বাবার চিঠিতে ইন্দিরার বেড়ে ওঠা

পৃথিবীর অসংখ্য জনপ্রিয় বইগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে জওহরলাল নেহরুর ‘গ্লিমসেস অব ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি’। মেয়ে ইন্দিরা গান্ধিকে উদ্দেশে রচিত বাবা জওহরলাল নেহরুর চিঠির সংকলন এটি। বাংলায় বইটির নাম হচ্ছে ‘বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গে’।

১৯৩০ সালের অক্টোবর হতে ১৯৩৩ সালের আগস্ট, এই তিন বছরের মধ্যে ভারতের বিভিন্ন কারাগারে ‘বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ’ লেখা হয়েছে। ভারতে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ এবং ভারতে ব্রিটিশ-শাসনের প্রতিরোধ করার অপরাধে জওহরলালকে সেসময় কারাজীবন কাটাতে হয়।

বইটি চিঠির সংকলন হলেও ব্যক্তি ও সময়কে ছাপিয়ে এ গ্রন্থের আবেদন এমনই সর্বজনীন ও সর্বকালীন যে, ফিরে ফিরেই পড়তে হয় এ বইটি। পুরাতন কালকে আবিষ্কার ও পুরাতনের সঙ্গে নতুনের সম্বন্ধ নির্ণয় করতে গিয়ে জওহরলাল তার জীবনের অভিজ্ঞতা এবং জ্ঞানকে জীবন্ত করে তুলেছেন। সে সঙ্গে তুলে ধরেছেন পৃথিবীর ইতিহাস। বিশ্বের নায়কদের নিয়েও তিনি তার আদরের মেয়েকে চিঠির মাধ্যমে জানিয়েছেন। এমন চিঠির মধ্যে দিয়েই বেড়ে উঠেছেন ইন্দিরা গান্ধী।

ইন্দিরা গান্ধীকে লেখা জওহরলাল নেহরুর কয়েকটি চিঠির অংশবিশেষ বইটি থেকে তুলে দেওয়া হলো।

 

জন্মদিনের চিঠি
সেন্ট্রাল জেল, নাইন
২৬ অক্টোবর, ১৯৩০

…ইতিহাসবিখ্যাত নরনারীদের মহত্ত্বের কথা স্মরণ করে মাঝে মাঝে আমরা কল্পনা করি, সেই বীর ও বীরাঙ্গনাদের মতো আমরাও যেন সব বড়ো বড়ো কাজ করতে পারি। তুমি যখন ছোট ছিলে তখন জোয়ান অব আর্ক-এর গল্প পড়ে ভেবেছ, কেমন করে তাঁর মতো হতে পারবে। সাধারণ মানুষ বীরত্বের ধার দিয়েও যায় না, নিজের সন্তানসন্ততি বাড়িঘরদোর নিয়েই ব্যস্ত থাকে। কিন্তু এমনসব সময় আসে যখন বড়-একটা-কিছুর জন্যে উচ্চ আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এরাও অসাধারণ হয়ে পড়ে। বড়ো বড়ো নেতারা যখন জনসাধারণকে জাগিয়ে তোলেন তখন ইতিহাসে যুগপ্রবর্তন হয়। …
Nehru
নববর্ষের উপহার
নববর্ষের প্রথম দিন, ১৯৩১

…ছেলেমেয়েরা যখন সন তারিখ মুখস্থ করে বিশেষ কোনো-একটি দেশের ইতিহাস আয়ত্ত করতে চায়, তখন আমার ভারি দুঃখ হয়। বিভিন্ন দেশের মধ্যে যে অচ্ছেদ্য সম্বন্ধ আছে সেটাকে উপেক্ষা করলে ইতিহাস টেকে না। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তুমি ওরকম বিশেষ একটা কি দুটো দেশের ইতিহাস পড়তে যাবে না- ওটা ভুল। সমস্ত পৃথিবীর ইতিহাস বিভিন্ন দেশের সম্বন্ধে পরম্পরাক্রমে আমাদের দেখে নিতে হবে। মনে রেখো যে জাতে জাতে এবং দেশে দেশে যে বৈষম্যটুকু আছে বলে আমরা মনে করি তা সব সময়ে সত্যি নয়। মানচিত্রে এবং ভূপরিচয়ে আমরা সাধারণত নানান দেশ নানান রঙে রঞ্জিত দেখি- মানুষে মানুষে ওইরকম বৈষম্য আছে, কিন্তু মিলও আছে। কাজেই সীমারেখা আর মানচিত্রের নজির অনুসারে চললে আমরা অনেক ভুল করবো। …

‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’
৭ জানুয়ারি, ১৯৩১

… সমস্ত প্রকৃতি প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে নিত্যনূতন হয়ে প্রকাশিত হচ্ছে। একমাত্র প্রাণহীন জড়পদার্থ অচল হয়ে বসে থাকে। উৎসধারা আপনার বেগে বেরিয়ে যেতে চায়, তাতে যদি বাধা দাও তা হলে সে অপরিচ্ছন্ন ডোবায় পরিণত হবে, আপনাকে নিরর্থক করে দেবে। মানুষ কিংবা জাতির জীবনটাও এইরকম একটা অব্যাহত ধারা। আমাদের ইচ্ছা থাক বা না থাক, আমরা বড় হবই। খুকিরা বয়সে বেড়ে হয় ছোট ছোট মেয়ে, আবার ছোট ছোট মেয়েরা পরিণত হয় বড়ো বড়ো মেয়ে ও বয়স্কা মহিলাতে এবং পরিণতবয়স্কা মহিলারা কালক্রমে বৃদ্ধা হন। এসকল পরিবর্তন-পরিবর্ধন মেনে নিতেই হবে। কিন্তু অনেকে আছেন যাঁরা জগতের পরিবর্তন স্বীকার করতে চান না। তাঁরা তাঁদের মনের দুয়ার রুদ্ধ ও অর্গলবদ্ধ করে রাখেন, যাতে করে কোনো নূতন ভাবধারা তাতে প্রকাশ করতে না পারে। চিন্তাশক্তি-পরিচালনার কথা ভাবতেই তাঁরা যৎপরোনাস্তি ভীত হন। ফল কী দাঁড়ায়? তাঁদের সাহায্য ব্যতীতও দুনিয়া এগিয়ে যাচ্ছে। যেহেতু তাঁরা এবং তাঁদের মতোই অন্যান্য লোকেরা নিজেদের জাগরিত পরিবর্তনের সঙ্গে ঠিক খাপ-খাওয়াতে পারেন না সেজন্যেই মাঝে মাঝে বিরাট অভ্যুত্থানের সৃষ্টি হয়; এক শো চল্লিশ বছর আগেকার ফরাসি-বিপ্লব বা তেরো বছর আগেকার রুশ-বিপ্লবের মতো বড়ো বড়ো বিপ্লব ঘটে থাকে। সেইরূপ আমাদের দেশে এখন আমরা একটা বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হচ্ছি।

পৃথিবীর প্রধান ধর্মপ্রবর্তকগণ সকলেই জন্মেছেন এই এশিয়ায়। পৃথিবীর প্রাচীনতম যে ধর্মের প্রভাব আজও বর্তমান, সেই হিন্দুধর্মের উদ্ভব এই ভারতেই। চীন জাপান বর্মা তিব্বত সিংহল প্রভৃতি দেশের ধর্মগুরু বুদ্ধের জন্মস্থান এই ভারতে। ইহুদি ও খৃষ্টীয় ধর্মের উদ্ভব হয়েছিল প্যালেসটাইনে- এশিয়ার পশ্চিম-উপকূলে। পার্শিরা যে জরথুস্ট্রের ধর্মে বিশ্বাস করে তার সূচনা হয়েছিল ইরানে, ইসলামের পয়গম্বর মহম্মদ জন্মেছিলেন আরব দেশের মক্কাশরীফে। কৃষ্ণ বুদ্ধ জরথুস্ট্র, চীনের দার্শনিকশ্রেষ্ঠ কনফুসিয়স ও লাওৎসে- কত যে দার্শনিক ও তত্ত্বজ্ঞানী এ দেশে জন্মেছেন তার ইয়ত্তা নেই। পাতার পর পাতা লিখে গেলেও এশিয়ার জ্ঞানবীর ও কর্মবীরদের নামের তালিকা নিঃশেষ হয়ে যাবে না। এছাড়া, আরও কতভাবে এশিয়া যে পৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতার ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেছে সে কথা বলে শেষ করা যায় না। …

শেষ চিঠি
৯ আগস্ট, ১৯৩৩

ঊনবিংশ শতাব্দীতে বিখ্যাত ইংরেজ রাষ্ট্রনীতিবিদ বেঞ্জামিন ডিস্রেলি লিখেছেন: ‘অন্য লোক যারা নির্বাসন বা কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়, তাঁরা বেঁচে থাকলেও বাঁচে হতাশায় জীবন্মৃত হয়ে; আর বিদ্যাব্রতী ব্যক্তির পক্ষে সেই দিনগুলিই হয় জীবনের সর্বাপেক্ষা সুখের দিন। ’

তিনি বলেছিলেন হুগো গ্রোটিয়াসের কথা। ইনি সপ্তদশ শতাব্দীর হল্যান্ডের একজন বিখ্যাত আইনজ্ঞ ও দার্শনিক: এর প্রতি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ হয়, কিন্তু দু’বছর পরে ইনি জেলখানা থেকে পালিয়ে যান। জেলখানায় এই দু’টি বছর তিনি কাটিয়েছিলেন দর্শন এবং সাহিত্য সম্বন্ধে গ্রন্থ রচনা করে। বিখ্যাত জেল-ঘুঘু সাহিত্যিক পৃথিবীতে অনেকেই জন্মেছেন: এদের মধ্যে বোধ হয় সবচেয়ে বেশি প্রসিদ্ধ হচ্ছেন স্পেনের লেখক সাভান্টিস্ , যিনি ডন-কুইকসোট লিখেছিলেন; …

আমি সাহিত্যিক ব্যক্তি নই; জীবনের যে অনেকগুলো বছর জেলখানায় কাটালাম সেইগুলোই আমার জীবনের সর্বাপেক্ষা মধুরকাল, এমন কথাও বলতে রাজি নই আমি। তবু একথা স্বীকার করতেই হবে, সে বছরগুলো কাটিয়ে দিতে লেখা আর পড়ার কাজ আমাকে চমৎকার সাহায্য করেছে। আমি সাহিত্যিক নই, আমি ঐতিহাসিকও নই; বাস্তবিক, আমি কী তা হলে? এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আমার পক্ষে মুশকিল হয়ে পড়েছে। বহু জিনিসই নাড়াচাড়া করে দেখেছি আমি: কলেজে প্রথম ভর্তি হয়েছিলাম বিজ্ঞান নিয়ে, তারপর পড়তে গেলাম আইন, তারপর জীবনে আরও বহুবিধ চিত্তাকর্ষক জিনিসের আলোচনা ও অনুসরণ করবার পরে শেষপর্যন্ত গ্রহণ করেছি ভারতবর্ষে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও বহুল-প্রচলিত পেশাটি: জেলে-যাওয়া! …

…কর্মকে মানুষ অনেক সময়ে এড়িয়ে চলতে চায়, কারণ সে কর্মের ফলাফল সম্বন্ধে তাদের ভয় আছে: কর্মই ঝুঁকি, বিপদ। কিন্তু ভয়কে দূর থেকেই ভয়ংকর মনে হয়; খুব কাছে গিয়ে যদি তাকিয়ে দেখ তবে আর সে তত ভয়ংকর থাকে না। অনেক সময় আবার সেই হয় সুখপ্রদ সঙ্গী; জীবনের উৎসাহ আর আনন্দকে সে বাড়িয়ে তোলে। আমাদের এই সাধারণ জীবনযাত্রাটা এক এক সময়ে বড়ো একঘেয়ে হয়ে ওঠে, বহু জিনিসকে আমরা শুধু গতানুগতিক বলে মেনে চলে যাই, তাই মধ্যে কোনো আনন্দ খুঁজে পাই না। অথচ জীবনের সেই সামান্য জিনিসগুলো থেকেই যদি কিছুদিন বঞ্চিত হয়ে থাকি, তবে তাদেরই মাধুর্য আমাদের কাছে দারুণ বেড়ে ওঠে! অনেক মানুষ প্রকা- উঁচু পাহাড়ে গিয়ে চড়ে; শুধু পাহাড়ে বেয়ে ওঠার আনন্দের লোভে, একটা বিঘœকে অতিক্রম করা, বা একটা বিপদকে জয় করার ফলে যে আত্মপ্রসাদটুকু আসবে তারই লোভে নিজের দেহ এবং প্রাণকে বিপন্ন করে; যে বিপদ সেখানে সারাক্ষণ তাদের ঘিরে আছে তারই তাড়নায় তাদের সকল ইন্দ্রিয়ের অনুভূতি প্রখরতর হয়ে ওঠে; একটি সূক্ষ্ম সুতোর উপরে জীবনটা ঝুলে রয়েছে বলেই সে জীবনের আনন্দ তাদের কাছে গভীর লাগে। …

বই প্রসঙ্গে: ইংরেজি ভাষায় লিখিত ‘গ্লিমসেস অব ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৩৪ সালে। বঙ্গানুবাদ ‘বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গে’ – এর সংস্করণ ১৯৫১ সালে শ্রীগৌরাঙ্গ প্রেস প্রাইভেট লিমিটেড থেকে প্রকাশিত হয়েছিল।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত