খেলার সাথি

বড় হয়েছি দক্ষিণ কলকাতায়। অন্তত ইতিহাস আর স্মৃতি অনুযায়ী দক্ষিণ। সাতের দশকে সেই গড়িয়া অঞ্চলের বৈষ্ণবঘাটা নামক অঞ্চলটি অবশ্য গ্ল্যামারের দাক্ষিণ্য পায়নি তেমন, সে তখন তীব্র দক্ষিণ। যেখানে সাউথের সফিস্টিকেশন শেষ, সেখান থেকে তার সীমারেখা শুরু। সে সব ভৌগোলিক জ্ঞানের কথা থাক। ছেলেবেলার কথা কই খানিক।

চিরকাল মর্নিং ইশকুল। সকাল ছ’টা দশে বাড়ির সামনের রাস্তায় স্কুল বাস। বাড়ি ফিরতে বেলা বারোটা। বাড়ি ফাঁকা। মায়ের ইশকুল, বাবার আপিস। পাশের ফ্ল্যাট থেকে চাবি নিয়ে দরজা খোলা। ক্লাস থ্রি-ফোর থেকেই এভাবে স্বাবলম্বী হবার পাঠ। কারণ, প্রথমত তখন প্রতিবেশি মানেই বৃহত্তর পরিবার। আশেপাশে কাকা-জ্যাঠা-কাকিমা-জেঠিমাদের ক্রমাগত নজরদারি। আর বাড়ির বাইরের পৃথিবীতে তখন মেয়েমানুষকে কেউ ধর্ষণযোগ্য মাংসপিণ্ড মনে করত না। কাজেই ছোট্ট হাউজিঙের ফ্ল্যাটে অভূতপূর্ব নিরাপত্তায়, অসম্ভব স্বাধীনতায় বেড়ে ওঠা। সবচেয়ে বড় কথা যেদিকে তাকাই, সেদিকেই বন্ধু। পাড়ার বন্ধু। ওপরের ফ্ল্যাটে মুনমুন, তার ওপরে লাল্টু। পাশের ফ্ল্যাটে ছোট্ট বোনের মতো মান্তু। তার ওপরে ঝুমা আর অপুদা। এ তো শুধু আমাদের কে ব্লক। আর আশেপাশে? আই ব্লকে তিনতলায় মিঠু আর একতলায় লেখা। জিগরি দোস্ত। জানের জান, প্রাণের আধখান। মিঠুদের ওপরে সোমনাথ আর বিশ্বনাথ। (পয়েন্ট টু বি নোটেড, তখন আমাদের জেন্ডার বায়াসনেস গড়ে ওঠেনি ভাই)। তার সঙ্গে বিরাট খোলা মাঠ। পিছনে পাঁচিল ঘেরা পার্ক। পার্কে বড় দাদারা ফুটবল খেলে। ওদিকে ছোটরা যাইনা। আমাদের চৌহদ্দিতেও ছোট ছোট বেশ কয়েকটা মাঠ।

দুপুরটা কেটে যেত রেডিও নিয়ে। পড়ার ঝামেলাগুলোও নিজে নিজেই সেরে ফেলতাম চটপট। সন্ধে হলেই লোডশেডিং। আমার কম আলোয় পড়া বারণ। ক্লাস টু থেকেই নাকের ওপর মাইনাস পাওয়ারের একটি অতি ভারি চশমার জন্য ডাক্তারের বিধিনিষেধ। আহা! সে যে কি অনাবিল আনন্দের মুহূর্ত! আবার রেডিও শোনা যাবে। মা রান্নাঘর থেকে চেঁচিয়ে পড়া মুখস্থ ধরবে। না পারলে মা নিজেই বই দেখে পড়িয়ে দেবে। খুব চটপট খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়তে হত তখন। আবার সেই কোন ভোর পাঁচটায়…।

আমার সারাটা দিনের অপেক্ষা বিকেলের জন্য। দেওয়ালে লাগানো ছোট্ট ঘড়িতে বিকেল চারটে বাজার অপেক্ষা। রোদ যথেষ্ট চড়া তখনও। তবু। চারটে বাজে তো! সবার আগে বীরদর্পে মাঠে নামি। ওরে আয় রে! হাঁকডাক শুরু। মাঠে আয়। নামবি না তোরা?
কোনও এক কাকীমা বারান্দায় এলেন। চোখ পাকিয়ে প্রথমেই বকুনি, তুই এই এত তাড়াতাড়ি নীচে নেমেছিস? দাঁড়া, আসুক আজ শিবানীদি। ওই যে, বৃহত্তর পরিবার! নিউক্লিয়ার না হাতি! সব একান্নবর্তীর ঠাকুর্দা! বাপরে। মায়েদের বকুনির আড়াল দিয়েই দু’চারজন সুড়ুত করে নেমে পড়ে। আমার মতো বখে যাওয়া এবং বখিয়ে দেওয়া ক্যাটালিস্ট পৃথিবীতে বিরল। যে মিশেছে, সেই হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে!

নামার পরেই হট্টগোল। কি কি খেলা হবে আজ? কুমিরডাঙা? দাঁড়িয়াবান্ধা? পিট্টু? না লুকোচুরি? যা হোক একটা কিছু ঠিক হয়। হই হই শুরু। অস্বাভাবিক রুগ্ন ছিলাম সেই মেয়েবেলায়। প্রচন্ড হাঁপানি নিয়ে মাঝেমধ্যেই কেতরে পড়তাম। তখন ইনহেলার আবিষ্কার হয়নি। টারবুটালিন সালফেট বলে একটি মাইক্রোস্কোপিক ট্যাবলেট খেলে টানা সাতদিন মাথা ঝিমঝিম, গা গুলোনো, হাত-পা কাঁপা চলত। সব খাবার মুখে বিস্বাদ, সমস্ত পৃথিবী অপ্রয়োজনীয়। বেঁচে থাকার অবলম্বন তখন মাত্র দুটো। রেডিও আর খেলার মাঠ। রোগা আর অসুস্থ বলে প্রচুর সমবেদনা পেয়েছি, কিন্তু বিশ্বাস করুন, জোরে ছুটতে পারিনা, চোখে কম দেখি, দুবলা প্যাংলা চেহারা বলে কিন্তু কোনও অবহেলা বা করুণা পাইনি। সেইসময় ‘জিরো ফিগার’ শব্দটিতে কেউ আগ্রহী ছিলেন না, কিন্তু আপনারা তো জানেন, আমার মতো কিছু মানুষ সময়ের আগেই ইয়ে হয়ে যান, মানে ওই আইকনিক। তো সেইরকম একটি আইকনিক জিরো সাইজ ছিল বটে আমার! হুঃ! কোথায় লাগে ক্র্যাশ ডায়েট আর জিম করা ‘করিনা’। নেহাত তেমন কিছু করি না…। যাক গে। অবান্তর কথা।

কুমিরডাঙায় ‘কুমির’, লুকোচুরির ‘চোর’ হওয়া কি সহজ? অত্যন্ত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে, নিখুঁত ভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করে এবং অভ্রান্ত নিয়ম মেনে এইসব ইমপার্শিয়াল সিদ্ধান্ত নেওয়া হত। ‘দশ-কুড়ি নাড়ি-ভুঁড়ি চিংড়ি মাছের চচ্চড়ি’ শুনেছেন? যাঃ এত কম জানলে, খেলবই না। আচ্ছা, ‘দুধভাত’? আঃ, খাওয়ার কথা হচ্ছে না। খেলার সময় আবার খাওয়া কিসের? ওটা মাইনরিটি বোঝাতে। আরে বাবা, মাইনর মানে ওইসব জাত-পাতের ধ্যাষ্টামো নয়, বয়সে অতি কচি, অথচ আমাদের সঙ্গে খেলতে চায়, তাকে বলি ‘দুধভাত’। দেখবেন, ছানাটির সামনে খবরদার বলবেন না। ছোট বলে কি তার কোনও আত্মসম্মান নেই? ‘আব্বুলিশ’ বলেছেন কখনও? আরে দূর কচুপোড়া, পাশবালিশ বা চোর-পুলিশের সঙ্গে তার বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই। এইসব খেলার মাঠের কোড। না জানলে আপনিই ‘আউট’।

কুমিরের নাগাল থেকে বাঁচতে ধুপধাপ করে লাফিয়ে যে ‘ডাঙ্গায়’ উঠতাম, সেগুলো ছিল এক-একটা সেপটিক ট্যাংক। নাঃ, সবকটা অক্ষত ছিল। অত লাফালাফি ঝাঁপাঝাঁপিতে তারা ভেঙ্গেচুরে অতল গর্ভে তলিয়ে আমাদের কোনওদিন বিপদে ফেলেনি। আরে বাবা, তখন তো কন্সট্রাকশনে সিন্ডিকেট রাজ শুরু হয়নি; সরকারি হাউজিঙের দেখভাল যথেষ্ট ভালই ছিল। চাপ ছিল না। তবে লুকোচুরি মানেই হাউজিঙের কোনও না কোনও ব্লকে ঢুকে পড়া। মাঝেসাঝে অন্যের বাড়ির কলিংবেল বাজিয়ে দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার মধ্যে যে যে কী নির্মল আনন্দ! শুধু একবার কে যেন লুকোতে গিয়ে গাছে চড়ে আর নামতে পারছিল না!

পিট্টু খেলায় দরকার হত অবিশ্বাস্য দক্ষতা। ইঁটের টুকরো পরপর সাজানো, তাকে রবারের বল ছুঁড়ে এক চান্সে ছড়িয়ে ফেলেই দে দৌড় দৌড়। প্রচন্ড উত্তেজনা। টুয়েন্টি-টুয়েন্টিকে হার মানায়। দাঁড়িয়াবান্ধাতে আমি চিরকাল অপটু। গায়ের জোর নেই, তাই খো খো তেও আমি দর্শক গ্যালারি। এদিকে ক্রিকেটে তখন তিরাশির বিশ্বকাপের আঁচ। সেই আঁচে আমরাও দাঁত বার করে বলি ‘পামলিভ কা জওয়াব নেহি’। রবি শাস্ত্রীর পোস্টার কেটে রাখি আনন্দমেলা থেকে। কিন্তু লিটল মাস্টার যখন বুক চিতিয়ে দাঁড়ান ম্যালকম মার্শাল, জোয়েল গার্নারের মতো বিশালদেহীদের সামনে, কী আশ্চর্য অনুকম্পা হয় আমার! আহা রে! বেচারাদের ক্লান্ত করে দেবে ঐ ছোট্ট লোকটা। ক্রিকেট তখন ধৈর্যের, ক্রিকেট তখন ভদ্রলোকের। ক্রিকেট তাই আমাদেরও। আমার ভীষণ প্রিয় ছিল ব্যাডমিন্টন। শীতের আঁচ পড়তে না পড়তেই সকালে-দুপুরে-বিকেলে আমার কাঠের র্যা কেট রেডি। রাতে ফ্লাড লাইটে আলো জ্বেলে, চুনের গুঁড়োতে কোর্টের সীমানা বানিয়ে, নেট টাঙ্গিয়ে বাবা-কাকারা খেলতেন ব্যাডমিন্টন, ভলিবল। বাবার তো অসম্ভব প্রিয় খেলা ছিল ভলিবল। অফিস থেকে ফিরেই তখন ধবধবে সাদা হাফপ্যান্ট পরে নেমে যেতেন পিছনের মাঠে। আমরা কেউ বারান্দায়, কেউ জানালায়। বড়দের খেলা দেখে শিখে নিতে হবে মোক্ষম সব মারপ্যাঁচ।

শীতের দুপুরে রুমালচোর, ছোট্টদের সঙ্গে ইকিরমিকির আর চলত মাঠে কোর্ট কেটে চু-কিতকিত। জোড়া পায়ে। এক পায়ে। অবিশ্বাস্য দম লাগত ন’টা ঘর ঘুরে আসতে। গুটি নিয়ে কাড়াকাড়ি। মিটার বক্সের ওপর তাকে যত্ন করে গুছিয়ে রাখা। ঘষে ঘষে তাকে পাতলা করা। দাগের কয়েক চুল আগে গুটি লেগেছে কিনা সেটা দেখার জন্য বিশেষজ্ঞ ডাকতে হত না…। চারপাশে প্রচুর ভিড়! প্রতিটি বিকেল আমাকে কতকিছু দিয়েছে। দল গড়তে শিখিয়েছে। দল ভাঙতে শিখিয়েছে। কুচুটেপনা শিখিয়েছে, উদারতা শিখিয়েছে। আড়িভাব শিখেছি, আপন-পর চিনেছি।

একটু একটু করে বড় হই। পড়ার চাপ বাড়ে। ক্লাস নাইন-টেন। খেলার মাঠে কম। পড়ার টেবিলে বেশি। বাড়িতে একটা ছোট্ট সাদা-কালো টিভিতে হঠাৎ দেখি, একটা মেয়ে দৌড়চ্ছে। খুব কালো। আমার মতো। দাঁতগুলো উঁচু। আমারই মতো। হাড়সর্বস্ব চেহারা। একদম আমি। আরেব্বাস কি লম্বা! এ তো এক্কেবারে আমি! মেয়েটা দৌঁড়ায়। লম্বা লম্বা পায়ে অবিশ্বাস্য গতিতে হার্ডলস পেরোয়। রোগাভোগা আমিও মনে মনে দৌঁড়াই ওর সঙ্গে, প্রাণপণ। আমার সমস্ত দম ফুরিয়ে যাওয়া রুগ্ন ক্লান্ত শরীর নিয়ে আমি ওর সঙ্গী, আজও।
ভালো থেকো ছেলেবেলা। ভালো থেকো পি টি ঊষা। আজও হার্ডলস পেরোচ্ছি।

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত