কথোপকথন

সকাল হওয়ার আগের এই সময় বড় চমৎকার।রোদের ঝাঁজ নেই। নদীর ধারের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে থমকে দাঁড়ান বিকাশ। দেবদারু গাছের তলায় কে দাঁড়িয়ে? মনিময় না? হ্যাঁ মনিময়ই তো।হতেই হবে। কোন ছেলেবেলার বন্ধু। বয়স হলে কী হবে, ছাঁচ তো একই আছে। চিনতে ভুল হয়না।মনিময় হাতে বাজারের ব্যাগ নিয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। ওর তো আবার দেখার সমস্যা আছে।হয়ত রাস্তা পেরোনোর আন্দাজ পাচ্ছেনা। অসুবিধের কারণ নেই। তিনিওতো সামনে না দাঁড়ালে কোনকথাই ভালো বুঝতে পারেন না। কানের মেশিনটা একদম অচল হয়ে গিয়েছে। অনেক টাকার ধাক্কা। ছোটনকে বলতে হবে। লজ্জাও করে। বুড়োবয়সে সব ব্যাপারে ছেলের কাছে হাত পাতা। এগিয়ে যান বিকাশ।মনিময়কে ধরতে হবে।

এই মনিময়, মনিময়, কেমন আছ? বাব্বা কতদিন পরে দেখা।

কে সুভাষ?মনিময় ঘুরে দাঁড়ান।ভালো আছো তো? এই দ্যাখোনা বউমা বললেন বেগুন নিয়ে যেতে।এখান থেকেই বাজারে যাব। চোখে তো ভালো দেখি না। যদি পোকা ধরা বেগুন গছিয়ে দেয়, তাই ভাবছি…। এ রাস্তায় ভাগ্যিস এলাম। তবু তোমার সঙ্গে দেখা হল। সেই অনিলের ছেলের বিয়েতে দেখা হয়েছিল। তারপর…। কেমন আছ?

বিকাশ একটু ধাঁধায় পড়েন। আজকাল ঠোঁট নাড়া দেখে সবকথা ঠিকঠাক বোঝা যাচ্ছে না। মনিময় তাকে চিনতে পেরেছে তো?ছোটনের সম্বন্ধে জানতে চাইছে বোধহয়। নিশ্চয়ই তাই। সবাই তো ওর কথাই জানতে চায়। কিন্তু সবকিছু বলা কী ঠিক হবে?

হ্যাঁ হ্যাঁ ছোটন ভালোই আছে। এখান থেকে যাতায়াতে বুঝলে না বড় অসুবিধে, তাই বউমাকে নিয়ে…। জানো, ওদের কোয়ার্টারটা ভারি ভালো।গাড়িও পেয়েছে জানো। আমাকে নিয়ে যাবে বলেছে। একবার দেখে আসব। আমার ওখানে থাকা তো কোনভাবেই সম্ভব নয়। আমিই আপত্তি করেছি। আরে আমি ওল্ড ফেলো। ওদের পার্টি ফার্টি দিতে হয়। বুঝলে কিনা…।   

যাক মোটামুটি গুছিয়ে বলা গিয়েছে। নিজের ছেলের সম্বন্ধে এর থেকে বেশি কী-ই বা বলা যায়।লজ্জাও ও তো করে। কিন্তু ও ছোটনের কথাই জিজ্ঞেস করছিল তো? হাত দিয়ে কানের মেশিনটা নেড়েচেড়ে একটু ঠিকঠাক করে নেন। একগাল হেসে বলেন, তা তুমি কেন?ছেলে বাজারে যায়না?

মনিময় হাসেন এবার। অপ্রস্তুতের হাসি। না না ছেলেও বাজার করে বৈকি। চোখের চশমাটা খুলে ফুঁ দিয়ে পরিষ্কার করেন। গলাটা ঝেড়ে নিয়ে আবার বলেন, অফিস থেকে ফেরার পথে এই ফলপাকুড়, এটা ওটা, নাতির মিষ্টি, নিয়ে আসে তো। বউমাও তো অফিস যান। বাড়িতে আমি আর বুড়ি। তা তোমাদের বউদি নাতিকে স্কুলে দিয়ে আসা নিয়ে আসাটা করেন। আমি এই বাজার দোকানটা। এসব নিয়েই তো আছি। চোখটাই যা গোলমাল করছে। নাহলে এমন কী আর! তা বড়খোকা বলেছে এদিকে তো কিছু হল না, একবার নেত্রালয়ে নিয়ে যাবে। সেই সাউথে। সে নাকি বিশাল ব্যাপার! এখন তো আর আমাদের দিনকাল নেই। কেউ এখানে দেখায় না। চোখ বলো, নাক বলো, সব ছুটছে সাউথে। তা অনেক দিনের ব্যাপার। ছুটি টুটি না পেলে…। বছরে একটা ছুটি। নাতিকে নিয়ে একটু বেরিয়ে না এলে…।তাই আর হয়ে উঠছে না। ওরাও তো মানুষ। রোজ -রোজ অফিস কাছারি। ছুটিতে একটু না বেড়ালে কবে আর যাবে বলো?

বিকাশ এখনও কিছুই শুনতে পাচ্ছেন না। তবু বলেন, আচ্ছা বউদি কেমন আছেন? সেই বাতের ব্যথাটা…। অনেকদিন দেখিনি। সুরমা থাকাকালীন তবু এক আধবার যাওয়া-টাওয়া হত। এখন আর…।তা কী বলব তোমায়, ছোটন সব ব্যবস্থা করে দিয়েছে। সামনের দোকান থেকে চা দিয়ে যায়। দুপুর-রাতের ভাত রুটিও হোটেল থেকেই আসে।আমায় কিছুই মাথা ঘামাতে হয়না। আরে ইঞ্জিনিয়ারের ব্রেন। এতো আর আমাদের মত কেরানীর মাথা নয়। হেঁ হেঁ!

মনিময় এখনও চশমা পুঁছেই চলেছেন। মনিময়ের এই হয়েছে মুস্কিল। আজকাল দীর্ঘকাল ধরে চশমা মোছেন। ভাবেন কাঁচ পরিষ্কার হবে। হয় না। এবারও তাই হল। মোছা চশমা চোখে দেওয়ার পরও সামনে দাঁড়ানো বন্ধুর মুখ স্পষ্ট হল না। আবছা ঘোলাটে।মুখটা দেখতে পাচ্ছেন না কিছুতেই। পাওয়ারটা একদম ঠিক নেই। চশমাটা দেখাব দেখাব করে খোকা নিয়েই গেল না। রাস্তাই ঠিকমতো বোঝা যাচ্ছে না তো মানুষের মুখ। ও নির্ঘাৎ সুভাষ।সুভাষের মতই গলা।

মনিময় বিকাশের দিকে তাকিয়ে সুভাষ ভেবে মাথা নাড়েন।না না অসুবিধে কিছু নেই।ছেলেবউ দুজনেরই অফিস।নাতি আমাদের কাছেই থাকে।এমন সেয়ানা, বাবা মা বেড়াতে গেলেও সঙ্গে যেতে চায়না। আমাদের তো জানো। প্রাইভেট আপিসের চাকরি। পেনশানের বালাই ছিল না। রিটায়ারমেন্টের পর ওই কটা টাকার সুদে কী হয় বলো? তাও তো সরকার কমিয়ে দিল। তবে তেমন কিছু আর প্রয়োজনই বা কী? ওই নাতিটা একটু আধটু বায়না করে। তা চলে যাচ্ছে। আর কটা দিন। চলেও যাবে ।তাই না?

বিকাশ এবার এগোবেন। হেসে বিদায় নেন। আচ্ছা আজ আসি। ঠিকঠাকই আছি বুঝলে। তবে সুরমাটা থাকলে..। ছোটনও তো আজকাল সময় –টময় পায়না। মাসকাবারে সবসময় নিজে আসতে না পারলে টাকাটা ঠিক কাউকে না কাউকে দিয়ে পাঠিয়ে দেয় জানো। ও ব্যাপারে কিছুই বলতে হয়না।

মনেমনে ফিস্‌ফিস্‌ করেন বিকাশ, ছোটনের সম্বন্ধে অনেক কথাই বলা হয়ে গেল। তা চাল মারছি ভাবো আর যাই ভাবো, একথা তো মানতেই হবে আমার সঙ্গে যাই করুক, পড়াশোনা কেরিয়ার, ছোটনের মত আর কারো হবেনা। বরাবর ফার্স্ট। অল এ্যালঙ এক দাঁড়ি। তোমাদের মত ছেলে বউ দুজনকেই অফিসে ছুটতে হয়না। আরে একজনের পয়সাই কে খায় তার ঠিক নেই। মনিময়ের দিকে তাকিয়ে হাসেন আর একবার। আচ্ছা চলি তবে?

মনিময়ের মুখ সুভাষকে ঠিকমত বুঝতে না পারার কারণে বিষণ্ণ হয়ে যায়। ও, তুমি চলে যাচ্ছো? আচ্ছা বাড়িতে একদিন এসো। বাজারটা ঘুরে আমিও ফিরব। এমনই কপাল, ভালো করে তোমার মুখটাই দেখতে পাচ্ছি না। চারপাশে আলো। মধ্যিখানটাই আবছা। মানে তুমি যে পাজামা -পাঞ্জাবী পরেছ ধরতে পারছি। কিন্তু মুখটা…! বুঝলে সুভাষ আজই গিয়ে গিন্নিকে তোমার কথা বলব। পারলে একদিন…। আচ্ছা। আর কিছু অসুবিধে নেই।একটাই সমস্যা। চোখটায় ঠিকমত দেখা যাচ্ছে না।সাইডে তবু আলো আছে। এবার মাঝখানটাও যদি…। আচ্ছা এসো। পরে আবার দেখা হবে।

বিকাশও অন্যদিকে এগোতে এগোতে বিমর্ষ হয়ে যান। এতদিন বাদে দেখা হলো। মনিময়ের কথাগুলো ঠিকমত শুনতে পাওয়া গেলনা। এত লোক এত কথা বলে, কোনটাই ঠিকমত ধরতে পারা যায়না।

যাকগে আমার তো তবু কান। মনিময়ের তো চোখটাই…। বেচারি প্রায় কিছুই দেখতে পায়না।কীভাবে হাঁটছিল…। এখন আবার বাজারে যাবে।যাকগে, ওর থেকে আমি অনেক ভালো আছি।তাছাড়া অনেকদিন তো ঠিকঠাক দেখাশোনা হল।আর তো হাতেগোনা কয়েকটা দিন। পুরনো মেশিনটাকেই নেড়েচেড়ে যদি…।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত