| 16 এপ্রিল 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

চন্দ্রমুখী কিংবা রুদ্রপ্রভা 

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট
চন্দ্রমুখী। চাঁদের মত রূপ বলে এমন নাম দেয়া হয়েছিল তার। চন্দ্রর ছোটবেলা বড্ড বেশি আদর -সোহাগে কেটেছে। পাঁচ ভাই-বোনের সবচেয়ে ছোট বলে কথা। ভীষণ ডানপিটে চন্দ্র কাঠবেড়ালির মত তরতর করে বাড়ির সামনের মস্ত বড় আমগাছের একদম মগডালে চড়ে বসত। খেলার মাঠে তার নাগাল পাওয়া ভার। সঙ্গীরা দিশেহারা। চন্দ্র নিমেষেই তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে যেত যেন। বৃষ্টিতে উথাল -পাথাল চারদিক। চন্দ্র কোথায়? বাড়ির পুকুরে। চন্দ্র কোথায়? পাশের নদী জুড়ে। রোদেলা ঝলমল দিনে আকাশের দিকে তাকালেই চন্দ্রর ইচ্ছে হত একদম উড়ে যাবে। মিলিয়ে যাবে দিগন্তের ওই নীলের মাঝে। মা বলতেন, আমার চন্দ্র বড় হয়ে ঠিক পাইলট হবে। আমাকে নিয়ে উড়ে যাবে এদিক -সেদিক, যেমন খুশি। একধাপ এগিয়ে চন্দ্র বলতো, আমি আকাশ ছাড়িয়ে মহাকাশে যাব মা। দু’ জন মিলে কয়েক আলোক বর্ষ দূরের পৃথিবীকে দেখব। মা বলতেন, তা বেশ । আমার চন্দ্র ঠিক পারবে।
 
 
 
আদরে -সোহাগে বড় হওয়া সেই উচ্ছল চন্দ্র এখন সুপারওম্যান।  কত কী যে পারে! অফিসে যায়।  একা হাতে সংসার সামলায়। প্রতিদিন কাজ সেরে হাঁপাতে হাঁপাতে বাসায় ফিরে সবার জন্য স্বাস্থ্যকর জলখাবার বানায়। সন্তানের পাহারসম হোমওয়ার্ক , পরীক্ষার বোঝা ঠেলে রাতের রান্নার প্রস্তুতি নেয়। বাড়িতে সাহায্যকারি রাখা মানা। একসাথে রান্না করে রেফ্রিজারেটরে রাখাও মানা। কর্তা বড় নারাজ হন তাতে। স্ত্রীর হাতের টাটকা রান্না প্রতি বেলায় না হলে তার চলে না। স্বাস্থ্যবিধির দোহাইও চলে জোরে-সোরে। বাঙালি রীতি মেনে প্রায় প্রতিদিন চলে আত্মীয়-বন্ধুর আনাগোনা। তাদের একেক জনের জন্য চাই একেক রকমের আয়োজন। কারো ডায়াবেটিস, কেউ ভুগছে উচ্চ রক্ত চাপে। কারো প্রচণ্ড ঝাল পছন্দ , কারো মুখে রুচি নেই। ছোট বাচ্চা বড়দের তরকারি খায় না, কেউ ঘণ্টায় ঘণ্টায় চা খায় – এমনি কত কিছু মাথায় রাখতে হয়! খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকতে মাঝ রাত পার হয়ে গেলেও কিছু বলার যো নেই। অতিথি নারাজ হবেন। গৃহস্বামীর মান যাবে।
 
 
 
সকাল হতেই আবারও রান্নাঘর সামলানোর  ধাক্কা। সন্তানের স্কুল, স্বামীর অফিস , হাসিমুখে অতিথি বিদায় পর্ব-সব শেষে যদি ফুসরত মেলে তবেই না নিজের অফিস, কাজের বোঝা এসব নিয়ে ভাবা।  ছুটির দিনেও বিরাম নেই। সকাল সকাল এক বোঝা বাজার, টাটকা রান্নার বাটনা বাটা, কুটনো কোটা-এসবেই দুপুর পার। বিকেলে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চৌকস বাচ্চা তৈরির মানসে  আরেক দফা ছোটাছুটি চলে নাচ -গান -ছবি আঁকার স্কুলে। বিয়ে বাড়ি, জন্মদিন, হাসপাতালে অসুস্থ রোগী কত কিছু যে থাকে প্রতিদিনের জীবনে!   চন্দ্রকে তাই ভীষণ ফিট থাকতে হয়। অসুখ-বিসুখ হতে মানা। কোন কিছুতেই না করতে মানা। তবুও পরিবারের সবার মন রাখা দায়। কিছু কমতি হলে স্বামীর সর্বংসহা মা কিংবা যেকোন সুগৃহিণী আত্মীয়ার সাথে তুলনা চলে। চাকরিজীবি চন্দ্রকে প্রচণ্ড স্বার্থপর বলতে কেউ পিছপা হয় না। চন্দ্রর ভুল ধরতে সবাই সদা তৎপর,  কিন্তু কেউ কখনো ভুল করেও বলে না, তোমাকে ভালবাসি চন্দ্র। কেউ বলে না, একটু জিরিয়ে নাও চন্দ্র, বড্ড ক্লান্ত তুমি।
 
 
 
এসব নিয়ে চন্দ্র বড় একটা ভাবে না । সেই তেপান্তরের মাঠ পার হওয়া চন্দ্র ছুটে চলে। ছুটেই চলে। খোলা আকাশ দেখার ফুরসত মেলে  না তার। তবুও হঠাৎ কোন একদিন কী যেন হয়। ইট-কাঠের তপ্ত শহরে যেন মাধবীলতার মৃদু- মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। রান্নাঘরের পাশে যেন ডেকে ওঠে ছন্নছাড়া কোকিল । খোলা আকাশ যেন ডাকে ‘আয় চন্দ্র আয় ‘। ঘর ছাড়ার প্রবল ইচ্ছে জেগে ওঠে । মুক্ত পাখির মত উড়তে ইচ্ছে করে যেথায় খুশি। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই ইচ্ছেগুলো মিলিয়ে যায়। ঘর ছাড়ার বিধানই তো নেই যে! এখন চন্দ্র জানে, সমস্ত দিনের শেষে সব পাখি ঘরে ফেরে। কিন্তু চন্দ্রর তো কোন বাড়ি নেই। কোথায় ফিরবে সে ? চন্দ্র জানে, তবুও যেতে চাইলে হারাতে হবে ভবিষ্যতের স্বপ্ন – নিজের মেয়েকে। অনেক লড়াই করে চন্দ্র যার নাম রেখেছে ‘রুদ্রপ্রভা’।
 
 
 
তাই নিমেষেই চন্দ্র থেমে যায়। শামুকের মত  গুটিয়ে যায় নিজের মাঝে । ঝটপট নেমে পড়ে খুন্তি হাতে। ঝপ-ঝপ করে রাঁধে-বাড়ে-খাওয়ায়। অফিস যেতে প্রায়ই দেরি হয়ে যায়। সহকর্মীরা বলেন, চন্দ্র তেমন কাজের নয়। চন্দ্র হাসিমুখে মেনে নেয়। এভাবেই বয়ে চলে জীবন। ক্ষয়ে যেতে থাকে চন্দ্র। আয়নায় বিবর্ণ নিজেকে দেখা বন্ধ করে দেয় একদিন। শুধু শেষ রাতে চন্দ্র রঙিন এক স্বপ্ন দেখে। গনগনে তেজদীপ্ত রুদ্রপ্রভা মাকে নিয়ে গোটা মহাকাশ জুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। কত আলোর  খেলা চারদিকে!  আর শক্ত হাতে রুদ্রপ্রভাকে জড়িয়ে বাঁধ – ভাঙা খুশির জোয়ারে ভাসছে চন্দ্র। চন্দ্র শুধু সেই দিনটির অপেক্ষায় থাকে। কেবলি স্বপ্ন দেখে। ভুলে যায়, এমন স্বপ্ন একদিন চন্দ্রর মাও দেখতেন। নারীর স্বপ্ন কদাচিৎ সত্যি  হয়।
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত