| 21 এপ্রিল 2024
Categories
ধারাবাহিক

ধারাবাহিক: একাকিনী শেষের কথা (পর্ব-৯) । রোহিণী ধর্মপাল

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট
সেই ঠাণ্ডা বরফের ওপর শুয়ে দ্রৌপদী আবছা ভাবছেন, যে ঠাণ্ডা মন আর শরীরকে এত আরাম দেয়, সেই ঠাণ্ডাও এত কঠিন আর যন্ত্রণাদায়ক হতে পারে! আর তার চেয়েও শীতলতর হতে পারে যুধিষ্ঠিরের উত্তর!কেউ ফিরে তাকালেন না। কোনও কথা বললেন না। কিন্তু ভীম! একমাত্র ভীম। আঃ। অস্পষ্ট একটা আওয়াজ বেরিয়ে এল তাঁর মুখ দিয়ে। মধ্যম পাণ্ডব ভীম। অর্জুন ছাড়া স্বয়ংবর সভায় আর একজন, যিনি দ্রৌপদীর ওপর নিজের অধিকার দাবী করতেই পারতেন। কারণ বাকি রাজারা যখন আক্রমণ করেছিলেন, অর্জুনের সঙ্গে ভীমই তাঁদের প্রতিরোধ করেছিলেন।
কুটিরের বাইরে যখন অর্জুন চোখ নিচু করেছিলেন, বাকি চার ভাই দেখছিলেন তাঁকে, একমাত্র ভীমের চোখেই কাম ছাড়া আরও কিছু ছিল বলে তাঁর মনে হয়েছিল। কিন্তু তা তো এক ঝলকের মনে হওয়া। তা সত্যিও হতে পারে, আবার মিথ্যাও হতে পারে। ধীরে ধীরে দিন যেতে লাগল, তিনিও বুঝতে পারলেন ভীমের চোখে কী দেখেছিলেন। হ্যাঁ, অবশ্যই কাম ছিল। তবে তার থেকে বেশি ছিল প্রেম। আর কোথাও যেন লুকিয়ে ছিল স্নেহ। যেন বাবার মতো।
এখন তিনি জানেন, যাঁকে তিনি আর ভাই ঋষিদাদু বলে জানতেন, আসলে তিনিই তাঁদের দুজনের বাবা। তিনি স্নেহ করতেন ঠিকই, কিন্তু পিতৃপরিচয়ে তো নয়। সেটা তো গোপন রেখেছিলেন। মায়ের শরীর আর সেবা ভোগ করতে কখনও অসুবিধা বোধ করেন নি তো। তবে এও সত্যি, তিনি কখনও তাঁদের অযত্নও করেন নি। তবু বাবা হিসেবে তো তাঁরাও দেখেন নি! দ্বিতীয় বাবা আবার সবার সামনে বাবা। সামাজিক ভাবে বাবা। অথচ তাঁরা দুই ভাইবোন জানতেন দ্রুপদ তাঁদের রাজনৈতিক বাবা। তিনিও স্নেহ করেছেন বৈকী তাঁদের। কিন্তু তা তো আসলে নিজের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার লক্ষ্যে। তাই বাবার আদর পাওয়ার একটা চাহিদা তাঁর মধ্যে অজান্তেই রয়ে গেছিল। সেই অভাব যেন অনেকটা পূরণ হল তাঁর, যখন ভীমকে কাছে পেলেন।
বিয়ের দ্বিতীয় দিন, যখন ভীম হলেন তাঁর বর, সেদিন কেন যেন বধূবেশে তিনি খুব সাধারণ একটা সাজ বেছে নিয়েছিলেন। রেশম নয়, পরেছিলেন সুতির পরিধেয়। সবুজ রঙের। সঙ্গে বেছে নিয়েছিলেন শুধুই মুক্তো। মুক্তোর একটি টায়রা, কর্ণাভরণ, মালা, বাজুবন্ধ। চুলটি বেঁধেছিলেন একটি এলো খোঁপা করে। তাতে ছিল মুক্তোরই একটি কাঁটা। ব্যস। এইটুকুই ছিল তাঁর সাজ। এরচেয়ে বেশি সাজতে তাঁর ইচ্ছেই করেনি।
কারণ আগের রাতে তাঁর অভিজ্ঞতা বড় তিক্ত ছিল। যে যুধিষ্ঠির বাইরে এত শান্ত, এত মার্জিত, এত ধীর; সেই মানুষের রূপ রাতে, শয্যায় দেখে তিনি স্তম্ভিত হয়ে গেছিলেন। তাঁর মনে হয়েছিল যুধিষ্ঠির আশাই করেন নি যে দ্রৌপদীকে তিনি শেষ পর্যন্ত পাবেন। যেন কতদিনের জমে থাকা কাম তিনি সেদিন মেটালেন। দ্রৌপদী ঘরে এসে বিছানায় বসার পর কোনও কথা বা আদরেও যাননি তিনি। দ্রৌপদী সেদিন এতটাই হতভম্ব হয়ে গেছিলেন, যে তিনি আটকাতেও পারেননি। তবে সব কিছুর শেষে ছিন্ন ভিন্ন অবস্থাতেই তিক্ত স্বরে তিনি বলেছিলেন, এভাবে আমার কাছে আর কখনও আসবেন না। শস্ত্রচালনা কিন্তু আমিও জানি। যুধিষ্ঠিরের কালো হয়ে যাওয়া মুখটা দেখে খানিক আরাম পেয়েছিলেন তিনি। তারপরেই গভীর ভাবে ঘুমিয়ে পড়ছিলেন।

আরো পড়ুন: একাকিনী শেষের কথা (পর্ব-৮) । রোহিণী ধর্মপাল


পর দিন ভোরে আবার উলুধ্বনি আর সখীদের পায়ের মলের, কঙ্কনের রুনুঝুনু আর হাসির আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেছিল। ধীরে চোখ মেলে দেখেছিলেন তিনি একা। ঘরের দরজাটি ভেজানো। সখীদের ঠেলাঠেলিতে একটু ফাঁক। তিনি আস্তে উঠে বসে গায়ে উত্তরীয়টা টেনে মুখে স্মিত হাসি এনে সখীদের ঢুকতে বলেছিলেন। সবাই একেবারে হাসিমুখে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়েছিল। মেয়েদের মধ্যে এই কিছুদিনে যে সবচেয়ে কাছের হয়ে গেছিল, সেই পত্রলেখা এসে বলেছিল, “রাজকন্যা, উঠতে হবে যে। আজ যে আপনার দ্বিতীয় বিবাহ। কত কাজ পড়ে আছে। উঠে আগে এই বাদাম মেশানো দুধটা খেয়ে নিন।” এই বলে রত্নখচিত একটি লম্বা পাত্রে ঈষদুষ্ণ দুধ ধরিয়ে দিয়েছিল। বিনাবাক্যব্যয়ে তিনি সেই দুধ এক নিঃশ্বাসে খেয়ে নিয়েছিলেন। তারপর পত্রলেখাকে বলেছিলেন, “আমি স্নান করব। ব্যবস্থা করো। আর ঘরে শুধু তুমি থাকো।”
 পত্রলেখার ইঙ্গিতে ঘর ফাঁকা হয়ে গেছিল। কৃষ্ণা তখন চাদর সরিয়ে পালঙ্কটি থেকে নামলেন। পত্রলেখা মনে মনে শিউরে উঠল। এই কদিনে এই তেজি রাজকন্যাকে দেখে সে যা বুঝেছে, তার ভিত্তিতেই সে অনুমান করতে পারল কৃষ্ণার মনের অবস্থাকে। একটিও প্রশ্ন করল না সে। বরং তাড়াতাড়ি ঘরের স্নানাগারটিতেই গিয়ে ঘড়া ঘড়া শীতল জল ঢেলে ভরে দিল স্নানের শোওয়ার জায়গাটি। তাতে ছড়িয়ে দিল রঙিন ফুলের পাপড়ি। সামান্য কপ্পূর। ঘরটি কাপড় দিয়ে ঢেকে জ্বালিয়ে দিল একখানি মাত্র প্রদীপ। ও বুঝতে পারছিল কৃষ্ণার একটু একান্ত প্রয়োজন। অন্ধকার প্রয়োজন। সব ব্যবস্থা করে ঘরে এসে দেখল কৃষ্ণা ওই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে। সে এসে হাত বাড়াতেই কৃষ্ণা এত জোরে সেই হাতটা চেপে ধরলেন, যে পত্রলেখার রীতিমত ব্যথা লাগল। তবুও সে একটুও আওয়াজ না করে কৃষ্ণাকে নিয়ে এগিয়ে গেল স্নানঘরের দিকে। ও বুঝতেই পারছিল গতকাল রাতে যা হয়েছে, এত আচম্বিতে হয়েছে, যে পাঞ্চালী তা আটকাতে পারেনি। সেই তিক্ততা ভুলতে সময় লাগবে। অথচ আজ দ্বিতীয় বিয়ে। আবার সেজেগুজে বসতে হবে বধূর আসনে। একমাত্র শীতল জলে অবগাহন যদি শরীরটাকে অন্তত ঠাণ্ডা করে।
স্নানের ঘরে ঢুকে দ্রৌপদী আস্তে আস্তে পুরো শরীরটা জলে ডুবিয়ে দিয়ে ছিলেন। কপ্পূরের মৃদু গন্ধ ফুলের সৌরভ, আর ঠাণ্ডা জলের ছোঁয়া মনটাকে যেন ভালোবাসার প্রলেপ দিচ্ছিল। পত্রলেখা তাঁর চুলে বিলি কেটে দিচ্ছিল চুপ করে। এইজন্যই এই মেয়েটিকে তাঁর এত পছন্দ। ঠিক বুঝেছে এখন পাঞ্চালীর নিজেকে গুছিয়ে নিতে অন্ধকার আর নীরবতা প্রয়োজন।
 জলের ভেতরে ডুবে কৃষ্ণা ভাবছিলেন গত রাতটির কথা। পুরো ঘরটি ফুলে ফুলে ভরিয়ে দিয়েছিল সখীরা। পালঙ্কটিকেও। ঘরের কোণে কোণে ঝুলছিল প্রদীপের মালা। যাতে সব স্পষ্ট দেখাও যায়, অথচ একটা মায়াময় আলোর আভা তৈরি হয়। পাঞ্চালী প্রথম দিনে পরেছিলেন লাল-সবুজ একটি রেশমের বস্ত্র। কাঁচুলী আর নিচের অংশটি সবুজ। উত্তরীয়টি সোনার জরির কাজ করা লাল। আর পান্নার কাজ করা অলঙ্কার। সিঁথিমৌরটি আবার টকটকে চুণীর। চুলটি বেঁধে দিয়েছিল সখীরা বড় যত্ন করে। কূরীর ছিল সেদিনের খোঁপাটির নাম। সখী কৃতিকা জানত নানা ধরণের খোঁপা বাঁধার ধরণ। সেদিন ওই খোঁপাটি বেঁধে দিয়েছিল। সঙ্গে দিয়েছিল চূণী বসানো সোনার কাঁটা। পেছন থেকে মনে হচ্ছিল যেন একটি আগুনের গোলা। পায়ে ছিল আলতা। সরু করে। হাতের তালুতেও দুটি লাল চক্র। পুরো সাজ শেষ হওয়ার পর পত্রলেখা বলেছিল, “রাজকন্যা, তুমি তো সবার চোখে মনে আজ আগুন ধরিয়ে দেবে।” পাঞ্চালী স্মিত হেসেছিলেন। তিনি জানতেন তাঁকে অপরূপ সুন্দর লাগছিল। তিনি অনুমান করেছিলেন যুধিষ্ঠির স্তব্ধ হয়ে যাবেন এই রূপ দেখে। এই রূপ বহুক্ষণ ধরে ধীরে ধীরে দেখার মতো। এই রূপের, এই ব্যক্তিত্বের মর্যাদা যে দিতে পারে না, সে কাপুরুষ। যুধিষ্ঠির প্রথম রাত থেকে দ্রৌপদীর কাছে কাপুরুষ রূপেই চিহ্নিত হয়ে গেলেন।
error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত