কে তুমি রূপমতী 

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com(১)

কলকাতা থেকে ইন্দোর এসেছি ট্রেনে করে। তারপর গাড়ি নিয়ে মান্ডুর দিকে। এত জার্নি করা এই মুহূর্তে দরকার ছিল না আবার ছিলও। তবে পাগল না হলে কেউ প্রচণ্ড গরমে মধ্যপ্রদেশ যায়? তবুও চলে এলাম। সাতপাঁচ না ভেবেই। না না মোটেও ভবঘুরে নই আমি। অত বেড়ানো-টেড়ানোর ঝোঁক বা হঠাৎ করে ঝোলাঝুলি কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়া কোনোদিন ধাতে সয় না আমার। এবারে তার ব্যাতিক্রম। শুনেছি দাদু দিদিমা বিস্তর রোগ ভোগান্তির পর বিন্ধ্যাচলে আসতেন হাওয়া পরিবর্তনের কারণে। আমার সেসব নয়। অফিসের ছুটি নেওয়াও সমস্যা ছিল তবুও ম্যানেজ করলাম। অনলাইন টিকিট কাটতে গিয়ে সেই ঘুরেফিরে ভারতবর্ষের মাঝখানটাতেই ক্লিক করে ফেললাম আর কি।  তবে ক’টা দিন কলকাতা থেকে কিছুটা পালিয়ে এসে বেঁচেছি যেন। আমার অস্থিরতা, তোলপাড় কিছুটা হলেও তো কমল এই এদ্দূর এসে। সেটাই বা কম কিসের?

অফিসের একদল কলিগ সেবার মান্ডু ঘুরে এসে বলেছিল। পাথরের স্থাপত্যের নাকি অভাবনীয় উৎকর্ষ সেখানে। আফগান স্থাপত্যের এক অপূর্ব নিদর্শন নাকি এই মান্ডু। এককালে মুঘল সম্রাটদের আরামের শৈলশহর ছিল পাহাড়ের অলঙ্কার এই মান্ডু।
না না বাকীটা মানে মান্ডুর ইতিহাস, রাজাদের জীবনযাপন, সম্ভোগ, আনন্দ, যৌবন এবং ভালোবাসার কাহিনী শুনেছি বটে তবে তাই জন্য ছুটে আসিনি মোটেও। সবাই বলে এখানকার পাথরের নিপুণ শৈলী দেখলে মনে হয় মানুষ কি না পারে! তবে একদিন দেখতে যাবার ইচ্ছে আছে ঘুরে ঘুরে মান্ডুর রাজপ্রাসাদ এবং প্রতিটি মহল। নয়ত সামান্য কেরানীর পয়সা উশুল হবে কি করে? নিজের চোখে না দেখলে বুঝব কি করে তার বিশালতা এবং রাজকীয়তা? ফিরে গেলে অফিসে সবাই নয়ত আওয়াজ দেবে যে।

(২)

তখন আমার আস্তানা জঙ্গলের ভিতর, নদীর ধারের বাংলো। এক সন্ধেবেলা বারান্দায় বসে আছি। সামনে কুয়াশার চাদরে মোড়া অমাবস্যার জঙ্গল। কানে আসছে নদীর জলের আওয়াজ। মাঝেমধ্যে বুনো ঝিঁঝিঁর দাপুটে কনসার্ট। একদল পোকামাকড় থামে তো আরেকদল ধরে। ভাবছি কখন খুলব হুইস্কির বোতল। তাতেই আমার সব মনখারাপ আছড়ে পড়বে সেই জঙ্গলে।

হঠাৎ শুনতে পেলাম পায়ের খসখস শব্দ। ঠিক যেন শুকনো পাতার ওপর দিয়ে কেউ হেঁটে এলে যেমন খড়খড়ানি হয় তেমনি। চমকে উঠলাম। মানুষ? কিছু আগেই কেয়ারটেকার যে বলে গেল, পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে কোনও জনবসতি নেই। তাহলে? এবার পাতার খড়খড়ানি থেমে গিয়ে নূপুরের হালকা রিনরিন। তবে কি কোনও মেয়ে আসছে এদিকে? ভাবতে না ভাবতেই দেখি আমার সামনে একটি মেয়ে এসে দাঁড়িয়েছে। গায়ের রঙ মাজামাজা। মুখখানিও ঢলঢল।

-কে তুমি? কি চাও? কী নাম তোমার?মেয়েটির হাসির হররায় ফেটে পড়ল যেন অন্ধকার চরাচর।
-কি হল? হাসছ কেন?
মেয়েটার হাসিতে, শরীরি বিভঙ্গের লাস্যময়তায় গা জ্বালা করলেও সেই মুহূর্তে বেশ ছমছমে একটা অনুভূতি হল।

হাস্কি ভয়েসে মেয়েটা বলল, আমার নাম কালীমতী।

-মান্ডু কেমন লাগল বাবু?

মান্ডু তে গতকাল ঘুরে এসেছি। রূপমতীর আখ্যান শুনেওছি গাইডের মুখে। তুমি আবার কে হে কালীমতী?  

-তুমি তাহলে বাজ বাহাদুরকেও চেনো তো বাবু?
-হ্যাঁ, মানে শুনেছি, বললাম তো। আমার পিঠের শিরদাঁড়ায় চোরা স্রোত ওঠানামা করছে তখন।মেয়েটা বলল,

-আমায় তোমার সঙ্গে নিয়ে যাবে বাবু?
-সে আবার কি কালীমতী? তুমি কোথায় যেতে চাও? আমিই বা কেন তোমায় নিয়ে যাব? আমার কথাটা শেষ হতে না হতেই সে হেসে উঠল খিলখিল করে। বলল,

-আমি এখানেই থাকি। রূপমতীর মতই। তোমার সঙ্গে যেতে চাই গো বাবু।
-সত্যি করে বলবে? তুমি কে? মনে মনে বলি, রূপমতী তো মালওয়া প্রদেশের মেয়ে ছিল। সে তো অমন পরিষ্কার বাংলা বলতে পারত না। তুমি তো কালীমতী। তোমারও কি তার মত কোনও গল্প আছে না কি?
আবার হেসে ওঠে সেই মেয়ে।
-এই বাবু, বল না। তুমি কবিতা লিখতে পারো? বাহাদুর কিন্তু পারত। ওরা দুজনে ঐ দূরের বনে গোরু চরাতে যেত। বাহাদুর কবিতা লিখত। সেই কবিতায় রূপমতী সুর দিয়ে গান গাইত ।
-বললাম, জানি তো। কিন্তু আমি ওসব কবিতা টবিতা পারি না।
-সে কি বাবু? মেয়েটার গলার সরু অথচ তীক্ষ্ণ আওয়াজ। তুমি শুনেছ বাবু? মালওয়ার চারণকবিদের অপূর্ব গান এখনও মালওয়ার পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হয়। শোনোনি? এখনও সেখানে কবিতা লিখে গান গেয়ে বেড়ায়  রাজপুত্র কবি বাজ বাহাদুর।
-বাবু বাবু কোরোনা তো! আর ভাট বোকো না আর। বাজ বাহাদুর আর রূপমতী এখন ইতিহাস। রাগতস্বরে বলে উঠি। সবাই জানে এ গল্প।
-জানো বাবু? বাহাদুরের রাণী রূপমতীর প্রণয় গাথা মান্ডুর আকাশে বাতাসে এখনও ভেসে বেড়ায়। সমতল থেকে কত উঁচুতে রাজা তার বউয়ের জন্য কত বড় একটা প্রাসাদ বানিয়েছিল বল তো!
-তাই তো। বেশ অনিচ্ছা সত্ত্বেও উত্তর দিয়ে ফেলি বারবার। বেশ রেগে গিয়ে এবার বলি, আর কি কি বলবে বল তো? জানি তো সত্যিই মালভূমির শীর্ষদেশ জুড়ে লেক, রাজপ্রাসাদ, উন্মুক্ত সবুজ প্রান্তর সব মিলিয়ে মান্ডুদুর্গ এখন এক অনন্য ট্যুরিষ্ট ঠিকানা এখন। জানি জানি সব জেনেছি। বিরক্তি প্রকাশ করেও লাভ হয় না। এ  মেয়ে যেন নেই আঁকড়ে। ছাড়তে চায় না মোটে। আমার একলা থাকার ব্যাপারটায় এক ঘড়া জল ঢেলে দিল যেন। বললাম,

-গাইড বলেছে বটে, আজো সেই রাজমহলগুলির ভেতরে প্রবেশ করলে হয়ত শুনতে পাওয়া যাবে রাজকীয় সেই সোনাটা । ভুলভুলাইয়ার মত প্রাসাদে হারিয়ে গেলে অন্ধকারে শোনা যেতে পারে উৎসবের রাতে কোনো রাজনর্তকীর বিছুয়ার অণুরণন। আর পাথরের দেওয়ালে কান পাতলে হয়ত বা পাথর শোনাতে পারে রূপমতী আর বাজ বাহাদুরের রোম্যান্সের টুকরো গসিপ। এইসব বলবে তো তুমি? যাও তো এখন, যাও। বিশ্রাম নিতে দাও আমায়।
-হা, হা, হা… কালীমতীর সেই হাসি আবারও জঙ্গলের নিশ্ছিদ্র অন্ধকারকে পরতে পরতে ভেদ করে।  

এই মান্ডুকে নাকি তখন বলত “শাদিয়াবাদ” বা “সিটি অফ জয়।” জয় না হাতি! কি চরম তার পরিণতি! মনে মনে বলে উঠি।  সেদিন মান্ডুর অভিনব জাহাজমহল ও হিন্দোলামহল ঘুরে রেওয়া কুন্ডতে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়েছিলাম। রেওয়া কুন্ড একটা বিশাল জলাধার বাজ বাহাদুর বানিয়েছিলেন তার প্রিয়তমা পত্নী রূপমতীর জন্য। মাথায় ঘুরছিল কেবলই রূপমতী প্যাভিলিয়ন। কোথায় ভাবছি সঙ্গে নিয়ে আসা হুইস্কির বোতল খুলে দুদণ্ড বসব তা না!

-খুব করুণ গল্প না গো বাবু? কালীমতী আবার বলে ওঠে।
-হ্যাঁ, সব শুনেছি তো এসব ঘটনা। বলে উঠি সেই মেয়েকে। নতুন করে আর কি বলবে বলত তুমি? সব জেনেছি আমি। মান্ডুর শেষ স্বাধীন সুলতান বাজ বাহাদুরের  সঙ্গীতের প্রতি ছিল অকুন্ঠ ভালোবাসা। এক অতি সাধারণ হিন্দু রাজপুত ঘরের অসাধারণ রূপসী তনয়া কুমারী রূপমতীর গলার স্বরে ছিল এক অনবদ্য মিষ্টতা যা আকৃষ্ট করেছিল বাহাদুরকে।  একদিন শিকারে বেরিয়েছিলেন বাজবাহাদুর। বাগাল, রাখাল বন্ধুদের সঙ্গে রূপমতী গান গেয়ে খেলে বেড়াচ্ছিলেন সেই বনে।  সুলতান তাকে দেখে তার সঙ্গে রাজপুরীতে যেতে বললেন এবং তাকে বিয়ে করবেন জানালেন। রূপমতী একটি ছোট্ট শর্তে সুলতানের রাজধানী মান্ডু যেতে রাজী হলেন। রাজার প্রাসাদ থেকে কেবলমাত্র নর্মদা নদীকে দর্শন জানাবার বাসনা জানালেন। বাজ বাহাদুর সম্মত হলেন। সুলতান তার হবু বেগম রূপমতীর জন্য পাহাড়ের ওপরে বানালেন এক ঐশ্বরীয় রাজপ্রাসাদ  যার নাম এখন রূপমতী প্যাভিলিয়ন। সেখান থেকে রূপোলী সূতোর এক চিলতে নর্মদাকে রোজ দর্শন করে রাণী তবে জলস্পর্শ করতেন। ঐ পথেই নর্মদা এঁকে বেঁকে আরব সাগরে গিয়ে পড়েছে।

-এই বাবু রেওয়াকুন্ড দেখনি? আবার বলে কালীমতী। জানো তো? রাণীর জন্য তৈরী হয়েছিল পুণ্যতোয়া নর্মদার জলে এই রেওয়া কুন্ড। হিন্দু এবং মুসলিম  উভয় রীতি মেনে বিবাহ সম্পন্ন হলেও পরিণতি সুখকর হল না। মোঘল সম্রাট আকবর দিল্লী থেকে অধম খানকে মান্ডুতে পাঠালেন  শুধুমাত্র মান্ডু দখল করতেই নয় সুন্দরী রূপমতীকে ছিনিয়ে আনতে। বাজ বাহাদুরের ছোট্ট সেনাবাহিনী পারবে কেন সম্রাট আকবরের সেনাদের সঙ্গে? বাজ বাহাদুর ভয়ে চিতোরগড়ে পালিয়ে গেলেন রাণীকে একা ফেলে রেখে। কেমন করে পারলো বলতো? হেসে গড়িয়ে পড়ল কালীমতী।

আমি সেই গল্পের খেই ধরে বলি আর রূপমতী সেই খবর পেয়ে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করল তাই বলবে তো এবার? এবার আমার কালীমতীর আবেগ মাখানো কণ্ঠস্বর ভালো লাগতে শুরু করেছে। সে বলল, বড় কষ্টের সেটাই। তাই না বাবু?
বলে উঠলাম,
-হ্যাঁ। সুলতান লিখতেন কবিতা। রাণী গাইতেন গান। কবিতা আর গানের মধ্যে দিয়ে ভালোবাসার এক রূপকথার ভয়ানক পরিসমাপ্তি ঘটল।  এখনো রূপমতী প্যাভিলিয়নে হয়ত বা ঘুরে বেড়ায় রূপমতীর অতৃপ্ত আত্মা। চুপকথার চিলেকোঠায় চামচিকেরা আজো শুনতে পায় তার পায়ের নূপুরের শব্দ। দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হয় একটাই শব্দ যার নাম মেহবুবা। এখনো রাজপ্রাসাদের মধ্যে সেই ক্যানাল দিয়ে কলকল করে জল বয়ে চলেছে অবিরত। নর্মদাও রয়ে গেছে আগের মত শুধু রূপমতীই পারল না এই মহল ভোগ করতে ।

এ কি! আমি কেমন আগের মত কাব্যিক হয়ে পড়ছি যেন। ঠিক এমন হত আরেকজনের সঙ্গে গল্প করতে করতে। এ মেয়ে আমায় সম্মোহিত করে ফেলল তবে? আমার কাব্য করা হারিয়ে যায়।
-নীলকন্ঠ মন্দিরে গেছিলে বাবু? এটা আগে ছিল নীলকন্ঠ প্রাসাদ। অমনি কালীমতী বলে ওঠে। বললাম,

-নাম শুনেই বুঝে গেছি তো শিব মন্দির। তবে আশ্চর্য হলাম মুসলিম রাজত্বে শিবমন্দিরের ইন্ট্যাক্ট চেহারা দেখে। গাইডকে জিজ্ঞেস করতে সে দেখাল মন্দিরের গায়ে খোদাই করা অক্ষত একরাশ পার্সি লিপি। জানলাম সম্রাট আকবরের গভর্ণর নাকি স্থাপন করেছিলেন এই মন্দির।
-শিবলিঙ্গের মাথায় জল ঢেলেছ বাবু? আবারও সে মেয়ের কথা। জানো বাবু? রূপমতীর নর্মদা থেকে জল এসে সারাক্ষণ পড়েছে ঐ লিঙ্গের ওপরে। এমনভাবেই তৈরী ঐটি।
-বললাম নাহ! যাইনি। পাহাড় থেকে নীচে সিঁড়ি দিয়ে অনেকটা নেমে যেতে হয়। বাঁদরের বড় উৎপাত ভেতরে।

-এ বাবা! তবে তো কিছুই দেখনি গো বাবু। মন্দির থেকে জল শোধনের আশ্চর্য্য ব্যবস্থা। পাথরের আঁকিবুঁকির এক প্রণালীর মধ্য দিয়ে বইতে বইতে প্রবাহিত জল ধূলিকণা মুক্ত হয়ে সবশেষে বিশুদ্ধ হচ্ছে অবিরত। এসব দেখে এলে না?  
-বললাম, ওসব আর কি হবে দেখে? মান্ডু দেখা শেষ হতেই গাইডের রূপমতী আর বাজ বাহাদুরের প্রেমের গল্প তখনও লেগে রয়েছে কানে। তাই তখন আর কোনও কিছুতেই মন ছিল না। অমনি মেয়েটা বলে উঠল,

-সে কি গো? তুমি খুব ভালো প্রেমিক হতে পারবে বাবু।
-প্রেমিক কেন? আমি কি মানুষ নই? আমার কি মন নেই? আবেগ নেই?
প্রতিধ্বনি শুনলাম যেন সেই মেয়ের হাসির। পাহাড়ে ধাক্কা খেতে খেতে মিলিয়ে গেল তার ক্রুর হাসির শব্দ। তখনও আমার মনের কোণায় কিছুটা এলোমেলো চিন্তার সঙ্গে জমা রূপমতীর জন্য কিছুটা উদ্বায়ী আবেগ।

কালীমতী এবার বলে ওঠে। সম্পূর্ণ অন্য টোনাল ভয়েসে।

-হ্যাঁ, পারো তুমি। আমি জানি তুমি কবিতা লিখতেই এই জঙ্গলে এসেছো। কবিতাই তোমাকে দুদণ্ড শান্তি দেয়। কি ঠিক বলছি কিনা?
-ভুল বলছ তুমি। অন্য কারোর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলছ আমাকে। আবারো সেই অট্টহাসি। কালীমতীর ঝকঝকে দুধসাদা দাঁতের মধ্যে যেন ঝিলিক দিল আলো। কিন্তু এই মেয়ে কি করে জানলো যে আমি কবিতা লিখি? কবিতা আমার প্রাণ আর এই কবিতার জন্যই আমি এই জঙ্গলে এসে বসে আছি কদিন ধরে। আবারো বলে উঠলাম কে তুমি?
আবারো হাসি উচ্চগ্রামে। রসাতলে গেল যেন দিগ্বিদিক সেই হাসির শব্দে। এবার আমার যেন সম্বিত ফিরতে থাকল।

(৩)

উপালির সঙ্গে আমার ছাড়াছাড়িটা থেকে মুক্তি পেতেই মধ্যপ্রদেশের এই জঙ্গলে এসেছি আমি। কবিতা না ছাই? এখানে এসে থেকে এক লাইনও লিখতে পারিনি। মাথায় কেবল ঘুরছে উপালি, উপালি আর উপালি।বিশ্বাস কর। কি করে ভুলব তোকে উপালি? তোর গান, তোর সঙ্গে আমার কবিতায় প্রেম, কবিতায় ওঠা বসা! আমার কবিতায় তোর গানের সুর লাগানো। ঠিক যেন রূপমতীর মত।

ও মা! কোথায় গেল সেই মেয়ে? কালীমতী? উঠে ঘরের আলো জ্বালতে গিয়ে দেখি চার্জ ফুরনো সেলফোনটা সেই তুচ্ছ ব্যাটারীহীনতার বার্তা দিচ্ছে। লাল আলোর ফুটকি তার গায়ে মিটমিট করছে। উঠে গিয়ে চার্জে বসাতেই হোয়াটস্যাপ মেসেজ বক্সে দেখি দপদপ করে জ্বলছে সেই সবুজ বাতিঘর।
-ওমা! সে কি কাণ্ড! রণজয় জানিয়েছে আজ দুপুরেই উপালির সুইসাইডের খবর। ফোনে পড়ে থাকা একগুচ্ছ পোর্টালের আপডেটস ক্লিক করতে দেখি সেটাই আপাতত কলকাতার হটেস্ট নিউজ। মেট্রোরেলে যুবতীর ঝাঁপ। নাম উপালি রায়। মুখটা ফেসবুক প্রোফাইলের।

আমার অতি চেনা। আমার কবিতার উপালি। আমার ভালোবাসার উপালি। তোর সামনে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ছিল। আমার মত সাধারণ চাকুরে আর ভ্যাগাবন্ড কবির সঙ্গে তোর বিয়ে দেবে না বলেছিল তোর বাড়ির লোকেরা। পাত্র ঠিক করেছিল তারা মেয়ের জন্য। এসব মুখরোচক খবর ছেপেছে কাগজগুলো।  আমাদের বন্ধুরাই তবে জানিয়েছে। হ্যাঁ, হ্যাঁ সব সত্যি কথা লিখেছে। ইনফ্যাক্ট আমিও সেই দোনা-মোনাতেই ঝোলা নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম এদিকে। কলকাতা থেকে বেশ দূরে।
চীৎকার করে উঠি।

-কালীমতী? ঠিক বলেছ তুমি। উপালির কবিতার ছত্রে ছত্রে প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর ছিল। মৃত্যুঞ্জয়ী স্পর্ধার স্বাক্ষর রেখে যাব আমি। এবার কবিতা লিখব আমার উপালিকে নিয়ে। দুহাত পেতে বসে আছি উপালি। এসো তুমি। ধরা দাও।

জঙ্গলের সেই অন্ধকারে বিভ্রান্ত আমার ভিতরবাড়ি দিকচিহ্নহীন তখন। আমি ভয় পাইনি একটুও। রূপমতী, কালীমতী, উপালি সবাই কখন একাকার হয়ে যেন মিলিয়ে গেছে সেই আঁধারে।

 

 

 

One thought on “কে তুমি রূপমতী 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত