| 13 জুলাই 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

জায়গা

আনুমানিক পঠনকাল: 9 মিনিট

 

কথকের কথাঃ

গাঙের চর। পলিকাদা স্তর। জেগে ওঠা চর নয়। গাঙভাঙন ঠ্যাকাতে রাস্তা হঠে ফিতে শেকল মেপে শ’দুই ফুট ভিতরে গেল উঠে। কিছু ফসলি জমি হল লোপাট। সে প্রায় বছর সাত-আট। গাঙের দিকে নোনা জলের ওঠা নামায় পলিতে চকচকে। ফলনহীন পতিত জমি। খাইল ঘাসের চামোট। দু’একটা বাইন, ক্যাওড়া, গেঁওয়ার ভাস্‌না ফল বসে দু’পাঁচ বছুরে সতেজ ঝাঁকড়া। বাবুদের মুখে শোনা যাচ্ছে, এবার কিছু গাছগাছালির চারা পোঁতা হবে। তবে বাগদার মীন ধরা চলবে, যদ্দিন না লাগান হচ্ছে। সকালটানে জোয়ারজল চর কাড়িয়ে গেল। চরে এখন চিকচিকে নেল কাদার পরত।

প্রথম দৃশ্যঃ
সুন্দর চরে নামল। সুন্দর বিশ্বাস। রোগা পাতলা গড়নে উসোখুসো চুলদাড়িতে ঢাকা মুখে আটত্রিশ-চল্লিশের করিতকর্মা যুবক। ওদলা গা, ময়লাটে গামছা কায়দা করে জড়িয়েমড়িয়ে লজ্জা ঢাকা। কোদাল নিয়েই নেমেছে। বাইনের ছায়ায় দাঁড়িয়ে চিন্তান্বিত মুখে বিড়ি ফুঁকে চনমনে। কোদাল চালিয়ে চাপ চাপ মাটিতে সরু স্বল্প উঁচু আল। খপাখপ কোপে মাটির চাপ, চাপের পর চাপ ফেলে উঁচু, পায়ে থাবড়ে জমাট আল।

কথকের কথাঃ
এতদিন ওর বউ এসব করত। পাছ ফিরেও তাকাত না। বছরভর জন-মজুর, মাহিনা খেটে বেড়াত। পাড়ায় পাড়ায় তখন কাজের মুনিষের হেব্বি চাহিদা। একবার ক’দিনের জ্বরে নাজেহাল। শরীরটা কেলসে গেল। তাগতে আর কুলোয় না। তার উপর কাপালি বাড়ি কাজে গিয়ে একদিন মাজায় বেযুত লাগাল। ভারিভুরি কাজে ভয় ঢুকে যবুথবু। কেলোরা যাচ্ছিল কাজে। ব্যাঙ্গালোর না তামিলনাড়ু যেন। ও আর ওর বউ পাছ ধরল। ছেলেপুলে কেউ নেই। হয়নি। শুধু শুধু ঘরদোরের মায়া আর জড়ায়নি।

মাস ছয়েক কাটতে না কাটতেই একলা ফিরে এল। সঙ্গে একটা স্মার্ট মোবাইল। তবে বের করে কম। ঘরে থাকে। কারও সঙ্গে গোপনে কথা চালায় কিনা টের পাওয়া যায় না। গুজব রটল, ওর বউ কী এক অজানা রোগে টেঁসে গেছে। পাড়ার লোকের ধন্দ যায়নি। ওরা ভাবল, কোলের মেয়েমানুষটাকে খতম করে বেটা পালিয়েছে। কারণ, ছেলেপুলে না হওয়া নিয়ে ওদের মধ্যে খিটমিটে অসন্তোষ ছিলই। সুন্দরের কাছে জানতে চাইলে ম্লান বদনে অন্যমুখো হয়। তারপর সঙ্গিসাথি দু’একজন ফিরলে জানা গেল বেচারির বউটা সত্যিই রোগে ভুগে শেষ ওখানেই।

সুন্দরের ভাই সুরেশ। সব আলাদা। পিঠোপিঠি বাস। কিন্তু ওই যে সেই শরিকি কোন্দল, জমিজিরেত, বিষয় সম্পত্তি, যেমন হয়! দাদার চর্চা রাখত না। তবে সুরেশের বউ সোনা সময় সুযোগ পেলে ভালো-মন্দ খোঁজখবর নিত বড়ো জার কাছে। এ নিয়ে সুরেশ সোনার মাঝে দু’একদিন অশান্তিও হত। ফিরে আসার পরও। এমনি মন্দে অমন্দে কাটছে দুই শরিকে। আল তোলা ছোটো ছোটো ঘের। গাঙমুখো ফাঁকা। ফাঁকা মুখে নাইলনের চিকন ফাঁসের জাল পরিয়ে ভাটার সময়ে অপেক্ষা। বাগদার মীনে বাড়তি কামাই। এ মরসুমে এখনও কেউ আল গাঁথা শুরু করেনি। গেল সনের আলটা ঝড় বৃষ্টি ঢেউ স্রোতে ক্ষয়ে মজে ভেনিস। শেষের দিকে মাছ আর তেমন পড়ে না বলে আলের যত্ন হারায়। সুন্দর নতুন করেই আলের সীমা তুলছে।

দ্বিতীয় দৃশ্যঃ
-এই, তা তুই কি সব নিবি নাকি!
আপন ভাই সুরেশের গলা টের পেয়ে কোদাল পায়ের গোড়ায় বসিয়ে সুন্দর শুধায় – কেন?
সুরেশ তর্জনি বাগিয়ে কথা চালে – ও-ই বাইন গাছ থেকে এই গেঁওয়া গাছের গোড়া পর্যন্ত, এ তো আমার সীমা!
-চরে আবার তোর জায়গা হয় কিকরে?
– খোঁটা ধরে দেখিস তো, কোন সোজা পড়ে! চরে গেলেও জায়গার পয়সাকড়ি কি সরকার আমাকে দিয়েছে?
-আরেব্বাবা, আমিও পেয়েছি নাকি!
– ওসব জানিনে। তোর জায়গায় তুই যা। আমার ও জাল দেবে বলেছে।
– দেবে তো দেবে!
– আল সরিয়ে নে!
– কেন, পাশ দিয়ে দিতে বল্‌!
– ওসব চালাকি ছাড়। আমার জায়গা।
– এমন কিছু তো বেশি জায়গা বেড় খায়নি!
– পোঙাপাকামো কথাবাত্রা রেখে বল্‌, তুই জায়গাটা ছাড়বি কিনা!

কথকের কথাঃ
ওদের বাপ সটকে গেছে বহুতদিন। তখন সুন্দর আইবুড়ো। খাটাখাটনি তাকে আগে থেকেই লাগাতে হয়েছে। বাপ যে উড়নচন্ডি! সংসারধর্মে মন উড়ু উড়ু। সংসারের পেটগুলো চালাবে কে! গানবাজনা যাত্রার নামে এদেশ ওদেশ ঘুরেই বছর পার। সুন্দরকেই চৌদিক সামলে উঠতে হত। ইশকুল পাঠশালায় পড়াশুনো তো তার ঘুচে গেছে কোন কালে! এক-দু ক্লাশ গুঁতিয়ে ছাড়ান। লোকের বাড়ি মাইনে থাকা। চেয়েছিল, ভাইটার যদি একটু হয়। হয়েও ছে। মাধ্যমিক, মাধ্যমিকের পরে পাশের দ্বীপ ছোটো মোল্লাখালি মঙ্গলচন্দ্র থেকে উচ্চ-মাধ্যমিক। তারপর এমন এক কম্ম করল! ওখানকার এক মেয়েকে নিয়ে হাপিস। থানা পুলিশ টানাটুনি। পাত্র-পাত্রী নাবালক। সুতারাং ছাড়াছাড়ি। সেসব মেলা কথা। শেষমেস চব্বিশে বিয়ে করল সোনাকে। কাউকে দেখতে শুনতে যেতে হয়নি, সুরেশই পছন্দ মতো এনে তুলেছিল। বিয়ে করেই আলাদা। ঘরদোর সংসার। এমনকি মায়ের দায়িত্বও কানাকড়ি নিতে চাইল না। মিছে কথা নয়, সুরেশের বউ সোনা শাশুড়িমাকে রাখতে চেয়েছিল, কিন্তু ব্যাগড়া মেরেছিল সুরেশই। সুন্দরের জল করা পয়সায় কেনা জমিজিরেতের কিছুটাও মায়ের মুখপানে তাকিয়ে সুরেশকে দিতে হয়েছিল। ততদিনে সুন্দর সংসারি। মামারা দেখেশুনে দিয়েছিল। ভালো হোক, মন্দ হোক, বৈশালীর বিরুদ্ধে তার কোনও অভিযোগ এখন আর নেই। সব কিছুর উর্ধে সে সুন্দরের একান্ত আপন। এসব হাবিজাবি থাক, আসল কথায় ফেরা যাক। ওদের মাও সুরেশের বিয়ের মাস সাতেক পরে চোখ বুজল। আসল ঝামেলার গোড়া সেখানেই। শেষ শ্রাদ্ধশান্তির কাজেও সুন্দর ভাইকে পেল না। কাজবাজ আলাদাই হল। দুই বাড়ি, দু’জায়গায়। সব কাজ মিটে গেলে সম্পত্তি বাটোয়ারা। সুন্দর সংগত কারণে একটু বেশি রাখতে চেয়েছিল। শেষের দিকে মায়ের রোগভোগে ঋণদেনাও খারাপ হয়নি। সবার সামনে বলেও ছিল। কিন্তু দলভারি সুরেশ পাত্তা দেয়নি, জিতে নিল। কড়ায় গন্ডায় আধাআধি ভাগ। বরং ফুক্কুড়ি মেরে ভাগে দেড়ি ফেলল সুরেশ। ভিটেবাড়িও। লম্বালম্বি। স্বনামে সব লেখাজোখা, কাগজপত্তর। চরে বাদ পড়া অংশ এখনও সুরেশের নামে।

তৃতীয় দৃশ্যঃ
পুকুরেই স্নান করে সুরেশরা। সোনা দু’হাতে জল সরিয়ে উপরের ময়লা কেটে নাভিজলে। এদিক ওদিক ফালুকফুলুক। ওপারে কলাবাগানের খোলে চোখ আটকে যায়। সুন্দর। কী একটা করছে। কোমরজলে নেমে সোনার অস্বস্তি। খানিক থামে সোনা। ঠোঁট খুলে নিঃশব্দ হাসে। সুন্দরও। দু’জনের চোখমুখ চিকমিকিয়ে চনমনে। সোনা আর দাঁড়ায় না। বছর তিনেকের ছেলে টোটন ‘মা মা’ ডাক ছেড়ে ঘাটে। ঝপাঝপ ডুব মেরে ডাঙায় ওঠে। সুন্দর কী একটা কাজের ভানে এখনও দাঁড়িয়ে। টোটনকে ডাকে – জ্যা-ঠা!
টোটন না দেখতে পেলেও ‘এই তো’ সাড়া দেয়। পরে দেখাদেখি মেটে দু’জনার। হাসি বিনিময়। সোনা ততক্ষণে ভিজে কাপড়ে অদৃশ্য।

কথকের কথাঃ
সুন্দর বড়োই নিঃসঙ্গ এখন। সন্তানহীন একলা জীবন। তবু বৈশালী ছিল, রাগে অনুরাগে হাসি ঠাট্টায় দিন গড়িয়ে আবার সকাল হত। সুরেশের মেজাজের চোটে ওদের দুই জায়ের মধ্যেও সম্পর্ক মন্দ। সোনাকে বৈশালীর সঙ্গে মিশতেই দিত না। এখন খানিক খানিক সুন্দর টের পায় ব্যাপারটা। পাড়ায় একসঙ্গে চলাবলা বন্ধুবান্ধবের মুখে তখন কিছু কথা শুনেছিল। মনে হয়েছিল কেচ্ছা। এখন আনেক মিলিয়ে মিলিয়ে দেখেছে, একশ ভাগ খাঁটি।
পেটের ধান্দায় সুন্দর মাহিনা খাটতে গিয়ে মহাজনের বাড়ি দু-তিন মাস আবাসিক। হপ্তায় এক দিন বাড়ি ফিরতে পারত, অথবা না। সুরেশ তখন দাড়ি গোঁফের পষ্ট রেখা ধরে গরম যুবক। সুন্দরের মা বাড়ি থাকলেও সুরেশ নাকি রাতে বউদির কাছে থাকত। থাকতে বলা হত। রাত বিরাতে বৈশালীর যেন একলা ভয় না লাগে। বউদি দেওরের কী সুসম্পর্কই না দেখেছিল সুন্দর তখন। এই নিষ্পাপ মানবিক সম্পর্কের তলায় যে অন্য নেশার আসক্তি, সুন্দর ঘুনাক্ষরেও ভাবেনি। নতুন বউকে বুঝি এ কারণেই বড়ো জায়ের সঙ্গে মিশতে মানা। যদি সম্পর্কটা জেনে ফ্যালে! মেয়েমানুষের মুখে বিশ্বাস নেই। সদ্য বিয়ে করা বউ নিয়ে দেওর পৃথক হলে বৈশালী মনকষ্টে নিঃঝুম ছিল ক’দিন। সুন্দরও কিছুটা হতবাক। ভাইয়ের আচমকা বিচ্ছেদ বুকে বড্ডো বেজেছিল। ওদের মা মারা যাওয়ার পরও সুরেশ বৈশালীর কাছে এসেছে – সোনা বা সুন্দর জানে না। তারপর কী নিয়ে চাপা ঝামেলা বাধে বউদি দেওরে। কেউ আর কোনও দিন ওই অন্যায় সম্পর্ক জোড়েনি। একটা ছানাপোনা নিতে অক্ষম বলে সুন্দর বৈশালীর কাছে বার বার মুখঝামটা খেত। নিজের পৌরুষ দেখাতে গিয়েও পারত না সুন্দর। কোনও কাজে নিজের মনমতো সিদ্ধান্ত বাতলাতে গিয়েও হোঁচট খেত। বৈশালীর খিটমিটে কথাকেই প্রাধান্য দিত। স্বামী-স্ত্রীর বনিবনা চুলোয় উঠে কষ্ট। মনের কথা বলার লোক জোটেনি সুন্দরের, যাকে বলে মনের দুঃখ-ভার নামায়।

অন্যদিকে ভাশুর সুন্দরের সঙ্গে ভাদ্রবউ সোনার ঘোমট-টানা আত্মীয়তা। কথাবাত্রা লজ্জাঢাকা। যে দু’এক দিন নতুন নতুন একসঙ্গে ছিল, একটু আদ্দুক দূর থেকে গলা শোনা। বহুদিন আগে ভাশুর ভাইবউ সম্পর্ক যেমন ছিল আরকি। এখন কথা হয়। ছোট্টো টোটন কখনও সখনও সীমানার ঘেরা-বেড়া ফুঁড়ে পালিয়ে আসে সুন্দরের কাছে ফোনে কার্টুন দেখার জন্যে। সুরেশ বাড়ি না থাকলে সোনাও পুকুর পেরিয়ে ঘুর পথে আসে। টোটনকে নিয়ে যেতে। তখন সুন্দরের সঙ্গে টোটন বেয়ে কথা পড়ে। দিনে দিনে দু’জনার কথাবাত্রা আব্রু ছাড়ে। সুন্দরের একলা জীবনে এখন যে-কোনও মানুষের সঙ্গে কথা বলার বড্ডো ইচ্ছে। সুযোগ পেলে রেখার সঙ্গে সে থকরবকর করে কত কথা বলে ফ্যালে। বৈশালীর স্মৃতি শোকে, আনন্দে আছড়ে পড়ে দু’জনার মাঝে। সোনার মনে ভয়, কোলের লোকটা বাড়ি এল কিনা! টোটনকে নিয়ে সুন্দরকে ফেলে বাড়ি হাঁটে। এক দিন দেওর বউদির গোপন সম্পর্ক সোনাকে সাদা মনে ফাঁস করে সুন্দর হালকা হয়। যুক্তি দেখায় বৈশালী একটা সন্তান চেয়েছিল শুধুমাত্র।

চতুর্থ দৃশ্যঃ
এ-ই, তুই বেরো, বেরিয়ে আয় – নিশুতি রাতও সুরেশের মাতাল গলার চোটে আধজাগা – এখনও আসলি নে!
আচমকা হুড়মুড়িয়ে আঁধার উঠোন টর্চের গোল আলোকে ফর্সা। পোষা কুকুরও ঘেউ ঘেউ বাক ছেড়ে অস্থির।
-এখনও বেরোলি নে!
সাদা আলো পায়ে পায়ে এগিয়ে উঁচু নদীবাঁধের গোড়ায় নিভে আন্ধার। সুরেশ হাত পা ছড়িয়ে নিস্তেজ। কালো কালো ভুত ভুত দেখায় দু’জনকে।
-কদ্দিন বলেছি, একটু এগিয়ে যাবি। এ-ই, তোরে বলিনি!
হ্যাঁ – একটা চাপা মেয়েলি গলা।
-তবে যাসনি কেন? বাড়ি কী কামাই মারিস?
কখন তুমি আসবে, আমি জানি! – গলাটা একটু খোলে।
-এই, না জানিস, তা একটু এগিয়ে যেতে পারিস নে!
মেয়েলি গলাটা চুপ।
একটা পটাশ্‌ শব্দের সাথে সুরেশের গলা ওঠে – তা যাসনে কেন, বল্‌!
একদম গায়ে হাত দেবে না – মেয়েলি গলা ঝাঁকিয়ে ওঠে – প্রত্যেক দিন রাতে ছাইপাস গিলে এসে –
-মুখ সামলে কথা বলিস। তোর টাকায় খাই! এ-ই, তোর টাকায় মাল খাই!
-বেশি চেঁচিয়ো না – ছেলে ঘুমাচ্ছে, পাড়ার লোকে…
তুই বল্‌, উত্তর কর! – সুরেশের গলা সত্যিই খাটো হয় – আমি আগে বলিনি!
সুরেশের গজগজানি রাতের আন্ধারে মিলিয়ে শুনশান। ওর বউ বগলের তলায় হাত পুরে সুরেশকে কোনও মতে দাঁড় করায়। জাপটে ধরে আরও আপন যেন।

কথকের কথাঃ
এমনি দৃশ্য প্রায় ফি দিন চলে। কম বেশি। কোনও কোনও দিন সুরেশের মাতলামিটা সীমা ছাড়ায়। সোনাকে বেদম ঠ্যাঙায়। কতবার যে বৈশালী ‘আর না, আর না’ করেও ওদের ঝক্কি সামলে দিয়ে এসেছে! তা নিয়ে সুরেশ কম গালমন্দ শোনায়নি বউদিকে! বৈশালী গায়ে মাখেনি। যতই হোক, দেওর জা। শেষের দিকে সুন্দর বউকে যেতে মানা করত। যেতে দিত না। বাড়ি বসে বৈশালী উসফাসাত। এসব হাবিজাবি নাকি সুরেশ আগেও খেত। উচ্চমাধ্যমিক পেরিয়ে সেই যে মেয়েটা কেটে গেল, সেই জ্বালায় তখন থেকে। কিছুটা সঙ্গদোষেও। এখনোও ওর বন্ধুবান্ধবের কূল-কিনারা নেই। সব প্রায় ঠেঁকের। এত পয়সাকড়ি যে ও কোথায় পায়! লোকমুখে শোনা, বাজারে নাকি তাসের জুয়া খ্যালে, হার জিৎ যাই হোক, ভালো-মন্দ খাওয়া ফই নেই। সেদিন সুরেশ হয়তো বউটাকে মেরেই ফেলত। বেদম পেটাচ্ছিল। সুন্দর সবে ক’দিন ব্যাঙ্গালোর থেকে ফিরেছে। মন মেজাজ বেযুত। কথাও হয় না ভাই আর দাদায়। বনিবনা নেই। মান-সম্মানের মাথা খেয়ে টোটনের কথা ভেবে সুন্দর গিয়েছিল ঠ্যাকাতে। আতঙ্কিত টোটন জেঠুর কোল পেয়ে নিরাপদ। ভাদ্রবউও আশ্রয় নিল সুন্দরের বাহুপাশে। রাগে তড়পাতে লাগল সুরেশ। যাচ্ছেতাই বলে দূর দূর করে তাড়িয়েছিল সুন্দরকে। অসভ্য ইল্লতে কাঁচা খিস্তিতে অপমান। পুরানো সেই বিষয় সম্পত্তির জের। আবার হিসেব চাই তার। সব নাকি মেরে খেয়েছে সুন্দর। মদ টেনে চুর বেহুঁশ ভাইকে সেদিন কিচ্ছু বলেনি। শোনার মতো সুস্থ্য ছিল না সে। মা মারা যাওয়ার পরে এত ঘটা করে মোড়ল মাতব্বর জুটিয়ে সম্পত্তি ভাগ! সেদিন তো চুকে গেছে জমি-জিরেত, সম্পত্তি কড়ায় গন্ডায়। এত দিনে আরও কিছু ফাঁক ফোঁকড়ের দুনম্বরি হদিশ ঢুকেছে সুরেশের মগজে। কেন যে এমন ফন্দিফিকির খোঁজে!

সুন্দর নিঃসন্তান–ও ভালো মতোই জানে। বিষয়সম্পত্তি যা আছে দম ফুরিয়ে আসার আগেই সুরেশ বা টোটনকে দিয়ে যাবে – সুন্দর ভেবেও রেখেছে। নানান অন্তরঙ্গ কথায় কথায় একদিন খুব গোপনে কথককে বলেছিল। নীরবে চলে এসেছিল সেদিন মানসম্মান ধুয়ে। সোনা নাকি খুব কেঁদেছিল।

পঞ্চম দৃশ্যঃ

রাতে পাশ ফিরতে গিয়ে, নাকি সাড়ার সন্দেহে না-পোরা ঘুমটা থেতলে গেল সুন্দরের! সুন্দর বালিশ থেকে মাথা উঁচিয়ে ভালো করে কান পাতে আঁধার বাতাসে। দাওয়ায় কার যেন হাঁটার সাড়া। সাড়া ঠাউরে কান ঘোরায় নিঝুম কৃষ্ণ রাতের খোলে। বলল – কে-এ?
সাড়াটা নুকিয়ে আন্ধার জমাট।
-কে গো, আঁধারে দাওয়ায় কে?
আমি, দাদা – সোনার গলা।
মাথার কাছে রাখা মোবাইলে সময় দেখল সুন্দর। তিনটে চুয়াল্লিশ। মেঝেয় পাতা বিছানার মশারি উলটে ঘরের দোর খুলে টর্চ জ্বেলে সুন্দর নির্বাক। সোনার দু’চোখে অশ্রু উপচিয়ে জলের গড়ানি। টোটন মার কাঁধে ঘুমিয়ে।
হাত ধরে সুন্দর সোনাকে ঘরে ঢোকায়।

কথকের কথাঃ
অপমানিত হওয়ার পরে সুন্দর জেদ ধরেছিল, আর কোনও দিন সুরেশের বাড়ি পা দেবে না। জীবনে যত বিপদ আসুক। গত রাতেও হুটোপাটি হয়েছে। সুরেশ সোনাকে হরদম ঠেঙিয়েছে। বউদি দেওরের পুরানো কাসুন্দি সোনা টেনেছিল কিনা কে জানে! বাদ যায়নি টোটনও। ছেলেটা বেদম চিৎকার জুড়েছিল ‘ও বাবারে, ও মারে’ বলে। প্রাণটা ছিঁড়ে যেতে চাইছিল সুন্দরের। কিন্তু ওই যে জেদ – আর যাবে না কোনও দিন! সুন্দর প্রথমে টের পায়নি। ও ভেবেছিল, বৈশলী চুপিসাড়ে দেখতে এসেছে – ও নেই, কেমন রাত কাটাচ্ছে কোলের লোকটা। তাই সাড়াটা পরোখ করছিল এক মনে। পরে মনে হল, অশরিরী নয়, জ্যান্ত মানুষের চলাফেরা। তারপরেই ওই জিজ্ঞাসা।
সহ্য করতে না পেরে সোনা নিজেই এসেছে। আশ্রয়দান ছাড়া সুন্দরের উপায় কী!

ষষ্ঠ দৃশ্যঃ
সেদিন শেষ রাত টানে নেশা কেটে ঘুম এলিয়ে সুরেশ উসখুস। বারান্দা কাড়িয়ে সুরেশের সোনা আর তোলেনি ঘরে। মশার কামোড়ে অস্থির। একটু ঠান্ডাও আছে বাইরে। কষ্টেমষ্টে উঠে বারান্দার সোলারের আলোটা জ্বালে সুরেশ।
ঘরের দরোজা হা। দোর কাড়িয়ে ঘরের আলো জ্বালে। মশারির কোনা দু’একটা খোলা, মানুষহীন উস্কোখুস্কো বিছানা। মেঝেতে পাতা বিছানার দিকে তাকিয়ে সুরেশ অনড়। খানিক্ষণ ঘরের চৌপাশে তাকিয়ে কী ভাবল। আস্তে আস্তে আলো নিভিয়ে মশারির খোলে সাঁধিয়ে অসাড়। সকাল একটু পুরুষ্টু হলে ঘুম ভাঙল সুরেশের। দাওয়া থেকে, উঠোন থেকে, পুকুরপাড় থেকে, রাস্তায়ও এদিক সেদিক দেখল। কোত্থাও নেই নিরুদ্দিষ্টরা। দু’এক জনের কাছে খোঁজখবর লাগাতেই ব্যাপারটা রাষ্ট্র হল।

কথকের কথাঃ
সুরেশের সোনা, টোটনকে বাইরে কোত্থাও খুঁজে পাওয়া গেল না। কিন্তু সুন্দরকে সন্দেহ।
সুরেশ ও-বাড়ি পা ঢোকায় না। বাইরে থেকে তক্কে তক্কে সময় পার। সেখানেই মিলল। বেলা মাথার ওপর কাড়ালে। দিনভর সুরেশ কটকটে চোখে পাকিয়েছে সব। টোটনও আড়ে আবডালে বাবাকে চোখে পেলেই মায়ের কোলেকাছে দৌড়ে এসেছে, জেঠুর কোল ঘেঁসে থির মেরে শান্তি। সুরেশ সোনার চোখাচোখি হয়নি কখনও। কেউ সামনে পড়েনি কারও। ভাইকে কিছু বলবে বলে মনে হয় পুকুর পাড়ে গিয়েছিল। সুর তুলতেই সুরেশ রাগত মুখে ঝামটা টেনে কেটে গেছে। বিকালে বাজারেও যায়নি সুরেশ।

কত শত প্যাঁচপয়জার আলোচনা হয়েছে সুন্দর ও সোনায়। সোনা আর ফিরতে চায় না সুরেশের কোলে, স্বামীর দোরে। বোনের মতো সুন্দরকে আকড়ে থাকতে নাছোড়। নানান দিক ভেবেচিন্তে, অনেক বুঝিয়েসুজিয়ে ঠেলে গুঁতিয়ে সুন্দর সোনাকে সাঁঝবেলায় ঘরে পাঠাল। সুন্দরকে প্রণাম সেরে গেল সোনা। টোটনকে হামি খেল সুন্দর। থমথমে সুরেশের বাড়ি। টোটনের উচ্চবাচ্যও কানে ঠ্যাকে না। সারা রাত মনে হয় ঘুম হয়নি সুন্দরের। কান খাঁড়া রেখেছিল। পাশের বাড়ির কোনও সাড়া অবশ্য মেলেনি। পাড়ার মেলা কথা সুন্দরের কানে ঠেকেছে। যেমন, সত্তর কাড়ানো অচ্যুৎচরণ মোড়ল নাকি হেঁকেডেকে বলেছেন – ছি ছিঃ, শেষ পর্যন্ত ভাশুরের সঙ্গে! কী দিনকাল পড়েছে, বাবাজি।

সপ্তম দৃশ্যঃ
সকালের নরম সূর্য্যআলো সুরেশের মাটির দাওয়ায় ছড়িয়ে পষ্ট। টোটন মায়ের তৈরি মাটির পুতুল, গাড়ি ঘোড়া, খেলনাপাতি নিয়ে একাই ছটফটে। সুরেশ বেড়ার গায়ে হেলান টেনে এলিয়ে। আশপাশের বাড়ির বউ একটা উঠোনে এসে কথা ফেলল – দিদি কই?
সুরেশ হেসে শুধাল – কেন, কী দরকার?
-দুটো শুক্ন লঙ্কা নিতাম, বাড়ি হঠাৎ বেড়ে গেছ, বুঝতে পারিনি।
সুরেশ হেঁসেল থেকে এনে দিল।
বউটা হেসে বলল – দিদি কই, বললেন না তো!
-আমার কপাল দোষ। এমন মেয়েছেলের পাল্লায় পড়েছি! কেলেঙ্কারির এক শেষ।
– কেন?
– কাল রাতে কখন পালিয়েছে, টের পাইনি।
– বাপের বাড়ি যায়নি তো!
– সকালে ফোন করেছিলাম, যায়নি।
বউটা খানিক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে কী ভাবে। তারপর পা টানে।

কথকের কথাঃ
সত্যিই সোনাকে আর পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক জায়গায় খোঁজ লাগান হয়েছে। ফোনাফুনিও। সন্ধান মেলেনি। পাড়ার লোকজনও কম হদিস চালায়নি। কেউ সোনাকে রাতে দ্যাখেনি। সদর্থক কিছু বলতেও পারছে না কেউ। তবে দু’একবার কুকুরের গলা কানে ঠেকেছে কারও কারও। সুরেশও যেন থই পাচ্ছে না। ছেলেটাকে জড়িয়ে কাঁদতেও দেখা যাচ্ছে ওকে। পাড়ার মোড়ল মাতব্বরের কথায় ছোটো মোল্লাখালি সুন্দরবন কোস্টালে একটা মিসিং ডায়েরি লিখিয়েছে সুরেশ। এখন অপেক্ষা ছাড়া উপায় কী!

অন্তিম দৃশ্য ও কথকের আপাত শেষ কথা একসঙ্গেঃ
দিন চারেক পরে একটা লাশ মিলল। সাতজেলিয়ার চরে, গাঁড়াল নদীর তীরে– জল কাদা মাটি লেগে ফুলে ঢোল উলঙ্গ একটা বউয়ের। চোখ দুটো পাখিপক্কলে খেয়ে খোঁদল, মুখটা পোকা বা কাঁকড়ায় কেটে বিভৎস, গলায় কিছু চেপে ধরার মতো কালসিটে দাগ, নারীলিঙ্গে কাঁচের ভাঙা বোতল এখনও গেঁথে। পুলিশ ডেকে নিয়ে গিয়েছিল সুরেশকে। দেখামাত্র মুখের ভোল আচমকা বদলে গেলেও কারও নজরে লাগেনি। অনেক ভেবেচিন্তে দেখেদুখেও ও সনাক্ত করতে পারল না।
কিন্তু ওর পাড়ার অনেকেই ঠাউরেছে– ওটা সোনারই অসাড় দেহ। দুনম্বরি ব্যাপারটা খোলসা হতে পুলিশ টোটনকে আনল। সঙ্গে সুন্দরও এল। সুরেশের কোলে টোটনকে দিয়ে কাঁধে হাত রেখে সুন্দর জিজ্ঞাসা টানল– কী আর বলব! এ ক’দিন রাতে ভালো ঘুম হয়েছিল? সবাই দেখল, টোটকে জড়িয়ে সুরেশ বাচ্চা ছেলের মতো হাউ হাউ জুড়ল। দু’চোখ উপচিয়ে নামল বেদম অশ্রু। বাবাকে দেখাদেখি টোটনও হাপুশ নয়নে। সুরেশের কোলে অস্থির। আর থাকতে নারাজ। সুন্দরমুখো দু’হাত বাড়িয়ে কাঁদছে। ছেলেটাকে কোলে পুরতে পুরতে সুন্দর ভাইকে বলল – এখন ছেলেটার কী হবে!
চোখ ছাপানো টলমল অশ্রু, গালে দাঁতে মাড়িতে মোটা লালার বেলুন ছিঁড়ে সুরেশ বলল – তোমার কাছেই থাক, দাদা।
-এটা তুই কী করলি!
দু’হাতে মাথার চুল জোরসে খামচে কথা ছাড়ে সুরেশ – সন্দেহ, শুধু সন্দেহ। রাগের মাথায় এতটা হবে, বুঝতে পারিনি।

সুন্দর গাঙপানে তাকিয়ে থির। গাঙে সবে জোয়ার টান। কয়েকটা নৌকায় কাদের নাইলনের জাল বাগিয়ে বাগদার মীন ধরার প্রস্তুতি। পেটের দায়। ওপারে জঙ্গল। এতকিছু সুন্দর দেখছে বলে মনে হয় না। ভাবছে কিছু। সহস্র ভাবনার রাশ টানতে গিয়ে নোনা জোলো বাতাসের জ্বালাপোড়ায় তার দুচোখও সুড়সুড়িয়ে ভিজে উঠছে যেন।

                 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত