জড়ুল

অনির মাথাটা থেঁতলে দিলে কেমন হয় ! বেশীক্ষন থাকবে না। কিছুক্ষন ছটফট করবে তারপর এলিয়ে পড়বে একদিকে। ব্যাস! তারপর ঠান্ডা ফ্যাকাসে বডিটাকে লোপাট করে দিতে হবে। কিন্তু সেসবে বেশ ঝামেলা আছে। এর থেকে ইনস্যুলিনের ওভারডোজটা মনে হবে অনেক স্বাভাবিক। কেউ তেমন তলিয়ে ভাববে না । এমনিতেই আজকাল তেমন কেউ আসে না এবাড়িতে।
অনি …অনিমা আমার স্ত্রী । আমার ১৪ বছরের বিবাহিত জীবনের একমাত্র স্ত্রীসঙ্গ । সন্তানের মা নয়। আমাদের কোনো সন্তান নেই।

ভাগ্যিস নেই। নাহলে এর পরে বেশ মুশকিলে পরে যেতাম। খুব নিপুন ভাবে করতে হবে কাজটা । এখন বরং ওর গা টা স্পঞ্জ করে দিই। স্পঞ্জ করে দিলেই ও ঘুমিয়ে পড়ে অবোধ শিশুর মতো। গরমজলে ভিজে তোয়ালেটা পিঠে ঘষে ঘষে দিচ্ছি, এরপর শুকনো তোয়ালে দিয়ে মুছিয়ে দেবো। অনি তো ব্লাউজ পরেই না অনেকদিন। যে ঢোলা জামাটা পরে থাকে সেটা তুলে দিতেই বেরিয়ে এসেছে অনির ফ্যাকাসে পিঠটা। এক সময় কি ভরাট শরীর ছিলো অনির! হাঁটলে কাঁপুনি উঠতো ঢলঢলে শরীরের বিশেষ বিশেষ জায়াগায় । আমি ইচ্ছে করে পিছিয়ে পড়তাম। পিছন থেকে নিজেই নিজের স্ত্রীকে দেখতাম খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আর লক্ষ্য রাখতাম পথচারী অন্য পুরুষরা কেমন লোলুপ দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে অনির দিকে! আশ্চর্য্য একটা উত্তেজনা হোতো শরীর মনে। অনি ওদিকে তাড়া দিত “ কি গো এত আস্তে হাঁটছো কেন?

সবথেকে মারাত্মক ওর পিঠের বাঁদিকে থাকা একটা লালচে জড়ুল। সেটা একমাত্র আমিই দেখতে পেতাম গভীররাতে । মাঝে মধ্যে বড় পিঠের ব্লাউজ পরলে জড়ুলটাও উঁকি দিত। আমার খুব রাগ হতো তখন।
সেটা এখন কেমন কালচে হয়ে গেছে। গরমজলের তোয়ালেটা জোরে জোরে ঘষলাম, নাহ! কোনো পরিবর্তনে নেই। অনি সামান্য ঘষাতেই অস্ফুস্ট স্বরে ‘আঃ’ করে উঠল। চামড়া কেমন ফেটে ফেটে গেছে।ময়শ্চারাইজার লোশন লাগিয়ে দেয়, স্নান করিয়ে টুনিয়া। তাতে বিশেষ কাজ হয় বলে মনে হয়না। টুনিয়া ধাঙড় পাড়ার মেয়ে। সকালে এসে অনির যাবতীয় বর্জ্য ফেলা, ইউরিন ব্যাগ পালটে দেওয়া, স্নান করানো ওর কাজ।

টুনিয়া যখন অনিকে স্নান করায়, ময়শ্চারাইজার লাগিয়ে দেয়, আমি দেখি। অনিকে দেখি, টুনিয়াকেও। ধাঙড় মেয়েগুলোর খুব সুন্দর চেহারা হয়। খুব আঁটোসাটো। টুনিয়াও কেমন একটা বন্য সুন্দর চেহারা নিয়ে ঘরের এদিক ওদিকে ঘুরে বেরায় নানা কাজে। টুনিয়াও জানে আমি ওদের দেখি। যখন ও বৌদিমণিকে খালি গায় ময়শ্চারাইজার লাগিয়ে দেয় । ঘাড় ঘুড়িয়ে কেমন যেন নেশা নজরে তাকায়। ওর থুতনিতে ছোট্ট ছোট্ট তিনটে উল্কি আছে। কানে রুপোর মাকড়ি , নাকে নথ ।

সেদিন হাজার দুয়েক টাকা দিলাম টুনিয়াকে। ওর বর মেরে ওর ছেলের হাত ভেঙে দিয়েছে। ওকেও রোজ মারধোর করে। ইস! কি করে মারে এমন মেয়েগুলোকে! সবকটা মাতাল। শ’পাঁচেক টাকা চেয়েছিলো। আমি দু’হাজার দিলাম ইচ্ছে করেই, লাগবে কাজে ।

অনি কেমন ফ্যাকাসে রক্তহীন ভাষাহীন তাকিয়ে আছে এদিকেই । অসহ্য !  একটা স্টিলের বাটিতে চা ঢালছি আমি খাবো। অনিকেও চামচে করে খাওয়াবো। নেশা খুব বিষম বস্তু ! রোগেও যেতে চায় না।  আমার যেমন অনির পিঠের ওই জড়ুলটার নেশা যায়নি এখনও …! একটা নেশা ছাড়াতে অন্য একটা নেশা চাই । সেটা ছাড়াতে আর একটা! চা এককাপ মতো বাড়তি হবে মনে হচ্ছে । থাকুক! টুনিয়া এলে গরম করে নেবে নাহয়।

একটা ধূপ জ্বালি , বড্ড নোংরা গন্ধ হয়েছে ঘরটায় । এঘর থেকে ওঘর ছড়িয়ে পরছে। অনির অল্প শ্বাসকষ্ট হতে পারে জানি। কিন্তু, এই রুগী রুগী গন্ধটা আমি আর নিতে পারছি না । বেডপ্যানের গন্ধ, অনির গায়ের ফাটাফাটা চামড়ার গন্ধ, মশ্চারাইজারের গন্ধ, আরও কত গন্ধ মিশে একটা উৎকট গন্ধ ঘরময় থমকে আছে। হা ভগবান! কবে যে এর থেকে মুক্তি পাবো।

কিছু একটা ব্যবস্থা  করতেই হবে। টুনিয়াকে সঙ্গে নেবো ! নাঃ … ওদের বিশ্বাস নেই। যদি বলে দেয়, থাক বরং আর কিছু টাকা দিয়ে ওকে আমার কাজে লাগাতে হবে। ওর টাকার খুব ক্ষিদে। যা বলব, যেমন বলব করবে। আমি বুঝে গেছি। আঃ বিছানায় আবার একটা দাস পাবো আমি। ভেবে সুখি হয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে নিলাম।

এই নিয়ে দ্বিতীয়বার ইউরিন ব্যাগটা দেখল টুনিয়া । ক্যাথেডারটা একবার ভালো করে নেড়ে দিয়ে ঠেলে দিলো। অনি একটু যেন কুঁকড়ে গেল যন্ত্রনায়। তারপর আবার স্থির হয়ে শুয়ে রইল।

“ হেই দাদাবাবু একদম পিসাব নেহি হুয়া …” চোখের সামনে ইউরিন ব্যাগটা নেড়ে বলল টুনিয়া। কিন্তু উত্তর পাবার কোন আগ্রহের রেখা ফুটলো ওর না চোখে মুখে। তাকিয়ে দেখলাম ইউরিন ব্যাগে লালচে কয়েক ফোঁটা তরল আটকে, যাকে ঠিক ইউরিন বলা যায় না। তবে কি …!

“অনি …অনি…এই…” রাত একটা বেজেছে কিছু আগে। অনি বিছানার চাদরটা খামচে ধরেছে দু হাতে। একটা হাল্কা হেঁচকি মতো তুলছে থেকে থেকে। একবার একটা লম্বা হিক্কা তুলে পাশ ফিরে গেলো। ঢোলা জামাটার ফাঁক দিয়ে ওর জড়ুলটা দেখা যাছে স্পষ্ট আর বোধহয় বেশীক্ষন ধরে রাখতে পারবো না। এবার আমার মুক্তি। আহ! এবার আমার একটা কালো ডটপেন দরকার। এখুনি… ।

আমি আলতো করে আবার চিত করে শুইয়ে দিলাম অনিকে। বালিশে মাথাটা তুলে ঠিক করে দিলাম। অনির কষ বেয়ে লালা ঝড়ে শুকিয়ে সাদাটে একটা দাগ হয়ে আছে মুছিয়ে দিলাম। এবার ডটপেন দিয়ে অনির রক্তশূন্য ফ্যাকাসে থুতনিতে তিনটে ছোট্ট ছোট্ট ফুটকি এঁকে দিলাম। অনি শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে , একবার চোখের পলক কাঁপল মনে হলো। আমি জানি অনি কিছু বলবে। ঝুঁকে এলাম অনির মুখের কাছে। অনি অস্ফুস্ট স্বরে ভেঙে ভেঙে বলল “ আ…আমি…জানি…।”

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত