মানভূমের ভাষার আন্দোলন


আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে যতগুলো ভাষা-আন্দোলন হয়েছে তার মধ্যে দীর্ঘতম ভাষা-আন্দোলন হল মান ভূমের ভাষা-আন্দোলন। এ-আন্দোলন দীর্ঘ পাঁচ-ছয় বছর স্থায়িত্ব লাভের পর সফলতার মুখ দেখে। বঙ্গভঙ্গ সময় থেকে মান ভূম জেলা বিহার-ওড়িশায় অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা লাভের পর পৃথক বিহারে অন্তর্ভুক্ত হয় মানভূম। বাংলা ভাষাভাষী তথা বাঙালি অধ্যুষিত জেলা ছিল এই মানভূম।

মানভূম জেলা অর্থাৎ বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের পুরুলিয়া জেলায় বাংলা ভাষা-আন্দোলন ১৯৪০-এর দশক থেকে শুরু হয়ে ১৯৫০-এর দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত চলে। তৎকালীন বিহার রাজ্যের মানভূম জেলায় বসবাসকারী বাংলা ভাষাভাষীদের মধ্যে জোর করে চাপিয়ে দিতে চেষ্টা করে হিন্দি ভাষা। ফলে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে নতুন জেলা তৈরি করতে বাধ্য হয় সরকার।

যেসব দাবিকে ঘিরে মানভূম ভাষা-আন্দোলন দানা বাধে সেগুলো হল, বাংলা ভাষায় কথা বলা, বাংলা ভাষায় লেখা, স্কুল-কলেজে হিন্দি ভাষার পরিবর্তে বাংলা ভাষায় পড়াশুনার ব্যবস্থা করা। প্রশাসন বাঙালিদের ভাষার অধিকারে হস্তক্ষেপ করে প্রাথমিক শিক্ষায় হিন্দি ভাষাকে বাধ্যতামূলকভাবে চাপিয়ে দেয়। জেলা-পর্যায়ের স্কুলগুলোতেও বাংলা ভাষায় পড়াশুনা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেয়। মানভূমের প্রশাসনিক ভাষা হিসেবে হিন্দি স্থান করে নেয়। লক্ষ লক্ষ বাংলা ভাষাভাষী বাঙালিকে তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষা লাভ করা থেকে বঞ্চিত করা হয়, ভাষার অধিকার হরণ করা হয়। ফলে গর্জে ওঠে বাঙালিরা। শিক্ষা ও প্রশাসনিক স্তরে তাদের মাতৃভাষা বাংলাকে স্বীকৃতির জন্য শুরু হয় আন্দোলন। আন্দোলনকারীদের ওপর নানারকম নিপীড়ন-নির্যাতন চালানো হতে থাকে। অনেককে মিথ্যে মামলায় জড়িয়ে দেওয়া হয়, অনেককে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। ভাষা-আন্দোলনে প্রেরণা জোগাতে থাকে দুটো গান। একটি গান হল টুসু গান-

শোন বিহারি ভাই, তরা রাখতে লাড়বি ডাং দেখাই
এক ভারতের ভাইয়ে ভাইয়ে মাতৃভাষায় রাজ্য চাই।
আর অন্য গানটি হল অরুণ ঘোষের-
আমার বাংলাভাষা প্রাণের ভাষা রে।

এ-আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর আকার ধারণ করতে থাকে। স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং বাংলা ভাষা আন্দোলনের দুইজন নারী কর্মী লাবণ্য প্রভা ঘোষ এবং ভাবিনী মাহাতো আর সেই আন্দোলনের ফলে ১৯৫৩ সালের ২৯শে ডিসেম্বর ভারত সরকার সৈয়দ ফজল আলির সভাপতিত্বে হৃদয়নাথ কুঞ্জরু এবং কবলম পানিক্করকে নিয়ে রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন তৈরি করেন। সেই কমিশন ১৯৫৫ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি থেকে মানভূম জেলায় তদন্ত করে সেই বছর ১০ই অক্টোবর তাদের বক্তব্য জমা দেন। তাদের বক্তব্যে মান-ভূম জেলা থেকে বাঙালী অধ্যুষিত এলাকাগুলি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ১৯টি থানা নিয়ে পুরুলিয়া জেলা নামে এক নতুন জেলা তৈরি করার প্রস্তাব দেন। তারা মানভূম জেলা থেকে ধানবাদ মহকুমার ১০টি থানা এবং পুরুলিয়া মহকুমার ২টি থানা বিহার রাজ্যে রেখে দেয়ার প্রস্তাব করেন। অপরদিকে ধলভূম পরগণায় বাংলাভাষীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা স্বীকার করেও যেহেতু ভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ সে জেলায় বসবাস করেন সে কারণে কমিশন জামসেদপুরকে পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত করতে বা ধলভূম পরগণা ভেঙ্গে বাংলায় আনতে রাজি ছিলেন না। সেই প্রস্তাবে ১৯৫৬ সালের ১৭ থেকে ২০শে জুন বিহার পন্থীরা মানভূম জেলায় ধর্মঘটের ডাক দেন। অপরদিকে বাংলা ভাষা আন্দোলনকারীরা ধন্যবাদ বিহারের অন্তর্ভুক্তিতে খুশি ছিলেন না।

১৯৫৬ সালের ২৩শে জানুয়ারী পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বিধান চন্দ্র রায় এবং বিহারের মুখ্যমন্ত্রী শ্রীকৃষ্ণ সিং পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার উভয় রাজ্যের সংযুক্ত করে পূর্বপ্রদেশ নামে এক নতুন প্রদেশ গঠনের প্রস্তাবনা করেন। তাঁরা প্রস্তাব দেন যে, ঐ প্রদেশের সরকারি ভাষা হিসেবে হিন্দী এবং বাংলা উভয়েই স্বীকৃত হবে। মন্ত্রীসভা, বিধানসভা, পাবলিক সার্ভিস কমিশন একটি করে থাকলেও হাইকোর্ট থাকবে দুইটি। সেই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে প্রবীণ কংগ্রেস নেতারা ছাড়াও বামপন্থী দলগুলিও প্রতিবাদ করেন। দুই রাজ্যে সেই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে সত্যাগ্রহ আন্দোলনের মধ্যে বিহার বিধানসভায় ২৪শে ফেব্রুয়ারী প্রস্তাবটি পাশ হয়ে যায়। লোক সেবক সংঘের কর্মীরা ১৯৫৬ সালের ২০শে এপ্রিল পাকবিড়রা গ্রাম থেকে বাঁকুড়া, বেলিয়াতোড়, সোনামুখী, পাত্রসায়র, খন্ডঘোষ, বর্ধমান, পান্ডুয়া, মগরা, চুঁচুড়া, চন্দননগর, হাওড়া হয়ে কলকাতা শহরের দিকে শান্তিপূর্ণ পদযাত্রা শুরু করে ৬ই মে কলকাতা পৌঁছায়, ৭ই মে মহাকরণ অবরোধের কর্মসূচী অনুসারে বিনয়-বাদল-দীনেশ বাগ পৌঁছছে ৯৬৫ জন কারাবরণ করেন। এই ঘটনার তিন দিন আগে ৪ঠা মে উভয় রাজ্যের সংযুক্তির প্রস্তাবনা বাতিল হয়ে যায়।১৯৫৬ সালের ১৭ই আগষ্ট বাংল-বিহার সীমান্ত নির্দেশ বিল লোকসভায় এবং ২৮শে আগষ্ট রাজ্যসভায় পাশ হয়। ১লা সেপ্টেম্বর তাতে ভারতের রাষ্ট্রপতি সই করেন। তার ফলে ১৯৫৬ সালের ১লা নভেম্বর ২৪০৭ বর্গ মাইল এলাকার ১১,৬৯,০৯৭ জন মানুষকে নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের নতুন জেলা পুরুলিয়া তৈরী হয়। সম্পূর্ণ ধানবাদ মহকুমা বিহার রাজ্যে রয়ে যায়।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত