ছোট কাগজই সাহিত্যের প্রসূতি সদন, ওয়েব ম্যাগাজিন এই ভাবনাকেই বিকশিত করবে  

 

 

ছোট কাগজের দিন  শেষ- এই বিষয়ের উপর লিখতে গিয়ে মনে হল। আমার অবস্থান এর বিপরীতে। যারা মনে বাণিজ্যিক পত্রিকা ধারাবাহিকভাবে সাহিত্যের সেবা করে চলেছে, যারা মনে করে বাণিজ্যিক কাগজগুলিই সাহিত্যের মূল স্রোত আমার মতামত তাদের চেয়ে ১৮০ ডিগ্রি উল্টোদিকে।আমি মনে করি লিটল ম্যাগাজিনই আজ সাহিত্যের মূল ধারা।সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে সাহিত্যের গতিমুখ পরিবর্তন হয় এখানেই।

যদি প্রশ্নটিকে এভাবে দেখি   বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্রমাগত  অগ্রগতি একদিন ছোট পত্র পত্রিকাকে গ্রাস করে নেবে।পৃথিবীতে আর কোথাও কোন ক্ষুদ্র পত্র পত্রিকা প্রকাশিত হবে না, এই যে আশঙ্কা আমি এই আশঙ্কারও কোন ভিত্তি দেখতে পাই না।যতদিন মানুষ থাকবে, সাহিত্যের জন্য তরুণ তুর্কিদের হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা থাকবে, ততদিন বেঁচে থাকবে ছোট কাগজ।  

এই প্রসঙ্গে একটি কথা বলা যেতে পারে। তখন বেদ ছিল শ্রুতি । মানুষ শুনে শুনে মনে রাখত।তো একদিন এক শিষ্য আর্য ঋষির কাছে ছুটে এসে বলল- মুনিবর, মহা বিপদ হয়ে গেছে।

ঋষি বললেন- কী এমন বিপদ যে এত হন্তদন্ত হয়ে এসেছো,?

শিষ্যটি বলল- মানুষ লিপি আবিষ্কার করে ফেলেছে। এবার তো সব কিছু লিখে রাখলেই হবে। মানুষ কেন এই জ্ঞানভান্ডারকে মাথার ভেতর বহন করবে।

ঋষি সাময়িক বিভ্রান্ত হলেন, বললেন- তাই তো মহাবিপদ,এর ফলে মানুষ তো তার মাথা ব্যবহার করবে না, কিছুই মনে মনে রাখতে চাইবে না। জ্ঞানের চর্চা মলিন হয়ে আসবে।

পরে অনেকক্ষণ ভাবলেন তিনি। দুরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। বললেন – এতে তো ভালোই হবে মানুষ তার জ্ঞানের চর্চাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে।

আজকের ব্লগজিন বা ওয়েব ম্যাগাজিন এসে ছোট কাগজের বৃত্তটিকে সংকুচিত করে দিচ্ছে না কি ছোট কাগজের চিন্তাভাবনাগুলোকে আরও বৃহত্তর পৃথিবীর দিকে নিয়ে যাচ্ছে আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে আমাদের এই বিষয় নিয়ে ভাবতে হবে। খুব গভীর ভাবে ভাবলে আমরা দেখব ছোট কাগজের ভাবনার সাথে পরিপূরক এই ব্লগভাবনা। আমরা দেখব যে ব্লগসাহিত্য ক্ষুদ্র কাগজের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে তা বৃহৎ অংশের পাঠকের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। সাহিত্য তরল নয় যে পাত্র ভেদে তার আকার বদলে যাবে ।  তাকে কাগজের দুনিয়ায় ছাপার হরফে রাখলে তার স্বাদ যা যখন তালপাতার উপর শরের কলমে লেখা হত পুঁথি তার স্বাদ অথবা আজ ওয়েব মাধ্যমে যখন সাহিত্যচর্চা চলছে মুলগত বিষয়টির কিন্তু তারতম্য হচ্ছেনা।অন্তর্নিহিত যে উপাদানগুলি দিয়ে সাহিত্য নির্মিত হয়  অর্থাৎ সাহিত্যরসের কোন তারতম্য হচ্ছেনা । শুধু বদলে যাচ্ছে পাত্র বা কন্টেনার । আমি কাপে চা খেতে পারি । গ্লাসে খেতে পারি আবার মাটির ভাঁড়েও খেতে পারি । আমি যদি চা রসিক হই আমার কাছে এতে চায়ের স্বাদের কোন ইতরবিশেষ হবেনা । চায়ের প্রতি আমার আসক্তি কেমন এবং আমি একজন যথার্থই নিবিড়  চায়ের পিয়াসী কীনা এটাই কিন্তু আকর্ষণের মুল বিন্দু ।যারা সাহিত্য অনুরাগী নয় বরং সাহিত্যের প্রতি তীব্র বৈরাগ্য পোষণ করেন তাঁকে আপনি যেভাবেই সাহিত্য পরিবেশন করুন না কেন সে ফিরেও তাকাবেনা এদিকে । আবার যারা সত্যিকারের অনুরাগী এবং রসিক তারা কিন্তু গন্ধ শুঁকে শুঁকে ঠিক খুঁজে নেবে তার মনের খোরাক ।  আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে অন্তর্জালের দুর্নিবার গতিকে আমি অস্বীকার করতে তো পারিই না বরং এই গতির সাথে পা মেলানোর জন্য প্রতি মুহূর্তে নিজের পাদুটোকে আরোও প্রস্তুত করে তুলি । আরও গতিশীল করি আরও সম্মুখগামী করি । এ কথা ঠিক কবিতা তথা সাহিত্যভাবনাকে আজ সারা পৃথিবীর কাছে পৌঁছে দিচ্ছে অন্তর্জাল । আন্তর্জাতিক চিন্তন দুনিয়ার সাথে মেলবন্ধন ঘটছে ।  প্রিন্ট ম্যাগাজিনের ক্ষেত্রে সার্কুলেশনের একটা সীমাবদ্ধতা থাকে । তাকে পৌঁছে দেওয়ার দায়দায়িত্ব থাকে লেখকের কাছে , পাঠকের কাছে । এই কাজটি সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল । অন্যদিকে ওয়েব দুনিয়া অনেক প্রসারিত । শুধুমাত্র একটি স্মার্ট ফোনের সুযোগসুবিধা এবং নেট কানেকশন থাকলেই একজন সাহিত্যরসিকের কাছে উপলব্ধ হয়ে উঠছে আজকের পৃথিবীর সাহিত্যভান্ডার । প্রিন্ট ম্যাগাজিনের সীমাবদ্ধতার বিপরীতে এ এক অসীমের অনুসন্ধান । আমি এই উদ্ভাসনকে দুহাত তুলে  স্বাগত জানাই । এর অবদানকে এই অনস্ব্বীকার্য ভূমিকাকে কাজে লাগিয়েই আগামীর দিকে আমাদের অভিযাত্রা । সাহিত্যকে মুক্ত স্বাধীন এবং সর্বত্রগামী করে তুলেছে অন্তর্জাল । লিটল ম্যাগাজিন মানে ছোট কাগজ । ছোট কাগজ মানে প্রচারে প্রসারে এবং বানিজ্যায়নের ক্ষেত্রে তার কিছু সীমাবদ্ধতা আছে । কিন্তু সাহিত্যমনস্কতার ক্ষেত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ।সে আপামরের কাছে পৌঁছে যেতে পারেনা । তার এই অপারগতাই তার অহংকার । একজন সদ্যসাক্ষর নিশ্চয়ই কমলকুমার মজুমদার খুলে পড়তে যাবেন না  বা কোয়ান্টাম মেকানিক্স নিয়ে আলোচনার ধৃষ্টতা দেখাবেন না । ছোটকাগজ এরকমই । যার তার জন্য নয় । সে মাসের নয় , ক্লাসের । কেবলমাত্র পরিশীলিত এবং অনুশীলিত পাঠকের ।সকলের কাছে পৌছতে চাওয়ার প্রয়াস তার নেই । চাওয়ার দাবিও করেনা । সস্তা জনপ্রিয়তার বিপরীতে ছোটকাগজ এক মূল্যবান রত্নভাণ্ডার । বৌদ্ধিক পাঠক পাঠিকাই তার গর্ব ।অন্তর্জাল এসে যাওয়ায় ছোট কাগজের দুনিয়ায় ভবিষ্যৎ জিজ্ঞাসাচিহ্নের উপর দাঁড়িয়ে । এরকম মনে করার কোন সঙ্গত কারণ নেই । ছোট কাগজের অবাণিজ্যিক যে ভূমিকা । প্রকৃত কালজয়ী সাহিত্য , নতুন চিন্তাপ্রনালীর  বিকিরণ , মেধাসম্পন্ন প্রতিভাবান কবি সাহিত্যিকদের আলোকিত করা । তাঁদের মেধার মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এবং উৎসাহ প্রদানের ক্ষেত্রে লিটল ম্যাগাজিন চিরকাল এক অগ্রনী ভুমিকা পালন করে এসেছে । আজকের ওয়েব ম্যাগাজিনের সাথে এই সদর্থক প্রশ্নে লিটল ম্যাগাজিনের কোন বিরোধীতা নেই । বরং বলা চলে একে অন্যের পরিপূরক । কারন ওয়েব ম্যাগাজিনেরও ব্যবসায়িক কোন উদ্দেশ্য নেই , ছোট কাগজেরও নেই । এই অর্থে তো দুই মাধ্যমের মূল অভিমুখ একই । ওয়েব ম্যাগাজিন এবং অন্তর্জালের লাগামছাড়া বিস্তারের ফলে বাণিজ্যিক কাগজগুলির নাভিশ্বাস উঠতে শুরু করেছে । তাঁরা এতদিন প্রচার এবং প্রসারের যে সুকৌশলের উপর নির্মান করেছিল নিজেদের বিজয়যাত্রা । তা আজ অনেকাংশেই থমকে গেছে । তাদের ভয় পাওয়া এবং দুমড়ে যাওয়া মুখের চেহারা আজ বেরিয়ে আসছে ।  ত্রাহি ত্রাহি রব উঠছে চারদিকে – অন্তর্জাল এসে আমাদের সবকিছু কেড়ে নিল , মান মর্যাদা এবং অহংকার । যদি খুব নির্দিষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায় তাহলে দেখা যাবে কমার্শিয়াল কাগজগুলির আজ একটাই আলোচনার বিষয় – ফেসবুক কি বাংলা সাহিত্যকে বিপন্ন করছে ? অথবা অন্তর্জাল কি ঠিক করতে পারে সাহিত্যের অভিমুখ ? দিনের পর দিন বিভিন্ন সেমিনারে সভায় এমনকী বিভিন্ন চ্যানেলেও এই নিয়ে ক্রমাগত আলোচনা চলছে । তাহলে অন্তর্জালের এই ক্রম প্রসারে কারা বিপন্ন বোধ করছে । কারা খুঁজে পেতে চাইছে নতুন পথ । অনুসন্ধান করছে মুক্তির দিশা ?

লিটল ম্যাগাজিন কিন্তু নির্বিবার । সবুজপত্র থেকে আরম্ভ করে  শতাধিক বছর ধরে পথ চলার ঐতিহ্য নিয়ে সে গরিমামন্ডিত । সে জানে অন্তর্জালের মধ্য দিয়ে আসলে তার ভাবনা আদর্শ এবং অসমাপ্ত কাজগুলিই এগিয়ে যাবে । সুতরং নতুনপ্রযুক্তিকে  সাদর অভ্যর্থনা জানাতে তার চোখে কোন সংশয়চিহ্ন নেই আজকের সময়ে যে সময়ের উপর পা রেখে আমরা ভাবছি , লিখছি অথবা চিন্তাবিনিময় করছি । এক জটিল আবর্তের উপর তার অবস্থান । ব্যক্তিমানুষ আজ বিচ্ছিন্নতার শিকার । সামাজিক বিচ্ছিন্নতাকে অনেক সময় আমরা নির্জনতার সাধনা নামে গৌরবান্বিত করবার চেষ্টা করছি । মানুষ হন্যে হয়ে ছুটছে অর্থ বিত্ত, যশ, খ্যাতি আর ব্যক্তিগত সম্পদবৃদ্ধির দিকে । সাফল্য মানে অর্থিক উন্নতি ।বৈষয়িক সমৃদ্ধি প্রয়োজন, কিন্তু তার প্রয়োজন কতটুকু!  সততা বিসর্জন দিয়ে বা যেভাবেই হোক না কেম নিজের উন্নতির রাস্তা খুঁজে নিতে হবে । ভোগ আর তুষ্টির আয়োজন ছাড়া  জীবনের আজ আর কোন উদ্দেশ্য নেই । জীবন যাপনের প্রকৃত সংজ্ঞা আজ বদলে গেছে । উন্নয়ন মানে বৈষয়িক সমৃদ্ধি । ধনবাদী ভোগবাদী সমাজ সেখানে আবেগের কোন জায়গা নেই । মানুষের সাথে মানুষের আন্তসম্পর্ক নিরধারিত হচ্ছে মূল্যের বিন্যাসে । একান্নবর্তী পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আজ আনবিক হয়ে উঠেছে বন্ধনের বলয় । সেই টানই বা কতটুকু স্বার্থ নিরপেক্ষ ? আত্মকেন্দ্রিক ভাবনা আর স্বার্থ পাহারা দিতে দিতে  সাহিত্যের চর্চা মানবতার চর্চা থেকে সরে যাচ্ছে আমাদের ভাবনাবলয় । অথবা সাহিত্যচর্চার মুখোশেও প্রবলভাবে আত্মকেদ্রিকতার ছায়া পড়ছে । যা ঢেকে রাখতে পারছে না চরিত্রের ব্যক্তিক পরিসর । শূন্যতার হাহাকার গিলে নিচ্ছে প্রতিদিনের জীবন । ধনবাদের ফলশ্রুতি তাই বড় নির্মম । সে স্ত্রী সন্তান চেনে না, জানে না তারা চার পাশ , প্রকৃতি, জীবন,পারিবারিক- সমাজিক বন্ধন তাকে টানে না, এভাবেই তৈরি হয় বিচ্ছিন্নতা পরিবার থেকে , সমাজ থেকে , সন্তান থেকে এমনকী নিজের আত্মগত বিবেক চেতনা থেকে । মার্কস বলেছিলেন পুঁজিবাদের বিবরে বেড়ে ওঠা অভিশাপগুলোকে চিহ্নিত করার কথা । শুধু উপরতলা নয় সমাজের সার্বিক স্তরে ছড়িয়ে পড়ছে এই অভিশাপ । মানুষ অক্লান্ত পরিশ্রম করছে জীবনের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে । সঞ্চয়ের পরিসরকে আরও ব্যাপক বিস্তৃত করার প্রয়োজনে । সুকুমার অনুভূতি , পরিবার স্বজন্দের সাথে ভাবনার আদান প্রদান সুখে দুখে আনন্দে মিলেমিশে থাকার যে চিরন্তন জীবন তার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে আরও । বিপন্ন মানুষকে দেখেও উদাসীন ভাবে পেরিয়ে যাচ্ছে রাস্তা । সংবেদনশীলতার যে মরমী হৃদয় তা পরিপুর্ন হয়ে আত্মকেন্দ্রিক চেতনায় । ফলে প্রকৃতির রূপ , গানের সুর , কবিতার ছন্দ কিংবা ভালো লাগার মুহূর্ত খুঁজে পাচ্ছেনা  নির্লিপ্ত চোখ । এখন মানুষের কাছে একটাই জিজ্ঞাসা – কী পাবো ? কী পাবো কবিতা পড়ে ? গান শুনে ? অথবা সাহিত্যে নিবেদিত হয়ে ? পাওয়া মানে পারমার্থিক কোন পাওয়া নয় , পাওয়া মানে আত্মিক জাগরন নয় । পাওয়া প্রকৃত অর্থেই আর্থিক উন্নতি । বিষয়ভিত্তিক প্রাপ্তি । হুমায়ূন আজাদের কথামতো বললে নষ্টদের অধিকারে চলে যাচ্ছে সমস্ত কিছু । আমাদের এই ব্যক্তিগত বিচ্ছিন্নতা ভোগবাদের পিছনে নিরন্তর রুদ্ধশ্বাস দৌড় আমরা সংক্রমিত করছি শিশু কিশোরদের মনেও । যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক অথবা অভিভাবক শিশুদের তৈরি করবে তাদের অন্তঃকরণেই তো জমে আছে অনেক ফাঁকি এবং অনেক ফাঁকফোকর । কী দিয়ে মেরামত করা হবেএই নষ্ট হৃদয়ের চেতনাবোধের মানচিত্র ? আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে সাহিত্যরচনা করা তাই অত্যন্ত কঠিন কাজ । তবু আমি আশাবাদী একমাত্র সাহিত্যই পারে  নৈরাশ্যপীড়িত , দিশাহীন সমাজকে রাস্তা দেখাতে । যে মানুষ কোনদিন চোখের জল ফেলেনি । বই পড়তে পড়তে তাকে ডুকরে কেঁদে উঠতে দেখেছি।হতাশায় স্তব্ধ হয়ে যাওয়া মানুষকে জীবনের অভিমুখে ফিরিয়ে দিতে পারে সাহিত্যই। আর সেই সাহিত্য উঠে আসে ছোট কাগজের পাতা থেকে।মেধাবী লেখকের হৃদয় নিংড়ানো নির্যাস থেকে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা – A teacher , a child and a pen can change the  world শৌখিন মজদুরী  যে হচ্ছেনা তা নয় । প্রযুক্তির এই সুবিধাগুলো হাতের নাগালে এসে যাওয়ায় সকলেই কবি হতে চাইছেন । এদের বেশিরভাগ অংশেরই সেভাবে সাহিত্যের সাথে সংযোগ নেই । পড়াশোনা নেই । এমনকী সাহিত্যের প্রতি যে ভালোবাসা থাকা দরকার তাও নেই । আমি এই অংশের কিছু মানুষের সাথে কথা বলে দেখেছি ।তাদের লেখালেখির উদ্দেশ্য এবং  অভিমুখ জানবার চেষ্টা করেছি । যেহেতু ফেসবুক দ্রুত কবিতাকে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেয় এবং একটি কবিতা যা প্রায় রচনার সাথে সাথেই ফেসবুকে আশ্রয় পেয়ে যাচ্ছে অগনিত পাঠক পাঠিকার নজরে চলে আসছে । দ্রুত মতামত ( যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কবিতার অসাধারনত্বের শংসাপত্র ) পেতে পেতে কবিও চটজলদি একটি সহজ রাস্তার দিকে হাঁটতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছেন । অপেক্ষা শব্দটি হারিয়ে যাচ্ছে । ফাস্ট ফুডের মতো ফাস্ট পোয়েট্রির এক আবর্ত গিলে নিচ্ছে  ধৈর্য ,সংযম  এবং মানসিক স্থিরতা ।

 

   আলোর নীচে অন্ধকারের মতো প্রযুক্তিগত বিপ্লবের পাশাপাশি আছে , এই কারিগরী কৌশলকে কাজে লাগিয়ে অসৎ হয়ে ওঠার সুযোগ । শিল্পকর্ম চুরির অভিযোগ যেমন বাড়ছে ,উৎসাহিত হচ্ছে হ্যাকিং বা অন্যন্য   অসদুপায়গুলিও । যেহেতু আমি এই প্রযুক্তির পুঙ্খানুপুঙ্খ বিষয়গুলি সেভাবে জানিনা । তাই এখানে বিশেষজ্ঞের কোন মতামত দেওয়া সমীচীন হবেনা । টেকনিক্যালী যারা এই বিষয়ে পারদর্শী তারাই ভালো বলতে পারবেন সতর্কতার তালাচাবি । এই প্রবণতা চিরকালীন । ।  

শুধু অন্তর্জালে নয় খুব অলপ কিছু সংখ্যক পত্রিকা ছাড়া আজ আর  সাহিত্যের ভালো মন্দ , গঠনমূলক আলোচনা এসব পরিলক্ষিত হচ্ছে না । এ বড় দুঃসময়য় । নিজস্ব গ্রুপের মানুষজনের পিঠ চাপড়ে বাহবা দেওয়া ছাড়া আর কোন অভিমুখ দেখা যাচ্ছে না । আপনিই বলুন তো আপনাকে যদি বলি একটা কাগজের নাম করতে , যেখানে লেখা প্রকাশিত হলে আপনি নিজেকে খুব গর্বিত মনে করবেন ।  আজ আর সেরকম কোন কাগজ নেই এই স্পর্ধিত অহংকারের ।এই মায়াবী দিগন্তের অন্ধকার আমাকে খুবই পীড়িত করে । মাঝে মাঝে হতাশ হয়ে পড়ি , এই নৈরাজ্যের প্রবহমান স্রোতের ভেতর সাঁতার কাটতে কাটতে । প্রকৃত পাঠক কোথায় ? প্রকৃত সম্পাদকই বা কোথায় ? একটা গল্প মনে পড়ে যাচ্ছে এই প্রসঙ্গে শৈবাল মিত্রের লেখা  একটি গল্প ।একজন ময়রাকে নিয়ে । যে মিষ্টি বানায় । তার সুখ্যাতি জেলা এবং জেলার বাইরে দূর দূরান্তে । একটি বিয়েবাড়িতে সে মিষ্টি সরবরাহের অর্ডার নিয়েছে । কালই মিষ্টি পৌঁছে দিতে হবে সকাল সকাল । রাতে সে টের পায় কেমন পচা গন্ধ চারপাশে । রসগোল্লার ভেতর থেকেও গন্ধটা আসছে । এই মিষ্টি সাপ্লাই করলে তার বদনাম হয়ে যাবে । দীর্ঘ পরিশ্রমে অর্জিত সুনাম নষ্ট হয়ে যাবে । আবার হাতে সময় নেই । কী করবে সে । চিন্তায় পড়ে যায় । কর্মচারীদের  নির্দেশ দেয় ওই মিষ্টি যেন সাপ্লাই না করা হয় । যত সময়ই লাগুক আবার নতুন করে বানাতে হবে । কিন্তু কেউ তার কথা শোনে না । মিষ্টি প্যাকিং হয়ে পৌঁছে যায় বিয়েবাড়িতে । সে ভয়ে ভয়ে অস্থির হয়ে থাকে । এই বুঝি কেউ এসে দোকানে অভিযোগ করে গেল – ছিঃ মশাই ছিঃ । কিন্তু আশ্চর্য সেরকম কিছুই হল না । সে নিজেই গেল বিয়েবাড়িতে । জনে জনে জিজ্ঞেস করল – মিষ্টি ঠিক ছিল তো ? প্রত্যেকেই তার  কারিগরি দক্ষতার প্রশংসা করল – আপনার মিষ্টির স্বাদই আলাদা । মুখে দিলেই বোঝা যায় । সে দোকানে ফিরে এসে নির্দেশ দিল – দোকান বন্ধ করে দাও । আর মিষ্টি বানাবো না । সবাই চমকে উঠল – কেন ? -একজন রসিক মানুষও যদি না থাকে তাহলে কার জন্য শিল্প সৃষ্টি করব আমি ? পচা গলা আবর্জনার সাথে প্রকৃত শিল্প আজ ঘুলিয়ে যাচ্ছে। বাণিজ্যিক কাগজগুলি গুলিয়ে দিতে চাইছে সস্তা এবং মেধাবী লেখার ফারাক।তারা পরিবেশন করতে চাইছে পচা খাবার, যাতে এটাই অভ্যাসে পরিনত হয়ে যায়। মানুষের নাখটাকে ভোতা করে দাও যাতে সে দুর্গন্ধ না পায় ।প্রকৃত ও মেকি সাহিত্যের  ভেদরেখা নির্ণয় করার মতো মহৎ রসিক যাতে মরে যায় । ফলে হয়ত নিরাশা বাড়ছে ।

হ্যাঁ । একটা সময় এভাবেই পেরিয়ে এসেছি আমরা । এখনও যে খুব বদল হয়েছে তা নয় । একজন কবিকে কে বাঁচিয়ে রাখে ? প্রকাশক ? পুরস্কার ? না কি পাঠক ? কিছু কিছু কবিকে দেখেছি প্রকাশক আর পুরস্কারের সন্ধানে মেরুদণ্ড বিকিয়ে দিয়ে হন্যে হয়ে ঘুরতে । এরা পাঠক চায়না । কেউ কবিতা পড়ুক এটাও চায়না । শুধু পুরস্কার চায় । আর চায় প্রকাশকের করুণা । এরাই বাংলা কবিতাকে পাঠক বিমুখ করেছে । পাঠক নয় কিছু স্তাবকে ভরে গেছে কবিতার মানচিত্র । অন্তর্জাল অন্তত অংশত হলেও কবিতার দিকে ফিরিয়ে দিয়েছে পাঠকের মুখ। লিটল ম্যাগাজিনের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে চলেছে এই মাধ্যমগুলি। ফলে লিটল ম্যাগাজিনের ভাবনা আরও প্রসারিত হচ্ছে, খুলে যাচ্ছে নতুন দিগন্ত।  

 

   

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত