পাঠিকা মেয়ের মুখোমুখি লেখিকা মা (শেষ পর্ব)

সম্পূর্ণা মুখোপাধ্যায় এবং সোনালি মুখোপাধ্যায় ভট্টাচার্য।

মা লেখে সন্তান পড়ে,অন্তরালে সমালোচনা ও হয়ত করে। কিন্তু সন্তান পাঠক হয়ে মা কে প্রশ্ন করছে,
এমন প্রায়শই দেখা যায় না। পাঠক মেয়ের মুখোমুখি লেখক মা, তাদের মধ্যে যে কথোপকথন তার চুম্বক অংশ রেকর্ড  করেছে ইরাবতী টিম। লেখক সোনালী মুখোপাধ্যায় কে ভিন্নধারার অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে পাঠক মেয়ে সম্পূর্ণা মুখোপাধ্যায়ের। সেই প্রশ্নগুলোয় উঠে এসেছে লেখকের শৈশব থেকে বতর্মান। লেখার নানাদিক। আজ ইরাবতীর পাঠকদের জন্য রইল সেই কথোপকথনের শেষ কিস্তি।


মেয়ে : কিন্তু ব্যাপারটা ব্যজস্তুতি হল না কি?

মা : কেন?

মেয়ে : কলকাতা এয়ারপোর্ট নেতাজী সুভাসের নামে। বাঙালির আর দুই গর্বের নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং স্বামী বিবেকানন্দ।

তা এই তিন জনই ত বিদেশযাত্রী। তিন জনই  বহু লড়াই করে দেশে কিছু পরিবর্তন আনতে পেরেছেন।তো, তাঁদের কথা শিশুদের সামনে উদাহরণ হিসেবে ধরে কি লাভ যদি গন্ডীর বাইরে পা রাখাটাই তাঁদের অপরাধ হয়ে দাঁড়ায়?

মা: আহা আহা, বাকিটাও বল?

তিনজনেই জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর পরেও দেশবাসীর কাছে প্রভূত গালি খেয়েছেন।

যারা তলিয়ে ভাববে, তারা সারসত্য বুঝেই যাবে যে, লোকে কি বলল বিন্দুমাত্র গ্রাহ্য করাটা বোকামি।

ন্যায় অন্যায় কিছু চিরন্তন মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে আছে সারা পৃথিবীতেই। সেই সরল রেখাতেই পা ফেলে হেঁটে যাওয়াটাই মগজওয়ালা মানুষের কাজ।

মেয়ে : সে ঠিক আছে,  কিন্তু ভিন রাজ্যের মানুষের সংগে তর্কাতর্কি শুরু হলেই ত লোকে, “ আরে হামরা রবীন্দ্রনাথ কো নোবেল মিলা তুম কো ক্যা পতা?  “ বলবেনই…

মা : হ্যাঁ। আমরা বলব।

কিন্তু রবিবাবুর একটি গভীর লেখা বা প্রবন্ধ ইত্যাদি পড়ব না, বা সে নিয়ে ভাবব ও না?

ফাংশানে শ্যামা শাপমোচনে মুখে চারটি গলে পড়া মেকআপ আর মাথায় ফুল লাগিয়ে ন্যাকামি করার সুযোগ হবে বলে রবিঠাকুরের নাম আওড়াব। রবিবাবু বেঁচে থাকলে গালিয়ে এদের ভূত ভাগিয়ে দিতেন,  আমি নিশ্চিত।

অন্য দুজনের কথা তো ছেড়েই  দিলাম।

মেয়ে : বেশ। সরলরেখার কথায় আসি। আপনার লেখার পথটা কি খুব সরলরেখায় চলছে ?

মা : হ্যাঁ হ্যাঁ। একদম।

প্রেসিডেন্সী কলেজের মেইনগেটের মুখোমুখি একটা সোজা সরু মতন গলি হেদোর সুইমিংপুলের দেওয়াল বরাবর গিয়ে পৌঁছায় প্যারামাউন্টের শরবতের দোকানের সামনে। সেই রাস্তা ধরে হাতে কাগজের গোছা নিয়ে আমার ১৮ না পেরোনো পক্ক কন্যা আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে বলল, এই তো পাশের ভাঙা ভাঙা বাড়িটাই সপ্তর্ষি প্রকাশনার অফিস কেনই বা খুঁজে পাও না। চলো পান্ডুলিপি জমা দিয়ে আসি। ব্যাস! সেই তো, প্রথম বই, ” প ” এর সূচনা হয়ে গেল।

মেয়ে : সূচনা না হয় হল । তারপর ? বাকি যারা লেখেন তারা বিশের বা তিরিশের কোঠা থেকে শুরু করেন লড়াই । আপনি যে সাতচল্লিশে শুরু করে  বাহান্নর মধ্যে খান সাতেক বই , পত্র পত্রিকা ইত্যাদি ছাপিয়ে ঢাকা থেকেও বই বেরিয়েছে জানাচ্ছেন । জাতে উঠেছেন মনে হচ্ছে কি ?

মা : না , না । আমি কৌলীন্যহীন কলম। আগে তো পত্রিকা , লিটিল ম্যাগ ইত্যাদিতে লেখা পাঠানোর কথা জানতামই না ।

আমার একবারে ইস্কুলের বারো ক্লাসের লেখা থেকে শুরু করে, আজকের ডায়েরির পাতা থেকেও কুড়িয়ে নেওয়া লেখা দিয়ে সপ্তর্ষি প্রকাশনের সৌরভ মুখুজ্জে মহাশয় পরম যত্নে চার ফর্মার বই , ইউনিক প্রচ্ছদে সাজিয়ে ছাপিয়ে দিয়েছিলেন ।

অনুজপ্রতিম মস্ত সাহিত্যিক বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় এঁদের কাছে পাঠিয়েছিলেন ভাগ্যিস। সপ্তর্ষি বহুদিনের অক্ষর ব্যবসায়ী ।

এঁরা এত খুশি হয়ে ফর্মা কাকে বলে , প্রুফ কি করে দেখে , সাহিত্য জগতের কাদের আমার চেনা উচিত , ইত্যাদি যত্ন করে শিখিয়েছিলেন , বয়েসে ঢের ছোট এই মানুষদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই ।

মেয়ে:  দেখুন মা ম দ , মানে মাইকেল মধুসূদন দত্তর নাকি তিন জন লিখে দেবার লোক ছিল। আপনি একা একা লেখেন, তায় আবার কম্পিউটারে! এত কষ্ট করে লাভ কি ?

মা : কষ্ট ?

হ্যাঁ হ্যাঁ । সেই মা ম দ এর প্রতিও বিশেষ কৃতজ্ঞতা আগে জানিয়ে নিই। ওনার লেখা সম্পূর্না আর সর্বজিত বাবুর পড়ার সিলেবাসে থাকত । দুজনেরই খাতায় লেখা থাকত মা ম দ।

আমি এনাদের ক্লাসের প্রশ্ন উত্তর লিখে দেবার চেষ্টায় থাকতাম আর তাতেই তো আবার লেখালেখির কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। সেই তো মস্ত পাওয়া। অক্ষর নিয়ে খেলা আমার বাবামশাই আর আমার বেশ একটা নেশার জায়গা। ইংরেজী , রিডার্স ডাইজেস্ট পড়ে, বা মা সঙ্গে যোগ দিলে সংস্কৃত শব্দ ভেঙ্গে ভেঙ্গে। এইগুলো আমাদের তিন জনের বরাবরের আনন্দের উঠোন ।

আমার ছানাদের ক্লাসের পড়ার খাতা আমায় আবার সেই আনন্দে ফেরত নিয়ে গিয়েছিল। মনে পড়ে গিয়েছিল ডঃ মুখার্জীর , যে সে আসলে বিদ্যার্থী রঞ্জন পত্রিকার সম্পাদক শ্রী বলাই ভট্টাচার্য এবং সম্পাদিকা শ্রীমতী দীপালি ভট্টাচার্যের একমাত্র পুপু।

পুপুর বাবা মা চাকুরে ।

তাই ক্লাস টু থ্রির মধ্যে পুপু একা ঘরে বসে বড়ু চন্ডীদাস, বিদ্যাপতি , গোবিন্দদাস শেষ করত দুপুরে ভাত খেতে খেতে। বইগুলো বাবা মায়ের সম্পত্তি । অনেক গুলিই বাংলা অনার্সের টীকা শুদ্ধ। তাই মৈথিলী ব্রজবুলি বুঝতে ছোট মানুষের সুবিধে হত ।

সেই মেঘনাদবধ খানা মুখস্ত হয়ে গেছিল ছন্দের লোভে। একেবারে আগাগোড়া মুখস্ত বলে যেতে পারত মেয়েটা। সব মনে পড়ে যাচ্ছিল বাচ্চাদের ছোটবেলার অক্ষর ছুঁয়ে তারপর মাও যেই চলে গেলেন ২০০৯ , মনে হল নাহ , পুপুকে হারিয়ে যেতে দিলে চলবে না। সাহিত্যের সন্তান পুপু বলল  আমার শব্দদের টিকিয়ে রাখো। “আমি বাঁচতে চাই।” সেই থেকে লিখতে কষ্ট নেই। অক্ষর মানেই অক্ষয় হয়ে বেঁচে থাকা।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত