| 14 জুলাই 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

কর্মক্ষেত্র এবং

আনুমানিক পঠনকাল: 8 মিনিট

        রসুলপুর মোড় ছাড়িয়ে যে রাস্তাটা হরিরামপুরের দিকে গেছে, সেখানে এসে দাঁড়ায় সুমনা। বেশ দেরি হয়ে গেছে। আজ একটু তাড়াতাড়ি বেরোতে পারলে আগের বাসটা ধরা যেত। বিডিও অফিসে তত দেরি হয়নি। দেরি হল ব্লকে নিজেদের অফিসে এসে। ফালতু ঝামেলা।   

রাখালদা আজও কথা শোনাল। কাজের খুঁত ধরতে না পারলে অন্য কোনও খোঁটা দেয়। কোনওদিন বলে, ‘ও তুই তো আবার বিএ পাশ, তোরে তো কিছু কওয়াই যায় না। জ্ঞানী মেয়েছেলে তুই। এইসব ছেঁদো কাজে তোর তো মনই বসে না আজকাল’। পরশু তো বেশ খারাপভাবেই কথা শুরু করল। পঞ্চায়েত অফিস থেকে ডালের বীজ নিয়ে দলের মেয়েদের বিলি করে দেওয়ার কথা। এদিকে সুমনার শরীরটা সকাল থেকেই ম্যাজম্যাজ। চোখ দুটো জ্বলছে, গা ঢিসঢিস। রোদে এসে দাঁড়াতেই এক চক্কর দেয় মাথা। আর দেরি করেনি সুমনা। বাসরাস্তা থেকে উজিয়ে ফিরে এসেছে ঘরে। চৌকির ওপর কখন শরীর ছেড়ে দিয়েছে। মনে নেই আর কিচ্ছু।  

মোবাইল বেজেছে বার কয়েক। সাড়া দেওয়া হয়নি। বিকেল গড়িয়ে গেছে তখন। ধড়মড় করে উঠে বসে সুমনা। ফোনের দিকে এক ঝলক তাকিয়েই বুঝতে পারে, একটা গোটা দিন কেটে গেছে। কাজ হয়নি। ডালের বীজ আনতে যাওয়ার কথা ছিল পঞ্চায়েতে। রিপোর্ট জমা দেওয়ার কথা ব্লক অফিসে। কিচ্ছু হয়নি। রাখালদা’র চারটে ফোন। অফিস থেকে আরও দুটো। রাখি, চৈতালি। সুমনা বোঝে, আজ তার কপালে শনি।    

সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে প্রথমে অফিসেই ফোন করে। অফিসের নিয়ম মতো রাখালদাই যাবতীয় কাজকর্ম দেখাশোনা করে। ব্লক লীডার। দুটো প্রজেক্টেরও লীডার। তার ওপরের দিকে রয়েছে জেলার লোকজন। অফিসে ফোন করা মাত্রই ধরে কেউ ওপ্রান্তে। পুরুষকণ্ঠ। তবে রাখালদা নয়। ভাঙা গলায় বলে, ‘পরে করুন। রাখালদা বাইরে গেছেন’। সুমনা বোঝে, রাখাল এখনও বিডিও অফিসে। কিংবা অন্য কোথাও। দেরি না করে সুমনা রাখীকে ফোন লাগায়। বাচ্চা মেয়ে রাখী। পাস গ্র্যাজুয়েট। রায়গঞ্জ থেকে এই এনজিওতে চাকরি করতে এসেছে হরিরামপুরে। অফিসের পাশেই ঘর ভাড়া নিয়ে থাকে। রাখী আর চৈতালি। একসঙ্গে। ওরা দুজনেই খুব ভালবাসে সুমনাকে। সুমনা ওদের থেকে বেশ অনেকটাই বড়। বয়সে, অভিজ্ঞতায়। ফোন বেজে যায়। রাখীও ধরে না। মোবাইলের ঘড়ি বলছে এখন ছ’টা দশ। রাখী তাহলে এখন নিশ্চই বাঁধের ধারে। ওর প্রেমিক অতনুর সঙ্গে।    

ঘর অন্ধকার। আলো জ্বালে সুমনা। হলুদ বাল্বের আলোয় চৌকির ওপরে অগোছালো পড়ে থাকা গায়ের চাদরটা দেখে হঠাৎ কান্না পায় সুমনার। সুশান্ত’র কথা মনে পড়ে। এই চাদরটাই দুজনে কিনেছিল প্রথমবার শহর থেকে। চাদরের এলোমেলো ভাঁজে এখনও লেগে রয়েছে ভাঙা বিয়ের কটুগন্ধ।

ফোন বাজে। রাখালদা। মাথা ঠান্ডা রেখে ফোন ধরে সুমনা। ওপারে ঝাঁজিয়ে ওঠা গলা…

  • ‘কোন ভাতারের ঘরে ছিলি সুমনা? অফিসের সব কাজ ফেলে সারাদিন তোর টই টই করা আমি বার করছি দাঁড়া’।

আগুন দাপিয়ে ওঠে ভেজা সলতের মধ্যে। সুমনা দাঁতে দাঁত চেপে জবাব দেয়, ‘শরীর খারাপ ছিল রাখালদা। সকাল থেকে। মা কালীর দিব্যি বলছি…’

  • ‘ওই পোড়া মুখে আর দেব-দেবীর দিব্যি গালিস না সুমনা। কাজ করতে হলে কর, নইলে ছেড়ে দে’।  

ফোন ছেড়ে দেয় রাখাল। সুমনার কথাটাও পুরো শোনে না। এই হুমকির পরে বেশিক্ষণ মাথা ঠান্ডা রাখাও মুশকিল। সুমনার ইচ্ছে করে ছুটে গিয়ে ওর মুখে সপাটে একটা চড় কষিয়ে দিয়ে আসে। জানে, ভাবনাই সার। ও কিস্যু করতে পারবে না। লোকটা চিরকাল ওকে এইভাবেই বলে যাবে।  

কলতলায় গিয়ে সুমনা মুখেচোখে জল দেয়। ঘাড়ে জলের ঝাপটা। দুপুরে অচৈতন্য ঘুমে মাথাটা ছেড়েছে খানিক। টলোমলো ভাবটা আছে। তার ওপর যোগ হল এই অসভ্যতা। স্বামী-পরিত্যক্তা একটা মেয়ে গ্র্যাজুয়েট হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াবে, নিজের আয়ে বাঁচবে— তার উপায় রাখবে না এরা। বুলুর ক্লাস সেভেন। অপুর নাইন। দুটো ছেলেমেয়েকে একার চেষ্টায় টেনে তুলে আনছে সুমনা। যতক্ষণ না ওদের দুটোকে কোনও ভদ্র জায়গায় পৌঁছে দিতে না পারছে, ততক্ষণ দম ফেলার ফুরসত নেই তার।   

নিজের ছেলে অপুকে কাছেই রেখেছে। বাপের বাড়ির জোর বলতে একলা বিধবা মা। আর সামান্য কয়েক কাঠা জমি। কত’টুকুই বা আয়। তা’ও স্বনির্ভর দলের সঙ্গে জুড়ে ট্রেনিং নিয়ে কিচেন গার্ডেন বানিয়েছে সেখানে। মরশুমের ফসল হয়। অল্প জায়গায় নানারকম। ঘরের লাগোয়া জমিতে সম্বচ্ছর নানান আনাজপাতি। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে চাষ-আবাদ। কিছু বেচে দেয়। কিছু থাকে রোজকার পেটের জন্য। অন্তত না খেয়ে মরার দিন আর নেই। মেয়েটাকে মায়ের কাছে রেখে এসেছে। নিজে কাজেকর্মে বেরোয়। ঘরে একা মেয়েটাকে ফেলে যেতে অস্বস্তি। মায়ের কাছে রইল। টুকটাক কাজ শিখবে। মা’ও খেয়াল রাখে নাতনীর। স্কুল গেল কিনা, কখন ফিরল।   

গলা জ্বালা করছে। অস্বস্তির চোঁয়া ঢেকুর। বমি করলে ভাল হত বোধহয়।

‘তুমি আজও বেরোবে?’

বুলু বয়সে ছোট হলে কি হবে, কথা বলে বুড়িদের মতো। গম্ভীর। ঝগড়া করে না। মুখে মুখে কথাও বলে না। ওর সামনে দাঁড়াতে মাঝেমধ্যে বেশ ভয়ই পেয়ে যায় সুমনা।

‘হ্যাঁ রে। আজ যেতেই হবে। আজ হাজিরা না দিলে… কাল যেতে পারলাম না বলে কত কথা শোনাল’।

‘তা সারারাত যে হড়হড় করে অত বমি করল্যা, তার কি হবে? অতদূরের রাস্তা, এই চড়া রোদ্দুরখান…’

‘তুই থাম বুলু। আজ কাজে না গেলে রাখালদা কোথায় কোন কলকাঠি নাড়বে… আর ভাল লাগে না। সাধে কি যাই। এই তো ক’টা পয়সা। পেটের দায়’।  

বুলু কথা বাড়ায় না। জানে, মায়ের জেদ প্রচন্ড। আর তাছাড়া অভাবের সংসারের টানাটানি না বোঝার কথা নয় তার। বুঝদার মেয়ে সে। হাতে হাতে কাজ শিখছে। দিদিমার বাড়ি থেকে কাল সন্ধেবেলা একবার এসে পড়েছিল ভাগ্যিস। রাত থেকে মা অত বমি করছে। রাতভোর সে আর দাদা মায়ের পাশে। নুন-চিনির জল খাইয়ে দিয়ে, পিঠে হাত বুলিয়ে, পাখার বাতাস করে… বুলুর চোখ জ্বালা করে এখন। সারারাত দু’চোখের পাতা এক করতে পারেনি বেচারি। আজ আর ইস্কুল যাওয়া হবে না। দাদার স্কুল আছে। ওর জন্য চিঁড়ে ভিজিয়ে দিয়েছে। নিজেও তাই। মা’কেও চিঁড়ে খেতে ব’লে কলের পাড়ে গিয়ে বসে। ওর সাইকেলের পিছনের চাকায় হাওয়া কমে গেছে। নইলে মা’কে ওই সাইকেলে চলে যেতে বলত। কিন্তু অত বমি করে দুর্বল শরীরে মা আজ আর প্যাডেল টানতে পারবে না।      

সুমনার চোখমুখ টানছে। বেরিয়ে পড়ে সে। আজ তাকে সব কাজ সামলে নিতে হবে।

অফিসে গিয়ে ঢুকতে না ঢুকতেই দেখে রাখী। সুমনার দিকে এগিয়ে আসে। চোখমুখে একটা উৎকণ্ঠা। ভাবখানা এমন, কথা আছে। কিন্তু সকলের সামনে নয়।  

‘বল’।

কনুই ধরে বাইরে টেনে আনে রাখী।

‘রাখালদা কাল হেড অপিসে তোমার নামে কমপেলেন জমা দিয়েছে দিদি। আমি জানি’।   

সকাল দশটায় অফিস একদম শুনশান। সরকারি প্রজেক্টের টাকায় চলা এই এনজিও’র হেড অফিস কলকাতায়। ছ’টি জেলাতে কাজ হয় তাদের। তার মধ্যে এই দিনাজপুর জেলার হরিরামপুর ব্লকের ইন-চার্জ রাখাল মন্ডল। প্রথম দিন থেকেই তাকে দেখছে সুমনা। গত চার বছর ধরে। বিয়ে ভেঙে অফিসে এসে প্রথম দিনেই রাখালের নোংরা ইঙ্গিত শুনতে হয়েছিল তাকে। তখন এই অফিসে মহিলা কর্মী বলতে সে একা। সব হজম করেছিল সে। ‘মহিলা কিষাণ সশক্তিকরণ’-এর প্রজেক্ট এসেছে। সুমনাও নতুন ঢুকেছে কাজে। প্রতিদিন কাজ শিখতে হচ্ছে। রাখাল মন্ডলের একের পর এক তীক্ষ্ণ কটূক্তি তখন সহ্য করেছে সুমনা। এরকম হয়। ঘরের গণ্ডি থেকে বাইরের জগতে কাজে বেরোলে এটুকু সইতে হয়। নিজেকেই বুঝিয়েছে রোজ। সুমনার চোখ জ্বলে। অনেক কষ্টে দাঁত চেপে সহ্য করে সে।   

‘কি করে জানলি নালিশ করেছে?’

রাখী একবার চারদিকে তাকায়। ফাঁকা অফিস। তবু। দেওয়ালেরও কান থাকে।  

‘রাখালদা তো কম্পুটার জানে না। হাতে লিখেছে দু’পাতা চিঠি। দেবুকে সন্ধেবেলা বলল ছবি তুলে দিতে। ও তখন এক ঝলক দেখেছে তোমার নাম। কিচ্ছু বলেনি। তারপর দেবুকেই বলল, হেড অপিসে মেল করে দিতে। দেবু পাঠাল। রাখালদা কেবল দাঁত চেপে বলেছিল, এবার ওই রেন্ডিকে…। ব্যস, আর কিছু বলেনি’।   

‘হ্যাঁ রে রাখী, অপিসের কম্পুটার তো লক করা। মেলটাও খুলতে পারব না। একা দেবু জানে মেল কেমন করে খুলতে হয়। তবে?’

রাখী গম্ভীর হয়ে যায়।

‘একটাই রাস্তা দিদি। হেড অপিসে ফোন করো একটা’।

‘না রে। লাভ নেই। রাখালদা আমার নামে কি লিখেছে না জেনে ফোন করা ঠিক হবে না’।

‘তাহলে দেবু আসুক। ওরে একবার বলে দেখো’।

সুমনা অফিসের ভেতর ঢুকে বসে পড়ে। ফ্যানের হাওয়ায় কপালের ঘাম শুকোতে থাকে। থ্রি কোয়ার্টার হাতা উঁচু গলার সাদা ব্লাউজ ঘামে ভিজে চুপচুপে। রাখালের ওপর প্রবল ঘেন্নায় গা গুলিয়ে ওঠে ওর। রাখী ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে যায়। ও অফিসে হাজিরা দিয়ে সোজা যাবে ফিল্ডে। আজ তিনটে গ্রাম পঞ্চায়েতের একশ দিনের কাজের হিসেব লিখে মান্থলি রিপোর্ট তৈরি করবে। সারাদিন ফুরসত নেই। এদিকে সুমনাদিকে ফেলে যেতেও তার খারাপ লাগছে।

ফোন বেজে ওঠে সুমনার। খুব অনিচ্ছে নিয়েই ফোন ধরে সুমনা। চমকেই ওঠে। কলকাতার হেড অফিস থেকে ফোন। সুস্মিতাদি। এই প্রজেক্ট সে দেখে। ডিরেক্টরের পরেই ওর জায়গা।     

‘সুমনা…’

‘বলুন দিদি’।

সুমনা বোঝে কলকাতার হেড অফিসে কাল সন্ধেবেলা পাঠানো মেল আজ সকালে অপিস খোলামাত্রই সুস্মিতাদির হাতে।    

‘ব্যাপার কি? রাখালদা তো বিরাট দু’পাতা চিঠি লিখেছে তোমার নামে। অসংখ্য অভিযোগ’।

‘আপনি তো আমায় প্রথম থেকেই দেখছেন দিদি। আমি কেমন, আপনারা কি জানেন না?’

ফোনের ওপ্রান্তে সুস্মিতার গলায় মমতা।

‘এরকম বোলো না সুমনা। মৈনাকদা আসেননি এখনও। সেক্রেটারি আসতে দুপুর গড়িয়ে যাবে। তার আগে আমিই চিঠি দেখলাম। তুমি আমাকে একবার ঠিক করে বলো তো, কী হয়েছে?’

‘আমি তো জানিনা দিদি। কিছুই জানি না। বিশ্বাস করুন। কাল অপিসে আসতে পারিনি। শরীরটা খুব খারাপ। রাখালদা তো রেগেই থাকে’।

‘রাখালদা এর আগের দিন পিডিকে ফোন করেছিল। জানো না তুমি। মৈনাকদা সব শুনে ওকে লিখিত জমা দিতে বলেছেন। কি কি বলেছে সব আমি জানি না। তবে আন্দাজ করতে পারি। তাই এবার ও তোমার নামে একটা বড় চিঠি করেছে’।   

‘যা হয় হবে দিদি। আপনারা রাখলে রাখবেন, ছাড়ালে ছাড়াবেন। আমার কিচ্ছু বলার নেই। ও যা পারে করে নিক এবার’।

‘বেশ। তোমার নামে ছুটি নেওয়া, কাজ ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ। ও অনেকদিনের ঘটনা তুলে তুলে লিখেছে। ট্যুর ডায়েরি, হাজিরা খাতার নমুনা জমা দেবে বলেছে। তোমার কাজ আমরা জানি ঠিকই। কিন্তু তোমার ব্লক লীডার নালিশ করলে এই পক্ষ থেকে আমরাই বা কী করব?’

‘জানি দিদি। আগে মৈনাকবাবু আসুন। তখন কথা বলব নয়। তবে, আপনারা একবার ব্লক ভিজিটে আসুন দিদি। অনেক টাকার হিসেব নেই। নয়ছয় হচ্ছে। এসে না দেখলে বুঝবেন না দিদি’।

‘ঠিক আছে। সেইরকম দরকার হলে সেক্রেটারি নিজেই যাবেন। চিন্তা কোরো না। রাখছি এখন’।

কয়েকদিন ধরেই চাপানউতোর চলল। রাখালের প্রচুর অভিযোগ। সুমনা প্রথমে চুপচাপ ছিল। তারপর ভাবল অনেক। এত সহজে হাল ছেড়ে দেবে? হাল ছাড়া যায়? কাজ ছেড়ে দিলে বা কাজ ছাড়িয়ে দিলে বুলু-অপুর কী হবে? শেষ পর্যন্ত রাখী আর চৈতালিই ওকে বুদ্ধিটা দিল।

‘হেড অপিসের জেন্ডার দিদিকে একবার ফোন করো না। মেয়েদের অধিকার, অপিসে মেয়েদের জন্য কি কি আইনকানুন, সব একবার বলছিল তো আমাদের। কলকাতায় গিয়েও তো দুবার ট্রেনিং করেছি আমরা। তুমি ওরেই বলে দেখো একবার’।  

জেন্ডার দিদি। কলকাতা অফিসের অনিন্দিতা মজুমদারকে সকলে এই নামেই চেনে। বীরভূম, পুরুলিয়া, দক্ষিণ চব্বিশ পরগণায় মেয়েদের নিয়ে ওর সব কাজ। পঞ্চায়েতে মেয়েদের দায়িত্ব-কর্তব্য-ক্ষমতা নিয়ে ট্রেনিং করায়, ওয়র্কশপ করায়। আর একটাই শব্দে জোর দিয়ে কথা বলে। জেন্ডার। মেয়েদের নিয়ে কাজ করে বলে ওর নাম ‘জেন্ডার দিদি’। যৌন হেনস্থার কথা বুঝিয়েছিল। বাড়িতে, কাজের জায়গায় মেয়েদের কীভাবে রোজ হেনস্থা হয়। অত্যাচার হচ্ছে। কিন্তু মেয়েরা জানেও না, বুঝতেও পারে না। সুমনা একবার অনেক শুনে শুনে বুঝেছিল ওই ঘরের মধ্যে রোজ রাতে নিজের বরের অনিচ্ছের জবরদস্তিকেও নির্যাতন বলে। বর কাঁচা ভাষায় খিস্তি করলে, নাহ’ক দু’বেলা গায়ে হাত তুললে সেটাও নির্যাতন। থানায় গিয়ে বললেই ডায়েরি নেবে। ট্রেনিঙে এসে ছোট্ট একটা বই দিয়েছিল দিদি। গার্হস্থ্য হিংসা আর কাজের জায়গায়… ওই যৌন নির্যাতন।   

রাখী আর চৈতালি মনে করায়। সত্যিই মনে ছিল না একদম। রাখালদার নালিশের উত্তরে তাহলে পালটা যুক্তি সাজানোই যায়।

‘সাজাবে কেন দিদি। তুমিও যা সত্যি তা’ই লিখবে। আমরা আছি তোমার পাশে। তুমি গুছিয়ে একখান লেখো দিকিনি’। 

হেড অফিসে দুটো ঘরে দুটো চিঠি আসে। হরিরামপুর ব্লক থেকে সুমনা সরকার লিখছে। আলাদা লোককে লেখা। সেক্রেটারিকে এবং জেন্ডার দিদিকে। কিন্তু চিঠির বয়ান একদম এক। হরিরামপুর ব্লক অফিসের লীডার রাখাল মন্ডলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে ব্লকের কর্মী সুমনা সরকার। পয়েন্ট করে লেখা। সাদা কাগজ। কালো কালিতে একের পর এক কালো শব্দ। বিভিন্ন সময়ে রাখাল যা যা বলেছে, তার বয়ান। অন্ধকার আড়াল থেকে তুলে আনা। সহকর্মী সুমনা সরকারকে দিনের পর দিন প্রকাশ্যে কুৎসিত ভাষায় আক্রমণ, তার ভেঙে যাওয়া বিয়ে নিয়ে বাঁকা উক্তি, তার চালচলন নিয়ে সন্দেহ এবং বিভিন্ন সময়ে কাজের জন্য ব্লকে যে টাকা এসেছে তার নয়ছয়ের আভাস। শেষের অভিযোগ দেখার জন্য অ্যাকাউন্টস সেকশনের বিভুদা একটু নড়েচড়ে বসেন। বাকিটা নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়। অনিন্দিতা দুঁদে কর্মী। সতেরো বছর ধরে মেয়েদের নিয়ে তার মাঠেঘাটে কাজ। মহিলা-পুরুষ একসঙ্গে কাজ করবে অথচ ঠোকাঠুকি লাগবে না, তা আবার হয় নাকি? অনিন্দিতার অভিজ্ঞতা জানে, এই সবটাই ক্ষমতা আর দুর্দশার দ্বন্দ্ব। পাওয়া না-পাওয়ার লড়াই। মধ্যে শুধু লিঙ্গ আলাদা। কখনও নারী-পুরুষ অসাম্য। আর অসাম্য মানেই অপেক্ষাকৃত দুর্বল মেয়েটির চরিত্রে একটু ময়লা ধরিয়ে দেওয়া।    

আচ্ছা, গল্পটা এখান থেকে কোন দিকে মোড় নেবে বুঝতে পারছেন?

দুটো রাস্তা রয়েছে। একটাতে হেড অফিসে জেন্ডার দিদির হস্তক্ষেপে সুমনা সরকার সুবিচার পায়। রাখালের শাস্তি বা বহিষ্কার জাতীয় কিছু একটা হয়। অথবা রাখাল দিব্যি নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে যায়। হেড অফিস থেকে বেরিয়ে একদলা পানের পিক অফিসের পাঁচিলের বাইরে পুউচ করে ছুঁড়ে দেয়। মুখে রাজ্যজয়ের হাসি। সুমনাকে যথেষ্ট শিক্ষা দেওয়া গেছে। এবার ব্লক অফিসে ফিরে বাকি কাজ সালটাতে হবে।  

কিন্তু পাঠক, এ তো গল্প নয়। ঘটনা। সত্যি ঘটনা।

সুমনা সরকারের চিঠিতে মিটিং বসে অফিসে। সকলকে হাজিরা দিতে হয়েছিল সেদিন। সুমনা, রাখাল, রাখী, চৈতালী, দেবাশিস। ব্লকের আরও দুজন মেয়ে। স্বনির্ভর দলের। হেড অফিসের অনিন্দিতা, সুস্মিতার সামনে বয়ান দেয় একে একে। সব তথ্য নথিভুক্ত হয়। স্পষ্টই বোঝা যায় এ হল সেই চিরাচরিত ক্ষমতা দেখানোর খেলা। রাখালের মতো লোকেদের এটাই একমাত্র অবলম্বন। রাখালের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়ে রিপোর্ট জমা দেয় হেড অফিসের উইমেন্স গ্রিভ্যান্স সেল।   

কিন্তু তিনদিনের মধ্যে সুমনা সরকার সমস্ত অভিযোগ তুলে নেয়। লিখিত ভাবে জানায়, তার কোনও অসুবিধে হচ্ছে না এই ব্লকে।  

আচ্ছা, তাহলে নিশ্চই কোনও হুমকি… যেমন নাটকে-গল্পে-সিনেমায় হয়ে থাকে?  

নাঃ। রাখাল তেমন শাস্তি না পেলেও একটু চাপে আছে। রাখী আর চৈতালী কয়েকদিন তাকে প্রকাশ্যে অপমান করেছে বলে শোনা যাচ্ছে। ও হ্যাঁ, সুমনার ছেলে অপু এখন উত্তরবঙ্গের একটি ভাল আবাসিক স্কুলে চান্স পেয়েছে। সামনের মাসে তার মাধ্যমিক পরীক্ষা। তার জন্য আলাদা টিউশন ক্লাসের ব্যবস্থা। পরীক্ষা শেষ হলেই ক্লাস ইলেভেনে সে ওই স্কুলে ভর্তি হবে। সুমনার মেয়ে বুলু কলকাতায় থাকবে। পাকাপাকি। সেখানে সে’ও একটি স্কুলে ভর্তি হয়েছে। ক্লাস সেভেন। বুলু রয়েছে এনজিও’র সেক্রেটারি সুনীলবাবুর মেয়ের ফ্ল্যাটে। মেয়ে-জামাই বেরিয়ে গেলে বাড়ি পাহারা দিতে একটি ছোটখাটো বিশ্বস্ত মেয়ে থাকলে সুবিধে হয়। সে যদি টুকটাক কাজকর্ম করতে জানে, তাহলে তো…। একে প্লিজ শিশু-শ্রমিকের আইনে ফেলবেন না দয়া করে। বড্ড নিচু নজর আপনাদের।   

সুমনার কথা জিগ্যেস করছেন? হরিরামপুর ব্লকে আর ওকে কাজ করতে হয় না। ওর পোস্টিং এখন আলিপুরদুয়ারে। সেখানে ব্লক লীডার একজন মহিলা। অসুবিধে হবার কথা নয়।

     

আপনি গল্প ভাবলেন?

সেক্রেটারি সুনীলবাবু আর সুমনার সমস্ত কথাবার্তা তো হাওয়ায় হারিয়ে গেছে। কললিস্ট ঘেঁটে শুধু দেখতে পারেন, কে কাকে কতক্ষণ ফোন করেছিল।     

আমি শুধু আন্দাজ করে করে লিখলাম। দুই আর দুইয়ে পাঁচও হয়। কেয়ারলেস মিসটেক।       

 

 

 

 

  

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত