জলরঙের জীবন

এক.

আমার কেমন মনে হয়, সেই ছেলেটি, সেই ক্লাস সিক্স এর কৌতূহল, সেই ব্রীড়াচাহনি,সেই হেলে থাকা বিকেলের ছায়ায় সে যেমনি বল রেখে জল খেতে যেতো, আমি এক দৌড়ে ওর হাতের বলটা নিয়ে নাক ঘষে নিতাম। রবারের গা কেমন কুসুম কুসুম তেতে আছে ,যেন এইমাত্র রোদের ঘ্রাণের দাগ লেগে আছে ওর তলার মুখে। ঠোঁট দুটি যমজ, তবু অধরের ওপরে কী অদ্ভুত দুর্বলতা আমার। রক্তসাঁঝের কিত্কিতের গুটি নিয়ে আমি মাঠে ওর জুতোর ওপর নিজের চোখদুটো পুঁতে দিতে চাইতাম, বুঝতাম না কেন। মনে হোত ও আমার নিজের কেউ, জন্মবিস্মৃত আমি তাকে চিনতে পারছিনা।হোমিওপাথির গুলির মতো মিষ্টি সেই মুখ, চোখের দৃষ্টি কী মধুর, কাছে গেলে একরকম করে ঘাড় বেঁকিয়ে চেনা দেয়, হাসি থেকে মনে হয় গুঁড়ো গুঁড়ো স্পাইডার লিলির হলুদ রেণু মধুর মতো গড়িয়ে নামছে আর আমার কপালে সেই কাশের ফুলের আঙুলগুলো জ্বর দেখার ছলে একটুখানি পরখ করে দেখছে| সন্ধ্যা নামার আগে কতবার সাইকেল ফিরে গেছে, কত জন্ম কত লক্ষ মন্বন্তর। তবু সমস্ত আস্তাকুঁড় সরিয়ে একদিন সে আমায় ডেকে নেবে… ডাকনাম ধরে…বলবে পাগলি, তুই এক রয়ে গেলি রে। আর নিমেষে মায়ের গর্ভে তুলোয় মোড়া বাক্সে জোনাকির আসনাইলিপি থেকে একটা আশচর্য আলোয় আমরা পিঠোপিঠি ভাইবোন হয়ে নেমে আসবো পৃথিবীতে নীল অপরাজিতার অক্ষরে।

তোমার কচি আমপাতার আঙুলগুলো একত্র মুড়ে আমি তখন কত মাস আদরে ঈথারের নেশায় তোমাতে বুঁদ ,ভ্রূক্ষেপহীন।

দুই.

দূরের বারিশওয়ালা, গিরিশৃঙ্গের শেষ তুষারের পর তুমি ভেসে যাবে আমারই সমীপে, উদাসীন ঠোঁটের দৃষ্টিপাত নিয়ে। ভালবাসা সত্যি হয়, সত্যি হয় নাকি,বাকি জীবন এভাবেই কত শব্দ এসে ছবির মতো টা টা করা হাতটুকু নিয়ে চলে যায় | সিঁড়িঘরে সেই ঝুলনপূর্ণিমায় দেখেছি তোমায়। কোঁকড়ানো চুল,কী একটা যেন বলতে চাইলে…মুখে একটা ভুবন ভোলানো বিদ্যুতের হাসি।
স্টারবাক্স এও সব পর্দানসীন ইতিহাস সরে গেলে, তাকাতে পারিনি। তুমি তখন সাবালক। বড় হয়ে গেছো মাথায়। চোখ নামিয়ে নিই, মনে হয় সারিবদ্ধ হংসবলাকা উড়ছে তেরচা করে ৫ জন ,ক্রমে মেঘের রং হল গোলাপি। গাঙশালিখের কলবলানি কমতে লাগল। দ্রবণে গুলে কে এক ধুলো পায়ে গোটা আকাশকে ফিরোজা থেকে টুকটুকে রাঙিয়ে নিল।আসলে তোমারি এ সব কারসাজি। সাদা টোপর খুলে হাসতে হাসতে আমাকে পরিয়ে দিলে …
আর অববাহিকা ছাপিয়ে পৃথিবীর ঐ পারে,নৈঋতে মেঘকন্যাদের দুধে হলুদ ত্বকের গুঁড়ো পড়তে লাগল দিগন্ত জুড়ে ,ঘাসেরা তখন মৃত তারার চন্দনে সেজে উঠছে আর তুমি নীল অভ্রের চোখ স্থির করে কেবল আশ্চর্য এক নীরব বাহুডোরে ভাষাহীন তাকিয়ে তাকিয়ে যুগান্ত এনে দিচ্ছো।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত