যোধাবাঈ কি তবে রূপকথা

ভারত উপমাহাদেশের রহস্যময় ঐতিহাসিক চরিত্রগুলোর অন্যতম হচ্ছেন যোধাবাঈ। এই নামে কোন চরিত্র ইতিহাসের কোন কালপর্বে আদৌ ছিলো কি না সে নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে বিভিন্ন মত রয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক বইপত্রগুলো জানাচ্ছে, যোধাবাই নামে ইতিহাসে কোন চরিত্র ছিলো না। আবার রাজস্থানের প্রামান্য ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে লেখা বইয়ে তার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এই তথ্যগত দ্বন্দের কারণে যোধাবাঈ আসলেই ছিলেন কি ছিলেন না, সাধারণ মানুষের পক্ষে তা বোঝা কঠিন। ঐতিহাসিক মত যাই থাক না কেন, ভারতীয় উপমহাদেশে যোধাবাঈ এর নামে ছড়িয়ে থাকা কিংবদন্তীগুলোই সম্ভবত তাকে অমর করে রেখেছে।
‘সম্রাট আকবরের সময়কাল, শাসনব্যবস্থা এবং জীবনী নিয়ে যে তিনটি আকর গ্রন্থ (আকবরনামা, মুতাখাবাত তাওয়ারিখ, তবকাত-ই-আকবরী) ফার্সী ভাষায় রচিত হয়েছিল সেখানে কোথাও যোধাবাঈ এর নাম উল্লেখ নেই।’ বলেছেন দিল্লীর জামিয়া মিল্লা ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক ডক্টর আজিজুদ্দিন হোসেইন। এ বিষয়ে পাটনার খোদাবকস ওরিয়েন্টাল গণগ্রন্থাগারের পরিচালক ডক্টর ইমতিয়াজ আহমেদ বলেছেন, ‘আবুল ফজলের তিন খন্ডে রচিত আকবরনামায় উল্লেখ আছে আকবর রাজপুতের একজন রাজকুমারীকে বিয়ে করেছিলেন যার উপাধি ছিল মরিয়ম জামানী। পরবর্তীতে উল্লেখ করা হয় মরিয়ম জামানীর গর্ভে জন্ম নিয়েছিলেন এক রাজকুমার, যার নাম সেলিম— যিনি সম্রাট জাহাঙ্গীর ছিলেন। কিন্তু যোধা নামটি কোথাও উল্লেখ করা হয়নি।’ তিনি আরো বলেন, ‘যোধা শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন উনবিংশ শতাব্দীর একজন বৃটিশ ইতিহাসবিদ কর্নেল টড যিনি আসলে পেশাদার ইতিহাসবিদ ছিলেন না। তিনি মূলত রাজস্থানের লোক সাহিত্য থেকে নামটি পেয়েছিলেন। মজার বিষয় এই যে, যোধপুরের রাজপরিবার আবার দাবি করছে যোধা বলে কেউ একজন ছিলেন যার সঙ্গে আকবরের বিয়ে হয়েছিল।
বলিউড চলচ্চিত্র যোধা-আকবর মুক্তি পাওয়ার পর এক সংবাদ মাধ্যমে জয়পুরে রাজপরিবারের বংশধর পদ্মিনী দেবীও বলেছেন, যোধাকে বিয়ে করার মধ্য দিয়ে মোগল এবং রাজপুতদের মধ্যে একরকম সম্পর্ক স্থাপন হয়েছিল। এই বিষয়ে ডক্টর হোসেইন আরো বলেন যে, ‘যদি পদ্মিনী দেবী সঠিক হয়েই থাকেন তাহলে অবশ্যই তাঁর উচিত রাজপুতদের ইতিহাস প্রকাশ করা যেন সবাই জানতে পারে।’
আরেকটি বিষয় লক্ষ্যনীয় যোধাবাঈকে নিয়ে রাজপুত সম্প্রদায়ের মধ্যে আবার অন্যরকম গল্প প্রচলিত আছে। ফলে সে সম্প্রদায়ের লোকজন যোধাবাঈ চলচ্চিত্রটি প্রকাশ নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছিল এবং সেটি প্রকাশের বিরোধী ছিলেন। লোকেন্দর সিং কালভী যিনি ‘রাজপুত কর্ণ সেনা’ নামে একটি সংগঠনের প্রধান, তিনি বলছেন যে, আকবরের ৩৪ জন স্ত্রীর মধ্যে যোধাবাঈ বলে কেউ ছিলেন না। আকবর বিয়ে করেছিলেন ৬ ফেব্রুয়ারি, ১৫৬২ সালে ফতেপুর সিক্রিতে। আমিরের সাবেক মহারাজা ভারমলের বড় কন্যা করকবাঈ ওরফে হীর কুমারকে। তাঁর গর্ভেই ১৫৬৯ সালে জন্ম নিয়েছিলো সম্রাট জাহাঙ্গীর (সেলিম) । কিন্তু তথ্যপ্রমানে দেখা যায়, যোধাবাঈ ছিলেন মতিরাজা উদয় সিং এর কন্যা এবং বয়সে সম্রাট জাহাঙ্গীরের চেয়ে তিন বছরের বড়। ফলে যোধাবাঈ সম্রাট জাহাঙ্গীরের মা হওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না।
ইতিহাসবিদ সতীশ চন্দ্র বলেন, “গোয়ারিকারের চলচ্চিত্রটি মূলত একটি কাল্পনিক গল্পের চিত্রায়ন মাত্র। এটা ইতিহাসের উপর কোনো প্রামাণ্যচিত্র নয়। ফলে চলচ্চিত্রটি প্রকাশের বিরোধীতা করার কোনো মানে নেই। মোঘল-ই-আযম নিয়ে কোনো প্রতিবাদ কোথাও দেখা যায়নি, কেননা সেই সময়ে তথ্যসূত্রের অনেক সীমাবদ্ধতা ছিল এখন সেটি নেই। তাছাড়া সেটিও ছিলো কাল্পনিক গল্প, কেননা আনারকলি বলেও জাহাঙ্গীরের কোনো প্রেমিকা ছিল না।”
তাহলে যোধাবাঈ নামে কোন চরিত্র কি আসলেই ছিল না ইতিহাসে?
.
সূত্র: ইন্টারনেট (ইংরেজী থেকে ভাষান্তরিত)

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত