Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,kobi lekhakder kolamer golpo

ইরাবতী ফিচার: কবি লেখকদের প্রিয় কলমের গল্প

Reading Time: 7 minutes

যিনি লেখক ভাল কলমের প্রতি তাঁর আলাদা আকর্ষণ থাকা খুব স্বাভাবিক। পরিচিত নানা লেখকের তাই বিভিন্ন রকমের কলম-প্রীতি ছিল। আর এই টান ছিল মূলত ফাউন্টেন পেন বা ঝরণা কলমের প্রতি। কেউ একটি কলম দিয়ে একটি উপন্যাসই লিখতেন। আবার এমনও অনেকে ছিলেন যাঁদের কোনও বিশেষ কলমের প্রতি সে রকম কোনও আকর্ষণ ছিল না, যা পেতেন তাই দিয়েই লিখতেন।

পার্কার

কেউ কেউ লিখতেন টাইপ রাইটারে। কারও লেখার হাতিয়ার ছিল পেন্সিল। কারও কলমের প্রতি আকর্ষণ না থাকলেও দামি কাগজের প্রতি প্রবল অনুরাগ ছিল। কেউ পুরনো কাগজে লিখে তাতে সুগন্ধী মাখিয়ে দিতেন।

চলুন সেই বিচিত্র লেখার জগতে একবার ঢুঁ মেরে আসা যাক।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৪-১৯৫০)

সচরাচর ‘পাইলট’ কলম দোয়াতে ডুবিয়ে লিখতেন। সেটাই ছিল তাঁর প্রিয় কলম। ‘পথের পাঁচালি’ লেখা শুরু করেন ওভাবেই। তবে উপন্যাসটি শেষ করেন পরে কেনা এক ‘পার্কার’ কলমে। তাঁর ডায়েরি থেকে জানা যাচ্ছে, ‘পথের পাঁচালি’ শেষ করার পর তাঁর মনে হয়েছিল পরের দিকে ‘পার্কার’ কলম দিয়ে উপন্যাসটি লেখার জন্য ‘পাইলট’ কলমটি হয়ত কিছু মনে করেছে।

তখন তিনি তাঁর ডায়রির এই অংশটুকু লিখলেন সেই পুরনো ‘পাইলট’ কলমটি দিয়েই। আর সে লেখা শেষ করলেন এই ভাবে- ‘এই কথাগুলো লিখলুম আমার পুরনো কলমটা দিয়ে। যেটা দিয়ে বইখানা লেখার শুরু। শেষ দিকটাতে পার্কার ফাউন্টেন পেন কিনে নতুনের মোহে একে অনাদর করেছিলুম। ওর অভিমান আজ আর থাকতে দিলুম না।’ এই না হলে কলম-প্রীতি!

পাইলট

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৮-১৯৭১)

মোটা নিবের শক্ত ও দামী কলম ছিল পছন্দের প্রথম তালিকায়। কারণ চাপ দিয়ে লেখার অভ্যেস ছিল বলে নিব ভোঁতা হয়ে যেত। আঙুলে কড়াও পড়ত। তবে পছন্দের কলম ছিল ‘শেফার্স’। একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল তারাশঙ্করের। তিনি একটি কলম দিয়ে একটি মাত্র উপন্যাসই লিখতেন। তার পরে সে কলম আর ব্যবহার না করে যত্ন করে তুলে রাখতেন।

‘গণদেবতা’ লিখেছিলেন ‘পার্কার’ কলম দিয়ে। ভোরবেলায় স্নান করে নিয়ম করে লিখতে বসতেন তিনি। নিজের লেখার টেবিলে প্রথমে সাদা কাগজে নীল রঙের সুলেখা কালি দিয়ে খুব ছোট ছোট অক্ষরে এক হাজার বার মা কালীর নাম লিখে তার পরে অন্য লেখার কাজ শুরু করতেন।

শেফার্স

বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৪)

প্রিয় কলম ‘শেফার্স’। তবে তাঁর সংগ্রহে ছিল ‘পার্কার’, ‘ওয়াটারম্যান’ ও ‘মঁব্লঁ’-র মতো ডাকসাইটে কলমও। কালির রঙ হিসেবে তাঁর প্রথম পছন্দ ছিল কালো। শিবনারায়ণ রায় অনেক বিভ্রাট করে একবার অস্ট্রেলিয়া থেকে তাঁকে দু’বোতল কালো কালি এনে দিয়েছিলেন। সে কালি তিনি কৃপণের মতো খরচ করতেন।

ওয়াটারম্যান

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮-১৯৫৬)

টানাটানির সংসার ছিল তাঁর। লিখে আর কত টাকা পাওয়া যায়! তার ফলে কলম-বিলাস তাঁর ছিল না। একবার উপহার পান একটি ‘সোয়ান’ কলম এবং প্রেমে পড়ে যান সেই লেখনির। পরবর্তীকালে বিস্তর লেখালিখি করেছেন সেই কলম দিয়ে। লিখতে

সোয়ান

লিখতে এক সময় কলমের দফারফা। নিব, জিপ সব বেরিয়ে এসেছিল। সুতো দিয়ে বেঁধে সেই কলমেই লেখা চালাতেন তিনি। এমনই ভালবাসতেন সে কলমকে।

নীহারঞ্জন গুপ্ত (১৯১১-১৯৮৬)

‘শেফার্স’ কলম দিয়ে সাহিত্য জীবন শুরু করেন। প্রথমবার যখন রবীন্দ্রনাথের মুখোমুখি হন তখন তিনি কবিকে অনুরোধ করেছিলেন সেই কলমটি দিয়ে কিছু লিখে দিতে। কবি লিখে দেন- ‘তুমি অনেক বড় হবে।’ সে কলম আজীবন সঙ্গে ছিল তাঁর। প্রখ্যাত গোয়েন্দা ঔপন্যাসিক আগাথা ক্রিস্টির সঙ্গে একবার ইংল্যান্ডে দেখা করেছিলেন নীহারঞ্জন। লেখিকা তাঁকে একটি কলম উপহার দেন। সেই কলমও আজীবনের সঙ্গী ছিল তাঁর। সে কলম দিয়ে বহু উপন্যাস লেখা হয়েছে। আরও একটি কলমও তাঁর আজীবনের সঙ্গী ছিল। তাঁর লেখা ‘মায়ামৃগ’ অবলম্বনে হওয়া নাটক যেদিন ৫০০ রজনী পার করে, সেদিন তাঁকে সোনার নিব বসানো একটি কলম উপহার দেওয়া হয়। সেও ছিল তাঁর অতি প্রিয় কলম।

মঁ ব্লঁ

সত্যজিৎ রায় (১৯২১-১৯৯২)

সত্যজিৎ রায় ইংরেজি লেখার জন্য টাইপরাইটার ব্যবহার করতেন ঠিকই তবে বাংলায় একটি শব্দ লিখতে হলেও ঝরনা কলম হাতে তুলে নিতেন। তাঁকে কখনও ডট পেন ব্যবহার করতে দেখা যায়নি। তাঁর আর পছন্দ ছিল দামি সাদা ফুলস্কেপ কাগজ। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত রকমারি ফাউন্টেন পেনে টানা হাতে লিখে যেতেন তিনি। লাইনের ওপরে-নিচে

যথেষ্ট ফাঁক থাকত। অক্ষর হত বেশ বড়। প্রতিটি অধ্যায়ের শুরুর বর্ণটি (ড্রপ লেটার) লিখতেন অন্য কালিতে- নীল, বেগুনি, সবুজ, খয়েরি। প্রত্যেকটি আলাদা। পাণ্ডুলিপিতে কাটাকুটি প্রায় থাকতই না। ফাঁকে ফাঁকে পরিমার্জনা করতেন লাল কালিতে।

রমাপদ চৌধুরি (১৯২২-২০১৮)

প্রথম গল্প লেখেন জাপানি পাইলট কলম দিয়ে। ১০ বছর ধরে ওই কলম দিয়েই লিখেছেন। তার পর লিখতে শুরু করেন ‘শেফার্স’ দিয়ে। তখন থেকেই সেই কলমের প্রেমে পড়ে যান। একবার ট্রামে যাওয়ার সময় সে সাধের কলম পকেটমারি হয়ে গেলে তিনি এত কষ্ট পেয়েছিলেন যে ‘শেফার্স’ দিয়ে লেখা ছেড়ে

দেন। পরবর্তীকালে আমেরিকা থেকে তাঁর জামাই তাঁকে একটি ‘শেফার্স’ পেন এনে দেন। তিনিও তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতোই একটি কলম দিয়ে কখনও দুটো উপন্যাস লেখেননি। তাঁর মনে হত, একই কলমে লিখলে নতুন উপন্যাসে আগের উপন্যাসের প্রভাব চলে আসবে।

সমরেশ বসু (১৯২৪-১৯৮৮)

এক বন্ধুর কাছ থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া ‘শেফার্স’ কলমটির প্রতি তাঁর নিদারুণ মুগ্ধতা ছিল। ওই কলম থেকে বেরিয়ে এসেছে বহু উৎকৃষ্ট লেখা। তবে এর পাশাপাশি ‘পার্কার’ কলমও ছিল তাঁর পছন্দের। ফুলস্কেপ কাগজে চমৎকার হস্তাক্ষরে তিনি যখন পাতার পর লিখে যেতেন তখন তা ছিল দেখবার মতো। তাঁর লেখা প্রতি পাতার প্রায় ৪০টি লাইনে শব্দ সংখ্যা থাকতো আনুমানিক ৬০০-৬৫০। তবে তিনি বল পেনেও লিখতেন। ডান দিকে হেলে থাকা সারিবদ্ধ অক্ষরগুলোকে দেখে মনে হত যেন ধান বিছিয়ে রেখেছেন। কালো কালিতে লিখতেন, কখনও নীল কালিতেও। বেশ দামি কাগজে।

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় (১৯৩৫)

ডট পেন তাঁর দু’চক্ষের বিষ। স্কুল ফাইনাল পরীক্ষার সময় বাবা তাঁকে একটি ‘পার্কার জুনিয়র’ কলম কিনে দিয়েছিলেন। খুব যত্ন করে রেখেছিলেন সে কলম। পরবর্তীকালে সে কলম দিয়ে প্রচুর লেখা লেখেন। হঠাৎ একদিন হাত থেকে পড়ে সে কলমের নিব ভেঙে যায়। সারানোর পরও আগের ফ্লো আসেনি। কলমের খুব শখ থাকা সত্ত্বেও পয়সার অভাবে সেভাবে শখ মেটাতে পারেননি। তবে তাঁর সংগ্রহে মঁব্লঁ আছে। পছন্দের কালি ক্যামেলের কালো রঙা কালি। নীল রঙের কালি একেবারেই না-পসন্দ। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের লেখার কোনও কোনও অক্ষর এক এক জায়গায় এতই সরু যে, বুঝতে সময় লাগে বিশেষ করে সেই সব শব্দ, যারা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের নিজস্ব সম্পদ।

রবিশংকর (১৯২০-২০১২)

তিনি সঙ্গীতের লোক তাই নিয়ম করে লেখার দরকার পড়ত না। তবে যখন লিখতেন তখন কলম হত কখনও ‘কারঁ দাশ’, কখনও ‘পার্কার ফিফটি ওয়ান’ অথবা ‘পার্কার ডুয়োফোল্ড’। লেখালেখির সময় কখনও অন্য কেউ কলম বাড়িয়ে দিলে উনি মিষ্টি হেসে বুকপকেটে থেকে নিজের কলমই বার করে নিতেন।

পার্কার ডুয়োফোল্ড

কলম নিয়ে মাথা ঘামাতেন না যাঁরা

লেখক মাত্রেরই কলম নিয়ে অবসেশন ছিল এমন ভাবা ঠিক নয়। এমন কয়েকজন সাহিত্যিকের কথা জানাচ্ছি যাঁদের কলম নিয়ে কোনও মাথাব্যথা ছিল না।

আশাপূর্ণা দেবী

বিশেষ কোনও কলমের প্রতি আলাদা আকর্ষণ বোধ করতেন না করলেও তাঁর পছন্দের কালি ছিল ‘কুইঙ্ক’। যখন লিখতেন তখন বিছানা ছিল তাঁর প্রিয় স্থান। কারণ উপুড় হয়ে প্যাডে লিখতে ভালবাসতেন তিনি।

আশাপূর্ণা দেবী

প্রতিভা বসু

লেখা গেলেই হল। কলম নিয়ে তিনি মোটেও মাথা ঘামাতেন না। তাই হাতের কাছে যা পেতেন তাই দিয়েই একের পর এক লেখা লিখে যেতেন তিনি।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

পছন্দ করতেন দামি কাগজ, দামি কলম নয়। তাই ‘দেশ’ পত্রিকার দামি লেটারহেডে পাতার পর লিখে যেতেন এলেবেলে যে কোনও পেন দিয়ে। তাতে থাকতো ডট পেনও।

বইমেলায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

হুমায়ুন আহমেদ

হুমায়ুন আহমেদের কলম নিয়ে খুব বেশি আকর্ষণ ছিল না। তিনি লিখতেন অতি সাধারণ বল পয়েন্ট কলমে। যদিও প্রচুর দামি দামি কলম উপহার হিসেবে পেতেন।

দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন লেখকের পছন্দ ও অপছন্দ

লেখা নিয়ে নানা লেখকের নানা ধরনের পছন্দ-অপছন্দ ছিল। দেশ ও বিদেশের এরকম কিছু লেখকের কথা জানাচ্ছি।

দেশি

সন্তোষকুমার ঘোষ লিখতেন নিউজ প্রিন্ট দিয়ে তৈরি প্যাডে। খুব কমদামি, বাজে কাগজ বলেই হয়তো সন্তোষবাবু পাণ্ডুলিপির গায়ে আতর বা সেন্ট মাখিয়ে দিতেন। তবে নিন্দুকেরা বলাবলি করত ওটা মহিলা কম্পোজটিরদের প্রতি তাঁর সুগন্ধ-উপহার!

বিমল কর ও রমাপদ চৌধুরী লিখতে পছন্দ করতেন ল্যাব কপি বা প্র্যাকটিক্যাল খাতার কাগজে। মনে আছে তো, মসৃণ ও ঝকঝকে সে কাগজের এক দিক হত সাদা, অন্য দিক রুল টানা।

শঙ্খ ঘোষ লিখছেন

সমরেশ মজুমদার ঝড়ের বেগে লিখতেন। পাণ্ডুলিপি দেখলেই তা বোঝা যেত। তবে পড়তে অসুবিধে হত না।

মহিলা হলেও বাণী বসু বা সুচিত্রা ভট্টাচার্যের পাণ্ডুলিপি মেয়েলি ধরণের নয়।

শঙ্খ ঘোষের পাণ্ডুলিপি পরিশীলতার উদাহরণ। জয় গোস্বামীর লেখায় পরিমার্জনা হত প্রচুর। থাকত বিস্তর কাটাকুটি।

বিদেশী

আলেকজান্ডার দ্যুমা কল্পকাহিনী লিখতেন নীল কাগজে, কবিতা লিখতেন হলুদ কাগজে আর প্রবন্ধ লিখতেন গোলাপি কাগজে।

হ্যারি পটারের লেখিকা জে কে রাওলিংয় পুরনো আমলের কলম ও পুরনো হয়ে যাওয়া কাগজ ছাড়া লিখতেন না।

বিখ্যাত আমেরিকান লেখক জন স্টেইনবেক ছিলেন পেনসিলের মহাভক্ত। নতুন কিছু লেখা শুরু করার আগে সামনে গুনে গুনে ২৪টা ধারালো পেনসিল রাখতেন। একটা ভোঁতা হওয়া মাত্রই আরেকটা নিয়ে লিখতে শুরু করতেন।

লেখার টেবিলে টি এস ইলিয়ট

গোয়েন্দা শার্লক হোমসের লেখক আর্থার কোনান ডয়েল ১৯২১ সালে বানানো ‘পার্কার ডুয়োফোল্ড’ নামের একটি কলম দিয়ে।

ওয়েলসের জাতীয় কবি ডিলাস থমাসও ‘পার্কার’ ব্র্যান্ডের কলম ছাড়া লিখতেন না। তাঁর পছন্দের ছিল ‘পার্কার ৫২’।

রাশিয়ার বিখ্যাত লেখক ভ্লাদিমির নভোকভ লিখতেন ‘ব্ল্যাকউইং ৬০২’ মডেলের পেনসিল দিয়ে।

‘দ্য হাঞ্চব্যাক অব নোতরদাম’ লেখার আগে ভিক্টর হুগো নিজেকে গৃহবন্দি করে ফেলেছিলেন। দোকান থেকে এক বোতল কালি কিনে আনেন। এরপর মাসখানেকের খাবার জোগাড় করে জামাকাপড় সব একটা আলমারিতে তালা মেরে রাখেন, যাতে বাইরে যেতে মন না চায়। বইটা লেখা শেষ না করে ঘর ছেড়ে বের হননি তিনি।

ব্ল্যাকউইং ৬০২

টিএস ইলিয়ট কবিতা লিখতেন টাইপরাইটার মেশিনে। লাইন-স্পেস লিভার সরিয়ে সরিয়ে রেমিংটন টাইপরাইটারে কী করে আশ্চর্য সব পঙ‌্ক্তি পাতায় ফুটে উঠত তা ভেবে অবাক হতে হয়।

       

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>