়ের গল্প

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

মাকে নিয়ে লিখতে গেলে একটা সমস্যায় পড়ে যাই। এত কথা একসাথে মনে পড়ে যে কোনটা রেখে কোনটা লিখব ঠিক করে ভেবে উঠতে পারিনা। সব কথারা এসে ভীড় করে মনের জানালায়। প্রায়শই ভাবি,যে প্রত্যন্ত এলাকায় আমাদের জন্ম সেখান থেকে লেখাপড়া শেষ করাটা একটা ধাঁধা নয় কি? আমরা মানে আমরা চার ভাই। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন যে পরিবেশে আমাদের জন্ম সেখান থেকে আমরা কৃষক বা মৎস্যজীবী জেলে হয়ে জীবন পার করে দেওয়াটাই হত যুক্তিযুক্ত। কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি সন্তানকে মানুষ করার প্রত্যয়ে পিতা মাতার অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকার কারণে। চরম দারিদ্র্যের সেই সময়ে পিতার সাথে কৃষি কাজ করাটাই ছিল সহজ সিদ্ধান্ত কিন্তু বাবা মা সেই সস্তা লাভের পথে হাঁটেননি। আমার মায়ের ভালোবাসার গভীরতা অন্যরা হয়ত ঠিকমত বুঝতে পারবে না। তাদের কাছে অনেকটা হৃদয়হীন ব্যাপার বলে মনে হবে। কারণ যে বয়সে সন্তানদের মায়ের আঁচলের তলায় রাখার কথা সেই বয়সে তিনি তাদের পাঠিয়েছেন দূর গাঁয়ে পড়াশোনার জন্য। মায়ের এই সিদ্ধান্তের কারণে হয়তো আজ সবাই পড়াশোনাটা শেষ করতে পেরেছি।

আমাদের বাড়িতে অনেক ফলের গাছ আছে। গ্রীষ্মের মৌসুমে প্রচুর মৌসুমি ফল হয়। কিন্তু মাকে কখনো ভাল পাকা আম, বেল, পেয়ারা খেতে দেখিনি। তিনি সব জমিয়ে রাখতেন সন্তানদের জন্য। বাড়িতে যাওয়ার কথা থাকলেও পড়াশোনার কারণে সময়মতো যাওয়া হত না। তখন তো আর মোবাইলের যুগ ছিলো না। আম যথারীতি পচতে শুরু করত আর মা সেই আমের ভাল অংশটুকু খেয়ে পুনরায় ভাল আমগুলো আবার আলাদা করে রাখত। আফসোস, পচা আমের দুষ্টচক্র থেকে মা এখনো বের হতে পারলোনা। এ নিয়ে অনেক রাগারাগি করেছি কিন্তু কে শোনে কার কথা। মায়ের এক কথা, আমি তোদের রেখে কিছু খেতে পারিনা।

আমার মা সংসারে থেকেও সেই অর্থে বৈষয়িক নয়। ৪২ বছর সংসার করার পরেও নিজের বলতে কিছু নেই। নিজের নামে কোনো সম্পত্তি নেই, নেই নগদ টাকা পয়সা, নেই কোনো স্বর্ণালংকারও। নিজের নামে কিছু থাকতে হবে এটাই কখনো মায়ের মনে হয়না। বলে, তাহলে তোমরা আছো কিসের জন্য? তাহলে এত কষ্ট করে গায়ের রক্ত জল করে তোমাদের মানুষ করা কেন? বাড়ি থেকে আসার সময় মাকে টাকা দিতে গেলে বলবে আমার দরকার নাই বাবা। জোর করে দিয়ে আসলে পরেরবারে গিয়ে দেখব টাকাটা সেইভাবে বালিশের কাভারের মধ্যে পড়ে ঘুমোচ্ছে! নিজের জন্য কখনো কিছু নিজ থেকে কিনেছেন বলে দেখিনি। অথচ এখনকার স্ত্রীগন স্বামীর সংসারে এসে ডিপিএস, ফিস্কড ডিপোজিট ছাড়া কিছু বুঝেন না!

বলতে গেলে প্রাইমারির গন্ডি পেরুনোর পর থেকেই সব ভাই বাড়ি ছাড়া। চাকরির সুবাদে এখন সবাই বাড়ি থেকে দূরে। সেই স্টুডেন্ট লাইফ থেকে মা যে সন্তানহীন সংসার করা শুরু হল তা আর কাটলো না। মাঝে মাঝে মনে হয় সব সন্তানকে লেখাপড়া শিখিয়ে মা বাবা কী ভুল করলেন?

মা যে পরিমাণ কষ্ট করে আমাদের লালন পালন করেছেন তা বর্ণনাতীত। দরিদ্র সংসারে এসে ঘরে ও বাইরে সমানভাবে করতে হয়েছে শারীরিক পরিশ্রম। সে ঋণ কোনোদিন শোধ করা সম্ভব নয়। সন্তানরা সেটা কখনো পারেও না। তাদেরকে খুশি রাখাটা হতে পারে সন্তানদের জন্য বিন্দু পরিমাণ ঋণ শোধের ক্ষেত্র। কিন্তু কয়জন সন্তান সে দায়িত্ব পালন করে, খোঁজ করে তাদের দুঃখ বেদনার জায়গা?

পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এবং পিতৃতান্ত্রিক পরিবারে আমার মায়ের যেসব অধিকার পাওয়ার কথা ছিল মা সেটা পাননি। পারিবারিক অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মায়ের মতামতকে সব সময় প্রধান্যও দেওয়া হয়নি। এতে মায়ের মন খারাপ হয়েছে বটে কিন্তু তা নিয়ে বাবার সাথে কখনো গোলযোগ করতে দেখিনি।
আমার বড় আশ্চর্য লাগে গোটা জীবনে আমার মাকে কখনো বাবার সাথে ঝগড়া করতে দেখিনি। প্রতিবেশীদেরও এ নিয়ে গল্প বলতে শুনেছি তাদের জেলাসী অনুভব করেছি। বাবাকে না জানিয়ে নিজের শখের একটা শাড়ি কিংবা সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও কিনতে দেখিনি। ছোটবেলায় আমরা জোর করলে বলত তোমার বাবা আসুক তারপর কেনা যাব। আরেকটা জিনিস দেখেছি যেটা এখনকার সংসারে কল্পনা করা যায় না। মাকে কখনো বাবার সংগে উচ্চ স্বরে কথা বলতে দেখিনি। দেখেনি বাবার উপর দিয়ে মাতব্বরি করতে। বাবাকে ভয় পেয়ে যে মা এটা করতেন ব্যাপারটা মোটেও তা নয়। এটা ছিল বাবার প্রতি মায়ের সম্মানবোধ। এই জায়গায় মা আমার বরাবরই ফার্স্ট।

আমার মা মানুষকে অ্যাপায়ন করতে বড় ভালবাসেন। মানুষকে পেট ভরে খাইয়ে বড় আনন্দ পান। কিন্তু নিজে খেতে চান না। খাওয়ার প্রতি মায়ের কোনো লোভ নেই। খুব ভালমন্দ রান্নার পরেও মাকে দেখেছি মরিচ ডলা দিয়ে ভাত খেতে। শেষ মেহমানকে তরকারির বাটি উপুর করে ঢেলে দিতেন। নিজের জন্য কিছুই রাখতে চান না। “যাহা দিলাম সর্বোচ্চ উজাড় করিয়াই দিলাম” ব্যাপার আর কী! বাড়িতে মা এবং বাবা দূজন মানুষ। শরীরটা তাদের ভেঙে যাচ্ছে। ফোন দিয়ে বলি নিয়ম করে একটু বেশি করে খেও৷ মাছ বেশি করে খাবে। পালের মুরগি আছে জবাই করে খেও। একথা শোনার পর মা যেনো আকাশ থেকে পড়েন। ছেলেরা কেউ নেই ওনারা দূইজনে আস্ত মুরগি জবাই করে মাংস খাবে! যেনো এটা বড় অন্যায় কথা বলেছি, এরকম কথা বলতে নেই। যেনো ছেলেদের না দিয়ে মাংস খাওয়া যায় না? যেনো ছেলেদের না দিয়ে বুঝি রুই মাছের পেটিও খাওয়া যায় না? কিন্তু আমরা তো খাচ্ছি মা! তোমাদের রেখে প্রতিনিয়ত রসনা বিলাস করে যাচ্ছি! তোমরা এরকম করলে আমিও মাছ মাংস খাব না। কাতর স্বরে বলি আর ঠিকমত খাওয়া দাওয়াও করব না! মা হাসে আর বলে পাগল ছেলে।

মাকে কখনো পরনিন্দা করতে দেখিনি। অন্যের সমালোচনা করতেও শুনিনি। গ্রামের বাড়িতে থেকে যেটি প্রায় অসম্ভব। তবে মায়ের আরেকটি খারাপ অভ্যাস হল মনের কষ্ট চেপে রাখা। তিনি তার গোপন বেদনার ক্ষতগুলো সন্তানদের কাছে শেয়ার করেন না। আগে যা ও করতেন এখন তাও করেন না। একদম বোবা নিশ্চুপ হয়ে গেছেন। সন্তানদের উপর বিশ্বাস, আস্থা আর জোর খাটানোর জায়গায় হয়ত সংকট দেখতে পেয়েছেন। এখন মনে মনে তিনি জাহান্নামের আগুনে বসিয়া পুষ্পের হাসি হাসেন। কেন এমন করেন? জানি; তা অধম সন্তানদের অজানা নয়।

আমার মা’র চাওয়া খুব সামান্য। তিনি অল্পতেই খুশি হন। মায়েরা হয়ত এমনই। সেই দারিদ্র্যতা এখনও বহাল থাকলে মা হয়তো ঈশ্বরী পাটনী’র মত বলতেন, “আমার সন্তান যেনো থাকে দুধে ভাতে।” কিন্তু ভাতের সমস্যা মিটে যাওয়ায় এখন মা’র চাওয়া ভিন্ন।
তিনি চান, ‘তার সন্তানরা যেনো থাকে মিলেমিশে’।
তিনি মাঝে মাঝে হাহাকার করে বলেন আমার সন্তানরা যদি বাড়ি থেকে চাকুরী করতে পারত! এই বয়সে তার ঘরভরতি থাকবে মানুষ। নাতি পুতি নিয়ে হৈ হুল্লোড় করবেন। কখনোবা অভিমান করে বলেন চাকুরী ছেড়ে বাড়িতে চলে আসতে। বাপের জমিজায়গা চাষ করে তোদের বেশ চলে যাবে। পাগল মা আমার! মায়ের পক্ষেই এমন ভালোবাসার কথা বলা সম্ভব। আজ দুখিনী মা আমার র‍্যাপিড পি আর কতৃক ‘রত্নগর্ভা মা’ নির্বাচিত হয়েছে। কিন্তু আমরা সন্তানরা কী সত্যিকারের রত্ন হতে পেরেছি!!

আমার মা সারাটা জীবন সন্তানদের শুধু দিয়েই গেলেন। যখনই কোনো সমস্যায় পড়েছি কোনো বিপদে পড়েছি মায়ের দ্বারস্থ হয়েছি। মা সংকটের সহজ পথ বাতলে দিয়েছেন। বিপদে ধৈর্য ধারণ করতে বলেছেন। মা কে ভালবাসতে তাই বিশেষ কোনো দিনের প্রয়োজন পড়ে না। কাজে কর্মে সেটা বেশ বুঝানো যায়। তারপরেও মা দিবসের এই দিনটাকে মায়ের প্রতি দায়িত্ব কর্তব্যের নিক্তিটাকে হয়ত আমাদের যাচাই করে নিতে সহায়তা করে। মা তুমি তো সবই বোঝো, অনুভব করতে পারো সন্তানের হৃদয়ের হাহাকার। তবুও বলি, তোমাকে খুউব ভালোবাসি মা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত