সংসারে, আমি কেন নারী দি বস হয়ে উঠতে পারিনি!

জন্মের পর নাকি আমার প্রবল কাশি হয়েছিল টানের মত হতো। সেই একরত্তি আমি কে কাঁধে নিয়ে যিনি সারা রাত ঘুরতেন তিনি আমার বাবা। সরল খাদ্যের গরাস ভরে ভরে যিনি খাইয়েছেন তিনি আমার বাবা!  প্রতিটি পরীক্ষার সময় উৎকন্ঠিত মুখে যিনি অফিস ফেরত ছুটে এসে দাঁড়িয়ে থাকতেন তিনি আমার বাবা। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে যার পর পর তিনটি মেয়ে হবার পর ও হাসিমুখে মিষ্টি বিলিয়েছেন তিনি আমার বাবা। এবং তিনি একজন পুরুষ।

তাই বিক্ষিপ্ত, বিক্ষুব্ধ হৃদয় নিয়ে আমি পরের বাড়ি যেতে পারিনি। এযাবৎকাল  ছাতার মতন যে বড় পাতাটির নিচে বসে আছি আমি পা ছড়িয়ে ছায়ায় রোদ্দুরে, বৃষ্টিতে  তিনি আমার স্বামী। আমি রোজগেরে নই কিন্তু  করার যথেষ্ট যোগ্যতা ছিল তিনি সারাজীবন সুউচ্চ কন্ঠে বলে বেরিয়েছেন, না আমাকে শুনিয়ে নয়, নিভৃতে কারুর কাছে কনফেশন বক্সে, এই মহিলার অবদান, আমার জন্য, আমার থেকেও অনেক বেশি। অত্যাচারী শাশুড়ী পাই নি, স্নেহপ্রবণ শ্বশুর পেয়েছি, পরেরবাড়ির মেয়েকে আগে খেতে দিতে হয়, যত্নকরতে হয় এই কথা বহুবার তাঁকেই বলতে শুনেছি। শাশুড়ী হাসতে হাসতে শুনিয়েছেন সবার কাছে আমার বউমাকে শাড়ির থেকে চুড়িদারেই বেশি ভালো লাগে জানোতো! হৃদয়বান অকৃত্রিম বন্ধু বলতে এই বয়েসেও প্রথম যে আসবে সে আমার দেওর।  সেও পুরুষ এবং  সে অর্থে পরপুরুষ বন্ধুরা!

আমার গুণ গুলি  সাজানোর ক্ষমতা আমার স্বামীর হয় নি, তার পেশাগত ব্যস্ততার কারণে, কিন্তু গুণ গুলিকে স্বীকার করে নিতে তাকে পেছুপা দেখিনি। পারফর্মিং আর্টে আমার স্বামী দড় তাই  স্ত্রীকে ভালোবাসার বিজ্ঞাপন, কথা শোনার মেকি বাধ্যতা, মিথ্যাভাষন তাকে দেখিনি কোনদিন ও, কিন্তু সুযোগ পেলেও অন্যের কাছে বিশেষত সন্তানের কাছে মায়ের গুণ টি গ্রহণ করার নীরব অনুরোধ দেখেছি। আসলে সাদামাটা পুরুষ রাও কদর করতে জানে।  নইলে! পিতা রা এমন করে বাবা হয়ে যায় কি করে! সংসারে রোজগেরে না হয়েও সমান প্রায়োরিটি পাওয়া যায়, বস না হয়েও কিন্তু আপনার কথা আপনি শোনাতেই পারেন আপনার পরিবারের সবাই কে। আপনি মুল্যবান সে কথা বোঝানোর জন্য বাদের দরকার হয় কি!

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে দেখলাম ছেলেবন্ধুরা মেয়েদের থেকে সাহায্যে দরাজ হাত বাড়িয়ে দিতো। কেউ কেউ তার পিছনে স্বার্থের ঘ্রাণ দেখতে পেলেও, না বন্ধুরা আমি জুলিয়া রবার্টস নই তাই আমার জন্য কেউ পাগল হয় নি। নেহাত ই বন্ধুর জন্য বন্ধুত্বের অমল আশ্বাস।  অনেক বয়েস পেরিয়ে এসেও যে বন্ধুত্ব পেয়েছি তাতে যে কীট ছিল বলা যাবে না, যখন নিয়ন্ত্রণ ছাড়া হতে দেখেছি বিতাড়িত করার প্রথম সুযোগ আমি ই পেয়েছি তাই আলাদা করে নারীবাদী হতে পারিনি। আমি নারীবাদী নই, কিন্তু প্রবল প্রতিবাদী । তাই  তসলিমা কে পছন্দ করি  মুক্ত কণ্ঠে বলতে পারি,  তারজন্য নারীবাদী হতে হয় না, অন্যায় দেখলে দূর দূর করে তাড়াতে পারি, মুক্ত কন্ঠে নিজের দুর্বলতা স্বীকার করে নিতে পারি। বয়স লুকোতে হয় না   অনায়াসেই হিপোক্রিট পুরুষ কে চিনতে পারলেই খেঁদিয়ে দিই দূর বহু দূর। প্রেম আর পাপ কোনো টি ই স্পর্শ করেনা আমায়।  যাপনে বিশ্বাস রাখা জীবন প্রতিবাদী হতে শেখায় সততার সাথে।  যাপন ছাড়াও যে টুকরো টুকরো সময়েবন্ধুত্বের মাদুরে বসেছি সেখানে কাটা নয় ফাটা  নয়, নির্মল নিটোল বুনন পেয়েছি। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পেরিয়ে এসেছি যে পথ, সেই পথে বহদূর আলো দেখতে পেয়েছি। কখোনো মনে হয়নি আমি কোনোভাবে প্রতারিত। পারফরমিং আর্টের জায়গায় যেদিন সততা আর স্বচ্ছতা জায়গা করে নিতে পারবে, কোনো বাদী, কোনো দিবসের হয়ত আর প্রয়োজন হবে না।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত