| 20 এপ্রিল 2024
Categories
সময়ের ডায়েরি

শ্রীরামচন্দ্রের সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

বাল্মীকি রচিত ‘রামায়ণ’ ও তার প্রধান চরিত্র রামচন্দ্র খুবই সৌভাগ্যবান । রামায়ণের জনপ্রিয়তার তুলনা নেই কোন। গিলগামেস, ভার্জিলের আইনেইদ, দান্তের লা দিভিনা কম্মেদিয়া, বৈয়ার্দোর অর্লান্দো ইন্নামোরাতো, লুডভিকো আরিওস্তোর অর্লান্দো ফুরিওসো, তাসসোর জেরুসালেম্মে লিবেরাতা, এরসিলার লা আরাউকানা, লুই দ্য কামোয়েসের ওস লুসিয়াডাস, জন মিল্টনের প্যারাডাইস লস্ট, ফেরদৌসীর শাহনামার জনপ্রিয়তার সঙ্গে তুলনা করলে রামায়ণের জনপ্রিয়তার ব্যাপ্তি বোঝা যাবে।

রবীন্দ্রনাথ রামায়ণকে পারিবারজীবনের কাব্য বলেছেন। সেটা জনপ্রিয়তার একটা কারণ হতে পারে। আর একটা কারণ হতে পারে এ কাব্যের করুণ রসের প্রস্রবণ। নায়ক চরিত্রটির জন্যও রামায়ণের জনপ্রিয়তা। রাম সুদর্শন, ভদ্র ও মার্জিত। কৃষ্ণের মতো চাতুর্য বা শাণিত বুদ্ধির দীপ্তিতে তিনি উদ্ভাসিত নন। দুর্যোধন প্রভৃতির মতো যুদ্ধবাজ নন। তিনি সরল, স্নিগ্ধ, বাধ্য, অনুগত ও দয়াশীল। তাছাড়া ত্যাগব্রতী। মাত্র একবার ক্রোধের প্রকাশ দেখি তাঁর মধ্যে, সমুদ্রে সেতু বন্ধনের সময়।

বাল্মীকির রামায়ণ ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বময়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াসহ পৃথিবীর নানাদেশে নানা রামায়ণের সন্ধান পাওয়া যায়। সেজন্য ঐতিহাসিক এ কে রামানুজম বলেছিলেন ‘যত রাম তত রামায়ণ’। মহাভারতে রামায়ণের উল্লেখ আছে। বিষ্ণুপুরাণ, ভাগবতপুরাণ, পদ্মপুরাণ, স্কন্দপুরাণ প্রভৃতি পুরাণে রামায়ণের উল্লেখ আছে। ব্রাহ্মণ্যধর্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠার যুগে রামায়ণের ৩৭৫০০ টীকাগ্রন্থ রচিত হয়। তার মধ্যে ঐশ্বরদীক্ষিত টীকা, উমা-মহেশ্বর টীকা, গোবিন্দরাজ তিলক টীকা, চতুরর্থ টীকা প্রভৃতি মাত্র ২৮টি টিকা গ্রন্থ টিকে আছে কালের প্রহার সহ্য করে। পৃথিবীর নানা দেশে যে সব রামায়ণের সন্ধান পাওয়া যায় সেগুলি হুবহু বাল্মীকির রামায়ণের অনুবাদ নয়। বাল্মীকি যখন রামায়ণ রচনা করেন তখন লিপিবিদ্যা প্রচলিত হয় নি। লোকমুখে ছড়িয়ে ছিল রামায়ণ। এক বা একাধিক সংগ্রহকারক লোকমুখে ছড়িয়ে থাকা শ্লোকগুলি সংগ্রহ করেন। সেসব করতে গিয়ে পাদপুরণ হিসেবে তাঁর নিজের রচনাও অনুপ্রবিষ্ট হয়। আবার প্রাদেশিক ভাষায় যখন রামায়ণ রচিত হতে লাগল তখন সেখানকার রুচি ও প্রবণতা অনুযায়ী তার রূপ বদলে গেল। ভারতের বাইরেও এই রূপান্তর প্রক্রিয়া ঘটেছে। দু-একটা মজার রূপান্তর উল্লেখ করা যেতে পারে। থাইল্যাণ্ডের রামায়ণে সীতা রাবণের কন্যা ; মালেশিয়ার রামায়ণে দশরথ আদমের প্রপৌত্র। মঙ্গোলিয়ার রামায়ণে রামের পিতা দশরথ নন,জীবক।

মহাকাব্যের সুভদ্র নায়ক হিসেবে রামচন্দ্র আদৃত ছিলেন জনমানসে। পঞ্চদশ শতাব্দীতে রূপান্তর ঘটল তাঁর। ভক্তি আন্দোলনের স্রোতে। রামচন্দ্র হলেন হিন্দুর ভক্তির আধার । এই রূপান্তর ঘটালেন প্রতিভাবান কবি তুলসীদাস। তাঁর সুবিখ্যাত ‘রামচরিতমানসে’ রাম হলেন ভগবান বিষ্ণুর অবতার। উত্তর ভারতের শৈব প্রাধান্যের স্থানে গড়ে উঠতে লাগল ‘রামভক্তিবাদ’। আমাদের কৃত্তিবাসও প্রবাহিত করলেন অবতারতত্ত্ব ও ভক্তিরসের প্রবাহ।

রামের জীবনে দুর্ভাগ্যের সূচনা হল ১৯৪৯ সালের ২২ নভেম্বর। তিনি প্রবেশ করলেন হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির আবর্তে । ওই দিন গভীর রাতে আটটি ধাতুতে তৈরি রামলালার ৭ ইঞ্চি মূর্তি স্থাপন করা হল বাবরি মসজিদের ভেতরে। ছড়িয়ে দেওয়া হল এই কথা যে এখানেই রামচন্দ্র জন্মগ্রহণ করেছেন। এই ধারনা ধীর বিলম্বিতলয়ে ‘বিশ্বাসে’ পরিণত হল। এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর যে দৃঢ়তা প্রত্যাশিত ছিল, তা জওহরলাল দেখাতে পারেন নি। হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে শুরু হল আইনি যুদ্ধ। রামচন্দ্র রাজনীতির মতো আদালতের অঙ্গনেও প্রবেশ করলেন। এতে নতুন মাত্রা যোগ করলেন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী। প্রধান ফটকের তালা খুলে দেওয়া হল। রামভক্তরা প্রবেশ ও পূজার অধিকার পেলেন। আর রাজীবের আগ্রহে দূরদর্শনে শুরু হল রামায়ণ সিরিয়াল। এই সিরিয়ালের প্রভাব নিয়ে অসাধারণ গবেষণা করেছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিন্দিতা বসু। সিরিয়ালের সূত্র ধরে প্রায় সমগ্র ভারতে প্রসারিত হল রামভক্তিবাদ, রাম হয়ে উঠলেন ‘হিন্দু’ জাতির নেতা ও নায়ক। ইতিহাসের অচেতন হাতিয়ার হয়ে বি জে পির উথ্থানের পথ প্রস্তুত করে দিলেন রাজীব গান্ধী। পথ প্রস্তুত হল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার। রামজন্মভূমির দাবি ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হতে লাগল মানুষের মনে। তারপর ১৯৯০ সালে আদবানির রথযাত্রা, ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংস। রামকে সামনে রেখে উন্মাদনা, যুদ্ধং দেহি মনোভাব, হিন্দুত্ব প্রতিষ্ঠার প্রয়াস। কিন্তু এসব কিছুর মূলে রাজনৈতিক ক্ষমতালাভের প্রয়াস, ভোটব্যাঙ্ক তৈরির প্রচেষ্টা।

সুদীর্ঘকালের মন্দির-মসজিদ মামলার অবসান হল ৯ নভেম্বর, ২০১৯, সুপ্রিম কোর্টের রায়। সে রায়ে ২.৭৭ একর জমি থাকবে রামের, মুসলমানরা সান্ত্বনা পুরস্কার পাবেন ৫ একর জমি, সেখানে তাঁরা আর একটা মসজিদ তৈরি করে নিতে পারবেন। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমে এই রায়ের বিভিন্ন দিকের আলোচনা শুনে আমার মনে হতে লাগল ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে হয়তো। সকলে জানেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফলাফলের মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীজ বপন করা হয়েছিল। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের মথ্যে পরবর্তী সংঘর্ষের সেই রকম কোন বীজ চেতন বা অচেতনভাবে বপন করা হয়ে গেল না তো! পুরাতাত্ত্বিক খননের অসম্পূর্ণতা ও অস্পষ্টতাকে গ্রাহ্য করা, একদলের ‘বিশ্বাস’কে গ্রাহ্য করা সেই বীজ নয়তো! সুপ্রিম কোর্টের এই রায়কে কারোর আত্মপ্রতিষ্ঠার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি করা হল নাতো! যাতে যুগপৎ বাইরের শত্রু ও ঘরের শত্রু দমনের পথটা মসৃণ হয়!

বিতর্কের কেন্দ্র হল ২.৭৭ একর জমি। মাননীয় সর্বোচ্চ আদালত এই বিতর্কিত জমি নিয়ে অন্য একটা ভাবনা করতে পারতেন। বলতে পারতেন এই জমি রাম বা রহিম কারোর নয়, এই জমিতে একটা হাসপাতাল হবে, যেখানে হিন্দু মুসলমান সকলেরই প্রবেশাধিকার থাকবে। মরা মানুষের মতো রোগীর তো কোন জাত নেই। আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলির কাছে এমন চিন্তা আশা করা বাস্তব নয়। কারণ ভোটব্যাঙ্কের মোহিনী আড়াল উপেক্ষা করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই রামচন্দ্রকেও এই দুর্ভাগ্যের বোঝা বয়ে বেড়াতে হবে আজীবন।

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত