| 21 মে 2024
Categories
এই দিনে কবিতা সাহিত্য

সিফাত বিনতে ওয়াহিদের গুচ্ছকবিতা

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

আজ ২৭ ফেব্রুয়ারি কবি,কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক সিফাত বিনতে ওয়াহিদের শুভ জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


সুইসাইড নোট

নাক থেকে লোম তুলে ফেলার মতো সাবলীল হবে আমার মৃত্যু যাপন। বৃদ্ধা থেকে তর্জনীর এক চুটকি সময়টুকু হবে আমার স্মরণকাল! অথচ ইতিহাস এই বলে আর্তনাদ করবে- প্রকাশ্যে অথবা ছলে-বলে-কৌশলে আমার হৃদয়-অস্তিত্ব-মজ্জায় যতবার ধ্বনিত হয়েছে তোমার নাম, পৃথিবীর কোনো গর্ভধারিণীও ততবার চুমু খায়নি সন্তানের গাল! তবু তুমি সহস্র বছর ধরে বিকারহীন পথ হেঁটে যাবে; কেবল তোমার আড়মোড়া ভাঙা শেষ হলে, আমার মৃত্যুর উপর লিখে যাবে কেউ- অস্বাভাবিক!

শিরোনামহীন ১

কতটুকু মুক্তি চাই এই পরাধীন স্রোতে? একটি আরশোলার মৃতদেহ দেখে- প্রশ্ন জেগেছে মনে! আমার মৃত্যুর পর কেউ যেন টুকরো টুকরো করে ছড়িয়ে দিয়ে যায় ব্যর্থ কবিতার সমস্ত খাতাগুলো। কবর থেকে একে একে চলে গেলে সব, মৃত শবদেহের বিভৎস হাহাকারে ভেঙে যাবে যাবতীয় নিঃসঙ্গতা বোধ! ঠিক কি কারণে আমার মৃত্যু তরান্বিত হয়- সমস্ত সন্ধ্যা এসব মৃত চিন্তা কল্পনা করে মধ্যরাতে সযত্নে তুলে নিবো ছিঁড়ে ফেলা কবিতার খণ্ড খণ্ড দেহ! তারপর ভোরবেলা তুমুল বৃষ্টি শেষে এলোমেলো কবরের মাটি সরে এলে সেখানে রৌদ্র হাস্যজ্জ্বল এক অর্ধ ডুবন্ত মহাকাব্য দেখা দিবে, কেননা ব্যর্থ কবিতারা পুনর্জন্মে বিশ্বাসী!

শিরোনামহীন ২

আমাদের মেমোরি সেলে সাইরেন বাজায় এক সুতীক্ষ্ণ পোকা, যেন প্রগাঢ় শূন্যতাকে জাগিয়ে রাখে এক প্রকাণ্ড মাদক। কিছু পুরোনো অভিমান তপ্ত দুপুর রোদের মতো দীর্ঘজীবন নিয়ে বিঁধে থাকে মৌনতার জালে, আর আমরা পাথর ছুঁড়োছুঁড়ি করে আত্মঘাতী হয়ে উঠি প্রাত্যহিক কনফেশনে। আমাদের প্রত্যেকের নিজস্ব আয়না আছে তবুও একে অন্যের আয়না ভাঙার প্রতীক্ষার যেন অতর্কিত ছুঁতো খুঁজে পাই। আমাদের ভেতরের লাল ঘৃণাগুলো জমে অচিরেই গড়ে উঠবে ক্ষতের নীল সুদীর্ঘ প্রাচীর, কেননা একটু একটু করে প্রতি মুহূর্তে খুব গোপনেই চুরি হয়ে যাচ্ছে পরস্পর বিশ্বাসগুলো!

শিরোনামহীন ৩

মাতালের মৃত্যুর আগে; বেলা এগারোটা তেত্রিশ মিনিটে ফার্মগেট টু বিজয়সরণী মোড়ে সারিবদ্ধভাবে নির্জনতা নেমেছিল। নীল আকাশ খুঁড়ে খাচ্ছে কালো আইসক্রিম আর দিনের আলোতেই সেখানে ঝুলেছিল ঢাউস বাদুড়! মাতাল শুন্যে হাঁটে, চোখ বুজে শুকনো-ক্ষয়ে যাওয়া দু’ঠোঁট চোখা করে শিষ দেয়- ‘ইফ ইউ মিস দ্য ট্রেন আ’ম অন/ইউ উইল নো দ্যাট আই’ম গন/ইউ ক্যান হেয়্যার দ্য হুইসেল ব্লো অ্যা হান্ড্রেড মাইলস…।’ মাতাল থেমে যায়; শূন্যে তাকায়, হাসে! দু-এক ফোঁটা জল চোখে পড়ে কালো আইসক্রিম গলে। তীব্র হুঙ্কারে মাতাল চিৎকার করে- স্টপ ইন দ্য নেম অফ লাভ! স্টপ! ডু ইয়্যু নো মি! আমি অমিট রয়! লাবণ্য কোথায়? শহুরে নির্জনতা ভেঙে মাতালের কান জুড়ে তীক্ষ্ণ খিলখিল হাসি, যেন লাল নখে ছিঁড়ে দিয়েছে কেউ কানের দড়ি! নির্জন দুপুরে মাতালের শুকনো ঠোঁট ছিঁড়েখুঁড়ে খায় এক ক্ষুধার্ত শকুনি!

শিরোনামহীন ৪

আপনার সঙ্গে তৃতীয় পর্বে মিলিত হওয়ার সম্ভাব্য উপলক্ষ লিখে রেখে যাবো কোনো এক গোপন সমুদ্রের মাঝ বরাবর- সুদীর্ঘ তলদেশে। দীর্ঘ সেই চ্যানেল পাড়ি দিতে গেলে প্রথম পর্বের কৌতূহল আর দ্বিতীয় পর্বের ঘনিষ্ঠ পতন, পিনপতন নীরবতায় আলিঙ্গন করবে- বিশ্বাসঘাতকের গলায় ক্রুশবিদ্ধ আপনার যাবতীয় কনফেশন। আপনার-আমার তৃতীয় পর্বের খোঁজে সমুদ্রে ছলছল করবে ধর্ষিত হৃৎপিণ্ডের রক্তের কালো জল। আমাদের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বের সমস্ত দায় ডুবে যেতে দেখে পশ্চিমের এক প্রলয়কারী শিঙ্গারে ফুঁ পড়বে, তারপর সমুদ্রের সমস্ত জল প্রকট শব্দে মুহূর্তেই রূপ নিবে এক বিরাট- পাথর! কেননা এই পৃথিবীর সকল সমুদ্র জল নিমিষেই পাথরে বদলে দিতে পারে- এক ঠাণ্ডা মাথার খুনী!

শিরোনামহীন ৫

উৎসর্গ : (আমরা দু’জনে আছি; পৃথিবীর পুরোনো পথের রেখা হয়ে যায় ক্ষয়, প্রেম ধীরে মুছে যায়, নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়।)

ধরো তুমি-আমি দেখা হয়ে গেলে বিচ্ছিন্ন সন্ধ্যায়; আমি বেদনায় নীল হয়ে উঠি, তুমি ক্রোধে জ্বলে লাল। জ্বলন্ত শরীর সাগরে ডুবাতে ডুবাতে তুমি চিৎকার করে যাও- তোমার প্রেতাত্মা সরাও, আমার হৃদয় অপবিত্র হয়ে উঠে তার কুৎসিত কোলাহল শুনে! আকাশে-বাতাসে কঠিন বজ্রপাত; অথচ তোমার চিৎকারে আমার নেই কোনো পাপ, কেননা আমি জানি- মিরাকল হ্যাপেনস, স্টিল নাউ অ্যান্ড দ্যান!

শিরোনামহীন ৬

তুমি যখন ব্যর্থ বিরোধীদলের মতো ফ্লোর ছাইড়া চইলা যাইতেছিলা, আমার রেড ওয়াইনের গ্লাস তখনও শেষ চুম্বনের অপেক্ষায় বইসা ঝিমাইতেছিল। জিহবার নীচে পেঁয়াজের হালকা ঝাঁঝালো স্বাদ; কেশোনাট সালাদের বাটি থেইকা কিউব কইরা কাটা চিকেনগুলা তোমার চইলা যাওয়া দেখতেছিল অলস ভঙ্গীতে। বার কয়েক মোচড় দিল পেটের ভেতর, পেট থেইকা মুখ পর্যন্ত হালকা চুকা ঢেকুর উইঠা আসতেই তোমার চইলা যাওয়ারে কইলাম- টু হেল উইথ ইয়োর সাসপিশন, টু হেল উইথ ইয়োর লাভ!

কষ্টের কনফার্মেশন

তুমি আমারে দুঃখ দাও নাই কোনো,

তবু আমার খালি দুঃখবোধ জাগে।

মনে হয় আমার ইল্যুশনের ভেতর

প্রতি ন্যানো সেকেন্ডে এক একটা ফিকশন ক্রিয়েট হইতেছে।

তুমি ওইখানে ‘তুমি’ না থাইকা,

আমার ইনসিনিটির জার্নিতে অনেক বেশি ক্রূর হইয়া উঠতেছ,

রিয়েলিটির ‘তুমি’ থেইকা,

ইমাজিনেশনের তোমারে লাগে যেন

তুমি অলওয়েজ চেইতা থাকো-আমার চাইল্ডিস আচরণে।

তুমি আমারে কোনোদিন কষ্ট দাও নাই- জানি,

তবু লাগে যেন তুমি,

একমাত্র তুমিই আমারে কষ্ট দিতেছ ভিন্ন ভিন্ন পজিশনে,

সমস্ত পসিবল ডিজায়ার থেইকা তাই পালাইতে চাইয়া

ক্রমশ অনুভূতি এডিট করতেছি আমি

যেন রিয়েলিটির তুমি এইসব ইমোশনরে ফেইক ভাইবা

সিগারেটের বাটের মতো ছুইড়া ফেলতে পারো

আমার সার্টেন মেমোরিরে।

তুমি চাইলেই আমারে যেমন ইচ্ছা দুঃখ দিতে পারো,

আমি জাস্ট তোমার দুঃখের কনফার্মেশনটা চাইতেছি…

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত