ঈশ্বরী, পশুখামার ও বিষাদজননী আলো

আমার একটা ঘুম চাই। না, মৃত্যুনিষ্ঠ ঘুম নয়। অন্তত এখনও না। অন্তত, এখনই না! সাপের গায়ের মতো ঠান্ডা শিথিল সেই সুযোগ জীবন আমাকে এখনও দেয়নি। আমার আপাতত এমন একটা ঘুম চাই, যার থেকে উঠে নিজেকে খুব হালকা ফুরফুরে মনে হবে। পালকের মতো। অনিদ্রা আসলে আমার যেচে নেওয়া রোগ। কাকে যেন তিল-তিল করে ঘুম জুড়ে-জুড়ে দিতে গিয়ে হারিয়েছি নিজের সমস্তটাই! পুরোটা নিয়ে সে ফেরার হয়ে গেলে মনে পড়ে, তাকে ঈশ্বরী মেনেছিলাম!

সব কথার জবাব দিতে নেই। এমনকি সব অন্যায়েরও। অন্যায্য কল্পিত অভিযোগ হলেও না। জবাব দিলেই যখন হাসি-ঠাট্টা এবং কটূক্তি! মাঝেমাঝে ভিতরে একটা জান্তব রাগ অবশ্য দলা পাকাবেই। কিন্তু সেই হাওয়ায় ভর করে উড়তে চাইলে তো কবেই বলে দেওয়া যেত, ‘কারারা জওয়াব মিলেগা’। বলা হয়নি। বলা যায় না! জবাব অবশ্য মিলেই যাবে ঠিকঠাক। আজও বিশ্বাস করি, জীবন আসলে একটি চমৎকার দাঁড়িপাল্লা। একহাতে দিলে, দশহাতে ফেরত নেবে। দশহাতে দিলে, একহাতেই। কোথায় কীভাবে, কেউ জানে না। কিন্তু নেবেই! আজ না-হয় কাল। কাল না-হয় পরশু। সব হিসেব মিটিয়ে দিয়েই যেতে হয়। অতএব ধীরে রজনী, ধীরে!
ওড়ার কথায় মনে পড়ে গেল, পাখিদের নানা রঙ ও রূপ। পশুদেরও। গল্পের গরুও ডানা মেলে ওড়ে, আমরা তো জানি! অথবা পক্ষীরাজ ঘোড়া! গল্পটা আসলে প্রকৃতি ও পুরুষের। মাটি ও গাছের। নদী ও নৌকার। গল্পটা আসলে গল্পই নয়! কাহিনির মোড়কে ঘটে যাওয়া এবং আজও ঘটমান কিছু দৃশ্যের কোলাজ। ঠিক যেন ফিল্মের স্ক্রিপ্ট! তো, যে-কথা বলছিলাম। প্রকৃতি ও পুরুষের গল্পের প্রথমে পশু-পাখি ছিল না কোথাও। ততদিন সব মসৃণ ও সুন্দর। তারপরে একদিন হঠাৎ শ্রী কাকেশ্বর কুচকুচে। হ্যাঁ, কাক। কিন্তু কাক বলে কি সে পাখি নয়? পাখি হলেই যে সর্বদা টিয়া-ময়না-বুলবুলি হতে হবে, তার মানে কী! অনুগ্রহ করে গল্পটিকে বর্ণবিদ্বেষী ভাববেন না, পাঠক। কাকেশ্বর অবশ্যই কুচকুচে; কিন্তু আমরা কি জানি না, বিরল হলেও, মাঝেমধ্যে এক-আধটা সাদা কাক দেখা যায়! গাছ নিজে মাটির নরমে ওই কাকেশ্বরের ঢুকে পড়ার সাক্ষী। চালিয়াত কাকটিকে সে তার অতীন্দ্রিয় দিয়ে চিনে যায়। এবং খুব দ্রুত জেনে যায়, অপত্যস্নেহের ছলে বহুবিধ অন্তরবাক্সে চুকলি-কাটা পক্ষীটি শেষ পর্যন্ত মাটির দূষণ ঘটিয়ে গাছের শিকড়ে যা পৌঁছে দেবে, তার নাম ঘুণ!
তবুও প্রত্যেক অন্যায়ের জবাব দিতে নেই। বিশেষ করে সুবিধাবাদী মানুষ যখন, তার সিলেক্টিভ প্রতিবাদের মতো, আড়ালে রাখতে শিখে যায় বাছাই করা অক্ষর, শব্দকথন এবং চিত্রমালার লাস্য! বিশেষ করে, দশটি গোপন সংখ্যায় যখন এক বা একাধিক নতুন-পুরোনো ঠিকানায় বিলি হয় পার্থিব উষ্ণতা! একে কি বিশ্বাসঘাতকতা বলবেন, মাই লর্ড? নাকি এও একধরনের হানি ট্র‍্যাপ? ফাঁদ কি কখনও বিপরীতমুখী হতে পারে না? পারে বলেই তো সেই ফাঁদে পা-দিয়ে নিজের গতিপথ নিজেই রুদ্ধ করে, নৌকাটিকে ডুবিয়ে, পিছনে ফিরলো নদী! তবুও মাঝেমাঝে মুখ খুলতে হয়। বড়ো বেশি চুপ করে আছি আজকাল। বীরপুঙ্গবেরা খুব দুর্বল ভাবছে। বরাহনন্দনেরা ভাবছে ভীরু। নরম মাটি পেয়ে বড্ড বেশি-বেশি আঁচড়াচ্ছে বিড়াল। অপার আকাশ পেলে আরশোলাও যেমন পাখি, নরম মাটি পেলে বিড়াল তেমনই বাঘ!
কাকেশ্বরের কথায় ফিরি। বৃদ্ধ বায়সটি জানে না, এমন বিষয় নাকি পৃথিবীতে নেই! নিজের উপর এমনই অগাধ আস্থা তার! যার যা পাওয়ার কথা নয়, সে তা পেয়ে গেলেই যত সমস্যা—এমনই রায় দিয়েছিল সে একদিন। অনুমান করি, খুব গম্ভীর মুখে বেশ মাথা-টাথা নেড়ে রায়দান পর্বটি শেষ করেছিল সে। এর পিছনের বিদ্বেষটি গাছের নজর এড়ায়নি। মাটি কিন্তু তাৎক্ষণিক আবেগে হ্যাঁ-তে হ্যাঁ মিলিয়েছিল। গাছের সঙ্গ ছাড়া সে আর কবেই-বা পর্দার পিছনের খেলাগুলো ধরতে পেরেছে! গাছ তাই আহত হয়েছিল, তবু নিরাশ হয়নি। ভেবেছিল, একদিন ঠিক মাটির পলিতে আবার সে এনে দিতে পারবে উর্বরতার কাব্যিক বীজ। পুরুষ তো কবিতাই লিখতো। বরাবরের অন্তর্মুখী সে; কাগজ-কলম নিয়ে তার নিজস্ব ঈশ্বরীর মগ্ন সাধক। দেবীবরণের এই প্রগাঢ়তা কাকেশ্বর বুঝবে কী করে! কার কী পাওয়ার কথা, কেন পাওয়ার কথা, পাওয়ার জন্য কীভাবে উজাড় করে দিতে জানতে হয়, কীভাবে সম্পূর্ণ হয়ে উঠতে হয়, সে-সব তার সিলেবাসের বাইরে। বোধের সীমানায় সীমাবদ্ধ কাকেশ্বরের বয়ানে তাই প্রচারিত হলো ‘হ্যা-হ্যা করা’ কবিদের কথা। প্রকৃতিও আদৌ বুঝেছিল কি? তাই কোথাও ঝড় উঠলো না বোধহয়! প্রকৃতির রোষানলে দগ্ধ হলো না একটিও ফালতু নাটুয়া, চতুর শৃগাল অথবা লোলচর্ম শকুন!
চালাক শিয়ালটির কথায় মনে এল, সে আবার এক বহুরূপী। দৃশ্যত সে রামছাগল। অথচ তার ছাপ্পান্ন গুণপনা যারা জানে, তারা জানে, সারাদিন ছাগল-ভেড়ার পালে মিশে থাকার পরে কীভাবে অন্ধকার নামতেই ঘোর মাংসাশী একটি ছিঁচকে চোর হয়ে ওঠে সে। এসব ঘটনা কেচ্ছাপুরীর আনাচ-কানাচ থেকে উঠে এসে বাসি খবর হয়ে গেছে বহুদিন। কিন্তু প্রকৃতি সে-কথা বোঝে না। মাটি জানে না। নদীই-বা মানে কোথায়! না-বোঝার সেই দেওয়ালের ভারে একদিন পুরোপুরি চাপা পড়ে যায় নৌকারূপী পুরুষবৃক্ষ।
বিচ্ছিন্নতার শুরু ঠিক এখান থেকেই। নিজের হাতে নৌকাটির সলিলসমাধি ঘটিয়ে নদী তাই ভুলে যায় কোন হাহাকার থেকে একদিন পথের নির্জন পাঁচালি লেখা হয়েছিল। খুলে দেখাতে হয়েছিল যা-কিছু না-দেখানোর। গোপন কথোপকথন। গভীর ক্ষত। অজস্র তীব্র স্মৃতিকে সে ছুঁড়ে দেয় ‘মনগড়া স্বপ্ন’-মার্কা বিদ্রুপ। অথচ প্রতিটি গোপন দেওয়ালগাত্রে নিজেই খোদাই করে রাখে যৌথযাপনের প্রত্যেক খুটিনাটি!
শুনেছি, প্রকৃতি নাকি শূন্যস্থান পছন্দ করে না। তাই হয়তো খুব দ্রুত সে বিকল্প যাপন খুঁজে নেয় অনায়াস দক্ষতায়। ততোধিক অপারগতায় পুরুষ মগ্ন থাকে এই পশুখামারের আঁচড়  থেকে কীভাবে প্রকৃতিকে মুড়ে রাখা যায়, সেই সাধনায়। তখন কিন্তু তার কক্ষপথের কোথাও চাঁদের দ্বিগুণ উৎসাহী আলো, কোথাও বাদ্যের নৃত্যঝঙ্কার, কোথাও-বা অন্তর্নিহিত আহ্বান। তবুও সে-সব উপেক্ষা করেই মগ্ন থাকে সে। কারণ, আজও তার নিজস্ব গন্তব্য নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। অথচ নদী ইতিমধ্যে নর্তকী-বাঁক নিয়েছে অন্য পথে। নিহত নৌকার চোখে তখনও জ্বলজ্বল করছে নদীর বুকে তার বৈঠা থেকে ছলাৎছল আনন্দধ্বনি জেগে ওঠার দিন। গাছ জানে, তার মতো করে মাটির নিবিড়ে জীবন আনতে আর কেউ পারবে না কোনোদিন। মাটি নিজেও কি জানে না! তবুও গাছকে নির্বাক-ধূসর হয়ে নিরুপায় দেখতে হচ্ছে মাটির বদলে যাওয়া রঙ!
তবুও ওদের মতো একটা অপেক্ষা আমারও আছে। না, মৃত্যু-বিষয়ক লেখালেখি পড়াতে চাইছি না। পরাজিত মানুষের কোনো সাজঘর থাকতে নেই। ফেরারি হাওয়ার কাছে ঘ্রাণের দিব্যি রাখতে নেই। আমাদের যাবতীয় ছয়-নয় সত্ত্বেও, নেই। গভীরতম চুম্বনের প্রতিটি মুহূর্ত সত্ত্বেও, নেই। তোমার সহানুভূতি পাওয়া কোনো শৌখিন মনখারাপ এর কারণ বুঝবে না। তারা কোনো মেধাবী শূন্যতা জানে না। আমরা এখন আমার ডানহাতের জোডিয়াক রিঙের জেমিনি চিহ্নটার মতো হয়ে আছি। সংলগ্ন অথচ বিপরীতমুখী। প্রকৃতি নিজেই ডেকে বলেছে, ‘দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু তোমার জন্য নয়।’ মাটি নিজেই বলেছে, ‘তোমাকে ভাবছি না’। নদী নিজে থেকেই গেয়েছে, ‘তোমাকে আর চাইছি না’। কিন্তু এতসব ‘না’-এর মাঝেও আবহমান চরাচর জানে, বিষাদজননীর মতো সেই আলো। দেখা ও না-দেখার কাছাকাছি কোনো রঙে আমাকে অবিরত দেখছে ঈশ্বরীর নির্নিমেষ চোখ। আমি তার দেওয়া কল্পিত অপরাধের অপবাদ থেকে মুক্তি চাই। আমি তার কাছে একটা পালকের মতো ঘুম চাই। এইটুকু পেলেই জানি, বাকিটাও…

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত