সিংহ মানব

।। নির্ঝর রুথ ঘোষ।।

Lion-man নামটা পরিচিত লাগছে কি? না লাগলেও সমস্যা নেই। এটি সেই প্রাগৈতিহাসিক আমলের একটি ভাস্কর্য। ভাববেন না, আমি দুষ্টামি করে প্রাগৈতিহাসিক বলছি। এটি আসলেই আজ থেকে পঁয়ত্রিশ বা চল্লিশ হাজার বছর আগে তৈরি করা জিনিস! ঐ আমলকে ইংরেজিতে “prehistoric” এবং বাংলায় “প্রাগৈতিহাসিক” বলে। এই আমলে মানুষ লিখতে শিখেনি। আর লিখিত ইতিহাসের পূর্ববর্তী সময়ের ইতিহাসকে আমরা প্রাগৈতিহাসিক বলি। যবে থেকে লেখালেখির প্রচলন ঘটে, তবে থেকে প্রাগৈতিহাসিক যুগেরও সমাপ্তি ঘটে।

লেখালেখি শিখেনি তো কী হয়েছে? শিকার করা, খাওয়া, প্রজনন থেকে শুরু করে ভাস্কর্য কুঁদা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো প্রাগৈতিহাসিক মানুষের কাজকর্ম। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯৩৯ সালে, জার্মানির হলেন্সটাইন স্টাডেল নামক গুহায়। এখানে ম্যামথের (বিকটাকার লোমযুক্ত হাতি, বর্তমানে বিলুপ্ত) দাঁতের বেশ কিছু টুকরো আবিষ্কার করেন ভূতত্ত্ববিদ অটো ভলযিং। কিন্তু এই আবিষ্কারের মাত্র এক সপ্তাহ পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ লেগে যাওয়ায় গুহার খনন কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। কথা হলো, যুদ্ধের পর প্রায় ত্রিশ বছর ধরে কারো মনেই ছিলো না এই টুকরোগুলোর কথা। এগুলো জার্মানির উল্‌ম্‌ যাদুঘরে পড়ে ছিলো।

প্রত্নতাত্ত্বিক জোয়াকিম হান একদিন সব টুকরো গণনা করে দেখেন, সেখানে দুইশোরও বেশি টুকরো আছে। সেগুলো জোড়া দিয়ে দিয়ে তিনি যাচাই করতে শুরু করেন, সবগুলো টুকরো কি আসলে একটা জিনিসেরই অংশ কিনা। আর তখনই ঘটে এক আশ্চর্য ঘটনা। ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকে একটা ভাস্কর্যের অবয়ব, যার কিছুটা দেখতে মানুষের মত, কিছুটা পশুর মত। কিন্তু কোন পশু, এটা বুঝা যাচ্ছিলো না। এই খবর পেয়ে আবারও খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হয় গুহাটিতে। প্রায় নয় বছর খননের পর ১৯৭০ সালে গুহার মেঝেতে আবিষ্কৃত হয় ম্যামথের দাঁতের আরও কিছু টুকরো। ১৯৮২ সালে জীবাশ্মবিদ এলিজাবেথ শ্মিড সেই টুকরোগুলো যোগ করেন জোয়াকিমের জোড়া লাগানো মূর্তির সাথে। তিনি জোয়াকিমের কিছু ভুল সংশোধন করেন এবং মূর্তির দুটো প্রধান অংশ – নাক আর মুখ যোগ করেন। তখনই স্পষ্ট হয়ে উঠে, মূর্তিটি মানুষের শরীরের সাথে বিড়াল জাতীয় (feline) কোনো পশুর সংমিশ্রণ।

তবে এতকিছুর পরও মূর্তির দেহের মাত্র দুই-তৃতীয়াংশ পুনর্গঠন করা সম্ভব হলো। তখনও পর্যন্ত অনেক ছোট ছোট অংশ খুঁজে পাওয়া যায়নি। সেসব জায়গা ভরাট করা হলো মৌচাকের মোম, কৃত্রিম মোম এবং চক দিয়ে। ২০০৮ সালে আবারও গুহায় খনন কাজ শুরু হলো। তখন আরও অনেক টুকরো পাওয়া গেলো। সেসব টুকরো যোগ করে ২০১৩ সালে গঠন করা হলো “সিংহ মানব”-এর চূড়ান্ত রূপ। এই রূপটি ১২.২ ইঞ্চি লম্বা, ২.২ ইঞ্চি প্রশস্ত এবং ২.৩ ইঞ্চি পুরু। গবেষকরা বের করেছেন, এই ভাস্কর্য তৈরি করা হয়েছিলো চকমকি পাথরের তৈরি ছুরি দিয়ে। তৈরি করেছিলো অরিগ্নেশিয়ান সংস্কৃতির (Aurignacian culture) মানুষেরা। এই সংস্কৃতি বিকাশ লাভ করেছিলো প্রস্তর যুগের শেষ ধাপে এসে। এ আমলে মানুষের আচরণের মধ্যে আধুনিকতা ফুটে উঠতে শুরু করেছিলো।

কিন্তু কেন এই সিংহ মানব এত বিখ্যাত? কারণ এটিই এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে প্রাচীন পশু আকৃতির ভাস্কর্য। আবার কাল্পনিক প্রাণীর মূর্তি হিসেবেও এটিই সবচেয়ে প্রাচীন (এখন অব্দি)।

দেহ মানুষের, মাথা সিংহের… আমাদের পূর্বসূরিদের কল্পনা… ভাবতেই কেমন শিহরণ জাগে, না? চল্লিশ হাজার বছর আগে, জার্মানির কোনও এক গুহায় বসে, কোনো এক প্রাগৈতিহাসিক মানব বা মানবী তার মস্তিষ্কে ঘুরে বেড়ানো কল্পনাকে ফুটিয়ে তুলছে হাতির দাঁতের উপর। কে জানে, কীভাবে সিংহ মানবের প্রতিকৃতিটি তার মস্তিষ্কে ঠাঁই করে নিয়েছিলো!

তবে এই “অর্ধ মানব অর্ধ পশু” যে অরিগ্নেশিয়ান সমাজে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেছিলো, তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। গুহার যে জায়গায় সিংহ মানবকে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিলো, সেটা একটা কক্ষের মত। কক্ষটিতে এই মূর্তির সাথে হাড়ের তৈরি যন্ত্রপাতি, গলার হার, পুঁতি ইত্যাদিও পাওয়া গেছে। ধারণা করা হয়, কক্ষটি হয়তো ভাণ্ডার বা লুকানোর জায়গা বা ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের জায়গা ছিলো। আবার এই মূর্তির চেয়ে ছোট আকৃতির আরেকটা সিংহ মানব পাওয়া গেছে কাছাকাছি আরেকটা গুহায় (Vogelherd Cave)। এই মূর্তির চারপাশেও পশু আকৃতির অন্যান্য মূর্তি এবং বেশ কিছু বাঁশি পাওয়া গিয়েছিলো। গবেষকরা অনুমান করছেন, প্রস্তর যুগের শেষ ধাপে মানুষের যে সমাজ ছিলো, সেখানে এই কাল্পনিক প্রাণীর গল্প প্রচলিত ছিলো এবং প্রাণীটি ঐ সমাজে বেশ গুরুত্বপূর্ণ স্থানই দখল করে ছিলো।

.

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত