| 3 মার্চ 2024
Categories
প্রবন্ধ ফিচার্ড পোস্ট সাহিত্য

রুদালীদের বর্ণরেখা মহাশ্বেতা দেবী । সেলিনা হোসেন

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

মহাশ্বেতা দেবী আর নেই—মৃদু স্বরে খুব ছোট করে খবরটি টেলিফোনে আমাকে জানিয়েছিল কবি পিয়াস মজিদ। জিজ্ঞেস করেছিলাম, কখন চলে গেলেন। পিয়াস সময়ের কথা বলেছিল। আর কোনো কথা হয়নি। বাড়িতেই ছিলাম। জানালা দিয়ে তাকিয়ে বুঝলাম দুপুর শেষ হয়ে গেছে। আলো কমে এসেছে। বিকেল শুরু হয়েছে। বাইরে থেকে চোখ ফিরে আসে না। মনে হয় ছড়িয়ে থাকা আলোর মাঝে ভেসে উঠেছে দিদির চেহারা। কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল অনেকবার। ঢাকা, কলকাতা ও দিল্লিতে। বেশির ভাগ সময় সাহিত্য সম্মেলনে। কলকাতায় তাঁর বাড়িতেই গিয়েছিলাম।

মহাশ্বেতা দেবী নেই—এ খবর পেতে হবে তা আমাদের জানা ছিল। শুধু সময়ের অপেক্ষা মাত্র। কারণ তিনি অনেক দিন ধরে জটিল রোগে ভুগছিলেন ও হাসপাতালে ছিলেন। সন্ধ্যায় ফোন করে আরমা দত্ত। হ্যালো বলার সঙ্গে সঙ্গে বলে, খুকু দিদির খবর পেয়েছ? বললাম, তুমি যখনই কলকাতায় যাও, ফিরে এসে খুকু দিদির গল্প করো। এখন থেকে আর করবে না। বলবে না, খুকু দিদি জিজ্ঞেস করছে তুমি কেমন আছ। ঠিক, শুনতে পাই আরমার বিষণ্ন কণ্ঠস্বর। সঙ্গে দীর্ঘশ্বাসের শব্দ। চুপ করে থাকি আমি। আরমা আমার প্রিয়ভাজন। ভাষাসৈনিক ও ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নাতনি। মহাশ্বেতা দেবীর বাবা মনীষ ঘটক বিখ্যাত লেখক। কাকা ঋত্বিক ঘটক বিখ্যাত চিত্রপরিচালক। আরমার মা প্রতীতি দেবী তাঁদের বোন। মহাশ্বেতা দেবী ও আরমা দত্ত মামাতো-ফাপাতো বোন। আরমা প্রায়ই বলত, খুকু দিদির জন্ম ঢাকায়। বাড়ির ঠিকানা ১৫ জিন্দাবাহার লেন। দেশ ভাগ হলে ওরা চলে গেল। আমার দাদু ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত নিজের মাটি ছেড়ে যেতে চাননি।

আমি ওকে বলি, তিনি আমাদের অহংকার আরমা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছেন। আর তোমার খুকু দিদি, আমার মহাশ্বেতাদিও আমাদের গর্ব। তাঁর হাত দিয়ে বাংলা সাহিত্যের ভিন্ন মাত্রা তৈরি হয়েছে।

তা ঠিক। আরমার ভেজা কণ্ঠ শুনতে পাই। কেটে যায় ফোনের লাইন। আমার চোখ ভেজে না। আমি শোকে-বেদনায় মর্মাহত নই। কারণ তাঁর মৃত্যু আমার কাছে অপূরণীয় ক্ষতি নয়। তিনি ৯০ বছরের দীর্ঘ আয়ু পেয়েছেন। বেঁচে থাকার এ সময়ে যা করার তা করেছেন জীবনচেতনার পূর্ণ বোধে। সাহিত্য রচনা করেছেন শিল্পের জায়গা থেকে—বিচিত্র বিষয় দিয়ে সাহিত্যের যাত্রা প্রসারিত করেছেন। মানুষের প্রান্তিকতা ঘোচাতে চেয়েছেন অধিকার আদায়ের লড়াই থেকে। মানবিক কণ্ঠস্বরকে উচ্চগ্রামে রেখে বলে গেছেন নারী-পুরুষের যৌথ জীবনের কথা। ভূমির অধিকারের ন্যায্য দাবিতে সরকারের সমালোচনা করেছেন মানুষের পক্ষে অবস্থান নিয়ে। এমন মানুষের শারীরিক মৃত্যু হবে—এটি প্রকৃতির নিয়মের সরল সত্য। কিন্তু জেগে থাকবে তাঁর দেখিয়ে যাওয়া পথ। সে পথে হাঁটতে হবে অন্যদের। স্মরণ করতে হবে তাঁকে। এই অর্থে তাঁর কোনো মৃত্যু নেই। তিনি স্মরণীয়, তিনি বরণীয়। তিনি তাঁর ৯০ বছরের জীবনযাপনে সমাজ, দেশ, মানুষকে যা দেওয়ার তার সবটুকু দিয়েছেন।

২০০৮ সালে সম্পাদনা করেছিলাম ‘দক্ষিণ এশিয়ার নারীবাদী গল্প’ শিরোনামে একটি গ্রন্থ। এই সংকলনে মহাশ্বেতা দেবীর যে গল্পটি নিয়েছিলাম, তার নাম ‘রুদালী’। এই গল্পটি চলচ্চিত্র হয়েছে। গল্পটি পড়ে আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। বিষয়ের নতুনত্ব আমাকে বিস্মিত করেছিল, যখন পর্যন্ত ‘রুদালী’ শব্দের অর্থ আমার জানা ছিল না। গল্পের ভালো লাগার মোহে আচ্ছন্ন ছিলাম। এ লেখাটি লেখার সময় মনে হলো ‘রুদালী’ শব্দের অর্থটি জানা দরকার। বাড়িতে যে কয়টি অভিধান আছে, দেখলাম কোনো অভিধানে শব্দটি নেই। ফোন করলাম স্বরোচিষ সরকারকে। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান’-এ সহযোগী সম্পাদক স্বরোচিষ। বললাম, ‘রুদালী’ শব্দের অর্থ কী? ও বলল, এটি বাংলা শব্দ নয়। সে জন্য আমাদের অভিধানে নেই। এই শব্দের ব্যাখ্যা হলো, এরা টাকার বিনিময়ে ভাড়া করা নারী। এদের মৃত বাড়িতে গিয়ে কান্নাকাটি করতে হয়। বিনিময়ে টাকা পায়। এই নারীরা মূলত রাজস্থানের নিম্নবর্গের বিভিন্ন গোত্রের। এভাবে কাঁদানোর রীতি রাজস্থানের সংস্কৃতির অংশ। স্বরোচিষের কাছ থেকে রুদালীদের চিনতে পেরে মহাশ্বেতা দেবীর সৃজনের মাত্রা আমাকে আচ্ছন্ন করে।

গল্পের নায়িকার নাম শনিচরী। নিজের কেউ মারা গেলে শনিচরী কান্নার সময় পায় না। মৃতের সত্কারের জন্য নানা কাজ করতে হয়। বর্ণনা এমন : ‘শাশুড়ি মরলে শনিচরী কাঁদেনি। ওর বর আর ভাশুর—শাশুড়ির দুই ছেলেকেই হাজতে পুরেছিল মালিক-মহাজন-রামাবতার সিং। বুড়িকে দাহ করার ব্যবস্থা করতে শনিচরী এত ব্যস্ত ছিল যে কাঁদার সময় হয়নি। হয়নি তো হয়নি! বুড়ি যে জ্বালান জ্বালিয়ে গেছে, কাঁদলেও তো শনিচরীর আঁচল ভিজত না।’ এরপর মারা গেল শনিচরীর ভাশুর আর জা। তখনো কাঁদা হলো না শনিচরীর—‘কাঁদবে, না লাশ জ্বালাবার, সস্তায় শ্রাদ্ধ সারবার কথা ভাববে? শনিচরীর জীবন তো এভাবেই কাটে।

কারণ ওকে কাঁদতে হবে মৃত বাড়িতে গিয়ে। টাকা আয় করতে হবে।

স্বামীর মৃত্যুতেও কাঁদা হলো না শনিচরীর। একমাত্র ছেলে বুধুয়াকে নিয়ে রান্ডি হলো। ঘটনা দাঁড়াল এমন যে মোহনলালকে তুষ্ট করতে, রামাবতারের কাছে পাঁচ বছর ক্ষেত-বেগারি খেটে ৫০ টাকা শোধ করব—খতে টিপসই দিয়ে কুড়ি টাকা নিতে, সে টাকায় বুধুয়ার বাপের শ্রাদ্ধ করতে, শ্রাদ্ধ মেটাতে কচি ছেলে নিয়ে হা-ভাত! জো ভাত! করতে করতে এমন ব্যস্ত থাকে শনিচরী যে বুধুয়ার বাপের জন্য আর কাঁদা হয়নি।

এক বছর পর খত দিয়ে টাকা নেওয়ার দায় শোধ করার জন্য দিনমজুরির সময় শনিচরী অন্য মজুরদের বলল, ‘আজ আমি বুধুয়ার বাপের জন্য কাঁদব। বুক ফাটিয়ে কাঁদব।’

অন্য মজুররা অবাক হলো। এত দিন পরে কাঁদবে কেন শনিচরী? তাও আবার বুক ফাটিয়ে কান্না? ওদের জিজ্ঞাসার উত্তরে শনিচরী বলল, ‘তোরা মজুরি নিয়ে ঘর যাবি। আমি খত লিখে বসে আছি। আমি যাব চারটি ভুট্টার ছাতু নিয়ে। তাই কাঁদব। আমার কান্না পায় না?’

মৃত স্বামীর জন্য নয়, কাঁদতে হয় ভাতের জন্য। এভাবেই নিম্নবর্গের মানুষের জীবন চিত্রিত হয়েছে মহাশ্বেতা দেবীর গল্পে। এরপর ছেলে বুধুয়া মারা গেছে, এখনো কাঁদতে পারেনি শনিচরী। শুধু দুই চোখ ভরে তাকিয়ে দেখল খিদের জ্বালায় বুধুয়ার বউ ঘর ছেড়ে গেল। যে পুরুষদের ও ভাই ডেকেছিল তারা ওকে রান্ডি ছাড়া আর কিছু ভাবেনি। এসব নিয়ে শনিচরীর ভাবনা ভাঙিয়ে দিয়ে অন্যরা বলল, ‘অত পাপ-পুণ্য দেখাতে চাস না বুধুয়ার মা। পাপ-পুণ্য মালিকদের এখতিয়ারের জিনিস। ওরাই সে হিসাব ভালো বোঝে। তুই-আমি বুঝি খিদের হিসাব।’ শেষ পর্যন্ত শনিচরী কাঁদতে গেল গম্ভীরা সিংয়ের মৃত্যুর পরে। তার আগে ওকে অনেক রান্ডি জোগাড় করতে হলো। বেশ্যাপাড়ায় গিয়ে হাজির হলো ও। বিধবাদের জড়ো করলে যুবতী বেশ্যারা বলল, আমরা যাব না? শনিচরী পরিষ্কার কণ্ঠে বলল, সবাই চল। বুড়ো হলে এ কাজ তো করতে হবে, আমি থাকতে থাকতে তোদের হাতেখড়ি করে দিই।’

গল্পের শেষে দেখা যাচ্ছে, ‘পেটফোলা লাশ ঘিরে রুদালী রান্ডিরা মাথা কুটে কাঁদতে লাগল।’ মাথা কুটে কাঁদলে পাওয়া যায় ২০০ টাকা। গল্পের শেষ হলো শনিচরীর কান্না দিয়ে।

নারীবাদী প্রেক্ষাপটে এ এক অসাধারণ গল্প। অন্যদিকে নিম্নবর্গের মানুষের ভাতের কান্না প্রিয়জনের মৃত্যু শোকের চেয়ে প্রবল হয়ে ওঠে। এও এক কঠিন সত্য। জীবনের এই অনুচ্চারিত দিক সাহিত্যে এনেছিলেন তিনি। তাই তাঁকে স্মরণে রাখা মৃত্যুরও অধিক।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত