| 23 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

করোনাকালের মানুষগুলো

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট

খুব সকালে আজ ঘুম ভেঙে গেল সুরমার। কেমন যেন অন্যরকম লাগছিল।তখনো আলোফোটেনি ভাল করে। নিস্তব্ধ চারদিক।কিন্তু সুরমা বেশ শুনতে পাচ্ছিল মৃদুস্বরে কে যেন ডাকছে,

-সুরমা, এই সুরমা…।

ধড়ফড়িয়ে উঠে পড়ল সুরমা। আর তখনি যেন জানলার পাশে ডেকে উঠল অজানা কোন পাখি, টুই টুই…। একরাশ ভালোলাগার আবেশ যেন ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে। কী যে হল তারপর!  সুরমা যেন  সেই ছোট্ট ডাগর চোখের সুরমা হয়ে গেল। দুই বেণি দুলিয়ে কথা জুড়ল না দেখা পাখির সাথে। ওরে পাখি, কেমন করে এলে তুমি এখানে? কোথায় তোমার বাড়ি? কোথায় তুমি যাবে? পাখি শুধু বলে, টুই টুই…।

সুরমা বলে-দাঁড়াও পাখি, এক্ষুনি আসছি তোমার পাশে।

এই বলেই যেন হুঁশ ফিরল সুরমার। মনে পড়ল, কাল অনেক রাত অবধি ঘুমুতে পারেনি সে। করোনায় আক্রান্তদের আপডেট দেখে  বড্ড অস্থির লাগছিল। ঘোষণা না হলেও লকডাউন চলছে গোটা দেশজুড়ে। সুরমার অফিস কর্মীদের বাড়িতে থাকতে বলেছে। সেই মত গত তিন দিন ধরে বাড়িতে থেকে অনলাইন অফিস করছে সুরমা। হ্যাঁ সুরমার কথা বলছি। একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায় উচ্চ পদে কাজ করে সুরমা। এই সেক্টরে ব্রিলিয়ান্ট আর দক্ষ বলে খ্যাতি আছে তার। মাস গেলে মোটা মাইনে পায়। জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য আছে কিন্তু সময় নেই বড় একটা। কেবলি  ছুটতে হয় বলে  দিন-রাত, কাজের দিন-ছুটির দিন, দেশ বিদেশ  তফাতটা  তেমন অনুভব করে না  সুরমা।  বড্ড গতির এই জীবন নিয়ে বেশি মাথাও ঘামায় না। সুরমা হয়ত ভালই আছে তার বর্তমান নিয়ে। তার কর্মময় জীবন আর ছেঁড়াখোঁড়া সংসার নিয়ে। সুরমা হয়ত ভুলেই গেছে সেই ছোট ছোট আনন্দ, ভালো লাগা আর উদযাপনের দিন গুলোকে।

তবে আজ সকালেই কেন এমন হল? বর্তমান অতীতের মিশেলে তৈরি বিচিত্র এক অনুভূতি জড়িয়ে সুরমা তার ফ্ল্যাটের সামনের দিকের  বারান্দায় এসে দাঁড়াল অনেক দিন  বাদে। ঝকঝকে নীল আকাশ থেকে নরম আলো ছড়িয়ে পড়েছে।বারান্দার এক কোনে রাখা টবটিতে  ফুটে থাকা সাদা সাদা নয়নতারারা ঠাণ্ডা বাতাসের সাথে দুলে দুলে কেবলি  নাচছে।সুরমাকে দেখে যেন ওরা খুব খুশি। নয়ন তারার ঠিক পাশের টবে কে যেন একটা  কুমড়ো গাছ লাগিয়েছে, বেশ সজীব লতা গজিয়েছে তাতে। কয়েকটা ক্যাকটাস ঠায় দাঁড়িয়ে আছে এদিক সেদিক। ফুটে আছে একটা ছোট্ট নীল অপরাজিতা। কিছু টব খালি। কোন গাছ নেই। কোনটা ভেঙে গেছে। সরানো হয়নি। টুই টুই থেমে গেলেও অনেক রকমের শব্দ যেন ঘিরে ধরছিল তাকে- কিচ কিচ, তি তি, চিক চিক…। বাড়ির সামনের ব্যস্ত রাস্তা খালি। মানুষের হাঁকডাক, গাড়ির হর্ন, রিকশার অনবরত  টুং টাং, রাস্তার পাশের মাছওয়ালা, মুরগিওয়ালা, সবজির  ভ্যান  সব উধাও। সাপ্তাহিক ছুটির দিন বলে  আজ অনলাইনেও কাজ  করার তাড়া নেই। সুরমার বেশ লাগছিল এই নিস্তব্ধতার মাঝের শব্দগুলো। এই ঠাণ্ডা হাওয়ার স্পর্শ। আবার যেন ঘোর লেগে গেল তার। কোথায় সে? এই শহরেই তো, নাকি অন্য কোথাও?

ঘোর কাটল তার রাহেলা খালার ডাকে, -বলি, খাবে  আর কখন? তোমার সকালের ওষুধও তো খেলে না।

সম্বিত ফেরে সুরমার। তাইতো বেলা তো অনেক। এমন দেরি হয় না তার কখনো। সুরমা বড্ড ঘড়ি ধরে চলে। এক ফোঁটা সময় নষ্ট করতে পছন্দ করে না। বাড়িতে  ও অফিসে একই রকম সে। কাজ কখনো ফেলে রাখে না।  কিন্তু আজ কী যে হচ্ছে!  কিছুই করতে ইচ্ছে করছে না – পুরনো অলস স্বভাব পেয়ে বসেছে যেন। সুরমার অনুরোধে রাহেলা খালা এক মগ ব্ল্যাক কফি  নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালে মুখ তুলে তাকায় সে। রাহেলা খালা বেশ বুড়িয়ে গেছে। মাথার সামনের চুলে পাক ধরেছে, ঠিক সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না যেন। সুরমা মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করে, -কেমন আছ, খালা?

এই টুকুতেই রাহেলা খালা যেন ফুঁসে ওঠে। -এসব জানি তোমার কী হবে?

সুরমা বুঝতে পারে, আজ রাহেলা খালার মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে আছে। খালাকে শান্ত করার জন্যে  সুরমা প্রসঙ্গ পরিবর্তনের চেষ্টা করে। -কুমড়ো গাছটা কে লাগিয়েছে খালা? নিশ্চয়ই তুমি।

অন্যদিনের মতো খালা একগাল হেসে গলে পড়ে না। খ্যানখেনে গলায় বলে,- তুমি কী আর  আগের মত গাছের কাছে আসো? সংসারের কোন খিয়াল রাক? তুমি তো আছ তোমার অফিস আর কাজ নিয়ি। আমাগের  খবর কে রাকে?

‘আমাগের’  বলায় সুরমার এবার বুবাইয়ের  কথা মনে  পড়ল। এতো বেলা অবধি  বুবাই  কোথায়? বুবাই এই ফ্ল্যাটের  তিন নম্বর বাসিন্দা। সুরমার একমাত্র ছেলে। সত্যি, আজকাল বুবাইয়ের   সাথে খুব কম দেখা হয়  সুরমার। বুবাই  যেন ইচ্ছে করে মাকে এড়িয়ে যায়। খালার সাথে খুব সকালে বেরিয়ে  যায় স্কুলে। খালাই তাকে স্কুল থেকে নিয়ে আসে। কোচিং ক্লাসে নেয়। গিটারের স্কুলেও নিয়ে যায়। রাতে বাড়ি ফিরে সুরমা দেখে, বুবাই  তার ঘরে ভীষণ ব্যস্ত। দরজা বন্ধ। ডাকলেও তার সাড়া মেলে না। আজকাল বুবাইয়ের  খবর রাহেলা খালাই জানে।  সুরমাকে  জানায় কখন বুবাইয়ের  গাড়ি লাগবে, কবে বুবাইয়ের  বন্ধুদের সাথে রেস্টুরেন্টে খেতে যেতে হবে কিংবা  কোন বই  অনলাইনে অর্ডার করতে হবে। সুরমা যত তাড়াতাড়ি পারে ব্যবস্থা করে দেয়। তবু বুবাইয়ের  মুখে ঝলমলে হাসি দেখতে পায় না।

অনেক দিন বাদে  গলা চড়িয়ে  সুরমা ডাকে,- বুবাই, চলে এসো টেবিলে। খাবে না? অনেক বেলা হল। হৈ হৈ করে তেড়ে ওঠে রাহেলা খালা।- বুবাইকে ডাকবা না একন। ছুটির দিনে ও সকালে উটে না। একবারে দুপুরে   খায়।

আজ স্বাভাবিক ছুটির দিন না বলতে গিয়ে সুরমা থেমে যায়। হয়ত রাহেলা খালাই বুবাইকে ভাল বোঝে। সুরমা মনে করার চেষ্টা করে খালা ঠিক কত বছর কাটিয়ে দিল তার সাথে। হিসেব মেলে না। রান্না ঘরে কাজ করছিল রাহেলা খালা। সুরমা খালার পাশে দাঁড়ায়। জিজ্ঞেস  করে- খালা কত বছর হল মনে  পড়ে?

বেশ অবাক হয়ে খালা বলে- থাকবি  না আবার? এইতো দশ বছছর। বুবাইয়ের বয়স যখন দুই,  সেই থেকে।  তারপর  স্বরূপে ফেরে খালা।- বাজে কথা বলার সময় নাই কো। যাও তো নিজের ঘরে। অনেক কাজ বাকি। ঘর মুচব, রান্না-বান্না আচে। ছুটা বুয়া আসা বন্ধ করি দিচি যে বাড়িওয়ালা, মনে আচে তোমার?

হুম, মনে পড়ল করোনার ভয়ে বাইরের লোক এই বাড়িতে ঢোকা একেবারে বন্ধ করে দিয়েছে বাড়িওয়ালা। ভাড়াটেদেরও  অকারণে বাইরে যাওয়া নিষেধ। ড্রাইভার কে ছুটি দিয়ে দিয়েছে সুরমা। কিন্তু তার  কাজ কমলেও, ব্যস্ততা বেড়েছে রাহেলা খালার। একা  বাড়ির সব  কাজ করতে হচ্ছে এই হোম কোয়ারান্টাইনের দিনগুলিতে। বয়স বেড়েছে খালার। আগের মত সবকিছু সামলাতে পারে না। কারণে-অকারণে  প্রচণ্ড ক্ষেপে ওঠে। আজ বড্ড বেশী ক্ষেপেছে। পাল্টা রাগ প্রকাশের  বদলে আজকে ভীষণ লজ্জিত বোধ করে সুরমা। লেগে পড়ে ঘরের কাজে। ঘর মোছে, গাদা -গুচ্ছের শোপিসে জমে থাকা ধুলোর আস্তর সরায়, রেফ্রিজারেটর -ওভেন পরিষ্কার করে, টবের গাছগুলোর গোড়ার শক্ত মাটি  খুঁচিয়ে দেয় যত্ন করে, বুকশেলফে গুছিয়ে রাখে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বই। তারপর অনেকটা  সময়  স্নান ঘরে কাটিয়ে দেয়। আয়নায় নিজেকে খুঁটিয়ে দেখে।  আবিষ্কার করে, সেই প্রাণোচ্ছল  চেহারা আর  নেই।  চোখের নিচে কালি, একটা দুটো রূপালি  চুল উঁকিঝুঁকি মারছে, কপালে হাল্কা বলিরেখার ছাপ।  কেউ পাশে থেকে লক্ষ্য  করে নি  তাকে। বলেনি নিজের যত্ন নিতে। তাই হয়ত সুরমা নিজেও খেয়াল রাখেনি নিজের। রাহেলা খালার মত সেও বুড়িয়ে যাচ্ছে।

খালার হাঁকডাকে অস্থির হয়ে ডাইনিং টেবিলে যেতেই হল অবশেষে। বুবাইও এসে বসে আছে। মায়ের দিকে না তাকিয়ে রাহেলা খালার সাথে কথা বলছে টুকটাক। খাবারের আয়োজন অতি সামান্য। ডিমের কারি, মসুর ডাল আর কুমড়োর খোসা ভাজা। কুমড়োর খোসা দেখেই তড়াক করে লাফিয়ে উঠল বুবাই। -এটা কী? এসব কী খাওয়া যায়?

রাহেলা খালা তাকে শান্ত করার চেষ্টা করে, আজ একটু  কষ্ট করে খাও বুবাই সোনা। বাসায় যে সবজি নেই কো। তোমার মাকে বলিচিলাম, বেশি বেশি বাজার করি  রাকতে। শুনল না তো। আবার একরাশ বিরক্তি আর অনুযোগ ঝরে পড়ে সুরমার প্রতি।

সত্যিই, লকডাউনের আগে রাহেলা খালা বারবার বলা স্বত্বেও সে বাজারে যায়নি। অফিস কলিগদের অনেকেই ছুটছিল কাঁচা-বাজারে, ডিপারট্মেন্টাল স্টোরে। সে তেমন গা করে নি। কেমন যেন অস্বস্তি লেগেছে। নিজেকে স্বার্থপর মনে হয়েছে। তাই মাসের বাজারের বাইরে অতিরিক্ত কিছু কেনা হয়নি। সুরমা ঠিক করে কাল একবার বাইরে যাবে। কিছু সবজি আর মাছ কেনা দরকার। যাই হোক, দুপুরের খাওয়াটা মন্দ হল না। সুরমার  সবচেয়ে ভাল লাগল কুমড়োর খোসা ভাজা খেতে। রাহেলা খালার অনুরোধে বুবাইও চুপচাপ খেয়ে নিল।

সুরমা বলল-ও  খালা,  খোসা ভাজার আইডিয়া কী করে মাথায় আসল? রেসিপি কোথায় পেলে?

এবার রাহেলা খালার মুখে হাসির দেখা মেলে বলে, গরিবরা সব খাতি  পারে।  গোটা আনাজ-খোসা সবই। তবে তোমরা তো আমাগির রেচিপি খাবি  না নে, তাই একটু এধার ওধার করিচি। জি বাংলার রান্না ঘরে দেকিয়িচিল একবার। সেই মত, তেলে কালো জিরে ফোড়ন দিয়ে একটু আলু কুচির সাথে কুমড়োর খোসা কুচনো ছেড়ে দিচি। নেড়ে-চেড়ে সামান্য আদা বাটা, নবন (নুন), হলুদ, কাঁচা মরিচ মিশিয়ে ভাল করে ভেজে নিয়িচি। নামানোর আগে, একটু নারকেল কোরা আর টালা পোস্ত দানা ছড়িয়ে দিচি এই তো! 

রাহেলা খালার বিচিত্র ভাষাভঙ্গি   সুরমার বেশ লাগে।  হাসতে হাসতে সে বলে- বাহ!বেশ তো! তুমি আজকাল শুধু সিরিয়াল দেখ না, রান্নাও শেখ দেখছি। রাহেলা খালা আবার মুখ ঝামটা দিয়ে সরে যায়। সুরমা লক্ষ্য করে, বুবাইও হাসছে মিটিমিটি। বুঝতে পারল,  বুবাইয়েরও  খারাপ লাগে নি কুমড়ো- খোসা ভাজা খেতে।

খাওয়ার পাট চুকে গেলে সুরমা নিজের ঘরে ফেরে। বিছানায় গা এলিয়ে চুপটি করে বসে থাকে কিছুক্ষণ। হাতে অনেক পুরনো  কবিতার বই। মলাট ক্ষয়ে গেছে। নেড়েচেড়ে দেখতে দেখতে চোখ আটকে যায় প্রিয় লাইনগুলোতে। অজান্তেই সুরমা  গলা ছেড়ে পড়তে থাকে –

” বেহুলাও একদিন গাঙুড়ের জলে ভেলা নিয়ে –

কৃষ্ণা-দ্বাদশীর জোৎস্না যখন

মরিয়া গেছে নদীর চড়ায় –

সোনালি ধানের পাশে

অসংখ্য অশ্বত্থ বট দেখেছিল, হায়,”

গুটি গুটি পায়ের শব্দে চমকে ওঠে সুরমা। বুবাই দাঁড়িয়ে তার  সামনে। কুণ্ঠিত গলায় বলে-থামলে কেন, এই তো বেশ পড়ছিলে। আমি শুনছিলাম। তারপর  আদুরে বেড়ালের মত বুবাই উঠে আসে সুরমার পাশে। একসাথে দু’জন মিলে পড়তে থাকে –

” শ্যামার নরম গান শুনেছিল –

একদিন অমরায় গিয়ে

ছিন্ন খঞ্জনার মতো যখন সে

নেচেছিল ইন্দ্রের সভায়

বাংলার নদ-নদী-ভাঁটফুল ঘুঙুরের মতো

তার কেঁদেছিল পায়।”

সুরমা অবাক চোখে তাকায় ছেলের দিকে। কী যে সুন্দর লাগছে এলো-মেলো চুলের বুবাইকে, চোখ দু’ টো কী যে ঝকঝকে! সবাই বলত, বুবাই  একদম মায়ের চোখ পেয়েছে।

-বুবাই রে, কেন আসিস না আমার কাছে?

অভিমানী গলায় বুবাই বলে- আমি তো তোমার কাছে আসতে চাই,  মা। তোমাকেই তো পাই না আগের মত করে। তুমি শুধু কাজই করে যাও। গান শোন না, কবিতা পড় না। বেড়াও না। হাসোও না। তুমি বড্ড বোরিং  মা।

সুরমার কী যে হয় এতো বছর বাদে!  জমে থাকা কান্নাগুলো  যেন গলার কাছে দলার মত আটকে যায়। তারপর মা-ছেলে কত কথা…! বুবাই আজ সীমানা পেরিয়ে ঢুকে গেছে মায়ের আস্তানায়। এক সময়  সে শুয়ে পড়ে মায়ের পাশে। টুক করে ঘুমিয়ে যায় অবেলায়। সুরমা উঠে পড়ে। মোবাইল স্ক্রীনে চোখ আটকে যায়। বিপ বিপ মেসেজ আসছে অনবরত। চেনা-জানা, অজানা অনেকের। বেশিরভাগ মানুষ করোনার ভয়ঙ্কর তথ্য  কিংবা ভাইরাস নির্মূলের আজগুবি ভাবনা  শেয়ার করছে।  তবে অনেকেই  উদ্বিগ্ন টেক্সট করছে  সুরমারা কেমন আছে জানতে চেয়ে। অনেকে ফান্ড রেইজ করছে দুর্গত মানুষের জন্যে। সুরমা দ্রুত  চোখ বুলিয়ে সাইলেন্ট  করে দেয় মোবাইল। ঘুমন্ত বুবুনকে রেখে ড্রইং রুমে আসতেই রাহেলা খালার দেখা মেলে।  লো ভলিউমে টিভি চালিয়ে নিবিষ্ট মনে খবর দেখছে খালা।

-ও খালা, তোমার না এখন স্টার জলসা দেখার সময়?হালকা চালে সুরমা বলে।

ভাবলেশহীন গলায় খালা বলে- সব চ্যানেলে এখন নতুন নাটক দেখান বন্দ। তাই খবর দেকি। 

সুরমাও বসে পড়ে টিভির সামনে। গ্লোবাল করোনা আপডেট দেখতে থাকে। সাম্যবাদী করোনা এখন উহান ছেড়ে  প্রবল বেগে ছড়িয়ে পড়েছে ইউরোপে। প্রতিদিন ইটালিতে গড়ে আটশ মানুষ মারা যাচ্ছে, পিছিয়ে নেই স্পেন। আক্রান্ত আর মৃতের সংখ্যা যেন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। আমেরিকাও পিছিয়ে নেই। প্রচণ্ড ঝুঁকির মুখে আছে বাংলাদেশের মানুষ  কিন্তু হোম কোয়ারান্টাইনে থাকার পরামর্শ মানছে না কেউ। রাহেলা খালার চোখে -মুখে ভয়ের বিচ্ছুরণ দেখে এক সময় সুরমা টিভি বন্ধ করে দেয়। বলে-ভয় পেয় না, খালা। করোনা ধরলে কীই বা হবে এমন!  যদি মরেই যাই , বেশ তো সব ঝামেলা চুকে গেল।

ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে খালা। পরের বাড়িতে  কাজ করতি  আসলি এমুনই হয়। মরলি  কেউ দেখতি পারবি না লাশ টা। 

হেসে ফেলে সুরমা। রাহেলা খালার তিন কূলে কেউ আছে বলে সে জানে না।  বিধবা। সন্তান নেই।ছোট বেলায় মা-বাবাকে হারিয়েছে।একটা বোন ছিল। সেও মরে গেছে ডায়রিয়ায়  ভুগে। স্বামীর মৃত্যুর পরে শ্বশুর বাড়ির লোকেরা তাড়িয়ে দিয়েছিল খালাকে। এতো বছরে  কেউ তার খবর নেয় নি। খালাও যোগাযোগ করতে চায়নি কারো সাথে। সুরমার সংসারই খালার সংসার। সুরমার সন্তানই যেন তার সন্তান। এখানেই খালার রাজ্যপাট। বুবাইকে নিয়েই তার যত ভাবনা। আজ তবে কাদের জন্যে খালার এমন কান্না?

বিব্রত সুরমা স্বান্তনা দেয়-এমন করছ কেন খালা? কিছু হলে আমি কী তোমাকে দেখবো না?

খালার কান্না থামে না মোটেও।-মরি গেলি কী হবি, বল? দারোয়ান বলিচে,করোনায় মরলি সরকার লাশ পুরায়ে ফেলতিচে।   গিরামি মরলি  তবু  তো কবর হত ঠিক ঠাক।

সুরমা থমকে যায়। কোন কথা বলে না। জানে কোন লাভ হবে না। খালা কাঁদুক প্রাণ ভরে।

সন্ধ্যা নামার ঠিক আগে নিউইয়র্ক থেকে ফোন আসে। সুরমা মায়ের গলা শুনতে পায়। অনিরুদ্ধর সুরমাকে ছেড়ে চলে যাওয়াটা  অনেকের মত মাও  মানতে পারেন নি। অমন  শান্ত -সুবোধ প্রকৃতির জামাই কেন সব কিছু ফেলে হারিয়ে  যাবে? মেয়ের  কোন কথাই তিনি শুনতে চাননি। তারপরে একবারও আসেননি এই ছেঁড়া-খোঁড়া সংসারে। সুরমার ডাকে সাড়া না দিয়ে চলে গেছেন  ছেলের কাছে। এখন দূর থেকে নিয়ম করে ফোন করেন। বুবাইয়ের  খোঁজ -খবর নেন। তবে মা-মেয়ের সম্পর্ক জোড়া লাগে নি আর। সুরমার সাথে অদরকারি কথা আর বলেন না। কিন্তু আজ  অপ্রত্যাশিতভাবে মা বললেন-কেমন আছিস, মনা? বাইরে যাস না একদম। আমি জানি, তুই  বসে থাকার মত মেয়ে না। সুরমার যেন আবার সব গুলিয়ে যেতে থাকে।  কতকাল সে মনা ডাক শোনে না!

ভারী গলায় সুরমা বলে,-আমি ভাল আছি মা। বাসাতেই আছি। কোথাও যাচ্ছি না। তুমি সাবধানে থেকো মা। তোমাদের ওখানকার অবস্থা তো ভাল না।

মা বলেন, যদি বেঁচে থাকি তবে একবার তোর কাছে আসব মনা। তোকে যে বড্ড মিস করছি, মা।

সংযোগ কেটে যায় এরপর। সুরমার   ইচ্ছে  করে না আবার কল করতে। হাজার মাইলের দূরত্ব যেন এই  মুহূর্তে উধাও হয়ে গেছে।  তাকে বিবশ করে ফেলেছে মার আদর মেশানো  ডাক- মনা, ও মনা।

ক’টা ইমেইল করার ছিল। করতে ইচ্ছে করছে  না। রাহেলা খালার কান্না এখনও থেমে থেমে চলছে। সুরমা খাবার গরম করে বুবুনকে খেতে ডাকে।  খালা খাবে না বলে জানিয়েছে। সুরমারও যেন গলা দিয়ে খাবার নামছে না। খাওয়া শেষে বুবাই তার ঘরে ঢুকে গেলে  সুরমা বারান্দায় এসে বসে। রাত তেমন হয়নি, কিন্তু মনে হচ্ছে এ যেন গভীর রাত। গলির রাস্তাটা সকালের মতই শুনশান। কয়েকটা নেড়ি কুকুর ছাড়া কোথাও কেউ নেই। কেমন থমথমে পরিবেশ। হঠাৎ যেন  ভয়ের চোরা স্রোতে তলিয়ে যেতে থাকে সুরমা। কোভিড -১৯ যদি তার  শরীরে বাসা বাঁধে, কী হবে তাহলে? কে দাঁড়াবে তার  পাশে? সুরমার যেন সব কিছু ভেঙে পড়ে।  ভুলে যেতে ইচ্ছে করে অনিরুদ্ধর প্রচণ্ড আধিপত্যবাদি  স্বভাব, বাড়ির বউকে  বাইরে না যেতে দেয়ার ভয়ঙ্কর বাসনা,  পুরুষ কলিগদের নিয়ে অহেতুক সন্দেহ  আর  ছোট্ট  বুবাইকে ফেলে নির্দ্বিধায় হারিয়ে যাওয়ার দিনটিকে। মন জুড়ে কেবলি  ছড়িয়ে পড়ে সুরমাকে পাওয়ার জন্যে অনিরুদ্ধর পাগলামি,  সুরমাকে নিয়ে লেখা গান, সুরমার জন্যে কেনা কবিতার বই।করোনায় বন্দী এই শহরে  সেই পাগলামি ভরা অনিরুদ্ধর জন্যে  আজ সুরমার সত্যিই গলা ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করে।

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত