Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

ইরাবতীর কথা (পর্ব-১৪)

Reading Time: 4 minutes

নারীর নিজের মুক্তির জন্য, নিজের স্বাধীনতার জন্য নিজের উপর নিজেকে আস্থা রাখতে হবে, লড়াইটা নিজেকেই করতে হবে। নারীবাদ বলি কী নারী স্বাধীনতা বা নারী মুক্তি- অর্জন না করলে পাওয়া যাবে না। নরওয়ে নারী-পুরুষের সমতার জন্য একটি পারফেক্ট দেশ বলা চলে। তারপরও এই দেশেও তেমন নারীর সাক্ষাৎ মেলে যে নিজে ডাক্তার হয়েও ডাক্তার স্বামীর ভয়ে তটস্ত থাকে।স্বামী শুধু স্যান্ডউইচ দিয়ে লাঞ্চ করতে চায় না বলে স্ত্রীকে সাথে স্যুপও বানাতে হয়। আর এই স্যুপ বানানোটা ভালোবেসে বানানো না রীতিমতো আতঙ্কিত হয়ে বানানো। এর জন্য নিজের অফিসিয়াল কাজ শেষ কোথাও বসে দু’দণ্ড জিরায় না, পাছে বাসার কাজে দেরী হয়ে যায়। অথচ নরওয়ের সমাজে স্বামী-স্ত্রী সপ্তাহের দিনগুলো ভাগাভাগি করে রান্নাসহ ঘরের যাবতীয় কাজ করার নিয়ম। দেখা যাচ্ছে, আইন থাকলেও সব নারী তা যথাযথ নিতে পারছে না। এমন শিক্ষিত নারীকে কে নারী-স্বাধীনতা এনে দেবে বা তার কাছে নারী স্বাধীনতা বা নারীমুক্তির সংজ্ঞা কী কে জানে! ’ইরাবতীর কথা’ ধারাবাহিকে ইরাবতীকে নারীর অনেক না বলতে পারা কথায় ও রূপে সাজিয়েছেন বিতস্তা ঘোষাল আজ থাকছে ইরাবতীর কথা ধারাবাহিকটির ১৪ পর্ব।


 

ঐহিক যখন কলিংবেল বাজালো বেদভ্যাস তখন সবে পুজো সেরে ফোনের সামনে বসেছে। খেতে যাবার আগে মিনিট পাঁচেক সে খুব জরুরী কোনো কল করার থাকলে সেরে নেয়। কলিংবেলের আওয়াজ শুনে নিজের ঘর ছেড়ে উঠে গিয়ে আইহোল দিয়ে ঐহিককে দেখল। প্রাথমিকভাবে অবাক হলেও দরজা খুলে দিতে এতটুকু সময় নিল না।

ক’দিন ধরেই তার মন বলছিল, জামাই আসবে। ইরাবতীকে বার দুয়েক প্রশ্ন করেও এই সম্পর্কে একটি কথাও জানতে পারেনি।মেয়েটা বড় চাপা।নিজের ব্যক্তিগত সমস্যার কথা জানাতে চায় না কিছুতেই। সেই খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে জেনে নেবার চেষ্টা করে। মাঝেমাঝে মনে হয় এই বিয়েটা না দিলেই বোধহয় ভালো হত। বাবা হিসেবে তার উচিত ছিল দেখে শুনে একটা ভালো ছেলের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেওয়া। তাহলে মেয়েটাকে এত অর্থনৈতিক চিন্তা করতে হত না। নিজের ইচ্ছেতে যেটা ভালো লাগত করত।

মেয়েকে অবশ্য এই চিন্তার এতটুকুও বুঝতে দেয় না। উলটে বকাবকি করে, এখনো সব দায়িত্ব একা ঘাড়ে নেবার মত যোগ্য হয়ে ওঠেনি বলে। কিন্তু ঐহিক হঠাৎ এতদিন বাদে কেন এল, ভাবতে ভাবতেই ঐহিক সামনে এসে পা ছুঁয়ে প্রণাম করল।

বেদভ্যাস  স্ত্রীর উদ্দেশ্যে একবার চিৎকার করে বললেন, জামাই এসেছে। একটু চা মিষ্টি দিও। তারপর জামাইকে সঙ্গে নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে গেলেন।

ঐহিক বেদভ্যাসের মুখোমুখি চেয়ারটায় বসল। কিছু মুহূর্ত দুজনেই কোনো কথা বলল না। বেদভ্যাস একভাবে তাকিয়ে ছিলেন জামাইয়ের দিকে।ঐহিকের মনে হচ্ছিল, বেদভ্যাস তার ভিতরের যাবতীয় অক্ষরমালা, ঘটে চলা সমস্ত ঘটনা টেলিভিসনের স্ক্রিনের উপর ভেসে আসা ছবির মত দেখে নিচ্ছে, পড়ে ফেলছে সব অনুচ্চারিত কথা।

এভাবেই কেটে গেল আরো কিছুক্ষণ। সংযুক্তা একটা প্লেটে দুটো মিষ্টি নিয়ে ঘরে ঢুকলো। ঐহিকের সামনে টেবিলে প্লেটটা রেখে বিরক্তির দৃষ্টিতে তাকালো তার দিকে। ঐহিক উঠে গিয়ে প্রণাম করলে তিনি বললেন, থাক থাক, শুধু শুধু প্রণাম কোর না। আশির্বাদ করতে পারব না।

বেদভ্যাস বিরক্তির দৃষ্টিতে তাকালেন স্ত্রীর দিকে। তুমি ওভাবে তাকাচ্ছ কেন? আমি বলবই। উত্তেজিত স্বরে তিনি ঐহিকের উদ্দেশ্যে বললেন, এতদিন বাদে হঠাৎ কী মনে করে? চাকরীটা কী চলে গেছে? তাহলে জেনে রেখো ইরাবতী তোমার কোনো দায়িত্ব নিতে পারবে না। যে চুলোয় ফূর্তি করছিলে এতগুলো বছর সেখানেই চলে যাও। তবে আমার মেয়ের জন্য আমি আফশোষ করি না। সে কোনো দিন তোমার আশ্রিতা ছিল না। কিন্তু আমার ফুলের মতো নাতনীটাকে তুমি কিভাবে ফেলে রেখে চলে যেতে পারলে? তুমি কী মানুষ! ঈশ্বর তোমাকে কখনো ক্ষমা করবে না।

 তারপরেই বললেন, চা খেয়ে বিদায় হও দেখি। আমাদের এখন খাবার সময় হয়ে গেছে।

ঐহিক মাথা নিচু করে উঠে দাঁড়ালো।

বেদভ্যাস বললেন, বোসো। তারপর স্ত্রীর দিকে কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন, তুমি এখন যাও, আমি জামাইয়ের সঙ্গে একান্তে কিছু কথা বলতে চাই।

সংযুক্তা চেঁচিয়ে উঠলেন। কিসের একান্তে! তোমার কোনো বিচার বুদ্ধি নেই? এমন ছেলেকে জেলে দেওয়া উচিত। তা না উনি এখন কথা বলতে বসবেন! এই নোংরা ইতরটার সঙ্গে কোনো কথা থাকতে পারে না।

বেদভ্যাস নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর বললেন, শরনার্থীকে আশ্রয় দেওয়াই আমার এক মাত্র ধর্ম, তুমি এটা নিশ্চয়ই বিয়ের রাত থেকেই জানো। মনে না থাকলে আবার মনে করিয়ে দিচ্ছি। ঐহিক আমার কাছে জামাই হিসাবে আসেনি এত রাতে। সে তার সব কথা আমায় বলে মুক্তি পেতে এসেছে। তুমি এভাবে তাকে তাড়িয়ে দিতে পারো না সংযুক্তা। যাও। আমাদের বিরক্ত কোরো না।

বেশ, আমি ইরাবতীকে ফোন করছি, বলছি এখানে নাটক চলছে। তবে মেয়েকেই বা কী বলব! সেই তো আবার ঘরে ঢুকিয়েছে একে। নে, এবার আবার সেধে বাঁশ।

কথায় লাগাম দাও সংযুক্তা। ধীর কন্ঠে বললেন বেদভ্যাস। কথা ব্রহ্ম। এমন শব্দ উচ্চারণ কোরো না যাতে কথার মাধুর্য নষ্ট হয়ে যায়। তোমার জামাইয়ের উপর রাগ হওয়ার সংগত কারন আছে। কিন্তু সে এখন আমার কাছে এসেছে। তুমি এবার যাও। বলে নিজের ঘরের দরজাটা স্ত্রীর উদ্দেশ্যে খুলে দিলেন।

সংযুক্তা রেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। পস্তাবে পস্তাবে, আরো কত কী দেখা বাকি আমার! এবার গেলে বাঁচি।

সংযুক্তা যাবার পর নিজের আসনে ফিরে এসে বসলেন বেদভ্যাস। তারপর ঐহিককে বললেন, তোমার শাশুড়ি খুব কষ্ট পেয়েছে তোমার আচরণে। তাই এমন বাক্য বর্ষণ। একটু থেমে বললেন, বুঝলে ঐহিক,একটি ছেলে বা মেয়ে যখন একটু একটু করে বড় হয়ে ওঠে, জীবনের সবুজ পাতারা যখন ফুটে উঠতে থাকে বুকের ভিতরে, যখন হলুদ বিকেল জুড়ে আশ্চর্য আলো নেমে আসে আর দূর আকাশে একলা ঘুড়িটি ওড়ে নীল শূন্যতায়— তখন থেকেই বুকের ভিতরে জমা হতে থাকে হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ কথা। প্রথম যৌবনের রাতের স্বপ্নেরা জানে সেইসব কথাদের শিহরণ। সেই আধো আধো পৃথিবীর দিনগুলিতে মানুষের মনে হয় একদিন এমন কেউ জীবনে আসবে যার কাছে এইসব কথাদের উজাড় করে ঢেলে দেবে। ভাবে, পৃথিবীর অনন্ত সুখের মাঝে মিলিবে তাহারা দুই জনা।

কিন্তু বাস্তবে যে সঙ্গীটি আসে জীবনে — তার সঙ্গে চাল-ডাল, গাড়ি-বাড়ি সোনা-গয়না, ছেলে-মেয়ে, আরও কত বিষয়ে কথা হয়। শুধু কথা হয়না বুকের ভিতরে জমে থাকা সেইসব কথাদের বিষয়ে। কেননা দাম্পত্য এক এমন জায়গা — যেখানে হৃদয়ের জন্য কোনও দরজা খোলা নেই।ফলে আমাদের প্রত্যেকের ভিতরে রাশি রাশি না-বলা, না-বলতে পারা কথার ঝরাপাতা। সে পাতাদের উপর দিয়ে দুটো মানুষ কেমন হাত ধরে একটা গোটা জীবন পার হয়ে যায় ! তুমি চিন্তা কোরো না। সব ঠিক হয়ে যাবে সময়ের স্রোতে। শুধু মাথায় রেখো পরিস্থিতি সব সময় অনুকূল থাকেনা। ভালোবাসাও দ্রুত রং বদলায়। তাকে যেমন শক্ত করে বাঁধতে যাওয়ার চেষ্টা বৃথা, তেমনি বারবার এ মন থেকে আরেক মনে উড়েও যেতে নেই। সবই তো সেই এক। বিছানায় শুলেই সেই মুখের দুর্গন্ধ, নাক ডাকার আওয়াজ, বায়ু নিঃস্বরণ… আর সকাল থেকে কী দিলে কি পেলাম তার হিসেব কষা।

ঐহিক মুগ্ধ হয়ে শুনছিল বেদভ্যাসের কথা।এই লোকটির প্রতি তার রাগ হোত, হিংসা হতো। অথচ এই মানুষটা এক আশ্চর্য কথা বলে তার মনের ভিতর লুকিয়ে থাকা যাবতীয় বিতৃষ্ণা, গ্লানি, হতাশা এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দিল। তার মন এখন আর অতটা বিষন্ন লাগছে না।

বেদভ্যাস বললেন, ইরাবতী এতক্ষণে ফিরে গেছে। তুমি বাড়ি যাও। যাবার সময় ভাল গরম রসোগোল্লা নিয়ে যেও প্রান্তির জন্য। আর রাত কোরো না। তারপর উঠে গিয়ে দুটো দশ টাকার নোট হাতে দিলেন। রিকশা ভাড়াটা রাখো। তুমি তো আমার ছেলেই। জামাই বলে তো ভাবিনি।  বাবারা চায় তাদের সব সন্তান ভালো থাকে যেন। সেই যে বিখ্যাত লাইনটা ছিল –‘ আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’ এটাই চিরকালীন সত্য। এর বেশি কিছুই চাওয়ার নেই। তুমিও নিশ্চয়ই মেয়ের জন্য এমনি ভাবো।

ঐহিক হাতে টাকা নিয়ে সেখানেই স্থানুবৎ দাঁড়িয়ে রইল। তার চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছিল। বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল, বাবা আমাকে ক্ষমা করে দিন। ইরাবতীকে, প্রান্তিকে আমি আর কখনো তাকে যন্ত্রণা দেব না। কিন্তু কিছুই বলতে পারলো না। কথাগুলো গলার সামনে এসে পাক খেতে লাগল লাট্টুর মত। আর দুই চোখ বেয়ে নেমে এল জল। সে কোনমতে বেদভ্যাসকে প্রণাম করে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল বাড়ির দিকে।

আজ অনেকদিন পর নিজেকে কিছুটা হলেও হালকা লাগছে তার।  

            বিতস্তা ঘোষালের এই ধারাবাহিকটির আগের পর্বগুলো ও অন্যান্য লেখা পড়তে ক্লিক করুন।                            

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>