| 27 মে 2024
Categories
ধারাবাহিক ভ্রমণ

হিমালয়ের গহীনে : প্রকৃতি ও সংস্কৃতির মাঝে যাত্রা (পর্ব-৪)

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট

কাঠমন্ডু থেকে করে নিয়ে আসা TIMS কার্ডটি ওখানে পাসপোর্ট সহ দেখাতে হলো।TIMS মানে হল ট্রেকিং ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমস। ১০ ডলারের বিনিময়ে এটা জোগাড় করতে হয়। ছোট একটি ভবনে খুব দ্রুততায় নাম এন্ট্রি হয়ে গেল। একটু সময় নিলাম। কয়েকজনের সাথে কথাবার্তা হলো। ভারতীয় পরিব্রাজক আছে তবে তারা বেশীরভাগই অনিবাসী ভারতীয়। হয় আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে বাস করে নতুবা ইউরোপে। চেকপোষ্ট পার হতেই বিশাল দেয়ালে শেরপা ভাষায় লেখা প্রার্থনা বাক্য তারপর উৎরাই বহু নিচে নদী তার উপর দিয়ে ঝোলানো ব্রিজ। ব্রিজ পার হলে জোরেসালে আমার পরবর্তী গন্তব্য, প্রচন্ড ক্ষুধার্ত আমি, খাব ওখানে। ব্রিজ পার হবার পর প্রথম রেষ্টুরেন্টে -এই খেতে বসলাম আমি। আবার সেই জেসান এর সাথে দেখা। উল্টো দিক থেকে দক্ষিণ ভারতীয় একদল পরিব্রাজক প্রবেশ করলো, সবাই মনে হয় আমার মতই ক্ষুধার্ত। দ্রুতগতিতে খাওয়া শেষে একটু আয়েশ করে বিশ্রাম নেবো কিন্তু পেশাল তাড়া দিলো। আমার বই পড়া জ্ঞানে আর একটু গেলেই নামচে বাজার। এ অঞ্চলের সব চাইতে বড় বসতি আর দোকান পাট, যাকে শেরপা রাজধানী বলা হয়। সাগরমাথা জাতীয় উদ্যানের শুরু জোরেসাল থেকেই। একটা রোমাঞ্চকর অনুভব ঘিরে ধরে। পৃথিবীর এমন রহস্যময় অরণ্য আর সুউচ্চ পর্বতমালার মিশ্রণ আর কেথায় পাবো! যে রেস্তোরাঁয় বসে খেলাম তার পাশদিয়ে বয়ে চলেছে দুধ কোশী নদী। এই নদীটা যেন পিছু ছাড়ছেই না, পথ জুড়ে এর প্রচন্ড পানির তোড়ের শব্দ অরণ্য আর পাহাড়ের নিরবতা ভেঙ্গে সঙ্গ দেয়। ৯৩৩৪ ফুট উচ্চতা থেকে শুরু এই জাতীয় উদ্যান ২৯২৯ ফুট উচ্চতা পর্যন্ত বিস্তৃত। ১৬০০০ ফুটের বেশী উচ্চতায় ঊষর ভূমির পরিমাণ ৬৯ শতাংশ। পুরো পার্কটি জুড়েই চড়াই উৎরাই, খরস্রোতা নদী ও পৃথিবীর বৃহত্তম গ্লেসিয়ার বা হিমবাহ। যে অংশ জুড়ে গাছপালা আছে সেখানে বার্চ, জুনিপার, ব্লু-পাইন, বাঁশ, ফার আর বিস্তর রনডেনড্রনের ঝাড়। উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে তা শেঁওলা আর মসেস নামক ছোট নরম গুল্মে পরিণত হয় আর ১৮৮৬০ ফুট উচ্চতার পর হিমালয়ের স্থায়ী বরফের লাইনের কারণে কোন উদ্ভিদ বা গুল্ম জন্মে না। বনের নিচের দিকে পাইন আর হেমলক গাছে ছাওয়া। ১১৫০০ ফুট বা তার উপরে সিলভার ফার, বার্চ, রনডেনড্রন আর জুনিপার গাছ দেখা মেলে। এই উদ্যানে কমপক্ষে ১৫২ প্রজাতির পাখির দেখা মেলে যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হিমালয়ান মোনাল, ব্লাড ফিসান্ট, রেড বিলড্ কফ, ইয়োলো বিলড্ কফ। সাগরমাথা ন্যাশনাল পার্ক বেশ কিছু বিরল স্তন্যপায়ী প্রাণীর বাসস্থান যার মধ্যে মাস্ক ডিয়ার, স্নো লিউপার্ড, হিমালয়ার ব্ল্যাক বিয়ার, লাল পান্ডা, হিমালায়ন থার, লেঙ্গুর বানর, হিমালয়ান নেকড়ে অন্যতম। যদিও অক্সিজেনের চাপ যত উপরে ওঠা যায় ততই কমতে থাকে কিন্তু এসব বন্য প্রাণী কম অক্সিজেন ও প্রচন্ড ঠান্ডায় জীবন ধারনে অভিযোজন সক্ষম। আগেই বলেছি এটা ইউনেস্কো কর্তৃক সংরক্ষিত হেরিটেজ সাইট। ১৯৭৯ সালে ১৯ জুলাই এটিকে হেরিটেজ লিস্ট এর ১২০ নম্বরে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। উদ্যানের  মাঝে ২,৫০০ শেরপা বাস করে, মূলত এরা তিব্বতীয় বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। এদের মূল পেশা কৃষি ও বাণিজ্য নির্ভর। তাদের সম্পদ এই উদ্যানের মধ্যে আইনগতভাবে বৈধতা দেয়া হয়েছে। শেরপা সংস্কৃতি দ্বারা এ অঞ্চলটি প্রভাবিত। শেরপাদের নানান গাঁথা সুবিদিত। তারা ১৪০০ সালের শেষ দিকে অথবা ১৫০০ সালের শুরুর দিকে পূর্ব তিব্বতের খাম অঞ্চলের সালসে গ্যাং থেকে ২,০০০ কি.মি. দূরে এখানে এসে বসবাস শুরু করে। মূলত সামরিক ও রাজনৈতিক চাপে তারা স্থানান্তরিত হয়। শেরপারা দুটো গ্রুপে পূর্ণবাসিত হয় খুম্বু আর সোলু এই দুই অঞ্চলে। দুটো ক্ল্যান বা জাতি গোষ্ঠী (মিনইয়াগপা ও থিমি) খুম্বু অঞ্চলে ১২ টি সাব ক্ল্যান বা জাতিগোষ্ঠীতে বিভক্ত। শেরপারা তিব্বতীয় বৌদ্ধ ধর্মের নিগমপা গোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্ত। যা বিশিষ্ট ধর্মগুরু পদ্মসম্ভাব রিমপোচে কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত। কথিত আছে গুরু রিমপোচে ধানাখোশা লেকের মধ্যে ৮ বছরে বালক হিসাবে পদ্ম ফুলের মাঝে আবির্ভূত হন। ধানাখোশা লেক সোয়াত উপত্যকায়, বর্তমানে পাকিস্তানে পড়েছে। গুরু পদ্মসমম্ভাবের ৭ লাইনের প্রার্থনা খুবই বিখ্যাত এবং বহু তিব্বতীয়রা প্রতিদিন তা পাঠ করে থাকে। পথের ধারে এই গুরু রিনপোচের নানান মন্ত্রের বাহার। জোরেশালে ছোট গ্রাম, আপেল বাগান আর ছবির মত চমৎকার কিছু লজ, পাশ দিয়ে বয়ে চলা দুধ কোশী নদী। লজগুলো দেখলেই মনে হয় থেকে যাই। বাগানে ছড়ানো চেয়ারে গা এলিয়ে অলস সময় কাটাই সবুজ ঘাসের মাঝে। আপেল গাছ ভূটানে প্রচুর দেখেছি কিন্তু এখানে আপেল ফুলে ভরা বাগান দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। একটি সামরিক চেকপোস্ট আছে আবার নদী পার হবার আগে। টিমস কার্ড ও পাসপোর্ট দেখাতে হয়, তারপর নদী পার। আমার পোর্টার কাম গাইড নদীর পার ঘেঁষে হাঁটতে বললো, এটা বলে র্শট কাট। নদীর পারে বেশ খোলামেলা পথের কোন নির্দিষ্ট চিহ্ন নেই হাঁটবো, তাই দেখে শুনে পা ফেলতে হচ্ছে। তীব্র খরস্রোতা নদীর পানি পাথরে আছড়ে পড়ছে মাঝে কিছু কিছু জায়গায় নির্জনতা ছাপিয়ে ওঠা শব্দ ভয় ধরিয়ে দেয়। নদীর ধার ধরেই লারজা ডোবান এলাকা, এখানে কোন জনবসতি নেই তাই নামচে বাজারের আগে আর কোন দোকান পাট কিছুই নেই। লারজা ব্রিজ পাড় হতে হলে এখন উঁচুতে উঠতে হবে। খুবই খাড়া পথে বহু উঁচুতে লারজা ব্রিজ। এদিকে সূর্য পশ্চিমে হেলান দিয়েছে। আমি তখনো সত্যিকার ধারণা করতে পারিনি নামচে বাজার কতদূরে। লারজা ব্রিজটি এ পথের মধ্যে সবচাইতে ভীতিকরভাবে বড়। প্রচন্ড বাতাস আর নিচে গভীর নদী। এখানেই ভোটে কোশী আর দুধ কোশী মিলেছে তার স্রোত ভয়ংঙ্কর। ক্রমাগত প্রচন্ড বাতাসে দুলছে ব্রীজ। কোনমতে ব্রীজ পার হবার পালা শেষে আরও সরু পথে নিচে নামতে হবে। একটু এদিক সেদিক হলে আর রেহাই নেই। সমস্ত মনোযোগ দিয়ে নিচে নামলাম, আজ ভাগ্য ভালো কালকের মত বৃষ্টি পেয়ে বসেনি। উজ্জ্বল রোদের আলো পড়ন্ত এখন আর পাহাড়ের খাঁজে তা কিছুটা অন্ধকারে রূপ নেয়া। এখান থেকে শুধু উপরে উঠার পালা। মনে হচ্ছে না দুপুরে কিছু খেয়েছি। মাউন্টেন স্টিক এ ভর দিয়ে এগিয়ে চলেছি। একজন শেরপার সাথে দেখা হলো যিনি সকালে তার খদ্দেরকে লুকলায় প্লেনে তুলে চলে এসেছেন এত দূর! খুব ফূর্তিতে আছে সে। আমি অবাক হলাম। এদিকে আমার গাইড কাম পোর্টার এর পেটের পীড়া শুরু হয়েছে। বেচারা একটু পর পরই হাওয়া হয়ে যাচ্ছে। পানি ফুরিয়ে এসেছে তার; আমার মধ্যে থেকে তাকে ভাগ দিতে হলো। আমার দেশ থেকে আনা শুকনো খাবারের ভাগ দিলাম দু’জনকে তারপর হাঁটা শুরু। ক্রমাগত পথে লোকজন কমে গেলো। সূর্য পশ্চিমাকাশে অনেকটাই হেলে পড়েছে দূর পাহাড়ের আড়ালে গেলেই আলো কমে যাবে। দু-ধারে দূর্গম অরণ্য আর নিরেট পাথর। এর মধ্যে দৌড়াতে দৌড়াতে ২০-২২ বছরের সাদা চামড়ার ছোকড়া এসে হাজির। আমাকে দেখে বললো, যাক আমি ভেবে ছিলাম আমিই শেষ মানুষ এ পথে তুমি আছো ভালই হলো। কি অসুরে প্রাণশক্তি ছেলেটির লুকলা নেমে আজই চলে এসেছে এতদূর, নামচে গন্তব্য, আমি অবাক হই! এর আগে ছোকড়া অন্নপূর্ণা রেঞ্জও ঘুরেছে জানালো। প্রসঙ্গক্রমে জিজ্ঞেস করলাম কোন দেশ থেকে এসেছো, উত্তর ইসরায়েল, আমাকে জিজ্ঞেস করায় বাংলাদেশ বলায় আঁতকে উঠলো চোখ গোল গোল করে বললো তুমি নিশ্চয়ই হিন্দু! না সূচক মাথা নাড়তেই ছোকড়া মনে হলো উর্ধ্বশ্বাসে দৌড় দিলো। এবার আমার অবাক হবার পালা, ৮ দিন বাদে ছোকড়ার সাথে এভারেষ্ট বেইস ক্যাম্পের দোরগোড়ায় আবার দেখা। জিজ্ঞেস করলাম তুমি কি আমাকে হেজবুল্লাহ গ্রুপের টেররিষ্ট ভেবেছিলে কিনা, সে দিন যে অমন দৌড়ে ভাগলে! মৃদু হাসে। নামচে পৌঁছে বেচারা অসুস্থ হয়ে পড়ে, তাই অত তাগড়া পালোয়ানি করেও আমার মত কচ্ছপের সাথেই তাকে এভারেষ্ট দর্শন করতে হলো।

শুধু শারিরীক সক্ষমতা থাকলেই চলে না এখানে, প্রতিটি অঞ্চলের উচ্চতা আর তাপমাত্রার সাথে খাপ খাওয়ানোর বিষয় গুরুত্বপূর্ণ খুব আর তাড়াহুড়ো পরিব্রাজকদের জন্য প্রাণহানীরও কারণ হতে পারে। সাধারণত যে দু’জায়গায় একলাইমাইজেশান এর জন্য অবস্থান নেয়ার কথা বলা হয়েছে, সেখানে অবশ্যই দু’দিন অবস্থান করতে হবে শরীরকে উচ্চতার সাথে খাপ খাইয়ে তাল মেলানোর জন্য। আমি সামনে এগিয়ে যাই। আলো পড়ন্ত, পথে লোক সমাগম নেই বললেই চলে, এই খাড়া পাহাড় পেরিয়ে তবে নামচে বাজার। দু’একজন কদাচিৎ স্থানীয় অধিবাসী যারা দ্রুতগতিতে মালপত্তর বহন করে চলছে এ ছাড়া আর কোন পরিব্রাজক নেই। সূর্য পাহাড়ের আড়ালে নেমে গিয়েছে বহু আগেই। এই খাড়া পাহাড়ের খাঁজে একটা খোলা চত্বরে পেশাল বসে আমার জন্য অপেক্ষা করছে, একটু স্বস্তি ফিরে এলো। এখান থেকে এভারেষ্ট দেখা যায় কিন্তু মেঘে ঢেকে রয়েছে আর আলোর স্বল্পতাও রয়েছে। আমার খাবার পানি শেষ, তেষ্টায় গলা শুকিয়ে কাঠ, ক্লান্তিতে পা একটু এগুতে চাইছে না। পোর্টার পেশাল এর অবস্থাও কাহিল। এই শরীরে আমার ভারী ব্যাগ বহন করতে দেয়াটা অমানবিক কিন্তু আমি উপায়হীন।

 

 

 

 

চলবে …

 

 

 

 

মারুফ কবিরের সব লেখা ও এই ধারাবাহিকের আগের পর্বগুলো পড়তে ক্লিক করুন।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত