যত্ন

 

 

যত্ন কি ? যত্নের প্রয়োজনয়ীতা বা কি ? একজন বন্ধুর এই প্রশ্নের উত্তরে চোখে জল এল। সে কি বুঝবে প্রেমের মাহাত্ম্য যে নিজে কোনোদিন প্রেমেই পড়ে নি ?
চোখের সামনে সিনেমার মতো একটা পর্দা সরে গেল,লাল সিমেন্টের মেঝে , পরিষ্কার করে নিকোনো উঠান, উঠানের পাশে নিমগাছ, তপ্ত জৈষ্ঠ্যের দুপুর , একটু একটু হাওয়া দিচ্ছে। নিম গাছের ডগাগুলো দোল খাচ্ছে সে হাওয়ায় , হা ক্লান্ত পথিক এসে সেই দাওয়ায় নিমগাছ তলায় বসে পড়ে ধপ করে। কোমরের পেঁচানো গামছা দিয়ে মুখ মোছে … আঃ কি আরাম ! শরীর জুড়িয়ে গেল। কোথায় লাগে এ সি ? ঝকঝকে নিকোনো উঠোন , দাওয়া একটু নীচু হয়ে ঘরে ঢুকতে হয়। ঘরের ভেতরটাও কি ঠান্ডা ! প্রাণ জুড়িয়ে যায় ! ঢুকেই সিমেন্টের লাল মেঝে … বসেও কি আরাম ! কি আরাম! চোখ বুজে আসে পরম আরামে।
মাটিতে আসন বিছানো; কাঁসার গ্লাসে ঠান্ডা টলটলে কুঁজোতে রাখা জল, দুটো লাল বাতাসা আর একটুকরো মিছরি , কাঁসার রেকাবিতে একমুখ হাসি, আন্তরিক উদ্বেগ কেমন আছ বাপধন ? হাতপাখার মৃদু মন্দ বাতাস।এই হল যত্ন ; যা পয়সায় মেলে না, অন্তরের আন্তরিকতার টানে মেলে । হৃদয় ওপচানো ভালবাসায় মেলে।

একেকটা বাড়ীতে ঢুকলে প্রাণ জুড়িয়ে যায়। আসবাবের বাহুল্য নেই; কিন্তু সর্বত্র কি পরিপাটি! একটা অদ্ভুত গার্হস্থ্য শ্রী বিরাজ করছে,সুচারু ভাবে , নিপুন ভাবে সাজানো সংসার , কোত্থাও এতটুকু ধূলো মলিনতা নেই। পরনের কাপড়টা হয়তো পুরোনো ,তবে ঝকঝকে কাচা, টানটান করে পাট করা। বারান্দার এক কোণে টবে এক টুকরো সবুজ ভোরের বেলা দুটো রজনী গন্ধার ফুল ফোটা ডাল , জানালা দিয়ে বেরিয়ে আকাশ ছুঁতে চায়
আকাশটা আজ নীলার মতো নীল ; ঝকঝকে ; দূরে দূরে লাল নীল সবুজ বেগনে রঙের ঘুড়ি উড়ছে,কোত্থাও যাওয়ার নেই, ট্রেন ধরার তাড়া নেই। সর্বত্র এক অপার শান্তি বিরাজ করছে …

দুপুরে পাশের পুকুরে টলটলে কাকচক্ষু জল টুপ করে একটা ডুব দিয়ে উঠে আসা। পুকুর ঘাটে বাড়ীর বউরা ব্যস্ত বাসন মাজায় নিজেদের মধ্যে গল্প , কলকল যুবতী বউ একটা আলগা স্বাস্থ্যের শ্রী সারা শরীর জুড়ে ; কেউ কেউ আবার পান খেয়েছে ; ঠোঁট টুকটুকে লাল , ঢলঢল কাঁচা অঙ্গের লাবণি পুকুরের জলে হাঁসগুলো নিশ্চিন্ত মনে ঘুরে বেড়াচ্ছে মাঝে মাঝে ডাকছে প্যাঁকপ্যাঁক …

স্নান সেরে পাটভাঙা ধুতি পড়ে চুল আঁচড়িয়ে আসন পিঁড়ি হয়ে বসে পড়া। কাঁসার থালায় লাল চালের মোটা ভাত কি মিষ্টি ! আর কি স্বাদ ! আলু বেগুন বড়ি দিয়ে সজনে ফুল ভাজা পাঁচ ফোড়নের গন্ধে সারা বাড়ি ম… ম… গাছের গন্ধরাজ লেবু! কাঁসার জামবাটিতে ঘন মুগের ডাল, ঝিঙ্গে আলু পোস্তর তরকারি ছোট্ট ছোট্ট পোস্তর বড়া,ডাঁটা, আলু্‌, কাঁচা লংকা ,কালোজিরে দিয়ে পুকুর থেকে ধরা বাটা মাছের ঝোল; শেষ পাতে ঘরে পাতা টক দই। খাওয়া শেষে ছাঁচিপান মুখে দিয়ে নিমগাছের ছায়ায় খানিক জিরিয়ে নেওয়া।

” যত্ন গড়িয়ে পড়ে তোমার দু আঙ্গুল বেয়ে,
আলগা আদরে গলে যেতে থাকি আমি মোমের মতো …
কতকাল বসেছিলাম প্রতীক্ষায়
এই আদরের মাথায় মাথায় ভাসব বলে।
কেন ছুঁয়ে থাকি তোমার আঙ্গুল জানো?
কবিতার মায়া মাখানো ঘ্রাণ লেগে থাকে বলে …
সেই ঘ্রাণের কথা ভেবে এখনও বুক ভরে শ্বাস নিই …”

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত