তুতুল আর বাবাম

        বাবাম, ও বাবাম…
 
        বলো মা…
 
        বলছি কি, আমাকে দুটো টাকা দেবে? ঠিক দুটো?
 
        টাকা? টাকা দিয়ে তুমি কী করবে মা?
 
        খুব দরকার। দাও না গো। তোমার পকেটে নেই?
 
        পকেটে আছে। কিন্তু আগে বলো, টাকা নিয়ে তুমি কী করবে?
 
        আমি? উমমম… বলতে পারি। শুধু তোমাকেই বলব। তুমি আর কাউকে বলবে না তো?
 
        না না। একদম তুমি আর আমি। আর কেউ জানবে না। চুপিচুপি বলো। কানে কানে।
 
       
 
        আমার রাতের কিছুক্ষণ সময় এইভাবে কাটে। তুতুলের সঙ্গে। তুতুল আমার মেয়ে। ছয় পেরিয়ে সাতে পৌঁছল এবার। এক্কেবারে পুতুলের মতো। তাই ও তুতুল। রাতে আমার এটা রেগুলার ডিউটি। আমি ওকে ভাত মেখে খাইয়ে দিই। রোজ। এটা আমাদের নিজেদের সময়। ওর আর আমার। ভাত খাওয়া, গল্প বলা, গল্প শোনা। সব মিলিয়ে চমৎকার কাটে আমাদের। তুতুলের বড় বড় চোখে অনেক প্রশ্ন, অগাধ বিস্ময়। মধ্যবিত্ত এবং মধ্যচিত্ত এক ছাপোষা মানুষ আমি। দিনের এই সময়টুকু নিজের ছোট্ট মেয়ের কাছে আমি বড্ড দামি। সুপারস্টার। একেবারে হিরো। ও যা বলে, আমি সব শুনি। আমি যা বলি, ও শোনে। তুতুল জানে, ওর বাবাম সব জানে, সব পারে।
 
        আচ্ছা, ওই দুটো টাকা দিয়ে কী হবে মা?  
 
        আমি ওই বেলুনওলাটাকে দেব।
 
        বেলুনওলা? কোন বেলুনওলা?
 
        আরে ওই যে… রোজ সবুজ জামা পরে ফুটবল মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। ওকে দেব।
 
        ও আচ্ছা। এবার বুঝেছি। ওকে দেবে! কিন্তু বেলুন তো দু’টাকায় পাওয়া যায় না মা। তুমি বেলুন চাও? আমি কালই এনে দেব।
 
        না বাবাম। বেলুন চাই না তো। আমি বেলুনওলাকে দেব। ও সেদিন কাজলকাকুকে বলছিল, ও নাকি রাত্তিরবেলা কিচ্ছু খায়নি। ওর টাকা ছিল না। তাই। কাজলকাকু ওকে তখন একটা টাকা দিল। ও বলল, একটা টাকায় কী হবে? দুটো টাকার মুড়ি খেলে পেটটা একটু ভরবে। কাজলকাকু তখন ওকে আরও একটা টাকা দিল। আমাকে তুমি দুটো টাকা দেবে বাবাম? তাহলে ও আরেকদিন মুড়ি খাবে।
 
        দেব মা। আমি আর তুমি বিকেলে গিয়ে ওকে দিয়ে আসব।
 
        যাবে? সত্যি? আচ্ছা বাবাম, আরও একটা কাজ করা যায়।
 
        কী কাজ মা?
 
        যদি আমরা বাড়ির মুড়ির কৌটোটাই ওকে দিয়ে আসি? তাহলে তো আর টাকা দিতে হয় না।
 
        এই রে! না না। সেটা ঠিক হবে না। মা তাহলে আমাদের দুজনকেই খুব বকবে।
 
        মায়ের নামে তুতুলের মুখ শুকিয়ে যায়। ঠিকই। তুতুলের মা একটু রাগী। ইশকুলের দিদিমণি তো। বকে দেয়। বাবাম ভাল। একদম বকে না। মায়ের রান্নাঘর থেকে মুড়ির কৌটো নিয়ে গিয়ে বেলুনওলাকে দান করে আসার পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত হয়ে যায়।
 
        চলো মা। এবার মুখ ধুই, হাত ধুই, শুতে যাই।
 
        হ্যাঃ। চলো। কাল বিকেলে যাব কিন্তু। তুমি আর আমি।
 
        যাব মা। নিশ্চই যাব।
 
       
 
        তুতুল ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লে আমার কিছুক্ষণের ফুরসত। ও ঘুমিয়ে পড়লে তারপর আমার কিছুক্ষণ রাতযাপন। চারদিক শুনশান। বাড়ির সকলেই প্রায় শুয়ে পড়েছে।
 
        বাইরের ঘরের ছোট্ট চৌকিটিতে গিয়ে শুয়ে পড়ি। আমার নিজস্ব পরিসর।
 
        বাস থেকে নামবার সময় এক সহযাত্রী পা মাড়িয়ে দিয়েছেন। বেখেয়ালেই হয়ত। কেউ কি ইচ্ছে করে…। কড়ে আঙুলটাতে একটু ক্রিম লাগালে ভাল হত। পা ধোওয়ার সময় জ্বালা করে উঠছিল। তখন মনে পড়ল। আসলে আমি বড্ড অন্যমনস্ক হয়ে যাই। বাসের জানালার ধারে বসে বসে অনেক এলোমেলো চিন্তা বয়ে আসে অনর্গল। বাসস্টপ পেরিয়ে যায়। তখন হুড়মুড় করে উঠি।
 
        দাদা, রোককে। বাঁধবেন একটু।
 
        আরে স্টপ পেরিয়ে গেল যে!
 
        দাদা কী ঘুমোচ্ছিলেন?
 
        আরে দাদা বোধহয় ভরসন্ধেতেই টাল… হে হে হে
 
        এতক্ষণে মনে পড়ল! কোন জগতে থাকে এরা?
 
        কত বাক্য উড়ে উড়ে আসে। ধরি না তাদের। গায়ে মাখি না। কনুইয়ের গুঁতো, পা মাড়িয়ে দেওয়া হিংস্র জুতোর ঠোক্কর অবজ্ঞা করে এগিয়ে যাই।
 
        তুতুল এসব জানে না। ওকে বলি না।
 
        বাবাম, কাজলকাকু কিন্তু আজকাল খুব খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
 
        কেন মা?
 
        কাজলকাকুর সঙ্গে আমি আর ইস্কুলে যাব না।
 
        কেন মা? কী করেছে কাজলকাকু?
 
        খুব খারাপ হয়ে গেছে। খুব খারাপ।
 
        সে কী মা! কাজলকাকু তো ভারি লক্ষ্মী ছেলে। কাজলকাকু যখন তোমার মতো ছোট্ট, তখন থেকে আসে আমাদের বাড়িতে। মালতীমাসির ছেলে। মালতীমাসীর হাত ধরে আসত। মালতীমাসিকে মনে আছে তুতুল?  
 
        তুমি আগে শোনো…
 
        হ্যাঁ হ্যাঁ, বলো দেখি, কী করেছে কাজলকাকু?
 
        আমাকে কাল আইসক্রিম দিলই না।
 
        আইসক্রিম? আইসক্রিম কেন দেবে? তুমি চেয়েছিলে? ছি ছি মা। কারও কাছে কিচ্ছু চাইবে না। বলেছি না? তোমার যা লাগবে, আমাকে বলবে। কেমন? আর তাছাড়া কাজলকাকু তোমাকে দেবে কেন আইসক্রিম? কাজলকাকু জানে, তোমার গলায় অ্যাত্ত বড় টনসিল। আইসক্রিম খেলেই গলা ফুলে যায়। তাহলে?
 
        আহা। আমি তো আইসক্রিম চাইনি।
 
        তাহলে?
 
        সেবন্তী চাইল। কাজলকাকু অমনি পুলকার থামিয়ে কিনে দিল ওকে। আমি চাইলাম না। আমাকে দিলও না। সেবন্তী চাইল বলেই দিয়ে দিল?  
 
        খুব ভাল কাজ করেছে কাজল। তুমি আইসক্রিম খেও না মা।
 
        বাবাম, আমাকে কাল আইসক্রিম কিনে দেবে?
 
        আইসক্রিম? কেন মা? এই যে বললাম, আইসক্রিম খেলেই গলা ব্যথা হবে তোমার।
 
        আমি খাব না বাবাম। কাজলকাকুকে দেব। ও তো খায়নি। শুধু সে্বন্তীকে কিনে দিয়েছে।
 
        ঠিক এনে দেব মা। কালই। কাজলকাকুও খাবে, সেবন্তীও খাবে।
 
        বাবাম, তুমি?
 
        আমি? আমি খাব না।
 
        কেন বাবাম?
 
        তুতুল যেটা খায় না, বাবামও সেটা খায় না। তুমি জানো না?
 
        কিন্তু আমি সিগারেট খাই। তুতুল জানে না। ও ঘুমিয়ে পড়লে খাই। অফিসে খাই। রাস্তায় বেরিয়ে খাই। ও কিচ্ছু জানে না। ও জানে, ও যা যা খায় না, বাবামও খায় না সেগুলো।
 
        সকালের বাজারে গুনেগেঁথে সবজি কিনতে কিনতে তুতুলের কথা মনে পড়ে। আইসক্রিম কিনতে হবে কাজলের জন্য। বেলুনওলার কাছেও যেতে হবে। বাকি রয়ে গেল।
 
        ভাল কই মাছ ছিল দাদা। জ্যান্ত। নেবেন?
 
        নাঃ। নেব না। আমার মেয়েটা খেতে পারবে না গো। ছোট তো। তুমি চারাপোনাই দাও।
 
        মাছওলা কেষ্ট আমাকে তেমন পাত্তা দেয় না। জানে, আমি কমদামী মাছ কিনি। আমার ক্ষমতা কম। মাসের শেষে হাতটান। তাই চারাপোনাই ভাল। সস্তা, পুষ্টিকর। চারাপোনার কাঁটা আর কইমাছের কাঁটা নিয়ে তুলনামূলক আলোচনায় ও আর কথা বাড়ায় না। আমি ওর কাছে অত গুরুত্বপূর্ণ লোক নই। শুধু এই বাজারে ছেলেবেলা থেকে নিয়মিত আসি বলে পরিচিত মানুষের সম্মানটুকু দেয়। সবজিওলারাও তাই। যতটুকু চেনে, ততটুকুই।
 
        বাবাম, তুমি কি জানো, আজ ইস্কুলের আমগাছে সেই টিয়াপাখিটা এসে বসেছিল?
 
        তাই? কী কান্ড? তোমার সঙ্গে কথা হল ওর?
 
        না। বলল না। শুধু তাকিয়ে ছিল। আমার মনে হল, ও কিছু বলতে চায়।
 
        ইস। কত কথা ছিল নিশ্চই। আজ তো বলতে পারেনি। দেখো, কাল ঠিক আসবে।
 
        তুতুলের স্বর্গে একটা টিয়াপাখি আছে। সেটা প্রায়ই ওর কাছে আসে। রোজই কিছু না কিছু বলে। আমার এমন কেউ নেই।
 
        আমি সারাদিন একটা কেরোসিন জবজবে বস্তার মধ্যে থাকি। পাপ, অপরাধ, মতিভ্রষ্টতা, আবার সেই পাপের শাস্তি ও যন্ত্রণা। নরকের যাবতীয় আন্তর উপাদান দিয়ে তৈরি একটা গহ্বর। প্রেমহীন, ক্ষমতাহীন ক্রমিক পতনের নরক। সারাদিন হিসেবের খাতা লেখা। হিসেবের গরমিল। শুধরে নেওয়া। আবার লেখা। কাটাকুটি। সমস্তদিন ধরে চলছে দিশি মদের লোডিং আর আপলোডিং। মালগাড়ি থেকে একের পর এক তরল আগুন ভর্তি ক্রেট সশব্দে নেমে আসছে অতল ঘূর্ণির মতো। তীব্র অ্যালকোহলের গন্ধে অবশ হয়ে থাকা মস্তিষ্কের ধূসর কোষে চুপটি করে বসে থাকে তুতুল। ওর জন্যই আমার রোজ ঘরে ফিরে আসা। আমার একমাত্র পিছুটান।
 
        বাবাম, তুমি কাল অফিস যাওনি। কাল তো রবিবার ছিল। তাই ছুটি। আজ কেন গেলে না? আজ তো সোমবার। আজও তোমার ছুটি?
 
        হ্যা মা। আজও ছুটি।
 
        আমাদের তো পরীক্ষা শেষ বলে স্কুল ছুটি। মা’রও তাই। তোমারও অফিসের পরীক্ষা শেষ?
 
        আমাদের সবার সামনে একটা বিরাট পরীক্ষা তুতুল। আমাদের সবার এখন ছুটি।
 
        তাই? সবার ছুটি? কতদিন বাবাম?
 
        আমরা কেউ কিচ্ছু জানি না মা। কিন্তু এখন কয়েকদিন আমরা সবাই বাড়িতেই থাকব। বাড়ির মধ্যে। কেউ বাইরে যাব না।
 
        ওফ। তাহলে তো দারুণ মজা। সেই টিকটিকি আর নীল মাছির গল্পটা বলো তবে।
 
        একদিনের গৃহবন্দি দশা কেটেছে সবে। সোমবার থেকে শুক্রবার আবার কোয়ারান্টাইন। এক ভয়ংকর মারণ ভাইরাসের থাবা বিশ্বজুড়ে। চতুর্দিকে ছোঁয়াচে রোগের জেরে মৃত্যুমিছিল। অতএব, সরকারি নির্দেশে সকলের গৃহবন্দি থাকা ছাড়া কোনও উপায় নেই।    
 
        আজ অবধি মাছ খেয়েছি আমরা। কাল থেকে কী খাব তার সবকিছুর পর্যাপ্ত জোগান নেই। মাসের শেষ সপ্তাহে সবকিছুর জোগান থাকে না। সামান্য আলু-ডিম-পিঁয়াজ আর চাল-ডাল-তেল-নুন-মশলার স্টক। বড়জোর দিন চারেক চলবে। তারপর?
 
        রাতের ছাদে আকাশে অনেক তারার ভিড়। পাহাড়টা সমুদ্রের তলা থেকে উঠে এল ঠিকই। কিন্তু সমুদ্রের খোঁজ কতটুকু জানে? পাহাড়ের ওপরটা আলোয়। আর তলাটা অন্ধকারে। ওইখান থেকে উঠে আসছে সমস্ত অন্যায়, পাপের ইচ্ছে, নানারকম ভ্রষ্টাচারের প্রবণতা। এই মারণ-ভাইরাসও হয়ত সেখান থেকেই তৈরি…
 
 বাবাম, একটা কথা জিগ্যেস করব?
 
        করো মা।
 
        আচ্ছা, একটা ভাইকে তো আমরা ভাই বলি, তাই না? সিঙ্গুলার নাম্বার?
 
        হ্যাঁ। বলি তো।
 
        তাহলে অনেকগুলো ভাইকে কী বলব? বলো দেখি…
 
        অনেকগুলো ভাই? কী জানি! কী বলব। তুমিই বলো মা।
 
        এ বাবা! জানো না? অনেকগুলো ভাই হল ‘ভাইরা’।
 
        ও! হ্যাঁ। তাই তো!
 
        আচ্ছা, এবার বলো তো, ‘ভাইরা’কে যদি ইংরেজিতে বলি তবে আমরা কী বলব?
 
        ইংরেজিতে বলব, ব্রাদার্স। ভাই হল ব্রাদার। তাই ভাইরা হ, ব্রাদার্স।
 
        এ মা, হয়নি। ইংরেজিতে ‘ভাইরা’কে বলব ভাইরাস। ভাইরাস। হিহিহিহি। বাবাম, তুমি কিচ্ছু জানো না। এইরকম অনেক ভাইরাস এখন নেচে বেড়াচ্ছে চারপাশে। খুব সাবধান কিন্তু। খুব সাবধান। ওরা খুব দুষ্টু। আচ্ছা তুমি ওদের মারতে পারবে না?
 
        সত্যিই তো আমি কিচ্ছু জানি না। কে ভাই, কে ভাইরাস। কিচ্ছু পারি না। কিছুই না। ওরা কোথা থেকে এল, কোথায় যাবে, কাকে মারবে, কাকে রাখবে…… ওরাই জানে। আমি ছাপোষা মানুষ। শুধু জানি কাল সকালে উঠেই বাজারের দিকে যেতেই হবে। যেখানে যা আছে, যেভাবে যতটুকু সম্ভব কুড়িয়ে আনা…। বাড়ির সবার খাবারের জোগাড়। সবাইকে সুস্থ রাখা, খাইয়ে পরিয়ে রাখা…।   
 
        এই পৃথিবীতে, এই মহাবিশ্বে স্বর্গ কোথাও নেই। স্বর্গ মিথ এবং মিথ্যা। নরকই একমাত্র বাস্তব। সেই বাস্তবের ভয়ংকর মুখ আমি দেখতে পেয়েছি। তাই আমি তুতুলের কাছে অসমাপ্ত রেখে দিয়েছি আমার জীবনযাপন।
 
        গভীর অনুশোচনা ঘিরে ধরে আমাকে। পাপের স্খলন না ঘটলে পুণ্যে ফিরে যাব কী করে? পবিত্র হয়ে উঠতে হবে। শুধু হাত ধুয়ে ধুয়ে নয়। আপাদমস্তক পরিচ্ছন্ন হয়ে। তুতুলের কাছে ভাতের থালা নিয়ে, গল্প নিয়ে আবার তো বসতেই হবে। সেইদিনের কথা ভেবে ঘুমিয়ে পড়ি আমি। আর একটা ঝকঝকে সবুজ টিয়াপাখি আমার পাশে পাহারা দেয় রাতভর।
 
                
 
       
 
 
 
 
 
 
 
 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত