রুপম ও চোরাচালানকারী

পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই এখন ছড়িয়ে গেছে করোনা ভাইরাস। চীন উৎপত্তিস্থল হলেও এখন সব থেকে বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যু যুক্তরাষ্ট্রে। বাংলাদেশেও প্রচুর আক্রান্ত। জানালার ধারে বসে এসবই ভাবছিল রুপম।  রুপম এখন রংপুরে মামাবাড়িতে থাকে। এই মামা তার নিজের মামা নন। তার মায়ের মামাতো ভাই।  রুপমের মামার নাম বিকাশ দেবনাথ। মামার রংপুর আর এ এম সি শপিং কমপ্লেক্সে দোকান আছে। তার দোকানের পাশে লিটন লাহিড়ির দোকান। লিটন লাহিড়ি রংপুরের জাত ব্যবসায়ী। রংপুরে আরও দু’তিনটে দোকান আছে তার । 

কয়েক বছর আগে লিটন লাহিড়ি  ছেলের জন্য মেয়ে দেখতে বিকাশ বাবুর সাথে  রুপমদের গ্রাম চৌবাড়ি পয়রাডাঙ্গায় যান। গ্রামের রাস্তায় রুপমকে দেখে তিনি গাড়ি থামালেন। রুপমদের সাথে অনেকদিন যোগাযোগ না থাকলেও তিনি রুপমকে দেখে চিনতে পারেন এবং রুপমও তার মামাকে চিনতে পারে। রুপমের সাথে তার মামা রুপমদের বাড়ি যান। রুপমের মায়ের মুখে পারিবারিক অবস্থার কথা শুনে তিনি বললেন “দিদি কোনও চিন্তা করিস না  রুপমের পড়াশোনার সব দায়িত্ব আজ থেকে আমার”।  

মামা বিয়ে করেছেন কিন্তু তার কোনো সন্তান নেই। মামার সাথে রংপুরে এসে রুপম রংপুর টেকনিক্যাল কলেজে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ভর্তি হয়। দেশে করোনার আতঙ্ক। মানুষ মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার কিনে মজুত করছে। লিটন লাহিড়ির একটা ওষুধের দোকান আছে রংপুরের মেডিকেল মোড়ে। একদিন মামার সাথে রুপম লিটন লাহিড়ির দোকান ও গোডাউন দেখতে গেলো। গোডাউনে রুপম দেখল মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজারের বাক্স দিয়ে ঠাসা, ভেতরে পা দেবার জায়গা নেই। বাড়িতে ফেরার সময় রুপম লিটন লাহিড়ির দোকান থেকে দুই  বোতল হ্যান্ড স্যানিটাইজার কিনে নিয়ে এল। বাড়িতে ফেরার পর রুপমের হাতে হ্যান্ড স্যানিটাইজারের বোতল দেখে মামি বললেন “ভালো করেছিস নিয়ে এসে”। রুপম বলল “কাল গিয়ে আরও নিয়ে আসব”।

পরদিন সকালে রুপম লিটন লাহিড়ির দোকানে গিয়ে দেখল দোকানে কর্মচারী আরিফ বসে আছে। রুপম আরিফকে বলল “তিন বোতল হ্যান্ড স্যানিটইজার দিন”। আরিফ বলল “এক বোতলও নেই”। রুপম বলল “গোডউন থেকে এনে দিন”। আরিফ বলল “গোডউনের সব মাল চলে গেছে”। রুপম মনে মনে ভাবে- রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি মনে হচ্ছে। রুপম অন্য দোকান থেকে হ্যান্ড স্যানিটাইজার কিনে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে। 

দুপুরে খাবার পর রুপম বিছানায় শুয়ে ভাবতে থাকে। রুপমের মাথায় এখন হাজার হাজার প্রশ্ন। রুপম ভাবে- ব্যাপারটা কী? এক দিনের মধ্যে সব কোথায় গেল? লিটন লাহিড়ি কী চোরাচালানের ব্যবসা করে? তাহলে তো রাত ছাড়া উপায় নেই। ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ে রুপম।

ঘুম থেকে উঠে রুপম দেখল সন্ধ্যা হয়ে গেছে। রুপম চিন্তা করে যা করার আজকেই করতে হবে। দেশের মানুষকে বাঁচাতে হবে।  মামার বাড়ি রংপুর মেডিকেল পুর্বগেটের সাথেই। কাজেই মেডিকেলের ভেতর দিয়েই লিটন লাহিড়ির দোকানের কাছাকাছি যেতে হবে। মামার বাড়ির সদর দরজা রাতে বন্ধ থাকে তাই জানালার শিক খুলে পাইপ বেয়ে নামতে হবে। শিক খোলার জন্য অস্ত্রও আছে। মামা কাঠমিস্ত্রি দিয়ে বাড়িতে রুপমের জন্য একটি খাট বানিয়ে নিচ্ছেন। কাঠমিস্ত্রি দুখু মিয়ার বাড়ি দূরে হওয়ায় সে জিনিসপত্র রেখে যায়। তার থেকে স্ক্রু ড্রাইভারটা সরাতে হবে। 

রাত দেড়টার মতো হবে। রুপম জানালার শিক খুলে পাইপ বেয়ে নামতে শুরু করেছে। এক একটি মুহূর্তকে মনে হচ্ছে এক একটি ঘণ্টা। মামা চারতলায় থাকেন। দোতলা পর্যন্ত নেমে এখন রুপম মনস্থির করল এখান থেকেই লাফ দিতে হবে। নয়তো নিচতলার বাসিন্দারা টের পেয়ে যাবে। রুপম নিচে লাফিয়ে পড়ে। এরপর এক দৌড়ে পৌঁছে যায় মেডিকেলের ভেতর। তারপর মেডিকেলের মূল দরোজা দিয়ে বাইরে আসে রুপম। 

লিটন লাহিড়ির গোডাউনটা গলির ভেতর। রুপম গলির মুখ পর্যন্ত গিয়ে দেখল পাঁচটা পিকআপ ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে গলির ভেতর। রুপম দেখল একটি ছেলে (বোধ হয় পিকআপ ভ্যান চালকের সহকারি) ল্যাম্পপোস্টের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রুপম তাকে হাত নেড়ে ডাক দিলে সে এগিয়ে আসে। রুপম তার হাতে কুড়ি টাকার দুটি নোট গুঁজে দিয়ে জিজ্ঞাসা করে “পিকআপে কী তোলা হচ্ছে?” ছেলেটি বলে “মাস্ক ও হাত ধোয়ার ওষুধ”। রুপমের বুঝতে ভুল হয় না সে হ্যান্ড স্যানিটাইজারের কথা বলছে। রুপম আবার জিজ্ঞেস করে- “এই কারবারের হোতা কে?” ছেলেটি বলল “লিটন লাহিড়ি”। “এসব মাল কোথায় যায়”? ছেলেটি বলল “আমাশু কুকরুলের অনুকুল ঠাকুরের মন্দিরের পাশে লিটন লাহিড়ির জমিতে গর্ত করে সেখানেই রাখা হয়। সেখান থেকে আরেক পক্ষ এগুলোকে ঢাকায় নিয়ে যায়। রুপম দেখতে পায় লিটন লাহিড়িকে। 

রুপম একটু দুরে এসে থানা ও র‌্যাব অফিসে ফোন করে বিস্তারিত জানিয়ে দেয়। ভোরের আলো ফুটছে। রুপম বাড়িতে ফিরে আসে। সকালে মামাকে সব বলে। মামা শুনে ভয়ার্ত গলায় বললেন “লিটন লাহিড়ি তোকে দেখতে পায়নি তো”? রুপম না বলায় মামা নিশ্চিন্ত হলেন এবং রুপমের পিঠ চাপড়ে দিলেন। 

রুপম চলে আসার কিছুক্ষণ পর পুলিশ ও র‌্যাব অভিযান চালিয়ে লিটন লাহিড়িসহ সবাইকে গ্রেপ্তার করে এবং সব চোরাই মাল উদ্ধার করে। তিনদিন পর রুপমকে থানা ও র‌্যাব অফিস থেকে পুরস্কৃত করা হয়।  

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত