মাঝে মাঝে আমি কার কাছে যাব?

মাকে ফোন করা হয়ে গেলে আমার আরও একা লাগতে থাকে। একফালি বারান্দা, ঘরে প্লাস্টিকের চেয়ার অথবা স্টিলের খাটে পরিপাটি বিছানা-এটুকুই জায়গা আমার। প্রতিদিনের। পাশের খালি প্লটে গজিয়ে ওঠা অচেনা গাছগুলোর ডালে বসা দুয়েকটা পাখির ডাক বা রাস্তা থেকে ছিটকে আসা শব্দ আমাকে একেবারেই সঙ্গ দিতে পারে না। আমার নিকলা বিলের ধানক্ষেতের কথা মনে পড়ে। গাঢ় সবুজ ধানক্ষেতের উপর চৈত্রের রোদে আলোর নাচন আমার জীবনের সেরা ম্যাজিক। আর আলুথালু বাতাস। আর পথের জোনাকী। ভাঁটফুলের ঝাড়ের পাশ দিয়ে ছুটে যাওয়া রাস্তায় আমি যেন স্বপ্নে পথ চলি। সাথে সাথে চলে জোনাকীর ঝাঁক। রাতের জোনাকীরা জানে না, কী স্বর্ণালী আলো জ্বেলে তারা পথিকের প্রাণে জোছনা বুনে দেয়। জানি কী আমরাও, কী বিবশ বেদনার বিভ্রম বয়ে নিয়ে আমাদের প্রতিদিন হাসি হাসি খেলা। আহারে মগ্ন রাত, আহারে নিকলা বিলের হারানো জোনাকীর আলোসুর, মাকে ফোন করা হয়ে গেলে আমার আর কিছুই করার নেই! আমি এখন কার কাছে যাব?

দিনে তো রোদ ছিল, কথা ছিল, ইমেইল-ফেসবুক। মানুষেরা ছিল নানা কথা নিয়ে, নানা ব্যথা নিয়ে, সশরীরে অথবা ওয়েবে উদ্বায়ু। এত এত কথা বলা, এত এত ছোঁয়াছুঁয়ি, এত এত স্বপ্ন-সংগ্রাম-টানাপোড়েনের দিনরাত পার হয়ে এসে আমার একলা বিকেলে নদীপাড়ে শৈশবের নলখাগড়ার গোড়া চিবাতে ইচ্ছে করে। এই আলো, এই ব্যস্ততার মোহন মায়া আমাকে আরও একা করে দেয়। নিকলা কুড়ির পানিতে ডোবা কলমীর পাশে বসে আমার খুব কাঁদতে ইচ্ছে করে। জলের গায়ে কোমল কলমীর সেই মায়াময় স্নিগ্ধতাকে আর একবার ছুঁয়ে দেখার জন্য আমার আবার ফিরতি টিকেট কাটতে ইচ্ছে করে। এই চৈত্রের রাতে কোলাহলের শহর শান্ত হয়ে এলে বুকের পুকুরে আপনমনে ভাসতে থাকা হিজল ফুল খোঁজা ছাড়া আমার আর কিছুই করার থাকে না।

নিকলা বিলের ভাঁটফুলের পথগুলো সব হারিয়ে গেলে মাঝে মাঝে আমি কার কাছে যাব?

১৬ এপ্রিল ২০১৮; রাজশাহী

.

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত