| 23 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
পাঠ প্রতিক্রিয়া সাহিত্য

এই গল্প মানুষের কথা বলে

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

      মুখোমুখি আলাপ ইন্দিরাদির ডাকে “গল্পবৈঠক”-এ গল্প পড়ার সূত্রেই। তিনি এসেছেন গল্পের আলোচনায়। গল্পের আলোচনা করছেন। সকলের গল্প নিয়েই নোট করছেন, মতামত দিচ্ছেন। তার মধ্যে আমার গল্পটি শোনামাত্র বেশ কয়েকটি বিশেষণ বসিয়ে দেন চটপট। প্রশংসা করেছিলেন বলে নয়, আমার তাঁকে মনে রয়ে গেল তাঁর গল্প বিশ্লেষণের কায়দায়। যেভাবে কাটাছেঁড়া করছিলেন… নির্মোহ অথচ কি স্পষ্ট ইঙ্গিত!

      পরের আলাপ বইমেলায়। ওই ‘গল্পবৈঠক’-এর টানেই যাওয়া। তাঁর, আমার। জানতাম তিনি আসবেন। আমার সবেধন নীলমণি একটিমাত্র গল্পের বই হাতে দিই তাঁর। শিশুর সারল্যে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন। ‘নিশ্চই পড়ব। জানাব তোমায়’। জানাতে পারেননি। কারণ আমি তাঁকে ফোন নম্বর দিতে ভুলে গিয়েছিলাম। তিনিও মনে করে চেয়ে নেননি। কিন্তু মনে আছে তাঁর উচ্ছ্বাসটুকু। কোনও খাদ নেই তাতে…

      তিনবারের বার হঠাৎ মুখোমুখি। চুঁচুড়ায় ‘গল্পসল্পের আটচালা’য়। নাঃ। আমার গল্প পড়া অবধি থাকতে পারেননি। কিন্তু এসে আদর করে বলে গেলেন, ‘তোমার লেখা শোনা হল না আজ। পরে শুনব, কেমন? বইটা পড়েছি’। চিরকালের ক্যাবলা আমি। মনে পড়ল, এবারও নেওয়া হল না ফোন নম্বর।

      চন্দননগর গল্পমেলার আগেই যোগাযোগ হয়ে গেল। ‘গল্পবৈঠক’-এর বারোইয়ারি রহস্য উপন্যাসঃ ‘সবজে রুমাল রহস্য’তে আমাদের সঙ্গে এবার তাঁর জায়গা। হোয়্যাটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকেই ফোন নম্বর পাওয়া এবং ঝাঁপিয়ে পড়ে ফোন… তারপর …। সে এক হট্টগোল।

      তিনি সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়। চন্দননগরের স্থায়ী বাসিন্দা। ২০০১ সালে ‘দেশ’ পত্রিকায় কবিতা দিয়ে সাহিত্যজগতে আত্মপ্রকাশ। তারপর আসে গল্পের স্রোত। প্রথম সারির এমন কোনও পত্রিকা নেই, যেখানে তিনি গল্প লেখেননি। ধানসিড়ি তাঁর ‘গল্প সংগ্রহ’ প্রকাশ করেছে শুনে আর দেরি করিনি। কিনলাম। আর …। না। গোগ্রাসে পড়তে পারিনি। প্রত্যেকটি গল্প পড়ে আমি বেশ কয়েকদিন থমকে থেকেছি। ঘোর কাটেনি, প্রতিবার সেই একই ধাক্কা, এইভাবে ভাবা যায়? এমন করে গল্প বোনা যায়? এমন করে চরিত্র আঁকা যায়? হুড়মুড় করে ফোন করে ফেলি? কেমন করে লিখলেন দিদি?

      ‘গাড়ি চালাতে চালাতেই ও আর-একবার দেখে নেয় তনিমাকে। পিংক হাতকাটা ব্লাউজ। ওই রঙেরই সাদা প্রিন্টেড শিফন। সাদা গোলাপফুল ক্লিপে ঘাড়ের কাছে চুলগুলো আঁটা। একেই বুঝি হর্সটেল বলে। আবছা আলোয় চকচক করছে পিঠ। ধারালো মসৃণ। ঠিক ওইরকম চকচকে একটা লাল তিল আছে তনিমার। বুকের ঠিক মাঝখানে। তবু ও এখনও আধাচেনা হয়ে আছে শুভেন্দুর কাছে। গত ডিসেম্বর থেকে এবছরের নভেম্বর, এতখানি সময়েও তনিমাকে পুরো চেনেনি শুভেন্দু। কথাটা ভালো বোঝা যায় যখন তনিমা গান গায়। তনিমার ঠোঁট ফাঁক হয়ে দাঁতের সারি ঝিকঝিক করে। যেন একটা দুরন্ত রেললাইন। কিন্তু শুভেন্দু জানে ওই মুখে ঠোঁট চেপেও তনিমার সবটা পাওয়া যায় না’।

      নারীশরীরের বর্ণনা বহু পড়েছি। পুরুষের দৃষ্টিতে নারীর বিবরণ তো কম নেই কিছু। কিন্তু সর্বাণীদির বর্ণনায় এক আশ্চর্য নির্লিপ্তি। স্মার্ট অথচ উদাসীন। দেখছি, লক্ষ্য করছি, কিন্তু আলগোছে দেখছি। তুমি বুঝবেও না আমি তোমায় দেখলাম, এইরকম একটা ভাব। যে গল্পটি থেকে এই বর্ণনা দিলাম সেটি এই সংকলনের অন্যতম সেরা। ‘প্রতিপক্ষ’। এক পুরুষ, দুই নারী। এক অন্দরমহলের টানাপোড়েনের মধ্যে জড়িয়ে যায় গন্ধ। শুধু গন্ধ। দ্বিতীয় সম্পর্ক যখন অধিকার করে প্রথম বাঁধনকে, সেই অস্তিত্বসংকট ফিরে ফিরে আসে অবচেতনের অপরাধবোধে। এই মারাত্মক আত্মবিশ্লেষণের কাহিনি ‘প্রতিপক্ষ’। কে কার প্রতিপক্ষ, এটাই মৌলিক প্রশ্ন।

      ‘শেষের ধাক্কাটা যেন ঝাঁকুনি দিয়ে নাড়িয়ে দিয়ে গেল ওকে। অনেকদিনের পুরনো ঘুম ভেঙে উঠে পড়ল সুধন্য। অফিস থেকে বেরিয়ে সোজা হাঁটছিল ও। নির্ভার শরীর। মাথার মধ্যেও অনেকদিন বাদে সহজ চিন্তার আনাগোনা।  

      খুব বড়ো একটা ভুল হয়ে গিয়েছে। চেনা রাস্তাটা বাতিল করা উচিত হয়নি। আজ সোজা ওই রাস্তা ধরেই এগোতে হবে। …’  সুধন্য চেনা রাস্তায় ফিরতে চায়। ‘সুধন্যর সুখ-অসুখ’ গল্পে সামনের রাস্তাটায় কোনদিকে যাবে ঠিক বুঝতে পারছিল না সুধন্য। বাঁদিকে, না ডানদিকে, নাকি একদম সোজা যেতে হবে? মাথার মধ্যে কেমন সব গুলিয়ে যায়! সুধন্য ভুলে যায় সব। সুধন্য গুলিয়ে ফেলে। সুধন্য মনে করতে পারে না কিছু। মিথ্যে, অসততা এসব এখন কত সহজ হয়ে গিয়েছে। সততার সবচেয়ে কম দাম। কোনও ভ্যালুই নেই। অনুপমের কথাবার্তাই ছিল এই ধরনের। প্রথম প্রথম অস্বস্তি হলেও পরে গা-সওয়া হয়ে গিয়েছিল।

      সুধন্যর নিজের এসব নিয়ে কোনোকালে তেমন মাথাব্যথা নেই। অল্পস্বল্প উচ্চাশা, মোটামুটি স্বচ্ছলতা, সন্তান-স্ত্রীর জন্য স্বাভাবিক উদবেগ, ছোটখাটো ইচ্ছে-অনিচ্ছে–  এসবের মধ্যে অনুপমের ভারী ভারি কথাগুলো তেমন কিছু দাগ কাটত না।

      আমরাও তো এইরকমই। আমরাও সুধন্য। আমাদের সকলের মধ্যে একজন সুধন্য আছে। নাকি নেই? সুধন্য থাকা জরুরি ছিল। একজন সুধন্য প্রত্যেকের মধ্যে থাকলে হয়ত এয় সত্যি মিথ্যে গুলিয়ে যেত না… ‘সুধন্যর সুখ-অসুখ’ এই সংকলনের অন্যতম সেরা গল্প।

      যদিও, নির্মোহ হয়ে এই বইয়ের গল্প আমি পড়তে পারিনি। প্রতিটি গল্পে নতুন বাঁক, অন্য ইশারা। মানবিক সম্পর্ক আর অমানবিকতাকে এত নিখুঁত বুনোটে পাশাপাশি রাখা যায়? ভূমিকায় লেখিকা লিখেছেন, ‘যে প্রতিবাদ সবার সামনে করতে পারিনি, যে কষ্ট লুকিয়ে রেখেছি, যে ভালোবাসা প্রকাশ পায়নি, যে হওয়াটা হতে হতেও হয়নি, সেসব ডানা মেলে উড়েছে এই গল্পের আকাশে’।

      এই সংকলনে ষোলোটি গল্প। কেন আরও একটু বেশি নয়? আর অন্তত ন’টি। পঁচিশ নয় কেন? বড় আফশোস রইল। আর আফশোস রইল ‘দ্বীপ’ গল্পটির জন্য। বাংলা সাহিত্যে গত দশ বছরের সেরা গল্পের তালিকায় এই গল্পের থাকা উচিত। ‘দ্বীপ’ লিখতে পারা নয়। ‘দ্বীপ’ ভাবতে পারার জন্য আমি পরজন্ম চাই। এই জন্মে আমি তো পারব না।

      মেয়েদের কথা তো আছেই। কিন্তু এই গল্প সংকলন পড়ার আগে একবার ভাবুন, এই গল্প মানুষের কথা বলে, তাদের ধরা যায়, ছোঁয়া যায়, দেখা যায়। এখানেই একজন লেখকের সার্থকতা। তিনি আমার চেনা পৃথিবীকে নিয়ে এলেন এক আশ্চর্য মোড়কে।

আরও অনেক দিন লিখুন দিদি। আমাদের অনেকের শ্রদ্ধা, ভালবাসা আর প্রণাম আপনার জন্য।

 

 

গল্প সংগ্রহ

সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়

ধানসিড়ি

মূল্য– ২৫০ টাকা

 

 

                       

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত