আনুমানিক পঠনকাল: 6 মিনিটআজ কবি ও কথাশিল্পী আবু জাফর খানের জন্মদিন। তিনি পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার সৈয়দপুর প্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি সরকারি চিকিৎসক হিসেবে স্বাস্থ্য বিভাগে ডেপুটি সিভিল সার্জন পদে কর্মরত।
ইতোমধ্যে তার ১৮টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ৮টি উপন্যাস, ৮টি কাব্যগ্রন্থ ও ২টি গল্পগ্রন্থ। প্রকাশিত গ্রন্থগুলির মধ্যে বেশ কটি উপন্যাস এবং কাব্যগ্রন্থ দেশে এবং দেশের বাইরে ভারত, যুক্তরাজ্য এবং আমেরিকায় বাংলাভাষী পাঠকদের মাঝে বিপুল সারা জাগায়; দেশে এবং দেশের বাইরে বিভিন্ন পত্রিকায় আলোচিত ও প্রশংসিত হয়।
বর্তমানে তিনি পোয়েম ভেইন-এর সম্পাদক মণ্ডলীর সভাপতি ও ‘বাংলাদেশ কবিতা মঞ্চ’-এর প্রতিষ্ঠিতা সভাপতি।
বাংলা সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ইতোমধ্যে তিনি ‘বাংলাদেশ কবিতা সংসদ’ কর্তৃক আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা পদক, রবীন্দ্র স্মারক সম্মাননা, আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলন উপলক্ষে কথা সাহিত্যে (বাংলাদেশ) বাংলা সাহিত্য পদক, কলকাতা থেকে ড. বিআর আম্বেদকর সাহিত্য সম্মাননা, কলকাতা থেকে প্রকাশিত চোখ পত্রিকার পক্ষ থেকে চোখ সাহিত্য পদক, কবি জসীমউদ্দীন পরিষদ কর্তৃক পল্লীকবি জসীমউদ্দীন স্বর্ণ পদক, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত থেকে নজরুল সাহিত্য স্মৃতি স্বর্ণ পদক, মাইকেল মধুসূদন অ্যাকাদেমি, কলকাতা থেকে মাইকেল মধুসূদন স্মৃতি সম্মাননা এবং নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের পক্ষ থেকে সম্মাননা পদক-১৪২৫ অর্জন করেন।
যেমন দুরন্ত সঙ্গমে টুকরো হয়—
এমনকি অঙ্কের পাঠও শিখিনি, না শিখেছি গাণিতিক হিসাব;
হিসাবে বড্ড কাঁচা বোকা পুরুষেরা
আমরা ধর্ষক হয়ে উঠি তমসিত রাতের অরণ্যে
কদর্য কন্দর আমাদের ঠিকানা;
কী করে বাজবে কৃষ্ণের বাঁশি!
কী করে ঘর হবে নন্দিন আবাস!
ওপরে ঝোলানো ফ্যানের ব্লেডে—
কেটে টুকরো হয় স্থির অন্ধকারে,
তেমনই অনাদরে রমণীর প্রেম-অশনা ভেঙে খানখান
আমি সেইসব কাচের গুঁড়ো, টুকরো হয়ে যাওয়া–
রতির বাসনা, খানখান আঁধারের কাতর মিনতি
রেখে দেবো বলে জেগে আছি স্টেশনের
একটি নন্দিত মিলনের আকাঙ্ক্ষায়
অমি তাই সফুরার ঠিকানা বদলাই
এফোঁড়-ওফোঁড় করে ফুটিয়ে তুলব
বিধুর অবসাদ, মৃত্যু আর নিঃসঙ্গ বৃক্ষের পাতাঝরা সময়
ঢেকে দেবো আমার বিষাদতাড়িত দিনযাপনের হিসেব
ঢেকে দেবো প্রথম প্রেমের শব!
‘প্রথম’ বললেই দ্বিতীয়র কথা আসে
প্রকৃতপক্ষে আমার কোনও দ্বিতীয় ছিল না;
বিকেলের লালচে রঙে পিঠ ঠেকিয়ে—
ভাবি, সময় স্রোত ইচ্ছে স্বপ্ন সকলই বয়ে চলে যায়
যেতে যেতে যেতে ফুরিয়ে আসে…
এই যেমন একসময় পূর্ণ চোখেও—
তোকে ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি,
এখন আধবোঁজা চোখে সকল বুঝি, সমস্ত দেখি
যেমন দেখি, তুই আর তোর বিরহকে পাশাপাশি রেখে—
কী অনায়াসে প্রেমের ফুলকি ছড়াস!
মনের গলি ঘুঁজিতে ঢুকে পড়িস তুই,
ঠায় বসে থাকিস গহিনের জলজ পেয়ালায়;
কিছুরই হিসেব থাকে না আমার
কতবার আসিস, কতক্ষণ থাকিস কোনওকিছুরই না!
অথচ কী আশ্চর্য, আমার সময় স্থির হয়ে আছে—
সাত বছর তেত্রিশ দিন ছাপ্পান্ন ঘণ্টা;
পাহাড়ের বুক দীর্ণ করে গড়িয়ে নামে ঝরনার জল
জলের মাঝে লুকনো এক কষ্ট-পাথর—
আমার দিকে বিধুর চোখে তাকিয়ে থাকে
আমি না বলতে পারি আমাকে না সেদিনের—
পাথর ঠিক মনে রাখে জলের উচ্ছ্বাস!
একদিন খসে পড়ে, জলস্রোতে মিশে যায়;
আমার চারদিকে এখন নৈঃশব্দের নীল আগুন
আকাশে অর্থহীন মেঘ উড়ে চলে
আমি অন্ধকারের বিষন্ন ছায়াতে স্থির
গভীর আঁধারেও স্পষ্ট দেখি—
তোকে জড়িয়ে আছে আমারই মতো একটা ‘কে’!
হাসছিস কাঁদছিস, কী করে পারিস বল তো?
তোর ছায়া কিন্তু তোর পাশেই
একদিন চেষ্টা করে দেখিস দূরে সরিয়ে দিতে পারিস কি না!
যদি পারিস, তখন না হয় আমি–
প্রেমহীন আঁধারে ডুবতে ডুবতে সাঁতরে খুঁজব ডাঙা…।
বরফ মানে ‘আনালিয়া’, আমার প্রেমিকা
পূর্বাভাস বলে তুষার নামবে, আরও শীত
জানলার শার্সিতে আনালিয়ার চোখ
কেঁপে ওঠা দেখি, কাচের ওপারে তুষার, কাচের ওপারে ভয়
আনালিয়ার হাত বরফের মতো হিম!
প্রেম হামাগুড়ি দিতে জানে না
স্থির দাঁড়িয়ে থাকে নয়তো মুখ থুবড়ে উপুড় শোয়
একবার উপুড় শুলে মধ্যসাগরে নাবিকের নৌকাডুবি;
পতনের শব্দে ঘুমচূর্ণ অনিদ্রা নামে!
প্রেমিককে পেরিয়ে যায় প্রেমিকের অতীত,
সে তখন শূন্যগামী সিঁড়ি ধরে অনন্ত বায়!
একদিন আমি আনালিয়ার প্রেমিক ছিলাম।
বুঝে ওঠার আগেই আমার চোখে জেঁকে বসে
স্বপ্নের গভীরে থাকা যে বাড়ি
সমস্তই কাচে ঘেরা, কাচবাড়ি;
আলো জ্বলে না! না জ্বলে মোমের বাতি না ঝাড়লণ্ঠন
তবু কী কাচগলা ঝকঝকে সাদা—
তুলো ওড়ে, নরম শুভ্র কার্পাস তুলো
কোমল বালিশ ছিঁড়েখুঁড়ে নেতিয়ে পড়া—
সেই কাচের চাঁদঘর বরফভ্রমে এখন
সেই স্বাতিচোখ, ভোর পর ভাঁটফুল—
চুম্বনের ঘুমন্ত মুখ, তীর্থ দিঘির থই
কাজল চোখের ঠার, পুষ্ট ঠোঁটের কম্পন
চাঁদের শরীরে খুব বেশি ক্ষত
ক্ষত আমার হৃৎপিণ্ডের লোহিত নিলয়েও!
বিপুল এই জলরাশির কোনখানে আমি—
‘আমায় ভাসাইলি রে আমায় ডুবাইলি রে…’
কে ভাসায় কেইবা ডোবায়, আমি তাও জানি না
না কুল না শ্যাম, শুধু জানি শ্যামের বাঁশি—
আমি চোখ বুঁজে থাকি, আমার খুব জলের পিপাসা
‘ওয়াটার ওয়াটার এভরিহয়ার, নর আ ড্রপ টু ড্রিংক…’!
আসমুদ্র হিমাচলও দিতে পারে না,
খুঁজতে খুঁজতে একদিন কঙ্কাল হয়ে যাই
তোমার প্রেমের পাশে বসে আছি
না বৃক্ষ না চেনা কোনও পাখি
আমার কোথাও যাওয়া হয়ে ওঠে না;
তোমার দুঃখের পাশে বসে আছি
অনন্তবিসারী ধূসর দূর্বাদল
গ্রাফাইট শিষে ধরা আছে একালের শস্য আর রক্তবিন্দু
লাল নীল মোহের মায়ায় ভরে থাকে এই দুচোখ
নিবিড় কোনও শব্দ নেই আর কোথাও;
তোমার নিদ্রার পাশে বসে আছি
ঘুমন্ত সে-মুখ, যখন সোমেশ্বরীর জলে কল্লোল ছিল
এই ফিকে রাতে ছড়িয়ে রাখে আমার দুঃখের যত ছবি;
তোমার স্নান-শরীরের পাশে বসে আছি
গুচ্ছ গুচ্ছ শীতরোদ, প্রভূত চাঁদনির জল
এই রাতের মতো, এই ধূসর রাতের সমস্ত আঁধার আঙিনায়।
আমি বুঝে যাই এ পৃথিবীর কোথাও নিয়নের আলো নেই;
বড় রাস্তার ওপারে সেজে ওঠে মদের দোকান,
মোহরের ঝনৎকারে জেগে ওঠে নগরীর পান্থ নিবাস
এসব জেনে জেনে একদিন আমি নিজেই নিলাম হয়ে যাই।
এই হাত স্মরণের স্পর্শ লেখে না মাটির পাতায়
এই হাত হর্ম্যরে ভিত গড়ে ক্লেশে ক্লেশে,
একটি একটি করে উনুন বানিয়ে দিই জলপুর গাঁয়ে;
ভাবি, একদিন জ্বলে ওঠে যদি।
জখমগুলো আয়ু খেয়ে মরা পাতা ফেলে যায়
কায়ক্লেশে বাঁচি, তবু তোর কাছেই ফিরে যাবার এ যাত্রা
শ্যামা মেয়ে, এখানে এই অন্ধকারে
তোর কথা ভেবেই এই স্থবির প্রবহমানতার ভেতরও
স্বপ্ন বাঁচে : একদিন বিষাদ বাতির আলো কাচফুল হবে।
দেখবে অবিকল আমারই মতো আরেকটা
অশ্বর কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে,
তার পায়ের কাছে ঝরা শেফালির মতো
যা দিয়ে জীবনানন্দ বনলতা এঁকেছিলেন।
দেখবে কুমোরটুলির চেয়েও বড় এক ঠাকুরপাড়া,
যেখানে বিসর্জনের কাঠামোর গায়ে মাটি লেপে লেপে
ভাঙতে ভাঙতে শেষ বিন্দুতে গেলে দেখবে
রাত ফিকে হয়ে ক্রমশ ভোর ফুটছে!
একদিন দিনগুলো নিয়ে গিয়েছিলে। সন্ধ্যাগুলোও।
এরপর রাত্রি নামে। নকশি কাঁথা রাত্রি। পারোনি তবুও।
তবু তোমাকে জ্যোৎস্না দিয়েছিলাম। ঝাড়লণ্ঠন।
অনেকখানি যৌন সুবাস। তবু কথারা বসেনি
জোনাকি জোনাকি শব্দমালাও, এমনকি বেলফুল সুঘ্রাণও।
আমি সেইসব দুঃস্বপ্ন থেকে খুঁজে নিয়েছি
জানকী এবার তুমি পিঠ ফিরে শোও
আমার কোনও সাবিত্রী চাই না
আমার দু’হাত ভরা সন্তাপের ইতিহাস
আমার যতখানি ঘুম তার চেয়ে অনেক বেশি অধিবাস
এই করে করে নীল জলের সমুদ্রে শেষমেশ ভাসিয়েছি
কত আর পার করি মিথ্যের মন্ত্রতপঃ
এ সাগর বৈকালিক নয়, এ সাগর পুষ্পের নেশা
আমাকে ছুঁতে হবে অনেক দূরের ভোর-কুসুম।
ইদানীং বৃষ্টি হয় খুব আমার বুকের ভেতর
কোনও এক শান্ত দ্বীপে ভেসে থাকা নলিনীর বুক
আমাকে শয়ান রাখে যেন তার মখমল গোলাপি শরাব
ফিরিয়ে দেবে পৃথিবীর ডিঙাভরা ঘুম।
জানকী এবার তো পিঠ ফিরে শোও
আমি অ্যালবাট্রস, ছুঁয়ে ফেলি আকাশ ও সমুদ্রকে
তার সুগন্ধি রুমালি-গোলাপজল সাঁতরে স্থির এখনও,
অরুণাভ ছায়ায় ডুবে আছে তার ব্যথার শরীর।
জানকী এবার তুমি পিঠ ফিরে শোও।
যার সাথে মিলিনি আমি, তার সাথে মৃত্যুতে কী লাভ?
চুম্বনের পালক ওড়েনি আকাশে
তরঙ্গ স্পর্শ করব বলে ছুটে যাইনি সমুদ্রে
মেটেনি অনেক তৃষ্ণা তবু জগত ঘোরে
তৃষ্ণারা ভস্ম হলে একদিন হাওয়ায় ওড়া কাগজের নৌকো পেতো।
ডাহুকীর নরম পালকে আজ যে ওম
কালও কি সে ওমের উষ্ণতায় গা ভেজে?
দরজার ওই পাশে যেতে হলে অন্য এক চাবি প্রয়োজন
মৃত্তিকার কোল থেকে উঠে আসা মায়াডাক শুনিনি তবু।
আমাকে বরং পুড়িয়ে ফেলাই ভালো!
আমি আজ দু’হাত দিয়ে পৃথিবীর সকল বেদনার
যে ভার উত্তোলন করি, তার কিছুটা ওই পাহাড় শীর্ষের হিম বাতাস;
কিছু অবশেষ ডানা মেলে উড়ে চলে যাক
আমিই তো ব্যথাদের প্রান্তিক বিরহ-সুর।
তার পাশেই ঘুমিয়ে আছে সাদা পতাকা;
আমরা ঘষে ঘষে আগুন জ্বালাই
আমরা ফিনকির তরল কালি দিয়ে লিখি…
আলতা পরা পায়ের পাতায় একটি সোনার ধান
নূপুরের শব্দ নিয়ে স্থির হয়ে আছে;
একবার অভিভূত হয়ে চুম্বন করো এই অভাবিত দৃশ্যে।
প্রেম ও প্রণামের গৌরব আঁকন হয়ে জাগে
ছিঁড়ে যাওয়া এইসব চাঁদনির ভেতর।
ঝাপসা হয়ে আসা ঘোলা চোখের দৃষ্টি দিয়ে;
ভিজে পায়ের কোলে যেখানে গুল্মের মতো লতিয়ে উঠেছে
শ্রাবণের আকুল মেঘের আয়োজনের মতো
জলের ফোঁটায় ধারণ করে চলে আমার সারা জীবনের
নুয়ে পড়া দেহের কাঠামো তবু সর্বনাশ মুছে ফেলে
আগলের পরাগ ওড়ায় দখিন বাতাসে।
Related
শুভ জন্মদিন কবি