| 15 এপ্রিল 2024
Categories
এই দিনে কবিতা সাহিত্য

সোনালী চক্রবর্তীর কবিতা

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

 

আজ ২৫ জানুয়ারী কবি, অনুবাদক ও সম্পাদক সোনালী চক্রবর্তীর শুভ জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,sonali,সোনালী চক্রবর্তী

 

 

আষাঢ়ে বুলি
 
অন্ধ
পালক খেললে ময়ূর তুমি,
কৃষ্ণ জানলে না।
 
 
কৃষ্ণা কীর্তন
সোনার অঙ্গে কাঁটা রুইছে আষাঢ় অতি ধীরে।
আর পালক খসছে নীলের ভিতর,
গৌরচাঁদের ছলে।
জিন টাঙানো কাচের গায়ে,
পেরেকে ছেঁড়া ঘুম,
জোহরের নিশি জানু পেতে রাখে, শিশির পোড়ায় চাঁদের আলজিভ।
কী আসে যায়?
বাঁশী আজ কৃষ্ণা ভিলায়।
তোমার শুধু যমুনা ছিলো,
চিরল ছায়া, তমাল কিছু,
ননী ছেঁচা মায়া, শিখী বা গাভি।
সামান্যে গলে যাওয়া সোহাগিনী কদম।
সাম্রাজ্য খুবই পানসে এমন।
যজ্ঞ লাগে, আর
লীলা বা লালা থেকে ঝরা
অগণিত দোহাই…
পঞ্চ ভূতের ধর্ষণ বিনে,
সহস্রবার বস্ত্র গেলেও কি মিনার জোটে রাই?
 
 
 
শোক প্রস্তাব
তোলপাড় বারিষ এলে চূড়া থেকে কৃষ্ণ ঝরে পড়ে, আর কিছুটা ভারী হয়ে ঘনাতে থাকে রাধা।
এখন ভোঁ কাট্টা সুতো অথবা জানে বৃক্ষ সকল, ডোবা ছায়াদের চর থেকে আলোর তামাম ডানা, কোকিল যেমত একা।
দালির ছবির নিচে সাবলীল সরগমে আধ পোড়া সে কাছিমে গাঁথা রুপোর সুইঁ। অশ্ব ও গজ নিখুঁত সাজালে তস্করেই পায় রাজসূয় আসন,
তুমি আজকেও জানলে না জিগর বাঈ?
কী হবে এত ভেবে নাজিল-এ-কুরান!
ভাঙা নথের শোক প্রস্তাব,
রবিশঙ্করও কি কখনো বাজান?
Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com
গাভী
আমি মেকী, সেকথা জেনেছি বহু আগে,
নীতিহীন শরীরে বাজারী সারল্যের মসলিন,
মেধার অন্তর্বাসকেই দৃশ্যমানতা দেয় বেশী,
সর্পজিহ্বায় নীল আগুন।
প্রশ্নাতীত প্রমানিত প্রতি দহনেই,
তবুও তো পূর্ণিমা আসে,
আর নদীখাতে,
ভরা অমাবস্যায় চন্দ্রোদয়..
মনে পড়ে,
কথা ছিলো…
এমনই রক্তপ্লাবিত জ্যোৎস্নায়,
তোমার জাগ্রত অঙ্কুরজাত অপত্য সন্দর্শনের,
“শ্রী” নাম হতো তার,
এমনই কথা ছিলো..
অভিমান বিদ্যুৎ বই তো কিছুই নয়
যার ধারকপাত্র অনাবিষ্কৃত,
খেয়াল হয়,
“মোষ” শুধুই একাডেমীতে পড়ার জন্য,
বছরের পর বছর মাথা গুঁজে,
মেঘ এসে যৌথতায় ঢেকে দিয়ে যাওয়ার প্রতীক্ষায়,
কেউ সমর্পিত হয়না..
শুধু পূর্ণিমারা আসে,
আর ভরা অমাবস্যায় চন্দ্রোদয়,
নদীখাতে…
Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com
রমজান
বড় বিষণ্ণ লাগে তার ইদানিং
কি অদ্ভুত এক আলো সেই মনখারাপের মেঘে ভিজে ভারি করে তোলে
কৃষ্ণনগর থেকে চট্টগ্রামের দিকচক্রবাল ,
প্রথম আষাঢ় নামে
আর কয়েক শো জন্মের অপেক্ষা নিয়ে মাগরিব-বেলায় সে শুধু ভিজতে থাকে।
প্রতি ক্ষণে অন্তর্জাল দৃশ্য নির্মাণ করে
সেখানে পঞ্চম বেদের সাত শর্ত পূরণ করা তার পুরুষ
গায়েবী কণ্ঠে হেসে লৌহে মাহফুজের ঠিকানা জানায়
আর সে পদ্মগন্ধের উৎস খুঁজতে খুঁজতে
সন্ধান পেয়ে যায় জন্মদাগ এক তিলের
যার চারপাশে আঙুল দিয়ে চক্র এঁকে দেওয়া যায়।
সেহরিতে যাওয়ার আগে
সিঁদুরের ঠিক নিচে সঙ্গোপনে আদর রেখে
শয্যা ত্যাগ করে তার সুফি
বোধিসত্বকে অন্তরে ধারণ করলেও
তার মায়া বন্ধনকে কোটি অভিবাদন জানায় তখন
সে আর তার পরাশক্তি ।
জাতিস্মরেরা অভিশপ্ত হয়
চোখের সামনে দিয়ে তারা অহরহ ভেসে যেতে দেখে
পাল তোলা বাণিজ্য তরী, কাঁটা তার হীন প্রদেশ
হয়তো তখন তার সামনে সূর্য সিদ্ধান্ত খোলা
আর বহু বহু দূরে তার নিয়তির পাশে ফজরের আজান ।
প্রথম দুই ইন্দ্রিয় বড় দিশাহারা বোধ করে এই অবস্থানিক বিচলনে
আর সেই মুহূর্তেই তার মনে পড়ে যায়
ভোর রাতের আদরে ঘুমিয়ে পড়ার আগে
আজ তার স্নান করা হয়নি।
Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

সিরিজ— পঞ্চমুখী
(পাঞ্চালি নয়, পঞ্চকন্যাও নয়)

মহামায়া

দেখো, এভাবেই ঠিক, হারিয়েই যাব একদিন, বেঁচে আছি, এই কম্পন পদ্ম কাঁটার মতো ধ্রুবকহীন। ভেসে ওঠে, আবার মিলায়। যেভাবে জল মেনে নেয়, যেকোনো পাত্রে তার সামান্য পরাজয়। পোড়ো বাড়ির আগাছায়, বছর পুরোয় ফিকে হতে নেশারু আবীর। শুধু কিছু ছিন্ন মঞ্জরী গাঁথা হয়, ব্যবধানে গোলাপির। উঠোন জুড়ে শুকনো পাতা ছড়িয়ে শীত ফিরে গেছে, যেন সারা দুপুর ধরে গয়নাবড়ি দিয়ে আর তুলতে আসেনি সন্ধ্যায় সিঁদুরে সিঁথি নিয়ে গঙ্গা যাত্রার ঠাকরুণ। হলদে পাখির পালক খুঁজতে গিয়ে অজানা মহাদেশ আবিষ্কার করে ফেলল শৈশব এক ভগ্ন চিলেকোঠায় কিন্তু কৈশোরে কোনো রূপকথা কাজলের টিপ পরিয়ে গেল না। মেঘেদের দেশে না কি অনন্ত বর্ষা, সংবাদ এল না সবিস্তারে।

আয়ুগ্রাসে বসন্ত পেরোয়…
তবু, সন্তান ফিরবে না জেনেও রোজ তুলসীতলায় ‘মা’ প্রদীপ জ্বালায়।

নিম অন্নপূর্ণা

অভাবী চান্দ্রমাস গৃহস্থালির উঠোনে
খেলতে দেখছে ঝরে পড়া নক্ষত্রকণা,
ভরা চরকায় ডাইনরূপ নিষাদ,
সংক্রান্তির অপেক্ষায় মৃত্যু খুঁটছে
সহস্র বালিহাঁস, নাগ দেবীর মোহিনী হাসি।
খরজমিনে ভুলের বশে এই বছর আউল বারিষ।
আঙিনায় নির্লজ্জ ময়ূরাক্ষীর শরীর।
তুমি উদাসীন ব্রহ্মের মতো কালপুরুষ পাহারায়।
তোমার জ্বলন্ত উনুনে চাপানো হাঁড়িতে জল ফুটছে,
পলাশের রক্তে ছেয়ে উঠছে পাথুরে ভাস্কর্য ক্রমেই,
করতল ঋজুতায় মেপে ধুয়ে নিচ্ছে
আমার অন্ত্যেষ্টির চাল,
এই জনমে, আমি তবে তোমার
নিম অন্নপূর্ণা-ই?

উপাস্য কলঙ্ক

নির্বাসিত উপান্তে কোন ঋষি ফেরে পরিত্যক্ত জপমালার সন্ধানে?
যে মৃগচর্ম আসনের অহং-এ তুচ্ছ করে সাকার উপাসনা, বিস্মৃতি সম্বল হয় তার তৃণে অবিশুদ্ধি সঙ্গমে।
শূন্যস্থান বলে কিছুর স্বীকৃতি নেই এই ব্রহ্মাণ্ডের আদি হতে অন্তে,
শুষ্ক কমণ্ডলু জানে।
মৃত্যু অধিক নিপুণ ও অব্যর্থ ব্যাধ অলভ্য জেনেও
গৃহজ সুখ পূর্ণগর্ভা হয়, শকুন্ত সাক্ষী লোকপুরাণে।

এইসব কঠিন তত্ত্বে মায়াপাশ বড়ো উদ্ভ্রান্ত ঠেকে,
প্রাক্তন আত্মাকে দেখি আন্তর্জালিক আলাপরত,
সরল হতে ইচ্ছে হয়, মুগ্ধ বালকের অনাবিলে,
রাঙামাটি টানে, বিজন প্রস্তর বেলাভূমি,
আমি তো শ্লীল সভ্যতা চাইনি কখনও,
এ আর্য রক্তের উত্তরাধিকার পরম বধ্যভূমি,
জেনেও আমি অতন্দ্র,
সতী হোক অরুন্ধতী,
আমি দক্ষিণ অর্ধে ঈশ্বর রেখে,
ত্রিলোক সিদ্ধ অর্চনার বরাভয়ে দাঁড়াই।
আমি হ্লাদিনী, বিশ্ব কুহকিনী,
তন্ত্রে ডাকিনী ওরফে কলঙ্কিনী রাই ।

দ্বিতীয় লিঙ্গ

নারীজন্ম নাড়িছিন্ন ইস্তক চেনে যুদ্ধসাজ,
জানে অরণ্যে ঋষির কাম,
জলে কামটের রক্তঘ্রাণ,
পর্বতে ব্যাঘ্রের নখ,
আর ভূমে…
প্রতি ক্ষণের কস্তুরী শোক।

‘ধরিত্রী দ্বিধা হও’— পুরুষ বলে না কোনোদিন,
রক্তদাগ ধুয়ে এসে নবান্ন প্রসব করে যে গর্ভ,
তার অভিধানে শেষ আর শুরুর রেহাই লেখে না ভগবান ও তার সৃষ্টির ধর্ম।

তবুও শ্রান্তি আসে হে শ্রমণ,
কোথাও তো নীলচে ঘন অভিমান অশ্রু হতে নামতে চায় গহীন প্রস্তর সীমায়।
কেন যে ভ্রম আজও নিষ্কৃতি মৃত্যুর অধিকার পেল না,
অলীক রয়ে গেল মাথুর বিক্ষেপ।

নারী চিরদিন নটী…
সতী শিরোপা অর্জনে,
বেহুলাকে ছিঁড়তে হয় স্তনাংশ,
কৃষ্ণাকে বইতে হয় পঞ্চপ্রবলের সমানাধিকার।

ভালোবেসে কি আর অতিক্রম করা যায় চাকার দাগ?

সভ্যতা মানে…
মাটি উর্বর হোক বা নিষ্ফলা,
লাঙলের উপর ন্যাস্ত বীজের সম্ভোগ বিচার।

সোনালু

হরিণী এক আশ্চর্য অমলতাস,
‘ব্যথা’ এক ক্লিশে কাব্যিক শব্দ,
কারোর ঘনত্বের যথার্থ প্রতিনাম কেউ নয়।
পর্যাপ্ত অন্ধকার জমা হতে হতে
অধিগত হয় মায়ার এনাক্ষী সার্থকতা,
কায়া থেকে অগ্নিভ সঞ্চার উৎসারিত হলে
দীর্ঘশ্বাসে আবৃত হয় নাভিমূলের বেদান্ত ঘ্রাণ।
সহ্যাদ্রি দৃশ্য পেরিয়ে কোঙ্কনী চরে
লবণের মাদকতারা উপকূল বিস্ময়।
অথচ, প্রেম শুধুই মীরার পরিহাস।
নির্বাচন কি শুধু রাষ্ট্রসম্ভব ট্র্যাপিজ?
সে তো অস্তিত্ববাদের প্রতিটি ক্ষণ।
মাঘীপূর্ণিমায় ইকোর অলীক নিক্কন দৃশ্য
ঝলসে মুছে দেয় খরবাস্তবের ম্যাজেণ্টা সূর্যোদয়।

শিকড় শিমূল তুলো হলে,
মানুষের ডাকনাম পাখি।
অধিকারের মুঠি আলগা হলে,
কিছু প্রজাপতি, বরফচাপা মাছ।
আর আত্মাবিহীন সঙ্গম,
শকুনবান্ধব শ্মশান।

জড়বাদ গ্রাসের আগে হে চৈতন্য, আমি,
ওংকার পঞ্চমীতে কৈবল্যের প্রার্থনা রাখি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত