| 24 এপ্রিল 2024
Categories
দেশ ভ্রমণ

ভ্রমণ: মায়ায় ভরা মৌলিনং । ক্ষমা মাহমুদ

আনুমানিক পঠনকাল: 13 মিনিট

সবুজে সবুজ জৈন্তাপুর আর পাথর কাটার তীব্র শব্দের বৈপরীত্যের মধ্যে দিয়ে তামাবিল বর্ডারে ঢুকে গেলাম। একইসাথে ভালো আর খারাপের ‌একটা অনুভূতি তৈরী হলো- জৈন্তাপুরের সবুজ বনানী মন কেড়ে নেয় ঠিকই কিন্তু সেই সাথে পাথর উত্তোলনে ব্যস্ত বেনিয়াদের এই ‌অঞ্চলের বিস্তীর্ণ প্রকৃতি ধ্বংসের বেসাতি দেখে মন বিষন্ন হয়ে ওঠে। জানিনা কবে মানুষ বুঝবে যে এভাবে প্রতিনিয়ত প্রকৃতিকে আহত করে সে নিজেই নিজের কবর খুঁড়ে চলেছে!

ভারতীয় বর্ডার বলতেই মনের মধ্যে যে একটা নানান ঝামেলার আশংকা তৈরী হয় তার সাথে তামাবিল বর্ডারের কোন সম্পর্ক নেই। সুনসান, নিরিবিলি একটা বর্ডার আর দুপাশেই লোকজন যথেষ্ট সহযোগিতাপরায়ণ- সেটা মনে হয় এ কারণে যে এখানে খুব বেশী লোকজনের চাপ নেই। চাপ যেহেতু নেই, মাথা ঠান্ডা রেখে এরা কাজ করতে পারে, আচরণটাও সেজন্যে ভদ্র। সারা বছর হয়তো অল্প কিছু মানুষই মেঘালয় রাজ্যের শিলং বা চেরাপুন্জী ঘুরতে আসে। কিছুকাল আগেও বিদেশী পর্যটকদের মেঘালয় রাজ্যে প্রবেশে বিশেষ অনুমতি গ্রহণের বাধ্যবাধকতা ছিল। বর্তমানে সে নিয়ম শিথিল হলেও বাংলাদেশী ছাড়া পৃথিবীর অন্যান্য দেশের পর্যটকদের আগমন তেমন উল্লেখযোগ্য নয়।

শিলং এর মনমাতানো শীতল আবহাওয়া আর সুন্দর, পরিচ্ছন্ন, নির্মল পাহাড়ী জীবনের আকর্ষনে তৃতীয়বারের মত মেঘালয় রাজ্যে পা দিলাম। এবারের মূল লক্ষ্য মৌলিনং গ্রামে যাওয়া, যে গ্রামকে এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম বলা হয়। এর আগে দুবার শিলং ঘুরে গেলেও এই গ্রামের কথা জেনেছি পরে, সেজন্যেই এবার শিলং ঘোরার তালিকায় প্রথমেই রেখেছি মৌলিনংকে।

বাংলাদেশ থেকে সড়কপথে শিলং এ ঢুকতে গেলে কিছু তথ্য মনে রাখলে বর্ডারে ঝামেলাটা একেবারেই আর হয়না। যেটা মনে রাখা দরকার তা হলো, ট্রাভেল ট্যাক্সটা ‌অনলাইনে দেয়া যায়না, অবশ্যই সোনালী ব্যাংকের যে শাখায় করা হয় সেখান থেকে করতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয়, বর্ডারেই যে ব্যাংক আছে, সেখান থেকেই করে ফেলা। আমরা অনলাইনে ট্রাভেল ট্যাক্স করে এসেও ধরা খেলাম, কাজ হলোনা, অল্প হলেও কিছু টাকা নষ্ট হলো বা একই কাজ দুবার করা লাগলো। অনলাইনে কাজ হয় শুধু বেনাপোল, ভোমরা আর দর্শনা বর্ডারে। এখনও পর্যন্ত ভ্যাক্সিন কার্ডও অবশ্যই সাথে রাখতে হবে। ফেব্রুয়ারীর সকালের মিষ্টি, ঠান্ডা আমেজে সব কাজ বেশ তাড়াতাড়িই হয়ে গেল আমাদের। এপারের কাজ শেষে ওপারের কাজও সারা হলে একটা ট্যাক্সি নিয়ে আমাদের চারজনের দলটি রওনা দিলাম মৌলিনং এর পথে।

আমি এক যাযাবর—

আক্ষরিক অর্থেই নিরুদ্দেশ যাত্রা করেছিলাম এবার। হোটেল, গাড়ী কিছুই ঠিক করে যাইনি। আগেও দুবার শিলং এসেছি বলে তেমন কোন উৎকন্ঠাও ছিলনা, জানতাম কিছু না কিছু ঠিক জোগাড় হয়ে যাবে- হয়েছেও তাই। শিলং আর এর আশপাশের সবকিছুই ভারী মনকাড়া! যতবার তামাবিল বর্ডার পার হয়ে এপাশে আসি… শিলং এর সরু, পাহাড়ী পিচ ঢালা রাস্তা, পাহাড়ী মানুষের ভদ্র, শান্ত চেহারা আর ঠান্ডা হাওয়া গায়ে আরামের পরশ বুলিয়ে দেয়। প্রতিবারই আমার মনে হয়, সাতচল্লিশে র‍্যাডক্লিফ সাহেবের কলমের খোঁচা যদি ভুলক্রমে আরেকটু ওদিকে পড়তো তো গোটা মেঘালয়টা চষে বেড়ানোর জন্যে আমাকে বারবার এই পাসপোর্টের ঝামেলা করে এখানে আসতে হতো না, মন চাইলেই চলে আসতে পারতাম যখন তখন! বাংলাদেশের এত কাছে কিন্তু খুবই বিপরীত বা অন্যরকম ভূমি, আবহাওয়া আর জনপদের অসম্ভব সুন্দর এক জায়গা এই মেঘালয় রাজ্য।

একসময় মেঘালয় রাজ্য আসামের অংশ ছিল। ঊনবিংশ শতকে ব্রিটিশ প্রশাসনের অধীনে না আসা অবধি এ অঞ্চলটি খাসিয়া, গারো এবং জয়ন্তিয়া উপজাতিদের নিজস্ব রাজ্য ছিল। ১৮৩৫ সালে এ তিনটি অঞ্চলকে আসামের সাথে যুক্ত করা হয়। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ করার সময় মেঘালয়কে পূর্ববঙ্গ এবং আসামের সাথে যুক্ত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হলে মেঘালয় আবার আসাম প্রদেশের অংশে পরিণত হয়। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান বিভাজনের সময় মেঘালয় আসামের অংশ হিসেবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।

মৌলিনং যাওয়ার পথে পুরো রাস্তাটাই এক অদ্ভুত মায়ায় ভরা। রাস্তার পর রাস্তা পেরিয়ে চলেছি, দুপাশে পাহাড়ি মানুষের জীবন, তাদের বসতবাড়ি, দোকানপাট দেখতে দেখতে। ‌অনেক পাহাড়ি পথে ঘোরার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, পাহাড়ি পথের চেহারাগুলো কম বেশী একইরকম। পাহাড় কেটে কেটে সরু রাস্তায় সাপের মত আঁকাবাকা পথ ধরে চলা, যে পথ ধরে চলতে চলতে বরাবরের মত গুনগুনিয়ে উঠি ‘এই পথ যদি না শেষ হয় তবে কেমন হতো তুমি বলতো?’ গানের সাথে আপামর বাঙালীর প্রিয় সেই দুই মুখ উত্তম- সুচিত্রার চেহারাও ভেসে ওঠে মনের কোনায়, যার পুরোটাই সুখস্মৃতি!

পাহাড়ের মানুষগুলোর চেহারায়ও এমন কিছু থাকে যা খুব মন কাড়ে। প্রকৃতির বড় কাছাকাছি তাদের জীবন, সবুজের আলোছায়াতেই সে জীবন কাটে। এমন জীবন যাপন দেখাটাও চোখের আরাম। আমরা এই তথাকথিত শহূরে মানুষগুলো প্রকৃতির এই সরলতা মাখানো জীবন থেকে এত দূরে চলে এসেছি যে চাইলেও হয়তো এই জীবনে আমরা আর বাস করতে পারবোনা! শুধু দুদিন তিনদিনের একটু অন্যরকম ভাবে কাটানো সময়ের কিছু বৈচিত্র আর ভালোলাগা নিয়ে আবার ফিরে যাবো শহুরে জীবনের সেই কৃত্রিমতায়।

পথ চলতে চলতে মাঝে মাঝেই গাড়ী থামিয়ে রাস্তার পাশের পাহাড়ি টং দোকানগুলো বা কুঁড়ে বলাই ভালো,সেখানে বসে চা, পানি খাই। এক জায়গায় দেখলাম একজন ঝালমুড়ি বিক্রি করছে আর তার আশেপাশে বেশ কিছু যুবক ছেলে আড্ডা দিচ্ছে, কেউ কেউ ঝালমুড়িও খাচ্ছে। গাড়ি থামিয়ে আমরা হূড়মুড় করে নেমে ইচ্ছেমত সেই ঝালমুড়ির ফরমায়েস দিলাম। ঝালমুড়িওয়ালা তো একসাথে এতজন মুড়িখোর পেয়ে খুবই উৎসাহের সাথে নানারকম মশলা দিয়ে তার ঝালমুড়ি বানাতে লেগে গেল। খুবই উপাদেয় সেই ঝালমুড়ি হাতে নিয়ে পাশের একটা চায়ের দোকানে আয়েশ করে বসলাম। খেয়াল করলাম বাড়ীর একটা অংশে দুটো বেঞ্চি বসিয়ে পথচলতি পথিকের জন্যেই এই চায়ের আয়োজন করে রাখা। হৈ হট্টগোল, ভিড়ভাট্টা কিছু নেই, বড় সাদাসিধে আয়োজন। তবে রাস্তাঘাটে এই সময় রাজনৈতিক নির্বাচন নিয়ে সবার মধ্যে বিশেষত তরুণদের রাস্তায় রাস্তায় পার্টির পতাকা, লিফলেট নিয়ে বেশ ব্যস্ততা দেখতে পেলাম।

মানুষের ‌অল্প বিস্তর ব্যস্ততা দেখতে দেখতে আর গল্পে গল্পে বেশ খানিকটা সময় এখানে কাটিয়ে আরো প্রায় ঘন্টা তিনেকের রাস্তা পেরিয়ে তবেই পৌঁছলাম মৌলিনং- এ। বেশ অনেকটা জায়গা জুড়েই গাঢ় সবুজ বনানীর ইঙ্গিত পাচ্ছিলাম। তার মধ্যে দিয়েই যে রাস্তা দিয়ে মৌলিনং এ ঢুকবে সেখানে দেখি বড় একটা সাইনবোর্ডে ইংরেজীতে লেখা –

ঈশ্বরের নিজের উদ্যান

এশিয়ার পরিচ্ছন্নতম গ্রাম

মৌলিনং এ স্বাগতম

মেঘালয়ের ইস্ট খাসি হিল ডিস্ট্রিক্টের এই ছোট্ট গ্রামটাকে ২০০৩ এ ডিসকভারী ইন্ডিয়া ম্যাগাজিনের পক্ষ থেকে এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রামের তকমা দেয়া হ্য়। কেউ কেউ বলেন God’s own garden. সত্যিই যেন খোদার নিজের হাতে সাজানো বাগান। হরেক রকম পাতাবাহার আর ‌অসংখ্য মনকাড়া ফুলের গাছ দিয়ে সাজানো গোটা গ্রামটা।


Mawlynnong


সবুজ, হলুদ, লাল ও আরো নানান বাহারি রঙের পাতা

বাহার আর রকমারি ফুল ভর্তি গাছ গাছালিতে ঘেরা এক টুকরো খড়ের ছাউনি দেয়া কুটিরের সামনে বসে আছে একজন, সামনে লেখা রিসেপশন। ড্রাইভার তাকে একশো রুপি বাড়িয়ে দিতেই সে আমাদের গাড়ী ভেতরে যাওয়ার অনুমতি দিলো। গ্রামটায় ঢুকতেই এক অন্যরকমের জনপদের আলাদা ধরণের জীবনযাপনের ছোঁয়া চোখে পড়তে লাগলো চারদিকে; সেই কোলাহলহীন জনপদে এগিয়ে চলার অভিজ্ঞতা বড়ই মনোরম। যেতে যেতে গ্রাম দেখার ফাঁকে ফাঁকে আমরা আমাদের দুদিনের জন্যে থাকার বাসস্থানেরও খোঁজ করতে থাকি। সেই সুযোগে চোখে পড়ে মানুষের এদিক ওদিক নানা ধরণের কাজের হালকা ব্যস্ততা। গেরস্থালি কাজের পাশাপাশি একটা দুটো নতুন বাড়ী বানানোর আয়োজনও চোখে পড়লো। দেখে চমৎকৃত হলাম, মাত্র পাঁচশো খাঁসি মানুষদের এই পুরো গ্রামটাই যেন পর্যটকদের থাকার জন্যে রেডী করে রাখা হয়েছে কিন্তু তাতে তাদের নিজেদের বসবাসের স্বাভাবিকতা ব্যাহত হয় বলে মনে হয়না। প্রায় প্রত্যেকটা বাড়ীই এক একটা হোম স্টে আর পর্যটকরা তাদের জীবনের একটা অংশে পরিণত হয়েছে। কোন কোন বাড়ীতে নিজেদের বসবাসের জায়গার পাশাপাশি হয়তো দুটো তিনটে রুম সাজানো আছে টুরিস্টদের জন্যে। তারমধ্যে থেকে যে কেউ তার পছন্দ মত জায়গা পেয়ে যাবে আশা করা যায়। খুব বাহুল্যতার কোন চিহ্ন নেই কিন্তু মোটামুটি থাকার উপযোগী সব ব্যবস্থাই আছে, প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে যতটুকু স্বাচ্ছন্দ্যে থাকা যায় আরকি! থাকার জায়গার এসব খোঁজ এয়ার বিএনবি থেকেই পেতে পারে যে কেউ।

আমরা চাইছিলাম একটু নিরিবিলি কোন জায়গা। বেশ অনেকটা খোঁজাখুঁজির পর পেলাম মনের মত একটা কটেজ, এতটাই মনের মত যে আমরা ভাবতেই পারছিলাম না যে এই পরিবেশে এর থেকে ভালো আর কোন থাকার আয়োজন হতে পারে। একতলা একটা সূর্যমুখীরঙা বাড়ীর সামনে সুন্দর একটা বাগান যা আগের দিনের মফস্বল শহরগুলোর বাড়ীর সামনে যেভাবে ছোট বাগান থাকতো সেই স্মৃতি উসকে দেয় মনের মধ্যে। বড় বড় গোলাপ গাছে ফুল ধরে আছে সাথে বাহারি পাতাবাহার ও অন্যান্য ফুলেরাতো আছেনই যথারীতি। দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই প্রাণটা জুড়িয়ে গেল লম্বা টানা একটা বারান্দা, আর তার পেছনে বেশ ঘন লম্বা লম্বা গাছপালায় ঘেরা ঘন সবুজ দেখে। এখনকার দিনের বাড়ীতে আর এমন লম্বা টানা বারান্দা আমরা দেখিনা, জায়গার বড় অভাব, সবই যে ‘দশফুট বাই দশফুট’ অথচ বছর পনেরো আগেও একতলা দোতলা বাড়ীর এমন টানা বারান্দাগুলো মানুষের জীবনের অবসর কাটানোর অন্যতম সুন্দর অনুষঙ্গ ছিল।


Mawlynnong


বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখতে পাই নীচে বেশ কিছু খাসিয়া মানুষের বাড়ী ঘর আর সেখানে তাদের অলস আনাগোনা। বারান্দাবিলাস কিছুক্ষণের জন্য মুলতবি রেখে বাড়ীটার অন্যান্য দিকে চোখ ফেরাই। বারান্দার দুপ্রান্তের সাথে লাগোয়া দুটো বড় বড় কক্ষ আমাদের চারজনের জন্যে একেবারে যথার্থ বলে মনে হলো। ঘরের জানালাগুলোর নকশাও সেই আগের দিনের বাড়ীগুলোর কথা মনে করিয়ে দিলো। চারদিকে কাঠ আর মাঝে কাঁচের গ্লাস দেয়া আর সেই সাথে পুরনো আমলের ছিটকানি আমাকে সত্যিই নস্টালজিক করে তুললো! ঘরের ভেতরের জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে বাইরে ছবির মত সাজানো ছোট্ট ফুলবাগানটা। মনটা এক অপূর্ব সুন্দর অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হয়ে গেল, গোটা বাড়ীটাই আমাকে যেন বারবার ফিরিয়ে নিয়ে গেল মাত্র দশ পনেরো বছর আগেও আমাদের দেশের এমন বাড়ীঘরগুলো যখন ছিল, সেই সময়ে। যতটুকু সময় আমরা এ বাড়ীতে কাটিয়েছিলাম বেশীরভাগটাই ঐ লম্বা টানা বারান্দাতে গল্পগুজব আর এমন স্মৃতি কাতরতায় কেটেছে।


Mawlynnong


অত্যন্ত ভদ্র দুজন খ্রিস্টান ছেলে, যাদের কিনা কাকাবাড়ী এটা, তাঁরাই আমাদের প্রয়োজনীয় সবকিছুর যোগান দিয়েছে এখানে। সকালের নাস্তা, পরোটা ও ডিম ওমলেট এমনকি চা ওরা নিজেদের বাড়ী থেকে আমাদের জন্যে বানিয়ে নিয়ে এসেছিল, অবশ্য আমরা সেগুলোর মূল্য শোধ করেছি। বাংলাদেশ সম্পর্কে ছেলেদুটোর অনেক কৌতুহল। বিশেষ করে মার্ক নামে ছেলেটার সাথে জিনিসপাতি আনা নেওয়ার ফাঁকে নানান গল্প হলো। বাংলাদেশ সম্পর্কে ওদের অনেক কৌতুহল, বলেছিলো, কিছু টাকা জমাতে পারলে ওরা বাংলাদেশ ঘুরতে আসবে। সম্ভবত: বাংলাদেশ সম্পর্কে ওদের একটা ভালো ধারণা তৈরী হয়েছে, ওখানে বেড়াতে যাওয়া বাংলাদেশীদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা দেখে। আমার কাছে মনে হয়েছে, গোটা মেঘালয় অঞ্চল প্রাকৃতিকভাবে যতই সৌন্দর্যমন্ডিত হোক সম্ভবত যুব সম্প্রদায় শুধু সেটাতেই সন্তষ্ট নয়। হয়তো তারা তাদের জীবনযাত্রার আরো আধুনিকায়ন বা অর্থনৈতিক গতিশীলতা আশা করে।

মেঘালয় রাজ্যের অর্থনীতি বনশিল্প ও কৃষিভিত্তিক এবং  গুরুত্বপূর্ণ ফসল হলো আলু, ধান, ভুট্টা, আনারস, কমলা, কলা, পেঁপে এবং মসলা। আবার খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ হলেও আহরণ ও বাজারজাতজনিত প্রতিবন্ধকতার কারণে এসবের ব্যবহার অত্যন্ত সীমিত। ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে সড়ক যোগাযোগ দুর্গম হওয়ায় সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এখানে অর্থনৈতিক গতিশীলতার অভাব আছে। মার্কের সাথে এসব নিয়ে কথা বলতে বলতে মনে হলো ওরা মনে করে বাংলাদেশের সাথে ওদের  যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটলে ওদের অর্থনীতির দ্রুত বিকাশ ঘটবে যা রাজ্যটির জনমানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাতে সাহায্য করবে। আমি মুখে কিছু না বললেও মনে মনে এই রাজ্যের সাথে আমাদের মেলবন্ধন যেন আরো গভীর হয় সেই কামনা করি। তবে এটাও ভাবলাম আমাদের দেশে ভুল উন্নয়নের সজ্ঞায় যেভাবে আমরা প্রকৃতি হন্তারক হয়ে উঠেছি সেই উন্নয়নের ছোঁয়া যেন ওদের গায়ে না লাগে।

বাড়ীটাতে নিজেদের জিনিসপত্র সব গুছিয়ে লম্বা বারান্দায় বসে বেশ কিছুক্ষণ গল্প স্বল্প করে গ্রামটা ঘুরতে বের হলাম। এখানে এই মার্চ মাসেও আবহাওয়ায় পুরোই শীতকালের আমেজ যা আমাদের ভ্রমণকে আরো মোহনীয় করে তুলেছে কোন সন্দেহ নেই। সত্যিই ছিমছাম গোছানো একটা অপূর্ব গ্রাম। হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলাম মানুষ চাইলেই জীবনটা কত সুন্দর ভাবেই না কাটাতে পারে! মানুষের ক্রমাগত বস্তুগত চাহিদা মানুষের এই সহজ সরল প্রকৃতিনির্ভর জীবনের অন্তরায় হয়ে দাড়িয়েছে। এমন একটা স্বপ্নের মত বসবাসের জায়গা আমাদের দেশের এত কাছে আছে ভাবাই যায়না! যারা প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকতে পছন্দ করেন তাদের জন্য এই জায়গা অল্প খরচে এক দারুণ গন্তব্য। কিছুদূর হেঁটে যেতেই দেখলাম এক তরুণী দু তিনটে আনারস তার বাড়ীর সামনে একটা ছোট টেবিলে সাজিয়ে রেখেছে।যেখানেই যাই সেখানকার স্থানীয় খাবার মুখে দিতে একটুও ভেবে সময় নষ্ট করতে রাজী নই আমি। তবে তরুণী দাম হেকে বসলো অনেক এবং কিছুতেই সে দাম কম হলো না। অগত্যা সেই দামেই খেলুম। কিন্তু বলতেই হবে এর অর্ধেক দামে দুদিন আগেই ঢাকায় বসে মিষ্টি গুড়ের মত ছোট আনারস খেয়েছি। এখানকার আনারসের দাম ও স্বাদ দুটোই বেশ টকই লাগলো। বোঝাই যায় এরা বেশ নিয়মিতভাবে পর্যটকের দেখা পায়, এজন্যেই দাম নিয়ে কোন আপোষ নেই। গোটা গ্রামটা হেঁটে দেখাটা জীবনের এক মনোরম অভিজ্ঞতা হয়ে রইলো! একতলা সব বাড়ী, বাড়ির আঙিনাগুলো পরিপাটি, নিকোনো। অধিকাংশ বাড়ির সামনে অনেক খোলা জায়গা, এবং বাহারী সব পাতা বাহার ও নানা গাছ গাছালিতে পূর্ণ। সেসবের অনেকগুলোই  আমাদের অতি পরিচিতও। বাহারি ফুল আর পরিচ্ছন্ন পরিবেশ খাসিয়া মানুষের এই গ্রামকে আসলেই অনন্যতা দিয়েছে । মানুষের সাদাসিদে সরল জীবন যাপনের অপূর্ব দৃষ্টান্ত তারা! আফসোস! আমরা এসব জীবন যাপনকে মানুষের জীবনের মডেল বা আদর্শ বানাতে পারলাম না! মানব সভ্যতা শুধু উল্টোপথেই হেঁটে চলেছে। বাসিন্দারা প্রতিটি বাড়ীর সামনে ঝকঝকে করে রেখেছে, রাস্তাঘাটও তাই। সারাক্ষনই চোখে পড়ে স্থানীয়রা এদিক ওদিক পরিষ্কার করেই যাচ্ছে, কোথাও এতটুকু ময়লা পড়ে থাকার যো নেই। ময়লা ফেলার জন্য বাঁশ দিয়ে তৈরী করা পাত্র রাখা আছে জায়গায় জায়গায়।। খোলামেলা প্রতিটি বাড়ীর আঙিনা নানারকমের ফুল, লতা-পাতা অর্কিডে পরিপূর্ন! এ এক আশ্চর্য সুন্দর জীবন যাপনের দৃষ্টান্ত!


Mawlynnong


প্রকৃতির সান্নিধ্যে—

খাসিয়া বাচ্চারা খেলেধূলে গড়িয়ে বেড়াচ্ছে বাড়ির খোলা বড় বড় গাছপালা ছাওয়া উঠোনে। অকারণ খিলখিল হাসিতে ভরে উঠছে আশপাশ। অবিকল এসব দৃশ্য আমরা আমাদের ছোটবেলায় দেখেছি, বাড়ীগুলো যখন এমন একতলা দোতলা ছিল, এমনই খোলা চত্বর, গাছপালা ছিল আমাদের চারপাশে। নগরায়নের ভয়ংকর নেশায় সব যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে মাত্র দুদশকের মধ্যে। বাচ্চাগুলোর সাথে বসে আমরা একটু গল্প করার চেষ্টা করি, ওরাও লাজুক লাজুক মুখে আমাদের সাথে কথা বলে আবার খিলখিল হেসে দৌড়ে পালায়।

এখানে মন চাইলেই যেকোন জায়গায় চুপ করে বসে থাকা যায়, বা কজনা মিলে বসে গল্পও করা যায়। গোলপাতার ছাতাওয়ালা একটা বসার জায়গা দেখে তো আমরা মুগ্ধ! কাঠ দিয়ে বানানো বেদীর মত বসার জায়গাও আছে সেখানে। কি পরিচ্ছন্ন চারদিক! এইকারণেই এই গ্রামের এত সুখ্যাতি! সর্বোচ্চ শব্দ দুষণের মধ্যে বাস করে করে শূন্য শব্দ দুষণে মাঝে মাঝে যেন আমরা হাঁপিয়েই উঠছিলাম! পাখির কিচির মিচির ছাড়া আর কোন শব্দই যে শোনা যায়না! হেঁটে বেড়ানোর ফাঁকে দেখি এক খাসি মেয়ে, পরনে তাদের পরিচিত থামি, দোকানের মত করে সাজানো ছোট্ট একটা জায়গায় মম, পানিপুরীসহ অল্পকিছু খাবারের আয়োজন নিয়ে বসে আছে, নিজে মোবাইলে কিছু একটা করছে এবং মোবাইল থেকে পরিচিত এক ইংরেজী গানের সুর ভেসে আসছে যা শুনে একটু অবাকই হলাম! পেছনে তাদের পুরো বাড়িটি আর সেখান থেকেই দিব্যি একটু জায়গা বের করে কিছু আয় করার ব্যবস্থা করে ফেলেছে। গ্রামের ‌অনেক জায়গাতেই এমন। যেহেতু সবসময় এরা টুরিস্ট পায় সুতরাং যার যা কিছু উদ্বৃত্ত আছে সেটাকে এরা পসরা বানিয়ে বেশ দুপয়সা আয় করে ফেলে বাড়তি। দোকানের পাশে বসে আমাদের জন্যে মম দিতে অনুরোধ করলাম আর মেয়েটির সাথে একটু গল্প জমানোরও চেষ্টা করলাম। একটু গম্ভীর প্রকৃতির মেয়েটি সব কথার উত্তর দিলো বটে, জানলাম সে শিলং এ কলেজে পড়ে, কিন্তু গল্প করতে খুব যে আগ্রহী তা মনে হলো না। তবে অন্য অনেককে আবার দেখেছি যে খুব মিশুক। ছবি তুলতে চাইলে, পিঠে জিনিস পত্র নিয়ে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া পান খাওয়া লাল ঠোঁটের সুন্দর খাসিয়া মহিলারা খুব হাসি মুখেই ছবির জন্যে দাড়িয়ে গেছেন।


আরো পড়ুন:  দালাই লামার সাথে পথে হল দেখা । ফাতিমা জাহান


মাতৃতান্ত্রিক জীবনের সৌন্দর্য —

মাতৃতান্ত্রিক এই খাসি সমাজে মেয়েরা বেশী উদ্যমী সেটা চোখে পড়লো তবে ছেলেদেরও দেখেছি নানা ধরণের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে। এই সমাজে মায়ের সবচেয়ে ছোটমেয়ে সমস্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়। খাসিয়া প্রবাদ মতে, নারী থেকেই সভ্যতার সূচনা। মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার দরুন মেয়েরা অন্য গোত্রের পছন্দসই কোনো যুবককে বিয়ে করে ঘরজামাই করে রাখে। স্বগোত্রে বিয়ে নিষিদ্ধ। স্বগোত্রে কোনো ছেলে-মেয়ে বিয়ে করলে তারা সম্পত্তির অধিকার হারায়, গ্রাম থেকে বহিষ্কৃত হয় এবং মৃত্যুর পর এদের কবর দেওয়া হয় না। বিয়ের পর কন্যার মাতৃগৃহের পাশেই নবদম্পতির জন্য নতুন কুঁড়েঘর তৈরি করে দেওয়া হয়। কোনকারণে সেটা সম্ভব না হলে মাতৃগৃহের পাশেই তারা বাস করে। কোনো কোনো পুঞ্জিতে তা বাধ্যতামূলক। কনিষ্ঠ কন্যার জন্য আলাদা ঘর নির্মাণ করা হয় না কারণ সে মাতৃগৃহ ও সম্পত্তির উত্তরাধিকারিণী। গোটা দুনিয়া জুড়ে এমন সমাজব্যবস্থা চালু হলে তো মন্দ হতোনা।

বেশ ‌অল্প সময়েই মম আর পানিপুরী বানিয়ে মেয়েটা আমাদের দিকে এগিয়ে দিল। গরম গরম সেগুলো মুখে পুরে  যেন অমৃতের স্বাদ পেলাম। আয়েস করে খাওয়া শেষ করে তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে আবারও হাঁটতে বের হই। ঘুরে ঘুরে গাছপালা দেখি। এখানের মানুষের মূল জীবিকা চাষাবাদ, মূলত সুপারীর চাষ। পুরো গ্রাম জুড়ে প্রচুর সুপারী গাছ, তার সাথে আনারস বাগানও রয়েছে।

খাওয়ার হোটেল রয়েছে একটা কি দুটো, এছাড়া পথ চলতে চলতে কোথাও কোথাও দেখা যায় ছোট করে বসার জায়গা সাজানো আছে যেখানে বসে চা, কফি বা হাল্কা স্ন্যাকস খাওয়া যায়। অধিকাংশ মানুষ খ্রীষ্ট ধর্মের অনুসারী, উপাসনার জন্যে গ্রামে দুটো সুদৃশ্য চার্চও রয়েছে তাদের।

দেড়শো বছর আগে খ্রিস্টান মিশনারিরা খাসিয়াদের মধ্যে ধর্মপ্রচার শুরু করেছিল। বর্তমানে ৮০%-৯০% খাসিয়াই খ্রিস্টান। প্রায় প্রতি পুঞ্জিতেই গির্জা আছে। প্রতি রোববারে খ্রিস্টান খাসিয়ারা গির্জায় প্রার্থনার পাশাপাশি পুঞ্জির নানা বিষয়াদি নিয়ে আলাপ-আলোচনা করে।


Mawlynnong


গ্রামের মধ্যে বাঁশ দিয়ে বানানো একটা ভিউ পয়েন্টস রয়েছে যেখান থেকে বাংলাদেশ দেখা যায় যেহেতু এই গ্রাম বাংলাদেশ বর্ডারের একেবারে কাছেই অবস্থিত। এখানে দাঁড়িয়ে চারিদিকে তাকালে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে  অভিভূত হতে হয়। প্রকৃতি অনুরাগীদের জন্যে এই গ্রাম স্বর্গ বিশেষ কারণ এখানকার এই মনোহরিণী প্রকৃতি উপভোগ করা ছাড়া আর যথার্থই তেমন কিছু করার নেই। পুরোটা সময় আমরা ‘- রয়েছি সবুজ মাঠে—ঘাসে—
আকাশ ছড়ায়ে আছে নীল হ’য়ে আকাশে-আকাশে;

গোটা গ্রাম ঘুরে দেখতে দেখতে সন্ধ্যা নেমে আসে মন্থর গতিতে ! গ্রামের একেবারে এক প্রান্তে দেখি বেশ বড় একটা খেলার মাঠ, সন্ধ্যা নেমে এলেও বেশ কিছু ছেলে ফুটবল খেলে চলেছে তখনও। বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ওদের খেলা দেখতে দেখতে ভাবি, জীবন তো এমনই হওয়ার কথা, প্রকৃতির কোলে প্রকৃতির সন্তানদের এভাবেই তো খেলে ধূলে বেড়ে ওঠার কথা, এটাইতো স্বাভাবিক। প্রকৃতিসঙ্গ বঞ্চিত আমার দেশের হতভাগ্য ছেলেমেয়েদের কথা মনে পড়ে, যাদের জীবন সারাক্ষণ হয় স্কুলের বই পত্র অথবা ডিভাইসের মধ্যে বন্দী হয়ে আছে! খেলাধূলাতো বলতে গেলে উঠেই গেছে শহুরে জীবনে! মাঠই নেইতো খেলবে কি! এত সুন্দর জীবনের কি নিদারুণ অপচয় সেসব!

উৎসবের সেই অবাক করা এক রাত —

রাতের মৌলিনং একেবারে অবাক করা। এতটাই শব্দহীন যে আমাদের শহুরে মন মাঝে মাঝে অস্থির হয়ে উঠছিল। কোথাও কোন শব্দ নেই, কিন্তু বোঝা যাচ্ছে যে ঘরে ঘরে সব মানুষ আছে। রাতে কোন বাড়ী থেকে কোন শব্দ শুনতে পেলাম না তেমন। হাঁটতে হাঁটতে রাতের জীবন কেমন সেটা বোঝার চেষ্টা করছিলাম। মার্ককে জিজ্ঞাসা করেছিলাম  যে এখানে টিভি কেউ দেখেনা? কোন শব্দ শুনিনা যে! কেউ যে দেখছে তার কোন প্রমান পেলাম নাতো কোথাও।

মার্ক বললো, দিনে সবাই কাজ কর্মের মধ্যে থাকে আর রাত হলেই সব নাকি মোবাইল ফোন নিয়ে পড়ে থাকে। তাহলে আর টিভির শব্দ শুনবো কিভাবে! তবে দিনের বেলা আমরা কাউকেই দেখিনি তেমন মুঠোফোনে মুখ ডুবিয়ে আছে।

মার্ক আমাদের বলে রেখেছিল রাতের খাবার চাইলে আমরা যেন আগেই বলে রাখি কারণ ফরমায়েস অনুযায়ী গ্রামের এক জায়গায় খাবার প্রস্তুত করার ব্যবস্থা রয়েছে। যেহেতু অনেকক্ষণ ধরেই ঘুরছি, আমাদের বেশ একটু আগেই ক্ষিদে লেগে গেল। খাবার যেখানে প্রস্তুত করার কথা, গ্রামের একেবারে মাঝামাঝি বড় একটা খোলা জায়গা, সেখানে আমরা চলে এলাম এবং তবু কিছু মানুষজন সেখানে দেখতে পেয়ে ভালো লাগলো, আমাদের মতই যারা খেতে এসেছে। রাঁধুনি যিনি, বেশ কর্মঠ দেখতে মাঝবয়সী মহিলা, বললেন, বেশ খানিকটা সময় আরো লাগবে, কারণ আমাদের আগেই যারা এসেছেন খাবারের জন্যে তারাও অপেক্ষায় আছেন। খাবারের আয়োজন এখানে  সীমিত সেকারণে হাতে সময় রেখে আগে থেকেই খাওয়ার জন্যে বলে রাখতে হয় ; ফরমায়েস পেলে সে অনুযায়ী ওরা জোগাড়যন্ত করে আরকি। বেশকিছু খাবারের দোকান আছে কিন্তু তার অনেকগুলোই আমরা বন্ধ পেয়েছি হয়তো সময় সুযোগ মত সেসব খোলা থাকে। সবকিছুতেই যেন একটু একটু ঢিলাঢালা ভাব এদের। পর্যটক এখানে নিয়মিতই আসে কিন্তু তা সত্ত্বেও টাকা আয় করার জন্যে তারা যে একদম মরীয়া তাদের কোন আচরণেই তা মনে হয়নি।

খাবারের জন্য অপেক্ষা করতে করতে গল্প করছি আর মানুষের হাঁটাচলা দেখছি, হঠাৎ দেখি একটা দুটো করে বেশ বড় বড় ট্রাক, পিকাপ ভ্যান ভর্তি মানুষ পতাকা নাড়তে নাড়তে এসে থামলো, পতাকায় এনপিপি মানে ন্যাশনাল পিপলস পার্টির নাম লেখা। উল্লাস করতে করতে গাড়িগুলো থেকে নেমে এলো সবাই, যেন ট্রয়ের ঘোড়ার ভেতর থেকে পিলপিল করে বের হয়ে এলো গ্রীক বীরেরা! জোরে জোরে গান বাজানো শুরু হলো আর সেইসাথে হেলেদুলে জমজমাট নাচ। একের পর এক ট্রাক ভর্তি মানুষ আসতে থাকলো আর নাচানাচিও চলতে থাকলো। এত লোক সারাদিন কোথায় ছিল ভেবে অবাক হয়ে গেলাম! মেঘালয় রাজ্যে নির্বাচন চলছে সেটা জানতাম, সারাদিন রাস্তাঘাটে নানা ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে করতেই আসছিলাম।রাতের মধ্যেই তারা ফলাফল পেয়ে গেছে।

একটা শান্ত জনপদ কেমন করে তুমুল উচ্ছাসে মেতে ওঠে রাজনীতিকে কেন্দ্র করে , নিজেরা এটার সাক্ষী না হলে বুঝতে পারতামনা। পিপলস ন্যাশনাল পার্টি, তাদের প্রিয় দল যে নির্বাচনে জিতেছে সেটা সেই রাতের উল্লাস দেখেই বুঝতে পারলাম। গানের তালে তালে চলছে নাচ। গোটা গ্রাম উল্লাসে মাতোয়ারা কিন্তু তার মধ্যেও ওরা সুশৃঙ্খল। ওদের উল্লাস চলতে থাকে, আমরাও মনে মনে সামিল হই সেই বাঁধভাঙা আনন্দে। এরমধ্যেই আমাদের ডাক আসে, খাবার রেডী, চলে আসো। একটু অন্য ধরণের লাল চালের ভাত, একেবারে টাটকা দেশী মুরগীর ঝোল আর মুগের ডালের মাতাল করা স্বাদ আর বাইরে এই সদ্য চেনা উন্মাতাল নাচ ও গানের শব্দ। বড় তৃপ্তি নিয়ে খেতে খেতে জীবনটাকে ভারী সুন্দর মনে হলো! খাওয়া শেষ হতে হতে ওদের উল্লাসের প্রাথমিক উত্তেজনাটা একটু থিঁতিয়ে এলো মনে হয়। আমরা আরো বেশ কিছুক্ষন সেই আনন্দের অংশীদার হয়ে আস্তে ধীরে আমাদের ডেরায় ফেরার পথ ধরি।

সেই মনকাড়া টানা বারান্দায় বসে বেশ রাত পর্যন্ত গালগপ্প করে ঘুমুতে যাই অনিচ্ছাসত্ত্বেও। ঘুমাতে গেলেই যেন কতকিছু দেখা শোনা বাদ হয়ে যাবে এমন আমাদের ভাব! একদম শব্দহীন রাতে বিরামহীন ঘুমে রাতটা কেটে গেল। এই পৃথিবীতে এত শব্দহীন জায়গা এখনও আছে এমন!


Mawlynnong


খুব সকালে ঘুম ভেঙে যেতেই থেকে থেকে কুক্কুরুক্কু শব্দে মোরগের ডাক কানে ভেসে আসে। মুহূর্তেই মনটা চলে যায় আমার ছেলেবেলার শহর যশোরে! সন্ধ্যা হতে না হতেই শেয়ালের হুক্কাহুয়া এবং ভোর হতে না হতেই তারস্বরে মোরগ মুরগীর  ডাক দিয়ে সেই জীবনে সকাল শুরু হতো! এখনকার মত গাড়ির তীব্র হর্ণের যান্ত্রিক শব্দে নয়!

প্রকৃতি এখানে নিরুপদ্রব, খাসি মানুষেরা প্রকৃতির সন্তান। জীবন বস্তুগত জিনিসপত্রে উপচে পড়েনা, তবু মানুষের সুখী চেহারা দেখতে পাই। গোমড়ামুখো মানুষ চোখে পড়েনি। সবাই হাসিখুশী, যার যার কাজ নিয়ে আছে।কেউ উদভ্রান্তের মত দৌড়ুচ্ছেনা। কত অল্পে তুষ্ট এখানকার বাসিন্দাদের জীবন। গ্রামের প্রতিটা মানুষ দায়িত্ব নিয়ে সুন্দর রাখে এই গ্রামকে। সকালে উঠে বারান্দার নির্মল বাতাসে গিয়ে দাঁড়াতেই কাছের স্কুলের ঘন্টাধব্বনি ভেসে এলো। দেখলাম ছোট্ট দুজন খাসিয়া বাচ্চা স্কুলের ড্রেস পরে বই হাতে নিয়ে ধীরে সুস্থে যাচ্ছে স্কুলের দিকে। এই বাচ্চা গুলো যে বাড়ীতে ছিল সারারাত বা সন্ধ্যায় তার কোন শব্দ পর্যন্ত পেলাম না! আমার খুবই ইচ্ছা করছিল জানতে, আসলে ওরা কি করেছে ঘরের মধ্যে, এত নিঃশব্দে যে পুরো সন্ধ্যা রাত ওদের কোন সাড়াই পেলাম না!

প্রকৃতির নিজস্ব একটা শব্দ আছে, সেই শব্দ যে শুনতে পায় তার মতো ধনী আর কে আছে! এত রকমের অদ্ভুত সুন্দর পাখি দেখে আর শব্দ শুনে রোদ মাখা সকালটা পার করতে করতে ভাবলাম কেন যে পাখি বিশারদ হলাম না, সব পাখিদের নাম জানতে পারতুম তাহলে, মজাটা আরো দিগুন হতো!

মৌলিনংকে বিদায় জানাবার সময় হয়ে এলো। মন চাইছিল না ওখান থেকে আর ফিরে আসতে তবু ‘যেতে হয়, তবু চলে যায়’- এমনই আধুনিক মনুষ্য জীবন। বুকের মধ্যে স্বপ্নের অন্য এক জীবনকে নিয়ে আমরা এই নব্য সভ্য মানুষেরা প্রতিদিনকার জীবন কাটিয়ে দিই। বাক্স-পেটরা গুছিয়ে নিয়ে গাড়িতে ওঠার আগে, হলুদ খয়েরী বাড়িটার দিকে নির্নিমেষ কিছুক্ষণ তাকিয়ে বলি, ‘যাবার সময় হলো…’  মনে মনে ভাবি বেঁচে থাকলে আর একবার অবশ্যই আসবো এখানে। গাড়ি ছুটে চলে দুই পাশের সবুজ বনানীকে পেছনে ফেলে, মনের মধ্যে সবুজ এক জনপদের ছবি নিয়ে, আরেক টুকরো মৌলিনং এর সন্ধানে॥

 

 

 

ছবি কৃতজ্ঞতা লেখক

 

 

 

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত