Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,interview amar mitra

সাক্ষাৎকার: অমর মিত্রর মুখোমুখি অঞ্জন আচার্য

Reading Time: 11 minutes

কথাসাহিত্যিক অমর মিত্রের সাড়া জাগানো গল্প ‘মেলার দিকে ঘর’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৪ সালে। বলা যায় এটি দিয়েই তাঁর লেখক জীবনের শুরু। প্রথম উপন্যাস ‘নদীর মানুষ’। রচনাকাল ১৯৭৮। সেই বছরই বের হয় প্রথম গল্প সংকলন ‘মাঠ ভাঙে কালপুরুষ’। ‘স্বদেশযাত্রা’ নামক ছোটগল্পের জন্য ১৯৯৮ সালে পেয়েছেন সর্বভারতীয় ‘কথা’ পুরস্কার। তাঁর অনেক গল্পই মঞ্চে অভিনীত হয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রযোজনা- পিঙ্কি বুলি, দামিনী হে, পাসিং শো। ১৯৯৯ সালে তিনি লেখেন ‘অশ্বচরিত’। ২০০১ সালে এই উপন্যাসটি বঙ্কিম পুরস্কার লাভ করে। ‘ধ্রুবপুত্র’ উপন্যাসের জন্য ২০০৬ সালে পেয়েছেন সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার। ২০১৪ সালে দেশভাগ আর কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবন নিয়ে লিখেছেন উপন্যাস ‘দশমী দিবসে’। লিখেছেন ছিটমহলের বেদনা নিয়ে উপন্যাস ‘কুমারী মেঘের দেশ চাই’।

অমর মিত্র কবিকুঞ্জের আয়োজনে অনুষ্ঠিত জীবনানন্দ মেলায় যোগ দিতে বাংলাদেশে এসেছিলেন। সে সময় তিনি মুখোমুখি হয়েছিলেন গদ্যকার অঞ্জন আচার্যের।

অঞ্জন আচার্য: আপনার জন্মগ্রাম সাতক্ষীরার ধূলিহরের কথা শুনতে চাই। কেমন ছিল আপনার সেই শৈশবজীবন, ফেলে যাওয়া গ্রাম?

অমর মিত্র: ১৯৫১ সালের ৩০ আগস্ট ধূলিহর গ্রামে আমার জন্ম। ওই গ্রামকে আমরা ডাকতাম ‘ধুরোল’ বলে। দেশ তখন ভাগ হয়ে গেছে। যতটা শুনেছি বা আমার অগ্রজ মনোজ মিত্র’র লেখায় পড়েছি- বাবা ছিলেন ওই গ্রামের প্রথম বিএ পাস। ডিস্টিংশন ছিল তাঁর। আমাদের সেই গ্রামে একটি প্রাইমারি স্কুল স্থাপন করেন বাবা। সেই স্কুলে আমি ২০০০ সালে গিয়েছি। পরিচয় পেয়ে স্কুলের হেড মাস্টার মশায় স্কুলঘরে বসিয়ে আলমারি খুলে ১৯৩৮ সালের রেজিস্টার বের করে আমার বাবার স্বাক্ষর দেখিয়েছিলেন। ১৯৪৪-এ আমার বড়দা (মনোজ) এবং মেজদা (মেজকাকুর বড় ছেলে রণজিৎ) যে ওই স্কুলে ভর্তি হয়েছিল এডমিশন রেজিস্টার খুলে তা দেখিয়েছিলেন। দেখতে দেখতে আমি আমার জন্মের আগের পৃথিবীতে পৌঁছে গিয়েছিলাম যেন!

আমরা ছিলাম সাধারণ রায়ত। খুব বেশি জমি ছিল না। আবার তেমন অভাবও ছিল না। জমিজমার কিছুটা গিয়েছিল আমার ঠাকুরদা অন্নদাচরণ মিত্রের চিকিৎসায়। তিনি ছিলেন অসুস্থ মানুষ। অল্প মনে আছে ভোরে ঘুম থেকে উঠে নির্দিষ্ট চেয়ারে এসে তিনি বসতেন। বসেই থাকতেন। মাঝে মধ্যে মাছের খারা হাতে বাজারে যেতেন। বাজারটা কাছে পিঠেই ছিল। আমার তেমন কিছু মনে নেই। মনে পড়ে অনেকগুলো পুকুরের কথা, বাড়ির সামনে একটা বড় পুকুর, সেই পুকুরে জল ছিল না বেশি, পুকুরের ওপারে আমার ছোট কাকিমার মামার বাড়ি, ধর বাড়ি। একবার ওই বাড়ির কেউ একজন বৃদ্ধ মারা গিয়েছিলেন। মায়ের সঙ্গে আমি দেখতে গিয়েছিলাম। বাঁশের চালিতে শোয়ানো রয়েছে মৃত দেহ। আর রোখ ছেড়ে কাঁদছে নানা বয়সের নারী। সেই কান্নার কথা মনে গেঁথে আছে আমার। ওটাই বোধ হয় প্রথম মৃত্যু দর্শন।

কোন সাল হবে? চুয়ান্ন-পঞ্চান্ন বোধ হয়। আর একটি কথা মনে আছে, সেই বয়সের কথা। একটি চার পাঁচ মাসের নষ্ট হয়ে যাওয়া ভ্রূণ আমি কার কার সঙ্গে গিয়ে যেন বাড়ির পেছনের বাগানে পুতে দিয়ে এসেছিলাম। আমি সঙ্গে ছিলাম। সে ছিল মেঘময় দিন। বাগানে বা বাদাড়ে ছিল বড় বড় মানকচু গাছ। মানকচুর পাতা হয় মস্ত। বর্ষায় এই পাতা মাথায় দিয়ে গরিব চাষাকে আত্মরক্ষা করতে দেখেছি। হ্যাঁ, ওই ভ্রূণ মাতৃগর্ভের আশ্রয়ে ন’মাস কাটাতে পারলে আমার একটি ভাই হতো। আমি অবাক হয়ে দেখছিলাম সেই মানুষের আকৃতি পাওয়া ভ্রূণটিকে। তখন ভ্রূণ নষ্ট হয়ে যাওয়া আর শিশু মৃত্যু ছিল যেন সাধারণ ঘটনা। মায়েরা ছিলেন সর্বংসহা। আমার একটি দিদি ছিল, তাকে আমি দেখিনি। তার জন্য মাকে কাঁদতে দেখেছি। নাম ছিল ডিলডিল। আমার মা, আমার মেজদা উদয়ন বলতেন, সে ছিল খুব সুন্দর। এপারে কলকাতার বেলেঘাটার বাসায় সে মারা গিয়েছিল ক’দিনের জ্বরে।

আমার কেন তার কথা মনে নেই, আমি জানি না। আসলে পার্টিশন হওয়ার পর আমাদের পরিবার ঠিক করতে পারছিল না কোথায় থাকবে। ধূলিহরের সাতপুরুষের ভিটে ছিল, সাতক্ষীরে পার হয়ে সীমান্তের এপারে বশিরহাট শহরের লাগোয়া দণ্ডীরহাট গ্রামে জমি কেনা হয়েছিল কবে তা আমি জানি না। ধূলিহর খুব সাধারণ গ্রাম। কপোতাক্ষ ছিল কাছেই। কিন্তু আমি দেখিনি। দেখেছি সাতক্ষীরের নদী বেতনা। খালও হতে পারে তা। কিন্তু ঠাকুমা আর তাঁর বোনের সঙ্গে আমি গিয়েছিলাম কুকরুলি গ্রামে। সেখান থেকে ফিংড়ি। আমি ছোটবেলায় যে গ্রাম দেখেছি, ২০০০ সালে সেই গ্রামে এসে তা দেখিনি। সম্ভব নয়। যা কিছু বড় মনে হতো, সব আমার খুব ছোট লেগেছিল। সেই মাঠ, পুকুর। ছেলেবেলা দেখতে যাওয়া ঠিক না। ছেলেবেলার মানুষ, ছেলেবেলার গ্রাম। আমাদের সেই গ্রাম ছিল নানা কাহিনিতে ভরা। তার একটি হলো ভূত। কতরকম ভূতের গল্প যে শুনেছি! আমার ঠাকুমা বানিয়ে বানিয়ে বলতেন। আমার মা হুবহু বলতেন তাঁর ছেলেবেলার কথা। স্টিমারের ভোঁ আর কপোতাক্ষ নদের কথা।     

অঞ্জন আচার্য: একটি স্মৃতিমূলক গদ্যে আপনি বলছেন- ‘আমার ছেলেবেলার সেই শান্ত কলকাতা অশান্ত হয়ে উঠতে লাগল। খাদ্য আন্দোলন। নকশাল আন্দোলনের ভিতর আমি বড় হয়েছি ভয়ে ভয়ে। আতঙ্কের ভিতর। কলেজজীবন, লিটল ম্যাগাজিন করা, করতে করতে চাকরি নিয়ে গ্রামে চলে যাওয়া, ভারতবর্ষকে দেখতে পাওয়া, জীবনের অন্য এক সঞ্চয়। লেখার ভিতরে ডুবে থেকে কখন যে এই বয়সে পৌঁছে গেছি জানি না। কিন্তু এখনো জীবন যে আরো কিছু দেবে তা আমি জানি। চার অধ্যায়, শৈশব কৈশোর যৌবন আর প্রবীণ-এর বাইরে কত যে অধ্যায়, তার ঠিকানা নেই।’… এই যে সময়কে জন্ম নিতে দেখেলেন, কিংবা দেখলেন আমূল বদলে যেতে, এ সম্পর্কে জানতে চাই।

অমর মিত্র: কলকাতা আমার নিজের শহর। বেলগাছিয়া-পাইকপাড়া আমার নিজের পল্লী। আমরা ওপার থেকে আসা ছিন্নমূল মানুষ। কলকাতা আমাদের আশ্রয় দিয়েছিল। এই পাইকপাড়া বেলগাছিয়া অঞ্চল হলো কলকাতার সেরা জায়গার একটি। এমন অবারিত সবুজ মাঠ, গাছগাছালি, মস্ত জলাশয়, এমন নির্জন পথ আর ভালো মানুষের বাস আর কোথায় আছে? এমন বড় বড় মানুষ কলকাতার কোথায় বাস করতেন? তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, সজনীকান্ত দাস, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্য… আমি কতজনের কথা বলব? কাজী নজরুল ইসলামের পায়ের ধূলিতে ধন্য হয়েছে এই এলাকা। আমি তাঁকে দেখিনি কিন্তু তাঁর পাশের মস্ত ফ্ল্যাট বাড়িটিতে পরম শ্রদ্ধেয় শিল্পী অন্নদা মুন্সি মশায়ের বাড়ির দরজায় এক সকালে কড়া নেড়েছি। বালকদের দেখে তিনি অবাক। হাসি মুখে ডেকে নিলেন ভিতরে। সেই প্রথম চিত্রকরের ঘরে প্রবেশ। রঙের ভিতরে প্রবেশ। তাঁর সেই ঘরখানিতে ছিল যেন রঙিন বাতাস। আমাদের বন্ধুর দাদা শ্যামল বরণ বালক লান্টু ওই ঝিলের জলে ডুবে গিয়েছিল ক’বছর আগে। তার নামে একটি পাঠাগার করব, শুধু ছোটদের বই থাকবে সেখানে, তিনি যদি একটি ছবি এঁকে দেন বা পোস্টার। তিনি তো এঁকে দিলেন, পয়লা বৈশাখের সকালে এসে উদ্বোধন করলেন সেই পাঠাগার। তিনি আমাদের সঙ্গে মিশে গেলেন বালকের মতো। সেই আমার প্রথম আড্ডা বড় মানুষের সঙ্গে। হ্যাঁ, আমি এঁদের দেখতে দেখতে বড় হয়েছি আমার ছেলেবেলার এই কলকাতায় এই বেলগাছিয়ায়।

স্কুলের বন্ধুরা গিয়েছিলাম অরবিন্দর সঙ্গে তার দাদা অনুপকুমারকে দেখতে। জানালা দিয়ে দেখছি তিনি বসে আছেন ভিতরে। এ হলো মহার্ঘ স্মৃতি। সিনেমার মানুষ পর্দা আর পোস্টার থেকে ঘরের ভিতর। বিস্ময় যে যায় না। হ্যাঁ, সুখ্যাত নট প্রেমাংশু বসুকে দেখতাম ফোলিও ব্যাগ হাতে মাঠ পার হয়ে যাচ্ছেন এক নির্দিষ্ট সময়ে। তিনি হাতিবাগানের স্টার থিয়েটারে নিয়মিত অভিনয় করতেন। তাঁকেও তো সিনেমায় দেখেছি কত। আর একজনকে দেখতাম, আমাদের বাসাবাড়ি থেকে একটু ওপাশে থাকতেন। মস্ত দেহের অমর বিশ্বাস মশায়। তিনি উত্তম-সুচিত্রার সব ছবিতে থাকতেন ছোট একটি দৃশ্যে।

  ইন্দ্র বিশ্বাস রোডে আমাদের বাসা বাড়ি, সেখানে মস্ত টালা পার্ক। আগে যার নাম ছিল জিমখানা গ্রাউন্ড। একটা সময়ে বেঙ্গল জিমখানা নামের একটি ক্লাব কলকাতার ক্রিকেট ও ফুটবলে যে কোনো একটি ডিভিশনে খেলত। আমি ক্লাস ওয়ান-টু পড়িনি, একেবারে ক্লাস থ্রিতে ভর্তি হয়েছিলাম বেলগাছিয়ার মনোহর একাদেমিতে। তখন কলকাতার পাড়ার স্কুলগুলো ভালো ছিল। আমাদের স্কুলে ধনী-দরিদ্র একসঙ্গে পড়ত। আমার এক সহপাঠীর বাবা ছিলেন ছুতোর মিস্ত্রি, তাদের পদবী ছিল সূত্রধর। এক মেধাবী সহপাঠীর বাবা আইসক্রিম গাড়ি ঠেলতেন। সেই সহপাঠী পরে অনেক বড় চাকরিতে ঢোকে। ইংরেজিতে সবচেয়ে বেশি নম্বর পেত সে। নকশাল বাড়ির আন্দোলনে জড়িয়ে গিয়েছিল, জেল খেটেছিল। সে খুব সম্ভবত ফিজিক্স নিয়ে পড়েছিল। সেই ১৯৮৩ সালে যখন আমি ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রথম গল্প লিখি, সেই গল্প পড়ে সে আমার বাড়ি এসেছিল একদিন সকালে। সে ছিল এক অমলিন শ্যামলা বালক, আমি স্কুলের কথা বলছি। আমাদের আর দুই সহপাঠীর বাবার মিষ্টির দোকান ছিল বাজারে। কিন্তু এখন বুঝি সেই দোকানটি ছিল বিষণ্ণতায় ভরা। পুঁজিপাটা ছিল না তেমন। এপাড়ার জলধর মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের কাছে দাঁড়াতেই পারত না। কিন্তু সেই দোকানের নিমকি আর হালুয়াতেই ছিল আমার অমোঘ আকর্ষণ। সেই মিষ্টির দোকান কবে উঠে যায় মনে নেই। মনে পড়ে তার শো-কেসে কিছুই নেই, শুধু শূন্য গামলা আর পুরনো রসের তলানি। আমাদের সেই দুই সহপাঠীর একজন হয়েছিল ট্রাম কোম্পানির ড্রাইভার। আর একজনকে দেখতাম বাজারে সবজি নিয়ে বসত। ক্লাসের এক সহপাঠীর ছিল জাহাজ। তাদের মস্ত চারতলা বাড়ি। সেই বাড়ির গায়ে ধবধবে শাদা রঙ। সে আমার পাশে বসত। এক সহপাঠীর বাবা স্টেটসম্যান পত্রিকার সাংবাদিক। একজনের বাড়ি পাইকপাড়া যেতে মন্মথ দত্ত রোডে মস্ত জাহাজের মতো। বাড়িটার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতাম। এই সব বন্ধুদের কথা বলা মানে কত রকম ছেলেরা আমরা বড় হতাম একসঙ্গে তা বলা। আমি যখন বড় হচ্ছি, তখন উত্তাল কলকাতা। ১৯৬৫ থেকে ৬৮ খাদ্যের দাবিতে আন্দোলন, নকশালবাড়ির কৃষক বিদ্রোহ। ঘরের ছেলেরা ঘর ছাড়ে। পুলিশি সন্ত্রাসে যে কতজন হারিয়ে যায়! কতজনকে পুলিশ নিয়ে গিয়ে মেরেই ফেলেছিল। নকশালবাড়ির আন্দোলন আমার জীবনকে প্রভাবিত করেছিল। আমি যখন লিখতে আরম্ভ করি, আমাদের সামনে ছিল রাজনৈতিক আন্দোলনে রাষ্ট্রযন্ত্র ভাঙার ডাক, শাস্ত্রবিরোধী লেখকদের গল্পের ফর্ম ভাঙার আন্দোলন, ক্ষুধার্ত পত্রিকার লেখকদের সব ঐতিহ্য অস্বীকারের অঙ্গীকার- আমাকে সব কিছুই প্রভাবিত করেছিল। কিন্তু মনে হয়েছিল নিজের মতো করে নিজেকে তৈরি করতে হবে।

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,interview amar mitra

অঞ্জন আচার্য: পড়াশুনা শেষে আপনার চাকরি জীবন নিয়ে কিছু বলুন।

অমর মিত্র: ১৯৭৪ সালে আমি গ্রামে গিয়েছি চাকরি নিয়ে। এপ্রিল মাসে আমাকে যেতে হলো মূল ভারতবর্ষে। ক-বছর আগে নকশাল আন্দোলনে আলোড়িত ডেবরা থানার এক গণ্ড গ্রামে। বাস থেকে নেমে কংসাবতী নদী পার হয়ে এক গ্রীষ্মের বিকেলে আমি বেডিং আর সুটকেস নিয়ে আমার হল্কা ক্যাম্পে পৌঁছলাম এক ঘণ্টা পনের মিনিট হেঁটে। চাকরিটা জরিপের কানুনগোর। সে ছিল প্রায় জনবিরল একটি আধ-পাকা বাড়ি। কাদামাটি আর ইটে গাঁথা দেওয়াল আর টালির চাল। ওইটি আসলে তহসিলদারের খাজনা আদায়ের কাছারি। দুটি ঘর আমার অফিসের জন্য। আমার সেই অফিস, সেই নির্জনতা, অধীনস্ত কর্মচারীদের সঙ্গে মেস করে থাকা, সকাল আর সন্ধ্যেয় অফুরন্ত অবসর নিয়ে আমি করব কী? গ্রামের মানুষের সঙ্গে আমার বন্ধুতা হচ্ছে।

অঞ্জন আচার্য: সেখানেই বসেই তো আপনার ‘মেলার দিকে ঘর’ গল্পটি লেখা, তাই না? 

অমর মিত্র: হ্যাঁ। গ্রামটা ছিল খুব গরিব। আর খুব সাধারণভাবে বেঁচে থাকা সেই সব মানুষের। আমি এই জীবনের সঙ্গে পরিচিত নই। বিস্ময় আর বিস্ময়। কৌতূহলে কত কিছু জেনেছি। ধান আর মানুষ। আকাশের মেঘ আর মানুষ। ভয়ঙ্কর গ্রীষ্ম আর মানুষ। বর্গা চাষি, খেতমজুর, ভূমিহীন চাষি, খাজনা আদায়ের তহসিলদার। জমির প্রতি মায়া আর ভূমি-লিপ্সা, ভূমিক্ষুধা। আর নানা রকম বিপন্নতা। ১৯৭৪-এর সেই গ্রীষ্মে আমি একটি গল্প লিখি। নাম রাখি ‘মেলার দিকে ঘর’। তা ছিল সেই করন্ডা বা ওই রকম কোনো গ্রাম থেকে কংসাবতী নদীর দিকে গ্রীষ্মদিনে যাত্রা। বাবা ও মেয়ে চলেছে সেই যাত্রায়। বালিকা কন্যাকে মেলা দেখানোর নাম করে বেচতে নিয়ে যাচ্ছে বাবা সহদেব। সেই গল্প প্রকাশিত হলো ‘একাল’ পত্রিকায়। সেই গল্প প্রকাশের পর নানাজনের কথা শুনে মনে হয়েছিল লিখতে পারব। আত্মবিশ্বাস জন্মালো। ‘একাল’ পত্রিকা ছাপা হয়েছিল ৩০০ কপি। তা আর ক-জনের হাতে যাবে? গল্পটি পড়ে আমাকে কবি পবিত্র মুখোপাধ্যায় কবিপত্রে লিখতে বলেন। মূলত কবিতার পত্র, কবিপত্রে তখন গল্প লেখকদের একটা জায়গা ছিল। আমি কবিপত্রে পুজোয় লিখি ‘পার্বতীর বোশেখ মাস’। সেই সময়ে পরিচয় পত্রকায় একটি গল্প লিখি ‘শকুন্তলার জন্ম’ নামে। ১৯৭৫-এ কবিপত্র একটি গল্প সংখ্যা করে, সেখানে ‘মেলার দিকে ঘর’ আবার ছাপা হয়। এই গল্পেই প্রকৃত অর্থে ভারতবর্ষের দিকে আমার হাঁটা শুরু হলো। হাঁটছি এখনও।                 

অঞ্জন আচার্য: আপনার ‘দশমী দিবসে’ উপন্যাসের শুরুর দিকের সেই কথাগুলি- “ঘুম থেকে উঠে দেখবে সব বদলে গেছে। খারাপ মানুষগুলোও ভালো হয়ে গেছে। মন থেকে উবে গেছে সমস্ত অন্ধকার। হ্যাঁ, ঘুম থেকে উঠে দ্যাখো মানুষ ভুলে গেছে ধর্মাধর্ম। সমস্ত সীমান্তের রেখা গেছে মুছে। ব্যাধ ভুলে গেছে নিপুণ লক্ষ্য। মানুষ পেয়েছে পাখির স্বাধীনতা। ঘুম থেকে উঠে একদিন দেখো এমন হয়ে গেছে।”- এখানে আপনার লেখক মনের বিশ্বাস-অবিশ্বাসের বা বলতে পারি হয়ত এখানেই আপনি আপনার জীবনদর্শনকে পাঠকের কাছে উপস্থাপন করেছেন। এ সম্পর্কে একটু বিস্তারিত শুনতে চাই।

অমর মিত্র: ‘দশমী দিবস’-এর ওই অংশটিতে আবেগ কাজ করেছে। আর আবেগ না থাকলে কি লেখা হয়? তবে তা যেন আবেগ সর্বস্ব না হয়। দেশভাগ এক বেদনাদায়ক সত্য। এর পিছনে অনেক কারণ আছে। সবচেয়ে বড় বেদনা- আমি বরিশাল, পটুয়াখালী, চট্টগ্রাম, হাতিয়া দেখতে পারব না ইচ্ছা মতো। আমি যদি পেশোয়ার, করাচি, খাইবার গিরিপথ দেখতে পেতাম আমার উপন্যাস ধ্রুবপুত্র হয়তো আরও অন্যরকম হতো। দেশে দেশে সীমান্ত মানুষকে বন্দী করেছে এক অদ্ভুত ন্যাশানালিজমে। জাতীয়তা আমাদের পৃথিবীকে নষ্ট করেছে। বাংলাদেশ অন্যদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান অন্যদেশ। আমি স্বপ্ন দেখি বাহ্লিক দেশের। কোথায় আকশু নদী, আমুদরিয়া সিরদরিয়া, আমি তা এ জীবনে দেখব না। সে তো আফগানিস্তান পেরিয়ে। প্রাচীন পৃথিবীতে সীমান্ত ছিল না। পাসপোর্ট ভিসা ছিল না। তা থাকলে, ভাস্কো-দা-গামা, মারকো পোলোর পৃথিবীর কথা আমরা জানতে পারতাম না। ইতালো কালভিনোর ‘ইনভিজিবল সিটিজ’ আমার প্রিয় উপন্যাস। কত নগর পরিভ্রমণ করেছেন মারকো, তা বিবৃত করছেন কুবলাই খানের কাছে। মহৎ লেখা। আর সেই উপন্যাসের নগরও কাল্পনিক সত্য। অন্তর্গত সত্য। আমার মনে হয় দেশ আলাদা না হলে, আমাদের অখণ্ডতা অনেক আশ্চর্য শিল্পের জন্ম দিতে পারত হয়ত। তবে এই বিষয়ে নিশ্চয়তা কিছু নেই। আমি যেখানে যেতে পারি না, তা আমার কল্পনায় আছে। দশমী দিবসে, ধনপতির চর, ধ্রুবপুত্র সেইভাবেই লেখা হয়েছে। আমার যে বেদনা দেশভাগে, তা আমার নয়। আমার মায়ের, বাবার, ঠাকুমা, ঠাকুরদার। তাঁদের বেদনাকে ধারণ করেছি আমি। আমি দেশভাগের পরে, ১৯৫১-য় জন্মেছি। আমার মা আমাকে তাঁর বাপের বাড়ি আর কপোতাক্ষ নদের কথা বলতেন। আমি তিন-চার বছর বয়সে কবে কপোতাক্ষ দেখেছি মনে নেই। তবে গ্রাম ধূলিহরের বাড়ি, উঠোন, পুকুর, সাতক্ষীরে শহরে বাবার মেজমামার বাড়ি- সব আবছা মনে করতে পারি। মনে হয় দেশটা একসঙ্গে থাকলে বেশ হতো। প্রকৃত ভূমি সংস্কারে ভূমধ্যস্থতাকারী হিন্দুর ক্ষমতা কমে আসত। ভূমিহীন ভূমি পেত। যাই হোক, যা হয়েছে তা সত্য। সত্যকে অস্বীকার করা যায় না। তবে হিন্দুরা চলে আসায় কি গরিবে জমি পেয়েছে? মূল কারণ তো সিংহভাগ জমি হিন্দু জমিদারের আধীনে থাকা। ভূমি সংস্কারই ছিল এই অসমতা দূর করার উপায়। আমার মনে হয় সীমান্ত মানুষের পায়ে বেড়ি পরিয়ে দিয়েছে।       

অঞ্জন আচার্য: আপনার স্মৃতি থেকে দেশভাগের কথা, বেদনার কথা শুনতে চাই। ‘দশমী দিবসে’ উপন্যাসের প্রস্তাবনায় আপনি যেমন বলেছেন- ‘দেশভাগে সমস্ত দেশই হয়ে ওঠে বিদায়ঘাট’।

অমর মিত্র: সাগরদাঁড়িতে কবি মধুসূদনের বাড়ির সামনে কপোতাক্ষ। সেই কপোতাক্ষতীরে একটি জায়গা বিদায়ঘাট নামে চিহ্নিত। গ্রামবাসীরাই হয়তো ওই নাম দিয়েছেন। মধু হিন্দু বংশদ্ভূত, নিয়েছিলেন খ্রিস্টধর্ম। তাঁকে নিয়ে গর্বিত মুসলমান, হিন্দু, দুই ধর্মের মানুষই। তাঁরা বললেন, বিলেত যাওয়ার আগে খ্রিস্টান মধু এসেছিলেন মায়ের সঙ্গে দেখা করতে। সে-ই শেষ আসা। শেষ দেখা। যে ঘাট থেকে বিদায় নিয়েছিলেন তিনি, সেই ঘাটকে ওঁরা বিদায় ঘাট বলেন। কিন্তু এই কাহিনী সত্য নয় হয়তো। বিলেত যাওয়ার সময় মা জাহ্নবী বেঁচে নেই। তবে এই ঘটনা মাদ্রাজ যাওয়ার আগে হতে পারে। সেও তো কালাপানি পার। তখন জাহ্নবী মা জীবিত। মধুসূদন ফরাসি দেশে বসে কপোতাক্ষকে স্মরণ করেছেন। সেই অসামান্য কবিতা পড়তে গিয়ে আমার নিজের মায়ের কথা মনে পড়ে। মা-ও তো কলকাতার বাসাবাড়িতে বসে কপোতাক্ষকে স্মরণ করতেন। অনেক রাতে বুকের ভিতরে নিয়ে আমাকে চিনিয়েছিলেন বাপের বাড়ির সেই নদীকে। সব মিলিয়ে ‘দশমী দিবসে’। ওই দিনই তো মাতৃ বিসর্জন। দেশমাতৃকা বিসর্জন দেশভাগে। তবে এই উপন্যাসে মা তেমন নেই। আছেন যিনি তিনি মধুসূদনের নাতনি। কপোতাক্ষর প্রতি আমার ভালোবাসা আসলে আমার মায়ের, বাবার। আমার হারানো নদীর স্রোত গল্পে তা আছে।

অঞ্জন আচার্য: উপন্যাসের বীরাঙ্গনা দাসীকে কোথায় পেয়েছিলেন? নাকি আপনার কল্পনার সৃষ্টি?

অমর মিত্র: বীরাঙ্গনা আমাদের আত্মীয়া। তিনি মধুসূদনের দূরের কোনো সম্পর্কের নাতনি ছিলেন। মানকুমারী বসু তাঁর পিসিমা। ওপারে সব ফেলে রেখে এপারে মধুর কথা নিয়ে এসেছিলেন। তিনিই আমাকে মধুর কথা বলতেন আমার যখন সাত-আট বছর। ‘মেঘনাদ বধ’ কাব্য থেকে আবৃত্তি করতেন। অনেক সর্গ তাঁর স্মরণে ছিল। তাঁকে নিয়েই এই উপন্যাস। লিখতে হলে কল্পনা করতেই হয়। বীরাঙ্গনাকে আমি অনেকটা নির্মাণও করেছি।  

অঞ্জন আচার্য: উপন্যাসটিতে বার বার আপনি নদীর কথা বলছেন! হ্যাঁ, নদী। আপনার নিজের কোনো নদী আছে চোখ বন্ধ করলেই যার জলতরঙ্গ শুনতে পান?

অমর মিত্র: নদী প্রসঙ্গে নতুন কথা আর কী-ই বা আছে? নদীর কূলেই তো সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। কথিত আছে- সরস্বতী নদীর তীরে বৈদিক সভ্যতা। ছোট বড় কত নদী। নদী শুকোলে সভ্যতার পতন হয়। ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এ (অদ্বৈত মল্লবর্মণ) আছে তা, কাঁদো নদী কাঁদো (সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌) উপন্যাসে আছে তা। নদী নিয়ে কত মহৎ উপন্যাস লেখা হয়েছে। পদ্মা নদীর মাঝি, তিস্তা পারের বৃত্তান্ত, তিস্তা পুরাণ, গঙ্গা (সমরেশ বসু) এমনি অনেক। আমার নদী বলতে প্রায় না দেখা কপোতাক্ষ, তাকে আমি ফেলে এসেছি, কিন্তু আন্দাজ করতে পারি। ‘দশমী দিবসে’ উপন্যাসের বীজ সাগরদাঁড়িতে কপোতাক্ষ তীরে বসেই পেয়েছিলাম। আমার মা আমাকে কলকাতায় বসে চিনিয়েছিলেন এই নদী। 

অঞ্জন আচার্য: আপনি সাধারণত কোথায় লিখেন বেশি? বাণিজ্যিক পত্রিকায় নাকি লিটল ম্যাগাজিনে? এখন লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের কী অবস্থা?

অমর মিত্র: আমি লিটল ম্যাগাজিন থেকে বিগ ম্যাগাজিন সব জায়গায় লিখেছি। এবং তাই-ই লিখি। এখনও বারোমাস, অনুষ্টুপ, পরিচয় পত্রিকার আমি লেখক। নিজের ভালো লাগা লেখাটিই সেখানে লিখি। এইসব পত্রিকায় আমার ভালো গল্পগুলিই ছাপা হয়েছে। কিন্তু বড় পত্রিকা যে বলেছেন, আমি লিখেছি। আমি আমার লেখাটি লিখতে চাই, সুতরাং লিখেছি।

লিটল ম্যাগাজিনের আন্দোলন তেমন কই? ভালো ম্যাগাজিন আছে অনেক। লিখে সম্মানিত বোধ করি, এইটুকুই। আর শুধু লিটল ম্যাগাজিনে লিখবই বা কেন, বড় পত্রিকায় লিখে অনেক দূর পৌঁছানো যায় তো। অনেকেই বলেন এইসব (শুধু ব্যতিক্রম সুবিমল মিশ্র), কিন্তু লিখতে বললেই লেখেন। কমলকুমার মজুমদারও ‘দেশ’ পত্রিকায় লিখেছেন, দেবেশ রায়, শ্যামল- সবাই। আমিও। লিখতে বললে লিখেছি। তবে আমাদের লেখালেখির যত পরীক্ষা-নিরীক্ষা তার সবই লিটল ম্যাগাজিনে। আর ‘প্রতিক্ষণ’ নামের যে পত্রিকাটি গত শতকের আশির দশকে প্রকাশিত হতো, সেই পত্রিকার আনুকূল্যই বেশি পেয়েছি আমি। উপন্যাস এবং গল্প লিখেছি। তা ছাড়া প্রতিক্ষণ-এ দীর্ঘদিন আড্ডা মেরেছি দেবেশ রায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, কখনও শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে। সবই কাজে লেগেছে।

অঞ্জন আচার্য: লিখতে গিয়ে কি সাধারণত পাঠকের কথা ভাবেন?

অমর মিত্র: আমি নিজের কথা ভেবে লিখি। নিজের ভালো লাগার উপরে অনেক কিছুই নির্ভরশীল। পাঠকের কথা ভেবে লেখা হয় না। কিন্তু নিজের তৃপ্তি হলে, পাঠকের কাছে পৌঁছানো যায়, তা আমি দেখেছি।

অঞ্জন আচার্য: এই যে দেশভাগ, এই দেশত্যাগ এ সম্পর্কে আপনার দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে জানতে চাই।

অমর মিত্র: দেশভাগ, দেশত্যাগ নিয়ে আমি তো বলেছি। আমি তো চাই সীমান্তরেখা উঠে যাক। এই কথা ‘দশমী দিবসে’ উপন্যাসে আর অনেক গল্পে আছে। নতুন করে কী বলব!

অঞ্জন আচার্য: আপনি বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। আপনার কাছে জিজ্ঞাসা, প্রকৃতপক্ষে একজন লেখকের জীবনে পুরস্কারের কী ভূমিকা থাকে? পুরস্কার আসলে লেখককে কী দেয়?

অমর মিত্র: কিছুই না, আবার অনেক কিছু দেয়। আত্মবিশ্বাস দেয়। সমস্ত অপমান ধুয়ে দেয়।

অঞ্জন আচার্য: সেই চিরায়ত প্রশ্ন, ‘কেন লেখেন’?

অমর মিত্র: কেন লিখি জানি না। পারি বলে লিখি। না পারলে লিখতাম না। আবার এও মনে হয়, না লিখে পারি না তাই লিখি। প্রতিদিন একই সময়ে লিখতে বসা আমার অভ্যাসের অন্তর্গত হয়ে গেছে এতটাই যে, না লিখে ওই সময়ে আমি করবই বা কী? আমার ঘুম ভাঙে অতি প্রত্যুষে। এই অভ্যাস আমার বহুদিনের। তখন থাকে অন্ধকার। একটা বুড়ো কাক জাগে, তার সঙ্গে জাগি আমি। বহুদিন আগে তখনই মুখ হাত ধুয়ে স্টোভে চা করে লিখতে বসা হতো। শীতের সময় আলো ফুটত না। গরমে ফর্সা হয়ে যায়। এখনো সেই সময়ে উঠি, গান শুনি একা বসে। ভৈরবী কিংবা টোড়ী, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, বড়ে গুলাম আলি থেকে কিশোরী আমনকর, রসিদ খান, যাঁর হোক। বিলায়েত খাঁ সায়েব বা আমজাদ আলি খাঁ সায়েবের সেতার কিংবা সরোদ বা চৌরাশিয়ার বাঁশি, যাই হোক। তারপর একটু প্রাতঃভ্রমণ। ফিরে এসে লিখতে বসা। সকালের এই যে শিডিউল, এর অন্যথা হবার উপায় নেই। এর ভিতরে এক অদ্ভুত সুখ আছে। সেই সুখ আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। সকালের গান শোনা, চৌরাশিয়ার বাঁশিতে নদীর ছলছল শোনা (সঙ অফ দ্য রিভার), তারপর উষাকালে পৃথিবীর ফুটে ওঠা প্রত্যক্ষ করে বাড়ি ফিরে আমার লেখার টেবিলে, এখন কম্পিউটারের সামনে এসে বসা, লিখতে আরম্ভ করা, এর কোনো বিকল্প আমার সামনে তৈরি হয়নি। তাই লিখি।

আমার সকাল, আমার দিনারম্ভ আরো আরো মধুর করে তোলার জন্য আমার লেখা। সেই লেখাটা সাড়ে ছ’টা থেকে সাড়ে বারো-একটা অবধি চলে। মাঝে ঘণ্টা দেড় বাদ যায় নানা কাজে। তার ভিতরে বাজারও আছে প্রত্যহ। না লিখলে আমি করতাম কী? ভাবতেও পারি না। না লিখলে হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়ার ভূপালী কি আমার শোনা হতো? লেখার টানেই তো ভোরবেলা কিংবা শেষরাতে ওঠা। লেখাই আমার ঘুম ভাঙায়। যে উপন্যাস লিখছি বা যে গল্পের কথা ভাবছি, কিছুটা লিখেছি, তা আমাকে টানতে থাকে ঘুমের ভিতরে। সুতরাং না লিখে উপায় নেই। আমার আর কিছু করার নেই।

কৃতজ্ঞতা: রাইজিংবিডি

         

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>