পিলুর বন্ধু শেয়াল

শেয়াল ভায়া বেজায় চালাক
হুক্কা হুয়া ডাকে
দিনের আলোয় বন বাদাড়ে
গর্তে ঢুকে থাকে
সুযোগ পেলেই পাড়ায় এসে
হাঁস মুরগী ধরে
তবে কুকুর গুলোয় সে
বেজায় ভয় করে!

ছড়াটা পড়তে গিয়ে পিলুর মনটা দুঃখে ভরে ওঠে। গত কয়েকটা সন্ধ্যে ওর কাছে বেশ ফাঁকা ফাঁকা। কি যেন নেই। কি যেন হারিয়ে গেছে। প্রিয় কিছু হারালে যেমন হয় আর কি। বইটা একদিকে সরিয়ে রেখে জানলার কাছে ছুটে যায় পিলু। মা যাতে শুনতে না পায় সে রকম আস্তে জানালাটা খোলে। তারপর বাড়ির পিছন দিকের ধূ ধূ উলুবনটার দিকে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ একটা কুকুর দেখে পিলু ভাবে বন্ধু এসেছে। খুশিতে মায়ের বকুনি ভুলে হুক্কা হুয়া বলে সে চেঁচিয়ে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে ঘেউ ঘেউ শব্দে কুকুরটা জানালার কাছে তেড়ে আসে।

হতাশ পিলু জানালা বন্ধ করছে এমন সময় অনুভব করলো তাঁর কানে মায়ের আঙুল। ‘কিরে দুষ্টু ছেলে তোকে না পড়তে বলে গেলাম! আর তুই কিনা হুক্কা হুয়া ডাক ছাড়ছিস’! কান্না ভেজা গলায় পিলু বলে ‘উলু বনের শেয়ালটা আর ডাকে না কেন’?

ছেলের প্রশ্নে মা অপ্রস্তুত হয়েও নিজেকে সামলে নেয় ‘তোকে কতবার বলেছি শেয়ালের ডাক শুনলে অমঙ্গল হয় তবুও…! মায়ের কথা শেষ হয়নি পিলু বলে ওঠে ‘কেন অমঙ্গল হয় মা? কেন শেয়ালের ডাক শোনা খারাপ…ও মা বলনা কেন খারাপ’? নিষ্পাপ পিলুর প্রশ্নের উত্তর ছিল না মায়ের কাছে। ছেলেকে ভয় দেখাতে  শেয়ালের ডাকের সঙ্গে অমঙ্গলের মিথ্যে গল্প বলার জন্য মনে মনে একটু পস্তালেন তিনি।  কিন্ত মুখে বললেন ‘আগে বড় হও তারপর বুঝবি! এখন বক বক না করে পড়তে বস’।

রাত্রে বাবার পাশে শুয়ে পিলু গল্প শুনতে চায়। বাবা হেসে বলেন ‘কিসের গল্প শুনবি? ‘শেয়ালের’- ছেলের উত্তরে বাবার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে যায়। হাল্কা আলো অন্ধকারে পিলু তা দেখতে পায় না। তবু বাবা ছেলেকে তাঁর জানা শেয়ালের রূপকথা-উপকথা আর জাতকের অনেক গুলো গল্প শোনায়। সেই সব গল্পে শেয়াল সব সময় চালাক! সেই সব গল্পের শেষে অনেক নীতি শিক্ষাও হয়।

গল্প শুনতে শুনতে পিলুর মনে পড়ে যায় তাদের বাড়ির পিছন দিকের উলুবনে থাকা তাঁর বন্ধু শেয়ালটার কথা। প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় শেয়ালটা পিলুদের জানালার কাছে এসে হুক্কা হুয়া ডাক দিত। সবাইকে লুকিয়ে পিলু জানালা খুলে শেয়ালকে নানা রকম খাবার দিত। প্রথম প্রথম শেয়ালটা পিলুকে বিশ্বাস করতো না। খেতো না সে ওসব! ক্রমে কিভাবে যে শেয়ালটার মানুষের উপর বিশ্বাস জন্মালো পিলু আজও তা ভেবে পায় না। সেই থেকে ‘পিলুর বন্ধু শেয়াল’! এক একদিন পিলু শেয়ালটার ডাকের আগেই হুক্কা হুয়া ডাক দিলে শেয়ালটা সঙ্গে সঙ্গে উলুবন কাঁপিয়ে ঝোপঝাড় টপকে জানালার কাছে চলে আসতো। আর যেদিন জানালা বন্ধ থাকতো শেয়ালটাই ডাক ছেড়ে পিলুকে জানান দিত ‘আমি এসেছি বন্ধু…! অথচ সেই শেয়াল আজ বেশ কয়েকদিন আর আসছে না। পিলুর অত ডাকা-ডাকিতেও সাড়া দিচ্ছে না। ওর নিশ্চয় জ্বর হয়েছে কিংবা ওর ছানাদের শরীর খারাপ। এইতো কয়েকদিন আগেই বন্ধু শেয়ালটা ফুটফুটে তিনটে বাচ্চাকে নিয়ে হাজির হয়েছিল জানালার কাছে।

কুঁই কুঁই শব্দে বার বার সে বুঝিয়ে দিতে চেয়েছিল এরা হোল আমার ছেলেমেয়ে। সেদিন আনন্দে পাগল হয়ে গিয়েছিল পিলু। ফ্রিজে রাখা মুরগীর মাংসের বেশিটাই সে ওদের দিয়ে দিয়েছিল। মাংস কোথায় গেল তা নিয়ে মা সাড়া বাড়ি মাথায় তুললেও  কিছুতেই কোন কুল কিনারা পেলেন না।

পিলুকে চুপচাপ থাকতে দেখে বাবা ও মা ভাবলো সে ঘুমিয়ে পড়েছে। পিলুর মা বললেন ‘জান ছেলেটা আজ আবারও শেয়ালটার কথা তুলেছিল। সন্ধ্যে বেলায় পড়া ছেড়ে জানালার কাছে দাঁড়িয়ে হুক্কা হুয়া ডাকছিল। বাবা বললেন ‘ সত্যিটা পিলুর জানা উচিত। কিন্তু কি করে তা ওকে বলি। বড় প্রিয় ছিল যে শেয়ালটা ওর।

দোষটা আমারই! আমি যদি না বলতাম শেয়ালের ডাকের সঙ্গে অমঙ্গলের কথা। রাত্রে ঘুম ভেঙ্গে যাবার কথা তাহলে…? মায়ের কথা শেষ হয়নি বাবা বললেন ‘দোষ নয় আসলে তুমি বিরক্ত হয়েছিলে। আর যেদিন শেয়ালটার ডাকে আমারও ঘুম ভাঙ্গলো সেদিনই ঠিক করে ফেললাম ওটাকে তাড়াতেই হবে। তাই এইসব কাজ যারা করে তাদের সাহায্য চাইলাম। কিন্তু তারা যে অমন কীর্তি করবে তা আমি ভাবতেই পারিনি!

মা বললেন, ‘আসলে আমাদের লোভ ক্রমশ বাড়ছে। শুধু নিজে বাঁচার স্বার্থপর ভাবনায় আমরা মানুষেরা যা খুশি তাই করছি।

বাবা বললেন ‘তুমি ঠিকই বলছো। আমিতো লোকজন ঠিক করে নিশ্চিন্তে ছিলাম শেয়ালটাকে তাড়ানোর ব্যাপারে। যেদিন ওদের কাজটা করার কথা সেদিন সন্ধ্যেবেলায় প্রচন্ড জোড়ে বোমার আওয়াজ শুনে উলুবনে গিয়ে দেখি সব শেষ!

মা বললেন, ‘আমিও গেলাম তোমার পিছন পিছন। গিয়ে দেখি লোকগুলো শেয়ালটার চামড়া-দাঁত- আর হাড়গোড় নিতেই ব্যস্ত। অনেকটা জায়গা রক্তে ভেসে রয়েছে। আমরা বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারিনি চলে এসেছিলাম একরাশ অপরাধ বোধ নিয়ে।

বাবা বললেন, ‘আসলে লোকগুলো ছিল শেয়াল ধরার দল। চামড়া-দাঁত আর হাড় নিয়ে কি সব ব্যবসা করে। ওরা শেয়ালের চলাফেরার রাস্তায় খাবারের সঙ্গে হাল্কা বোমা বেঁধে রেখেছিল। শেয়ালটা যেই না খাবারটায় দাঁত বসিয়েছে অমনি বোমাটা ফেটে… ছিঃ ছিঃ! খুব ভুল হয়ে গেছে বুঝলে। চল কালই ওকে চিড়িয়াখানায় নিয়ে গিয়ে শেয়াল দেখিয়ে আনি।

চিড়িয়াখানায় শেয়াল দেখার কথায় পিলু কিন্তু খুশি হয় না। এতক্ষণ সে জেগেই ছিল। মা বাবার সব কথাও শুনেছে। ওর চোখের সামনে ভাসছে বন্ধু শেয়াল আর তাঁর ছোট ছোট তিনটে বাচ্চার মুখ। মাকে হারিয়ে ওরা বেঁচে আছেতো! না কি শেয়াল ধরার দল ওদেরও…! পিলুর শিশু মন আর ভাবতে পারে না। বড়দের লোভের ভয়াবহতায় ডুকরে কেঁদে ওঠে সে। ‘আমাকে কাল সকালে একবার সেই জায়গাটা দেখিয়ে দেবে বাবা? যেখানে আমার বন্ধুর রক্ত পড়ে আছে।

ঘটনার আকস্মিকতায় পিলুর বাবা-মা হতবাক হয়ে যায়। ছেলে সব কিছু জেনে গেছে। লজ্জায় তাদের মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে হয়। পিলুর মতো তাদের চোখেও জল। পিলুকে বুকে টেনে নেয় মা। বাবা মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলে ‘কেন যাবি ওখানে? ওখানেতো আর তোর বন্ধুকে পাবি না…! মায়ের বুকের মধ্যে আরো জোড়ে ফুঁপিয়ে ওঠে পিলু। অব্যক্ত বেদনায় সে বলে ওঠে  ‘ওখানে আমি কিছু ফুল দেব বাবা…’!

 

 

 

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত