খনা

কুস্তিখেলা হবে ভেবেছিলাম। আমরা তো কুস্তি জানি না। রদ্দা মারলে ঠোঁট চিরে পড়ব মনে হয়। কিন্তু নেভার দ্য লেস, আমাদের কুস্তির চাদরে দেখার জন্য বাঁশিতে সুর ওঠে, সে আজকে নয়। আমরা রোদ বুনতে গিয়েছিলাম। আমরা না চাইতে ঘূর্ণিকে স্পর্ধা করেছি। আমাদের ঘাড় ধরে নামিয়ে দেওয়া হল অমাবস্যার খেলায়। রেফারি বাঁশি বাজালেন। শুরু হল ম্যাচ। অনেকবার আমরা দমাদম পতনশীল জলের মতো পড়ে গেলাম। এক একবার শুয়ে শুয়ে ভাবলাম, এবার সব শেষ, আর উঠতে হবে না। চাঁদের রক্তাক্ত মুখ দেখতে হবে না। একটা অন্ধকার আকাশ নুয়ে পড়ে বলতে লাগল, বেশি লেগেছে? জল খাবে? আবার কানা বাউলের মতো উঠে দাঁড়ালাম। ততদিন সব ইন্দ্রিয় চুর হয়ে গেছে। আমরা শুধু পেটের গমগম আওয়াজ শুনতে পেলাম। কর্কশ চিরুনির মত বাতাসে শাড়ি নেতিয়ে গেছে। আমরা হাতড়ে হাঁটলাম। কাঁটাগাছের সঙ্গে আলতো আবছায়া চোখ বন্ধুতা চায়। ছাইমাখা বাতাসে ঘ্রাণ শকুন হয়ে ওড়ে। যে-স্রোত আমাদের টেনে রাখে, তার নাম খনা। খানাখন্দ গিলে ফেলার আগে, সাহেববাড়ির সেই ঝুঁটিওলা বাচ্চা মেয়ে জাপটে ধরে, কোলে চড়ে। আমরা ওর চোখে হারিয়ে যেতে থাকি। একজন বৃদ্ধ মর্মর সুর আর ক্ষীরের সাগর হয়ে ইজিচেয়ারে শুয়ে আছেন। তাঁর চোখ আমাদের প্রশ্ন করে, কী দেখতে পাও? আমরা ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে দেখি, তাঁর গায়ে পৃথিবীর বাঁশবন আর ঘনীভূত কালিতে ক্যালিগ্রাফি টেবিলে লুটোপুটি খায়। কলাপাতা খিচুড়ি দিয়ে কার যেন মুখেভাত হয়ে গেল। তিনি মাথা ছুঁয়ে বললেন, ‘খনা!’ দেখলাম দাঁড়িয়ে আছি আর উদ্যত মুষ্টি আমাদের বুকের কাছে এসে হাসতে হাসতে খসে পড়ছে। নাকি দস্তানার নিচে ছিল আটপৌরে ধুলোমাখা আঙুল, ঠিক জানি না। আবার দাঁড়াতে হয় রোদ বোনার জন্য। আর কাগজের কাছে গোপন, সব উত্তোলিত শব্দেরা ঝরে দু’চোখ থেকে। রক্ত মাটিতে পড়ে জবা হয়ে ছুঁয়ে ফেলে সব শব্দ। আর আমরা শাদা ঘরে বাজনা বাজাই আলতো বা জোর। উঠোন থেকে নেমে আসার পর, কেউ আমাদের হাত ধরে বলেন, এভাবে রোদের আলাপ হয়। এক বয়সী বৃক্ষ ছিলেন শেষ সারিতে, উঠে এসে জানান, ‘তুমি ডরো নাই। কেমনে জবাব দিছ। আমরা ডরাইছি হেরে।’ নির্বাক নদী আমাদের চোখে সাঁতার কেটে যায়। বাইরে তাকিয়ে দেখি, বটগাছের পাতা তখনো টুংটাং শ্বাস ফেলছে।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত