Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

মায়ের জন্য কবিতা

Reading Time: 8 minutes

কবি-লেখকদের কলম থেকে মায়ের স্তুতি রচিত হয়েছে যুগে যুগে। আজ মা দিবসে ইরাবতীর প্রিয় পাঠকদের জন্য থাকছে মাকে কেন্দ্র করে লেখা কিছু কবিতা।


 

‘মা’

-কাজী নজরুল ইসলাম

যেখানেতে দেখি যাহা

মা-এর মতন আহা

একটি কথায় এত সুধা মেশা নাই,

মায়ের মতন এত

আদর সোহাগ সে তো

আর কোনখানে কেহ পাইবে ভাই!

হেরিলে মায়ের মুখ

দূরে যায় সব দুখ,

মায়ের কোলেতে শুয়ে জুড়ায় পরান,

মায়ের শীতল কোলে

সকল যাতনা ভোলে

কত না সোহাগে মাতা বুকটি ভরান।

কত করি উৎপাত

আবদার দিন রাত,

সব স’ন হাসি মুখে, ওরে সে যে মা!

আমাদের মুখ চেয়ে

নিজে র’ন নাহি খেয়ে,

শত দোষী তবু মা তো তাজে না।

ছিনু খোকা এতটুকু,

একটুতে ছোট বুক

যখন ভাঙিয়া যেতো, মা-ই সে তখন

বুকে করে নিশিদিন

আরাম-বিরাম-হীন

দোলা দেয় শুধাতেন, ‘কি হোলো খোকন?’

আহা সে কতই রাতি

শিয়রে জ্বালায়ে বাতি

একটু আসুখ হলে জাগেন মাতা,

সব-কিছু ভুলে গিয়ে

কেবল আমায়ের নিয়ে

কত আকুলতা যেন জাগন্মাতা।

যখন জন্ম নিনু

কত আসহায় ছিনু,

কাঁদা ছাড়া নাহি জানিতাম কোন কিছু,

ওঠা বসা দূরে থাক-

মুখে নাহি ছিল বাক,

চাহনি ফিরিত শুধু আর পিছু পিছু।

তখন সে মা আমার

চুমু খেয়ে বারবার

চাপিতেন বুকে, শুধু একটি চাওয়ায়

বুঝিয়া নিতেন যত

আমার কি ব্যথা হোতো,

বল কে ওমন স্নেহে বুকটি ছাওয়ায়।

তারপর কত দুখে

আমারে ধরিয়া বুকে

করিয়া তুলেছে মাতা দেখো কত বড়,

কত না সে সুন্দর

এ দেহে এ অন্তর

সব মোর ভাই বোন হেথা যত পড়।

পাঠশালা হ’তে যবে

ঘরে ফিরি যাব সবে,

কত না আদরে কোলে তুলি’ নেবে মাতা,

খাবার ধরিয়া মুখে

শুধাবেন কত সুখে

কত আজ লেখা হোলো, পড়া কত পাতা?’

পড়া লেখা ভাল হ’লে

দেখেছ সে কত ছলে

ঘরে ঘরে মা আমার কত নাম করে।

বলে, ‘মোর খোকামনি!

হীরা-মানিকের খনি,

এমনটি নাই কারো!’ শুনে বুক ভরে।

গা’টি গরম হলে

মা সে চোখের জলে

ভেসে বলে, ‘ওরে যাদু কি হয়েছে বল’।

কত দেবতার ‘থানে’

পীরে মা মানত মানে-

মাতা ছাড়া নাই কারো চোখে এত জল।

যখন ঘুমায়ে থাকি

জাগে রে কাহার আঁখি

আমার শিয়রে, আহা কিসে হবে ঘুম।

তাই কত ছড়া গানে

ঘুম-পাড়ানীরে আনে,

বলে, ‘ঘুম! দিয়ে যা রে খুকু-চোখে চুম’।

দিবানিশি ভাবনা

কিসে ক্লেশ পাব না,

কিসে সে মানুষ হব, বড় হব কিসে;

বুক ভ’রে ওঠে মা’র

ছেলেরি গরবে তাঁর,

সব দুখ হয় মায়ের আশিসে।

আয় তবে ভাই বোন,

আয় সবে আয় শোন

গাই গান, পদধূলি শিরে লয়ে মা’র;

মা’র বড় কেহ নাই-

কেউ নাই কেউ নাই!

নত করি বল সবে ‘মা আমার! মা আমার!

      কত ভালবাসি -কামিনী রায় জড়ায়ে মায়ের গলা শিশু কহে আসি,- “মা, তোমারে কত ভালোবাসি!” “কত ভালবাস ধন?” জননী শুধায়। “এ-ত।” বলি দুই হাত প্রসারি’ দেখায়। “তুমি মা আমারে ভালবাস কতখানি?” মা বলেন “মাপ তার আমি নাহি জানি।” “তবু কতখানি, বল।” “যতখানি ধরে তোমার মায়ের বুকে।” “নহে তার পরে?” “তার বাড়া ভালবাসা পারি না বাসিতে।” “আমি পারি।” বলে শিশু হাসিতে হাসিতে!    

পল্লী জননী’ – জসীম উদ্‌দীন

রাত থম থম স্তব্ধ, ঘোর-ঘোর-আন্ধার, নিশ্বাস ফেলি, তাও শোনা যায়, নাই কোথা সাড়া কার। রুগ্ন ছেলের শিয়রে বিসয়া একেলা জাগিছে মাতা, করুণ চাহনি ঘুম ঘুম যেন ঢুলিছে চোখের পাতা। শিয়রের কাছে নিবু নিবু দীপ ঘুরিয়া ঘুরিয়া জ্বলে, তারি সাথে সাথে বিরহী মায়ের একেলা পরাণ দোলে। ভন্ ভন্ ভন্ জমাট বেঁধেছে বুনো মশকের গান, এঁদো ডোবা হতে বহিছে কঠোর পচান পাতার ঘ্রাণ? ছোট কুঁড়ে ঘর, বেড়ার ফাঁকেতে আসিছে শীতের বায়ু, শিয়রে বসিয়া মনে মনে মাতা গণিছে ছেলের আয়ু। ছেলে কয়, “মারে, কত রাত আছে? কখন সকাল হবে, ভাল যে লাগে না, এমনি করিয়া কেবা শুয়ে থাকে কবে?” মা কয়“বাছারে ! চুপটি করিয়া ঘুমা ত একটি বার, ” ছেলে রেগে কয় “ঘুম যে আসে না কি করিব আমি তার ?” পান্ডুর গালে চুমো খায় মাতা, সারা গায়ে দেয় হাত, পারে যদি বুকে যত স্নেহ আছে ঢেলে দেয় তারি সাথ। নামাজের ঘরে মোমবাতি মানে, দরগায় মানে দান, ছেলেরে তাহার ভাল কোরে দাও, কাঁদে জননীর প্রাণ। ভাল করে দাও আল্লা রছুল। ভাল কোরে দাও পীর। কহিতে কহিতে মুখখানি ভাসে বহিয়া নয়ন নীর। বাঁশবনে বসি ডাকে কানা কুয়ো, রাতের আঁধার ঠেলি, বাদুড় পাখার বাতাসেতে পড়ে সুপারীর বন হেলি। চলে বুনোপথে জোনাকী মেয়েরা কুয়াশা কাফন ধরি, দুর ছাই। কিবা শঙ্কায় মার পরাণ উঠিছে ভরি। যে কথা ভাবিতে পরাণ শিহরে তাই ভাসে হিয়া কোণে, বালাই, বালাই, ভালো হবে যাদু মনে মনে জাল বোনে। ছেলে কয়, “মাগো! পায়ে পড়ি বলো ভাল যদি হই কাল, করিমের সাথে খেলিবারে গেলে দিবে না ত তুমি গাল? আচ্ছা মা বলো, এমন হয় না রহিম চাচার ঝাড়া এখনি আমারে এত রোগ হোতে করিতে পারি ত খাড়া ?” মা কেবল বসি রুগ্ন ছেলের মুখ পানে আঁখি মেলে, ভাসা ভাসা তার যত কথা যেন সারা প্রাণ দিয়ে গেলে। “শোন মা! আমার লাটাই কিন্তু রাখিও যতন করে, রাখিও ঢ্যাঁপের মোয়া বেঁধে তুমি সাত-নরি শিকা পরে। খেজুরে-গুড়ের নয়া পাটালিতে হুড়ুমের কোলা ভরে, ফুলঝুরি সিকা সাজাইয়া রেখো আমার সমুখ পরে।” ছেলে চুপ করে, মাও ধীরে ধীরে মাথায় বুলায় হাত, বাহিরেতে নাচে জোনাকী আলোয় থম থম কাল রাত। রুগ্ন ছেলের শিয়রে বসিয়া কত কথা পড়ে মনে, কোন দিন সে যে মায়েরে না বলে গিয়াছিল দুর বনে। সাঁঝ হোয়ে গেল আসেনাকো আই-ঢাই মার প্রাণ, হঠাৎ শুনিল আসিতেছে ছেলে হর্ষে করিয়া গান। এক কোঁচ ভরা বেথুল তাহার ঝামুর ঝুমুর বাজে, ওরে মুখপোড়া কোথা গিয়াছিলি এমনি এ কালি-সাঁঝে? কত কথা আজ মনে পড়ে মার, গরীবের ঘর তার, ছোট খাট কত বায়না ছেলের পারে নাই মিটাবার। আড়ঙের দিনে পুতুল কিনিতে পয়সা জোটেনি তাই, বলেছে আমরা মুসলমানের আড়ঙ দেখিতে নাই। করিম যে গেল? রহিম চলিল? এমনি প্রশ্ন-মালা; উত্তর দিতে দুখিনী মায়ের দ্বিগুণ বাড়িত জ্বালা। আজও রোগে তার পথ্য জোটেনি, ওষুধ হয়নি আনা, ঝড়ে কাঁপে যেন নীড়ের পাখিটি জড়ায়ে মায়ের ডানা। ঘরের চালেতে ভুতুম ডাকিছে, অকল্যাণ এ সুর, মরণের দুত এল বুঝি হায়। হাঁকে মায়, দুর-দুর। পচা ডোবা হতে বিরহিনী ডা’ক ডাকিতেছে ঝুরি ঝুরি, কৃষাণ ছেলেরা কালকে তাহার বাচ্চা করেছে চুরি। ফেরে ভন্ ভন্ মশা দলে দলে বুড়ো পাতা ঝরে বনে, ফোঁটায় ফোঁটায় পাতা-চোঁয়া জল গড়াইছে তার সনে। রুগ্ন ছেলের শিয়রে বসিয়া একেলা জাগিছে মাতা। সম্মুখে তার ঘোর কুজঝটি মহা-কাল-রাত পাতা। পার্শ্বে জ্বলিয়া মাটির প্রদীপ বাতাসে জমায় খেলা, আঁধারের সাথে যুঝিয়া তাহার ফুরায়ে এসেছে তেল।      

‘কখনো আমার মাকে’

– শামসুর রাহমান

কখনো আমার মাকে কোনো গান গাইতে শুনিনি।

সেই কবে শিশু রাতে ঘুম পাড়ানিয়া গান গেয়ে

আমাকে কখনো ঘুম পাড়াতেন কি না আজ মনেই পড়ে না।

যখন শরীরে তার বসন্তের সম্ভার আসেনি,

যখন ছিলেন তিনি ঝড়ে আম-কুড়িয়ে বেড়ানো

বয়সের কাছাকাছি হয়তো তখনো কোনো গান

লতিয়ে ওঠেনি মীড়ে মীড়ে দুপুরে সন্ধ্যায়,

পাছে গুরুজনদের কানে যায়। এবং স্বামীর

সংসারেও এসেও মা আমার সারাক্ষণ

ছিলেন নিশ্চুপ বড়ো, বড়ো বেশি নেপথ্যচারিণী। যতদূর

জানা আছে, টপ্পা কি খেয়াল তাঁকে করেনি দখল

কোনোদিন। মাছ কোটা কিংবা হলুদ বাটার ফাঁকে

অথবা বিকেলবেলা নিকিয়ে উঠোন

ধুয়ে মুছে বাসন-কোসন

সেলাইয়ের কলে ঝুঁকে, আলনায় ঝুলিয়ে কাপড়,

ছেঁড়া শার্টে রিফু কর্মে মেতে

আমাকে খেলার মাঠে পাঠিয়ে আদরে

অবসরে চুল বাঁধবার ছলে কোনো গান গেয়েছেন কি না

এতকাল কাছাকাছি আছি তবু জানতে পারিনি।

যেন তিনি সব গান দুঃখ-জাগানিয়া কোনো কাঠের সিন্দুকে

রেখেছেন বন্ধ ক’রে আজীবন, কালেভদ্রে সুর নয়, শুধু

ন্যাপথলিনের তীব্র ঘ্রাণ ভেসে আসে!

 

‘আমাদের মা’

-হুমায়ুন আজাদ

আমাদের মাকে আমরা বলতাম তুমি, বাবাকে আপনি। আমাদের মা গরিব প্রজার মত দাঁড়াতো বাবার সামনে, কথা বলতে গিয়ে কখনোই কথা শেষ ক’রে উঠতে পারতোনা। আমাদের মাকে বাবার সামনে এমন তুচ্ছ দেখাতো যে মাকে আপনি বলার কথা আমাদের কোনোদিন মনেই হয়নি। আমাদের মা আমাদের থেকে বড় ছিলো, কিন্তু ছিলো আমাদের সমান। আমাদের মা ছিলো আমাদের শ্রেনীর, আমাদের বর্ণের, আমাদের গোত্রের। বাবা ছিলেন অনেকটা আল্লার মতো, তার জ্যোতি দেখলে আমরা সেজদা দিতাম বাবা ছিলেন অনেকটা সিংহের মতো, তার গর্জনে আমরা কাঁপতে থাকতাম বাবা ছিলেন অনেকটা আড়িয়াল বিলের প্রচন্ড চিলের মতো, তার ছায়া দেখলেই মুরগির বাচ্চার মতো আমরা মায়ের ডানার নিচে লুকিয়ে পড়তাম। ছায়া সরে গেলে আবার বের হয়ে আকাশ দেখতাম। আমাদের মা ছিলো অশ্রুবিন্দু-দিনরাত টলমল করতো আমাদের মা ছিলো বনফুলের পাপড়ি;-সারাদিন ঝরে ঝরে পড়তো, আমাদের মা ছিলো ধানখেত-সোনা হয়ে দিকে দিকে বিছিয়ে থাকতো। আমাদের মা ছিলো দুধভাত-তিন বেলা আমাদের পাতে ঘন হয়ে থাকতো। আমাদের মা ছিলো ছোট্ট পুকুর-আমরা তাতে দিনরাত সাঁতার কাটতাম। আমাদের মার কোনো ব্যক্তিগত জীবন ছিলো কিনা আমরা জানি না। আমাদের মাকে আমি কখনো বাবার বাহুতে দেখি নি। আমি জানি না মাকে জড়িয়ে ধরে বাবা কখনো চুমু খেয়েছেন কি না চুমু খেলে মার ঠোঁট ওরকম শুকনো থাকতো না। আমরা ছোট ছিলাম, কিন্তু বছর বছর আমরা বড় হতে থাকি, আমাদের মা বড় ছিলো, কিন্তু বছর বছর মা ছোটো হতে থাকে। ষষ্ঠ শ্রেনীতে পড়ার সময়ও আমি ভয় পেয়ে মাকে জড়িয়ে ধরতাম। সপ্তম শ্রেনীতে ওঠার পর ভয় পেয়ে মা একদিন আমাকে জড়িয়ে ধরে। আমাদের মা দিন দিন ছোটো হতে থাকে আমাদের মা দিন দিন ভয় পেতে থাকে। আমাদের মা আর বনফুলের পাপড়ি নয়, সারাদিন ঝরে ঝরে পড়েনা আমাদের মা আর ধানখেত নয়, সোনা হয়ে বিছিয়ে থাকে না আমাদের মা আর দুধভাত নয়, আমরা আর দুধভাত পছন্দ করিনা আমাদের মা আর ছোট্ট পুকুর নয়, পুকুরে সাঁতার কাটতে আমরা কবে ভুলে গেছি। কিন্তু আমাদের মা আজো অশ্রুবিন্দু, গ্রাম থেকে নগর পর্যন্ত আমাদের মা আজো টলমল করে।

 

‘মাতৃভক্তি’

-কালিদাস

বায়েজিদ বোস্তামী- শৈশব হতে জননীর সেবা করিতেন দিবাযামী। দুপুর রাত্রে জননী জাগিয়া ডাকিলেন,’বাছাধন, বড়ই পিয়াস পানি দাও’ বলি মুদিলেন দু’নয়ন। দেখিল বালক ঘরের কোণের কলসিতে নেই পানি, বহুদূর পথ ঝরনা হইতে কলসি ভরিয়া আনি।

মায়ের তৃষ্ণা মিটাইবে বলি গভীর অন্ধকারে ছুটিয়া বাহির হইল একাকী কলসি লইয়া ঘাড়ে। জল ঢালি পিয়ালায় সুপ্তা মাতার নয়ন শিয়রে দাঁড়ায়ে রহিল ঠায়। ভাঙালে নিদ্রা হবে অপরাধ, কখন ভাঙিবে নিঁদ, সেই ভরসায় পানি হাতে খাঁড়া রহিল যে বায়েজিদ। পূর্ব গগন ফর্সা হইল,ডাকিয়া উঠিল পাখি, জননী মেলিল আঁখি। দেখিল শিয়রে দাঁড়ায়ে রয়েছে দশ বছরের ছেলে পানি হাতে কেন, বুঝিল না মাতা প্রথম নয়ন মেলে। সহসা পড়িল মনে, গভীর রাতে পিপাসায় পানি চেয়েছিল বাছাধনে। কহিল মা, মরি মরি! বাছারে আমার, পানি হাতে করে সারা রাত্রটি ধরি দাঁড়াইয়া আছ? ঘুমাওনি আজ?’ চোখে এল জল ভরি। পুত্রেরে কোলে নিয়ে মা চুমিল বার বার মুখখানি। কহিল জননী,’নয়নের মণি, সাধারণ শিশু নও, খোদার দোয়ার বরকতে তুমি জগতপূজ্য হও। পুত্র গরবে গর্বিত বুকে,খোদা, স্মরি তব নাম, তোমারে আমার জীবনের এই সম্বল সঁপিলাম।’ বিফল হয়নি মায়ের আশিস, হৃদয়ের প্রার্থনা জগৎ-বন্দ্য জ্ঞানগুরুদের বায়েজিদ একজনা।    

‘জননী জন্মভূমি’ -সুভাষ মখোপাধ্যায়

আমি ভীষণ ভালবাসতাম আমার মা-কে -কখনও মুখ ফুটে বলি নি। টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে কখনও কখনও কিনে আনতাম কমলালেবু -শুয়ে শুয়ে মা-র চোখ জলে ভ’রে উঠত আমার ভালাবাসার কথা মা-কে কখনও আমি মুখ ফুটে বলতে পারি নি। হে দেশ, হে আমার জননী- কেমন ক’রে তোমাকে আমি বলি।

       

‘বীরপুরুষ’

-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

মনে করো, যেন বিদেশ ঘুরে

মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে।

তুমি যাচ্ছ পালকিতে, মা, চ’ড়ে

দরজা দুটো একটুকু ফাঁক ক’রে,

আমি যাচ্ছি রাঙা ঘোড়ার ‘পরে

টগবগিয়ে তোমার পাশে পাশে।

রাস্তা থেকে ঘোড়ার খুরে খুরে

রাঙা ধূলোয় মেঘ উড়িয়ে আসে।

সন্ধ্যে হল, সূর্য নামে পাটে,

এলেম যেন জোড়াদিঘির মাঠে।

ধূ ধূ করে যে দিক-পানে চাই,

কোনোখানে জনমানব নাই,

তুমি যেন আপন-মনে তাই

ভয় পেয়েছ-ভাবছ, ‘এলেম কোথা।’

আমি বলছি, ‘ভয় কোরো না মা গো,

ওই দেখা যায় মরা নদীর সোঁতা।’

আমরা কোথায় যাচ্ছি কে তা জানে-

অন্ধকারে দেখা যায় না ভালো।

তুমি যেন বললে আমায় ডেকে,

‘দিঘির ধারে ওই-যে কিসের আলো!’

এমন সময় ‘হাঁরে রে রে রে রে’

ওই – যে কারা আসতেছে ডাক ছেড়ে!

তুমি ভয়ে পালকিতে এক কোণে

ঠাকুর-দেবতা স্মরণ করছ মনে,

বেয়ারাগুলো পাশের কাঁটাবনে

আমি যেন তোমায় বলছি ডেকে,

‘আমি আছি, ভয় কেন, মা, করো!’

তুমি বললে, ‘যাস নে খোকা ওরে,’

আমি বলি, ‘দেখো-নাচুপ করে।’

ছুটিয়ে ঘোড়া গেলেম তাদের মাঝে,

কী ভয়ানক লড়াই হল মা যে

শুনে তোমার গায়ে দেবে কাঁটা।

কত লোক যে পালিয়ে গেল ভয়ে,

কত লোকের মাথা পড়ল কাটা।।

এত লোকের সঙ্গে লড়াই ক’রে,

ভাবছ খোকা গেলই বুঝি মরে।

আমি তখন রক্ত মেখে ঘেমে

বলছি এসে, ‘লড়াই গেছে থেমে,’

তুমি শুনে পালকি থেকে নেমে

চুমো খেয়ে নিচ্ছ আমায় কোলে

বলছ, ‘ভাগ্যে খোকা সঙ্গে ছিল’

কী দুর্দশাই হত তা না হলে!’

 

‘নোলক’

-আল মাহমুদ

আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেল শেষে

হেথায় খুঁজি হোথায় খুঁজি সারা বাংলাদেশে।

নদীর কাছে গিয়েছিলাম, আছে তোমার কাছে?

হাত দিওনা আমার শরীর ভরা বোয়াল মাছে।

বললো কেঁদে তিতাস নদী হরিণ বেড়ের বাঁকে

শাদা পালক বকরা যেথায় পাখ ছড়িয়ে থাকে।

জল ছাড়িয়ে দল হারিয়ে গেলাম বনের দিক

সবুজ বনের হরিৎ টিয়ে করে রে ঝিকমিক

বনের কাছে এই মিনতি, ফিরিয়ে দেবে ভাই,

আমার মায়ের গয়না নিয়ে ঘরকে যেতে চাই।

     

‘কোন এক মাকে’

-আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ

“কুমড়ো ফুলে-ফুলে

নুয়ে পড়েছে লতাটা,

সজনে ডাঁটায়

ভরে গ্যাছে গাছটা

আর, আমি ডালের বড়ি

শুকিয়ে রেখেছি,

খোকা তুই কবে আসবি।

কবে ছুটি?”

চিঠিটা তার পকেটে ছিলো,

ছেঁড়া আর রক্তে ভেজা।

“মাগো, ওরা বলে,

সবার কথা কেড়ে নেবে

তোমার কোলে শুয়ে

গল্প শুনতে দেবে না।

বলো মা, তাই কি হয়?

তাই তো দেরি হচ্ছে।

তোমার জন্যে কথার ঝুড়ি নিয়ে

তবেই না ফিরবো।

লক্ষী মা রাগ ক’রো না,

মাত্র তো কটা দিন।”

     

মাকে নিয়ে লেখা আরও কিছু কবিতা হচ্ছে:

মনে পড়া– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জন্মকথা– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মা– দিলওয়ার আম্মা– আবদুল মান্নান সৈয়দ মায়ের চোখে– দাউদ হায়দার স্মৃতি– আবু হেনা মোস্তফা কামাল আমার হারানো মাকে-পুর্ণেন্দু পত্রী একটি গ্রাম্য দৃশ্য– সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আমার মায়ের চোখ– রফিক আজাদ তোমার মা– হাবীবুল্লাহ সিরাজী স্বপ্ন– সঞ্জয় ভট্টাচার্য মা থাকো– দেবারতি মিত্র তাদের মাতা, জগৎমাতা– জাহিদ হায়দার মা-র কাছে ফেরা– রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ একটি সবুজ তারা– শিহাব সরকার উনুন– ত্রিদিব দস্তিদার ঋণ খেলাপ– আবু হাসান শাহরিয়ার আর কত– সিদ্ধার্থ সিংহ জীবন দেবতা– স্বপন বন্দোপাধ্যায় মা– সুজিত সরকার মা– শান্তি সিংহ তুই কেমনতরো মা?– কৃষ্ণ ধর আলোর ভাসান– সুনীলকুমার নন্দী মা আমাকে ফিরিয়ে নাও– মাহমুদ শফিক মা– জাহাঙ্গীর ফিরোজ মাকে নিয়ে– আশিস স্যানাল জন্মবৃত্তান্ত– দিব্যেন্দু পালিত মাও যেন কবিতা লেখেন– জয় গোস্বামী একটি সজল ছায়ামূর্তি– ইকবাল আজিজ সোনালী চুলের স্মৃতি– ভাস্কর চক্রবর্তী মা– পঙ্কজ সাহা আমার মা– শ্যামলকান্তি দাশ মা– সুমিত্রা দত্তচৌধুরী ঠিক কোনখানে– প্রমোদ বসু মা আমার– বৃন্দাবন দাস গল্প লেখার মাকে– নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায় এক পৌরাণিক দেবীর গল্প– দেবাঞ্জলি মুখোপাধ্যায় মা, তোমাকে– বিশ্বনাথ ভট্টাচার্য মা– মল্লিকা সেনগুপ্ত আমার মা-মাকিদ হায়দার মাকে– আবদুল গনি হাজারী বাঁচবো কি– আবুল হোসেন মধুর আমার মায়ের হাসি– প্রনব রায় মা– অসীম সাহা

           

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>