মল্লিকা সেনগুপ্ত’র আজ জন্মদিন

 

চোখ

কিছুতেই বোঝে না সে ভালবাসা শিয়রে এসেছে
বিছানার পাশে রাখা ছোট্ট সাদা আলো
ভালবাসা সন্তর্পণে সেখানে এসেছে |
আঁচল উড়তে দেখে যুবকটি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে উড়ে আসা ঘোড়া দেখে—
গবেষণাগারে ফেলে এসেছে সে আতস চশমা
আকুলতা স্পর্শ করে তাকে
তবু সে চেনে না চোখ, যে নয়নে তার জন্য রহস্য জমেছে ।

 

 

 

সুজাতা, ১১ মে ১৯৯৮  

(ঐ তারিখে ভারত যে পরমাণু বোমাটি ফাটায়, তার নাম স্মাইলিং বুদ্ধ)

কোথায়, কোথায় তিনি ?
ওরা যে বলল এই মরুস্থানে তিনি হাসছেন !

আমাকে তোমরা কেন যেতে দিচ্ছ না
এত পুলিশ পাহারা, লোকজন, অস্ত্রসম্ভার !
তোমরা বুঝতে পারছ না, উপোসি আছেন তিনি
আমি এই পরমান্ন নিয়ে তাঁর কাছে যেতে চাই
কয়েক শতাব্দি ধরে খুঁজতে খুঁজতে
আজ এত দিন পরে সন্ধান পেযেছি তাঁর এই মরুদেশে

বুদ্ধপূর্ণিমার রাত
ভয়ংকর শব্দ লেগে পরমান্ন চলকে পড়ল
চারিদিকে হৈ হৈ হাততালি, জনবিস্ফোরণ
সবাই বলল, দেখো, তিনি হাসছেন

তিনি হাসছেন ! এই ভয়-শব্দ  তাঁরই হাসির |
কাকে তোরা বেদিতে বসালি
কাকে তোরা সৈন্যদল পাহারা দিচ্ছিস
এ তো আলোকসামান্য সে মানব নয় !
এত ধোঁয়া, এত শব্দ  এত সৈন্যদল দিয়ে ঘেরা যে মানুষ
তাঁর পরমান্ন আমি ফিরিয়ে নিচ্ছি
ওই যারা ঊর্ধ্বশ্বাসে ঘর ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে
তাঁর পরমান্ন আমি সেই সব নিরন্নকে ভাগ করে দেব |

পারমানবিক বুদ্ধ এই দেশে থাকুক উপোসি |

 

 

 

 

 

মারের আগমন 

সুগন্ধ পুরুষ এক এসেছে আমার দরজায় |
তাঁকে ভালবাসি কি না কী করে বুঝবো ?
চিত্রিত শার্দুল এক এসেছেন এই হিমঘরে
রূপবান না হলেও সে তো স্বয়ংশাসিত এক মহারাজ
চুপিচুপি চুরি করে সে এখানে থাকতে এসেছে
উজ্জ্বল পোশাকে তার সন্মোহন, অভিমান, রাগ
প্রশস্ত দরজাবাহু এসেছেন মৃত্যুরূপী মার
ওই কূপে ঝাঁপ দিলে মৃত্যু নিশ্চিত
এ কথা জেনেও আমি উঁকি দিই, রামধনু দেখি
দেখি রাত্রির গোলাপ, একটি একটি করে পরত খুলছে
শেষে শুধু বাকি থাকে পুরুষ কেশর
মহাকাল আসছেন আজ রাতে বরফ চৌকাঠে |

 

 

 

 

 

স্বামীর কালো হাত

মশারি গুঁজে দিয়ে যেই সে শোয় তার
স্বামীর কালো হাত হাতড়ে খুঁজে নিল
দেহের সাপব্যাঙ, লাগছে ছাড় দেখি
ক্রোধে সে কালো হাত মুচড়ে দিল বুক
বলল, শোনো শ্বেতা, ঢলানি করবে না
কখনও যদি ওই আকাশে ধ্রুবতারা
তোমাকে ইশারায় ডাকছে দেখি আমি
ভীষণ গাড্ডায় তুমিও পড়ে যাবে,
শ্বেতার শ্বেত উরু শূন্যে দুলে ওঠে
আঁকড়ে ধরে পিঠ, স্বামীর কালো পিঠ |

 

 

 

 

 

ফ্রয়েডকে খোলা চিঠি 

পুরুষের দেহে এক বাড়তি প্রত্যঙ্গ
দিয়েছে শাশ্বত শক্তি, পৃথিবীর মালিকানা তাকে
ফ্রয়েডবাবুর মতে ওটি নেই বলে নারী হীনমন্য থাকে
পায়ের তলায় থেকে ঈর্ষা করে পৌরুষের প্রতি
প্রকৃতি সদয় নয়
পুরুষ সদয় নয়
সন্তান সদয় নয়
মেয়েদের প্রতি শুধু ফ্রয়েড সদয় !
এই দয়া কে চেয়েছে ! চিত্রাঙ্গদা ! জোন অব্ আর্ক !
সিমোন দ্য বোভোয়া না শ্যামল দ্রৌপদী !
“পেনিস-এনভি” বলে একটি শব্দ
পৃথিবীতে এনেছেন ফ্রয়েড সাহেব
ওই যে বাড়তি শুধু পুরুষের থাকে
ওই নাকি মেয়েদের কমতি বানায়
তাই তারা শিশুকালে টলমল করে
বালিকা বয়সে তাই শিবলিঙ্গ আকন্দে সাজায়
খেলাঘর ভরে ওঠে পুতুলে ও বাসনকোসনে
কারণ সে নাকি তার মায়ের প্রতিভূ |
অন্যদিকে রোহিতের জন্য থাকে শৌর্যপ্রস্তুতি
জংলাসবুজ উর্দি মার্কিন সেনারা তার ঘরে
ছোটায় মেশিনগান, ট্রা রা রা রা শব্দে সুগঠিত
হয়ে ওঠে পুরুষের আক্রমণ
শাণিত নখরে যদি গাল চিরে দেয়
দিদিমারা খুশি হয় বারতি বীরত্বে |
ওই যে বাড়তিটুকু শরীরের, ওই ছাড়পত্র
ওই তাকে পৃথিবীর মালিক বানাবে
রোহিত মালিক হবে কোন পৃথিবীর ?
যেখানে রোহিতা তার সহকারী ! অধম লিঙ্গ !
ছুটন্ত ঘোড়ার পিঠে খোলা তলোয়ার
বিশ্ববিজয়ে যাবে সম্রাট রোহিত
আর তাকে যুদ্ধ সাজ পরাবে তার মা বোন বউ
এই শুধু চেয়েছেন আপনি ফ্রয়েড !
উল্টোদিক থেকে যদি ঘোটকীর পিঠে কোনও নারী যোদ্ধা আসে
সে কী অস্ত্র ফেলে দেবে ভীষ্মের মতন—
“নারীর বিরুদ্ধে আমি অস্ত্র ধরবো না”
অর্থাত নারীকে আমি দেব না অস্ত্রের অধিকার—
এই লিঙ্গরাজনীতি আদি পুরুষের
ফ্রয়েড আপনি নিজে বাড়তির দলে বলে ধরেই নিলেন
মেয়েরা কমতি, তাই পুরুষের প্রতি তারা ঈর্ষাকাতর !
আমার শৈশবে কোনও লিঙ্গঈর্ষা কখনও ছিল না
আত্মপরিচয়ে আমি সম্পূর্ণ ছিলাম
আজও আমি দ্বিধাহীন সম্পূর্ণ মানুষী
তৃতীয়বিশ্বের এক স্পর্শকাতর কালো মেয়ে
আজ থেকে আপনার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে
কে অধম কে উত্তম বাড়তি কে কমতি কোনটা—
এই কূট তর্কের মিমাংসা করবার ভার
আপনাকে কে দিয়েছে ফ্রয়েড সাহেব !

 

 

 

 

তেভাগার ডায়েরি

আমি বিলাসিনীদের কাপড়ে নক্সা তুলি, সামান্য জীবিকা
পোকা আলু আর আতপ দেয় হাত ভরে
ভাসুরের কাছাকাছি এলোচুলে থাকি না কখনও

খোঁপায় জড়িয়ে নেব লাল ফিতে, কাস্তের ফলক
ক্ষেতের ফসল তিন ভাগ হবে, দুই ভাগ গৃহমূষিকের
উনুনের চার পাশে বসে হাত গরম করছি |

দূরের চাষিকে শালপাতা মুড়ে খবর পাঠাও
আনো কেরোসিন, যদি দরকার হয় আগুন জ্বালাব

 

 

 

 

বালিকা ও দুষ্টু লোক

বালিকাকে যৌনহেনস্থার দায়ে স্কুলবাসের ড্রাইভার ও হেল্পার ধৃত–
সংবাদ, আগস্ট, ২০০১

স্কুলবাসের বাচ্চা মেয়ে
সবার শেষে নামে
সঙ্গীগুলো বিদায় নিলে
তার কেন গা ঘামে !

বাসের কাকু বাসের চাচা
কেমন যেন করে
হঠাত গাড়ি থামিয়ে দিয়ে
আমায় নিয়ে পড়ে

কাকু জেঠুর মতন নয়
দুষ্টু লোক ওরা
মাগো আমার বাস ছাড়িয়ে
দাও না সাদা ঘোড়া !

দুষ্টু কাকু দুষ্টু চাচা
থাকুক না তার ঘরে
বাচ্চা মেয়ের সঙ্গে কেন
অসভ্যতা করে !

এই পৃথিবী সাদা কালোয়
মন্দ এবং ভাল
তবু কেন এই জীবনে
ঘনিয়ে এল কালো ?

আমার কিছু ভাল্লাগে না
স্কুলের বাসে ভয়
মাগো তোমার পায়ে পড়ি
ওই বাসে আর নয়

আমাকে আর কিছুতেই যেন
না ছুঁতে পারে ওরা
আমাকে দাও সবুজ মাঠ
পক্ষীরাজ ঘোড়া |

 

 

 

 

 

অনাবাসির চিঠি

এখানে জীবন বড় মায়াময়
বদলে গিয়েছে সমাজ সময়
এখানে সুখের ঘর বানিয়েছি
তপ্ত দুপুরে সারা দিন এ সি
তবু মনে পড়ে ধূ ধূ বাংলায়
বন্ধুরা মিলে শিতে বরষায়
চায়ের কাপেই তুলেছি তুফান
রকে বসে বসে সিনেমার গান

মন খারাপের বিকেলবেলায়
একটি মেয়েকে মনে পড়ে যায়
দেশে ফেলে আসা সেই সুখস্মৃতি
ভোলা তো গেল না প্রথম পিরিতি
এ দেশে আরাম এ দেশে ডলার
ছেলে মেয়ে বৌ ফিরবে না আর
এখন এখানে নামছে শেকড়
জমিও কিনেছি দু-এক একর

এখানে অশেষ অঢেল খাবার
এখানে পিত্জা হ্যামবার্গার
তবুও মায়ের হাতের শুক্ তো
মনে পড়লেই ভিষণ দুখ তো !
এখানে বৌরা স্বয়ংসিদ্ধা
নিজে হাতে কাজ তরুণী বৃদ্ধা
তবু মনে পড়ে কলেজের সেই
ছিপছিপে রোগা তরুণীটিকেই
বুকে দাগা দিয়ে গিয়েছিল চলে
আজও ডাক দেয় স্মৃতির অতলে

এখানে সুখের ঘর বানিয়েছি
তবু মনে হয় কি যেন হল না
বুক খাঁ খাঁ করে, বলো না বলো না
সুখপাখিটিকে হারিয়ে ফেলেছি |

 

 

 

 

ভাষা

ভাষা মানে তুমি আমি
ভাষা মানে বাংলা
ভাষা মানে বরাকর
থেকে ভাতজাংলা
বাজারের দোকানের
রাস্তার এ ভাষা
কবিতার স্লোগানের
বচসার এ ভাষা
বাংলায় কথা বলি
বাংলায় ছন্দ
তাই নিয়ে এত কথা
এত কেন দ্বন্দ্ব !
আমাদের বেঁচে থাকা
দাঁড়াবার ভঙ্গি
আমাদের শিকড়ের
পিপাসার সঙ্গী
আজ যদি সেই ভাষা
পথে পথে ভিখারি
যদি তাকে তাড়া করে
নিষ্ঠুর শিকারি
তবু ঘুম ভাঙবে না
পশ্চিমবঙ্গী !
একবার জেগে ওঠো
যুদ্ধের সঙ্গী |

 

 

 

 

 

আপনি বলুন, মার্কস

ছড়া যে বানিয়েছিল, কাঁথা বুনেছিল
দ্রাবিড় যে মেয়ে এসে গমবোনা শুরু করেছিল
আর্যপুরুষের ক্ষেতে, যে লালন করেছিল শিশু
সে যদি শ্রমিক নয়, শ্রম কাকে বলে ?

আপনি বলুন মার্কস, কে শ্রমিক, কে শ্রমিক নয়
নতুনযন্ত্রের যারা মাসমাইনের কারিগর
শুধু তারা শ্রম করে !
শিল্পযুগ যাকে বস্তি উপহার দিল
সেই শ্রমিকগৃহিণী
প্রতিদিন জল তোলে, ঘর মোছে, খাবার বানায়
হাড়ভাঙ্গা খাটুনির শেষে রাত হলে
ছেলেকে পিট্টি দিয়ে বসে বসে কাঁদে
সেও কি শ্রমিক নয় !
আপনি বলুন মার্কস, শ্রম কাকে বলে !

গৃহশ্রমে মজুরী হয়না বলে মেয়েগুলি শুধু
ঘরে বসে বিপ্লবীর ভাত রেঁধে দেবে
আর কমরেড শুধু যার হাতে কাস্তে হাতুড়ি !
আপনাকে মানায় না এই অবিচার

কখনো বিপ্লব হলে
পৃথিবীর স্বর্গরাজ্য হবে
শ্রেণীহীন রাস্ট্রহীন আলোপৃথিবীর সেই দেশে
আপনি বলুন মার্কস, মেয়েরা কি বিপ্লবের সেবাদাসী
হবে ?

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত