মঙ্গলকাব্যের ইতিকথা

।। রিজওয়ানুর রহমান প্রিন্স।।

 

গল্প-উপন্যাস-নাটক-কবিতা পড়তে কে না ভালোবাসে? সাহিত্যে মানুষ খুঁজে ফেরে জীবনের নানা দর্শন, নিজের জীবনের বলতে না পারা গল্পগুলোর প্রতিচিত্র। কিন্তু মানুষ যেমন সময়ের সাথে ব্যস্ত হয়েছে, সেই সাথে বদলেছে সাহিত্যের ধরণ। আজকাল ছোটগল্পের খুব ছড়াছড়ি। এরও আগে এসেছিলো বড়গল্প। তারও আগে এসেছিলো উপন্যাস। সেই সময়ে উপন্যাসের বিপরীতে বড়-ছোট গল্পদেরকে বেশ খাটো করে দেখার একটা স্বভাব উঁচু জাতের পাঠক সমাজে ছিলো। তারও আগে এসেছিলো কাব্য। সত্যি কথা বলতে কী, যেকোনো ভাষার সাহিত্যের দিকে তাকালেই দেখা যাবে, উপন্যাস-বড়গল্প-ছোটগল্পের তুলনায় কাব্যসাহিত্য অনেক বেশি সময় ধরে প্রভাব বিস্তার করে এসেছে মানবসমাজে। পদ্যসাহিত্যের বিপরীতে গদ্য সাহিত্যের বয়স তেমন একটা বেশি নয়। প্রায় সব ভাষাতেই প্রথমে কাব্যসাহিত্য দিয়ে শুরু করে পরে কালের আবর্তনে তা ছোটগল্প আকারে এসে ঠেকেছে।

এদিকে বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে বলতে গেলে, মাইকেল মধুসূদন দত্তের আবির্ভাবের আগে প্রায় সব কবিতা লেখা হতো গাওয়ার উদ্দেশ্যে। আবৃত্তির উদ্দেশ্যে নয়। এর আগে বাংলা ভাষায় যেসব কবিতা লিখিত হতো, সেসবের কবিগণ লেখার শুরুতেই উল্লেখ করে দিতেন, ‘গীতিকবিতা’-টা কোন ‘রাগ’-এ গাইতে হবে। মোটামুটি মধুসূদন দত্তের সময়কাল হতে ধীরে ধীরে কবিতা আবৃত্তির সুরে পাঠ করার রীতি চালু হয় বলা যায়। [১]

বাংলা সাহিত্যে এই কাব্যগুলোও যে রূপ ধরে শুরু করেছে, সেই রূপ ধরে রাখতে পারেনি বেশিদিন। নদীর বাঁকের মতো চলার পথে তৈরি করেছে অনেক ধারা-উপধারা। সত্যি কথা বলতে কী, শিল্প-সাহিত্য আসলে সময়ের প্রয়োজন মেটায়। যে সময়ে যে ধরণের চিন্তাভাবনা দরকার ছিলো, সেই ভাবনার আদলেই বদলে গেছে সাহিত্যগুলো। কাব্যরাও এর ব্যতিক্রম নয়। বিভিন্ন সময়ে কবিদের হাত ধরে সূত্রপাত ঘটেছে বিভিন্ন ধারার। বাংলা সাহিত্যে এমনই এক ধারা হলো ‘মঙ্গলকাব্য’।

বাংলা সাহিত্যে প্রাচীন যুগের নিদর্শন যদি হয় ‘চর্যাপদ’, তবে মধ্যযুগের নিদর্শন হচ্ছে ‘মঙ্গলকাব্য’-গুলো। মোটামুটি ত্রয়োদশ শতক হতে শুরু করে অষ্টাদশ শতকের মাঝে অনেকগুলো মঙ্গলকাব্য লিখিত হয়েছিলো বাংলা সাহিত্যে। একই মঙ্গলকাব্য কয়েক যুগ ধরে কয়েকজন কবি মিলে লিখেছিলেন, এমনও আছে। কিন্তু কী এই মঙ্গলকাব্য?

মঙ্গলকাব্য হচ্ছে দেবদেবীদের মাহাত্ম্য কীর্তন করে লেখা এক বিশেষ প্রকারের গীতিকাব্য। প্রত্যেকটা মঙ্গলকাব্যের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে বিশেষ কোনো দেব-দেবীর পূজা-অর্চনা সমাজে চালু করা। দেবী মনসার পূজা চালু করা দরকার? লেখা হলো ‘মনসামঙ্গল কাব্য’। দেবী চণ্ডিকার পূজা বেশি বেশি করাতে চান সমাজে? লেখা হলো ‘চণ্ডীমঙ্গল কাব্য’। দেবী অন্নপূর্ণার ভক্ত হিসেবে তার কথা বেশি প্রচার করতে চান সমাজে? লেখা হলো ‘অন্নদামঙ্গল কাব্য’। এরকম আরো আছে ধর্মমঙ্গল কাব্য, শিবমঙ্গল কাব্য ইত্যাদি।

বিভিন্ন দেবদেবীর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে লেখা হলেও প্রতিটা মঙ্গলকাব্যের একটা সুনির্দিষ্ট প্যাটার্ন ছিলো। বাংলা সাহিত্যে লিখিত সব মঙ্গলকাব্যকে আপনি এই প্যাটার্নের ভেতরে ফেলতে পারবেন। সেটা হলো,

১। বন্দনা অংশঃ প্রত্যেক মঙ্গলকাব্যের শুরুতে থাকবে এই অংশ। এতে শুধু যে দেবতার উদ্দেশ্যে এই কাব্য লেখা হচ্ছে, তার বন্দনা নয়, বরং সকল ধর্মের সকল ঈশ্বরের প্রতি স্তুতি জ্ঞাপন করা হয়। সকল প্রকারের ঈশ্বরদের প্রশংসা এবং সম্মান জানিয়ে শুরু করা হয় কাব্য।

২। কবির আত্মপরিচয় এবং এই কাব্য রচনার কারণঃ বন্দনা অংশের পরেই শুরু হয় কবির আত্মপরিচয় অংশ। এই অংশে কবি নিজের বংশ পরিচয় সবিস্তারে উল্লেখ করেন। তাঁর জীবনের উল্লেখযোগ্য সব ঘটনার বর্ণনার মাধ্যমে নিজেকে চেনাতে চেষ্টা করেন তিনি। বর্ণনা দিতে দিতেই তিনি বলে ফেলেন এই কাব্য রচনার মূল কারণ। এবং প্রতিটা ক্ষেত্রেই মূল কারণ একটাই। সেটা হলো, যে দেবতা বা দেবীকে নিয়ে কাব্য রচনা, তিনি কবির স্বপ্নে দর্শন দিয়েছেন এবং তাঁকে আদেশ করেছেন, যাতে কবি মানবসমাজে ঐ দেবতা বা দেবীর পূজা-অর্চনা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন। অলৌকিক ঐ দেবসত্তাকে নিয়ে যাতে মঙ্গলকাব্য রচনা করা হয়। সমাজে যাতে ভক্তের সংখ্যা বাড়ে। স্বপ্নে দেবদেবী দ্বারা আদিষ্ট হয়েছেন, এই কথা উল্লেখ না করলে পূজা-অর্চনার জন্যে ভক্ত যোগাড় করা একটু মুশকিলই বটে!

৩। দেবখণ্ডঃ এই অংশে বিদেশী এক দেবতার সাথে এই বাংলা অঞ্চলেরই স্থানীয় এক দেবীর সম্পর্ক দেখানো হবে। এই অংশটায় দেবতা শিবের উপস্থিতি বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। ‘Cameo’ বলে যে ব্যাপারটা প্রচলিত আছে শিল্পে, বিশেষত মুভিতে, মঙ্গলকাব্যেও অনেকটা তাই। কাহিনীতে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলে তো হলোই, আর না থাকলেও প্রতিটা মঙ্গলকাব্যের এই অংশে শিব একবার হলেও দর্শন দিবেনই।

৪। নরখণ্ডঃ কাব্যের সর্বশেষ এই অংশে উল্লিখিত হয় কোনো দেবসত্তা কিংবা স্বর্গবাসী কোনো চরিত্রের কাহিনী। স্বর্গ হতে ঝগড়া-বিবাদ বা যেকোনো কারণেই শাপগ্রস্ত হয়ে পতন ঘটে তার। মানুষ রূপে জন্ম নেয় সে পৃথিবীতে। তারপরে নানান ঝড়-ঝঞ্জা, দুঃখ-কষ্ট পেরিয়ে সমাজে প্রচলিত হয় বিশেষ কোনো দেবসত্তার পূজা-অর্চনা।

প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলা সাহিত্যে মঙ্গলকাব্য ধারার সূত্রপাত কেন ঘটলো? কীভাবে ঘটলো? আমরা যে উপরে জেনে এসেছি, “শিল্প-সাহিত্য আসলে সময়ের প্রয়োজন মেটায়”; এক্ষেত্রে আসলে কী প্রয়োজন মিটিয়েছিলো।

আসলে ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের শক্তিশালী সব আর্য দেবদেবীর ভিড়ে বাংলার স্থানীয় সব দেবদেবীরা নিগৃহীত হতে হতে হারিয়ে যেতে বসেছিলো। আর্য দেবসত্তাদের বিরুদ্ধে অনার্য দেবসত্তাদের এক অস্তিত্বের লড়াই থেকেই বাংলা সাহিত্যে সূত্রপাত ঘটেছিলো মঙ্গলকাব্য ধারার। প্রায় সব মঙ্গলকাব্যেই শক্তিশালী আর্য দেবসত্তার পরাজয় ঘটেছিলো সমাজে অনার্য দেবসত্তার পূজা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। প্রথমদিকে শিবও ছিলো আর্যদেবতা। শিবের ভক্তের সংখ্যাধিক্যের কারণে স্থানীয় দেবী মনসা, চণ্ডিকা প্রমুখদের ভক্তসংখ্যা নগণ্য ছিলো। পরে কালক্রমে শিবও আর্য দেবতা হতে অনার্যদের দেবতা হয়ে উঠে। মঙ্গলকাব্যে পজিটিভ আকারেই চিত্রায়িত করা হতে থাকে তাকে। [২] [৩]

মঙ্গলকাব্যের আরেকটা উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, এর মূল নায়ক-নায়িকারা বণিক বা ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর। আর এর বাইরে রয়েছে অন্যান্য শ্রেণীর চরিত্রের আনাগোনা। তবে ব্রাহ্মণ কিংবা উচ্চশ্রেণীর চরিত্রের উপস্থিতি যে একেবারেই কম, সেটা উপরের পয়েন্ট থেকে বেশ বুঝা যাচ্ছে। নায়ক-নায়িকাদের বণিক শ্রেণীর হওয়ার কারণ হচ্ছে, তারা বিত্তশালী এবং ক্ষমতাবান সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে। আর মঙ্গলকাব্যের উদ্দেশ্য হচ্ছে সমাজে কোনো দেবদেবীর উপাসনা প্রতিষ্ঠিত করা। এই কাজের জন্যে বণিক শ্রেণীর মানুষদের বাছাই করা নির্দ্বিধায় উৎকৃষ্ট সিদ্ধান্ত।

তবে এতোসব কথার ভিড়ে যদি মঙ্গলকাব্যদের শুধুই বিশেষ ধর্মীয় গোষ্ঠীর রচনা ধরে বসে থাকেন, তাহলে বড় ধরণের ভুল করবেন। ত্রয়োদশ শতকের দিকে মঙ্গলকাব্য যে রূপ ধারণ করে আবির্ভূত হয়েছিলো, তাতে সমৃদ্ধ হয়েছিলো বাংলা সাহিত্যই। সেটা কীভাবে? মঙ্গলকাব্যের বর্ণনায় ফুটে উঠেছিলো তৎকালীন মধ্যযুগীয় বাংলার সামাজিক চিত্র, তাদের চিন্তাভাবনা ও জীবনদর্শনের চিত্র। তাদের বেশভূষার ধরণ, শিক্ষাব্যবস্থা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, রাজনীতি-যুদ্ধবিগ্রহ ইত্যাদি অনেক কিছুরই স্পষ্ট চিত্র খুঁজে পাবেন বিভিন্ন মঙ্গলকাব্যের বর্ণনায়। বাংলা সাহিত্য কোথা হতে শুরু করে, কীভাবে বিভিন্ন ধারায় বয়ে আজ এই পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, তার একটা সম্যক ধারণাও পাবেন এই রচনাগুলো থেকে।

মঙ্গলকাব্য দিনশেষে আসলে নিগৃহীত মানব সমাজের উপাখ্যান। তাই হাটে-বাজারে, গাছতলায় বসে কবিদের মুখ থেকে গীতিকবিতার মাধ্যমে নিগৃহীত দেবদেবীদের লড়াই আর সংগ্রামের পৌরাণিক সব কাহিনী শুনতো সাধারণ প্রজাগোষ্ঠীর মানুষজনই, যারা নিজেরাও উচ্চশ্রেণির মানুষের শোষণ ও বঞ্চনার শিকার। সেই সব সাধারণ ও খেটে খাওয়া মানুষগুলো তাদের সংগ্রামের প্রতিফলনই যেনো খুঁজে ফিরতো আর্য দেবদেবীর বিরুদ্ধে অনার্য দেবদেবীর পূজা প্রতিষ্ঠার রূপক গল্পের ছলে।

মনসামঙ্গল কাব্য

বাংলা সাহিত্যে মঙ্গলকাব্য ধারার সবচেয়ে পুরাতন নিদর্শন হচ্ছে ‘মনসামঙ্গল কাব্য’। কবি ‘কানা হরিদত্ত’ হচ্ছেন মনসামঙ্গল কাব্যের আদি কবি। ত্রয়োদশ শতকে তিনি প্রথম মনসামঙ্গল কাব্য রচনা করেন। কিন্তু তাঁর সেই রচনার কোনো কিছুই উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। অবশ্য তাঁর মূল রচনার সূত্র ধরে পরবর্তীতে যে কবিগণ নিজেদের মতো করে মনসামঙ্গলের নানা উপাখ্যান বর্ণনা করেছেন, তাদের কিছু লেখা উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এসব কবিদের মধ্যে আছেন বিজয়গুপ্ত, পুরুষোত্তম, নারায়ণদেব প্রমুখ। এর মধ্যে পঞ্চদশ শতকে বিজয়গুপ্তের লেখা সংস্করণ সবচেয়ে বেশি প্রচলিত।

মনসামঙ্গল কাব্যের কাহিনী অনেকে বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনী বলেও জানেন। এই কাব্যে হয়তো বেহুলা-লখিন্দরের অমর প্রেম উপজীব্য হিসেবে আসতে পারে, কিন্তু মূল কাহিনী হচ্ছে বণিক চাঁদ সওদাগর ও দেবী মনসার দ্বন্দ্ব। আর্য দেবতা শিবের বিরুদ্ধে অনার্য দ্রাবিড় সম্প্রদায়ের দেবী মনসার পূজা পাবার গল্প। [৪] [৫] [৬]

মনসামঙ্গল কাব্যঃ দেবী মনসা বনাম চাঁদ সওদাগর

আর সব মঙ্গলকাব্যের মূলচরিত্রের মতোই চাঁদ সওদাগর পূর্বজন্মে স্বর্গে সুখে জীবন কাটাচ্ছিলো। দেবী মনসার একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলো সে। কিন্তু একবার ঘটলো এক বিড়ম্বনা। মনসা দেবীর সাথে ভীষণ বচসা হলো তার। সেই ঝগড়ার ফলে স্বর্গচ্যুতি ঘটলো চাঁদের। তাকে পুনরায় মানুষ হয়ে জন্মাতে হবে পৃথিবীতে। সহ্য করতে হবে যাবতীয় পার্থিব দুঃখ-কষ্ট। চাঁদও ভীষণ ক্ষেপে গিয়ে বলে আসলো, তাকে ছাড়া দেবী মনসা অচল। চাঁদ সওদাগরের সাহায্য ছাড়া পৃথিবীতে তেমন ভক্ত পাবে না সে। পরের জন্মে চাঁদ আবার জন্মালে দেবী মনসা কীভাবে পূজা পায়, তা সে দেখে নেবে।

যথারীতি পরবর্তী জন্মে আবার জন্মালো সে চাঁদ সওদাগর হয়ে। এবারে সে হয়ে উঠলো শিবের একনিষ্ঠ ভক্ত। বাংলায় শিবের ভক্ত বাড়াবাড়ি রকমের বেড়ে যাচ্ছিলো। চাঁদ সওদাগরও অংশ নিলো সেই মিছিলে। এদিকে ব্যবসা-বাণিজ্য করেও ফুলেফেঁপে উঠলো সে। তার নৌবহর ব্যবসা করে বেড়াতো এই অঞ্চল-ঐ অঞ্চলের নানা হাটবাজারে। ব্যবসার লাভ সে অকাতরে ঢালছিলোও শিবের পুজো করে। তার বাড়িতে শিবভক্তদের উপাসনা আর পদচারণায় গমগম করতো সবসময়। শিবমন্দিরও বানিয়ে দিয়েছিলো সে।

দেবী মনসার ভীষণ ইচ্ছে হলো লক্ষ্মী, সরস্বতি আর শিবের মতো শক্তিধর দেবসত্তা হবার। বিশাল সংখ্যক ভক্তকূল পাবার। তাই সে এলো চাঁদ সওদাগরের কাছে। এসে বললো, সমাজে তার পূজা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কিন্তু চাঁদ সওদাগর তাকে দেবী বলে মানতেই নারাজ। ফলে দেবী মনসাও গেলো ক্ষেপে। হুমকি দিলো, মনসাপুজো না করলে চরম অত্যাচার নেমে আসবে চাঁদের উপরে। তার বংশ নির্বংশ করে দিবে সে। চাঁদ সওদাগরও তাচ্ছিল্য করে তাকে তাড়িয়ে দিলো।

আবার এমন বর্ণনাও পাওয়া যায়, চাঁদ সওদাগর ছিলো শিবের ভক্ত, কিন্তু তার স্ত্রী ‘সনকা’ ছিলো দেবী মনসার ভক্ত। একদিন স্ত্রী সনকাকে মনসাপূজা করতে দেখে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলো চাঁদ সওদাগর। লাথি মেরে পূজার সব উপকরণ তছনছ করে দিলো। তার বাড়িতে দেবী মনসার পুজো বন্ধ করে দিলো। তখন দেবী মনসা ক্ষেপে গিয়ে উপস্থিত হলো চাঁদের সামনে। তাকে নির্দেশ দিলো দেবীর বশ্যতা স্বীকার করতে। তাতে চাঁদ সওদাগর ক্ষেপে গিয়ে মনসাকে তাড়িয়ে দিয়েছিলো।

যাই হোক, পরিণামে রাগে ফুঁসে উঠে চাঁদ সওদাগরের নৌবহর ডুবিয়ে দিলো দেবী মনসা। সেই নৌবহরের একটায় ছিলো চাঁদ সওদাগর নিজেও। তার সাথের সবারই সলিল সমাধি ঘটলো, কিন্তু চাঁদকে তো মনসার জীবিত চাই। তার অসহায় আত্মসমর্পণ আর পূজাই তো কাম্য দেবী মনসার। তাই সে চাঁদকে বাঁচাতে একটুকরো কাঠ এগিয়ে দিলো। হাবুডুবু খেতে খেতে সেই কাঠ ধরতে যাবে, আর তখনই চাঁদ বুঝলো এটা দেবী মনসার সাহায্য। আত্মঅহমিকায় তাই সে দেবীর সেই সাহায্য ছুঁয়েও দেখলো না। হাবুডুবু খেতে খেতেই কোনোরকমে গিয়ে উঠলো জলের কিনারায়।

ভিন দেশে, অচিন রাজ্যে ভিখারি হয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়াতে লাগলো চাঁদ, এককালের কেউকেটা চাঁদ সওদাগর। দেবী মনসা আবার এসে দাঁড়ালো। পূজা চাইলো তার। ঘৃণাভরে মনসাকে আবার প্রত্যাখান করলো চাঁদ সওদাগর। মনসা দেবী প্রস্তুতি নিলো পরের পর্বে তার খেল দেখাবার।

বহুকাল ধরে পথে পথে ভিখারির মতো ঘুরে এককালে সে গিয়ে উঠলো তার নিজের দেশে। পথ চিনে চিনে গিয়ে উঠলো তার বাড়ির উঠোনে। কিন্তু এতোবছর পরে আপন গৃহে ফিরেও শান্তি নেই। গিয়েই দেখলো আরেক শোক তার জন্যে অপেক্ষা করছে। দেবী মনসার অভিশাপে সাপের কামড় খেয়ে একে একে মারা গেছে চাঁদ সওদাগরের ছয় সন্তান। কষ্ট বুকে চেপে তাদের সবাইকেই ভেলায় করে নদীতে ভাসিয়ে দিলো চাঁদ সওদাগর আর তার স্ত্রী।

দেবী মনসা আরেকবার গিয়ে দাঁড়ালো চাঁদ সওদাগরের সামনে। চাঁদ সওদাগর তবুও ভাঙ্গে না। কঠিন তার হৃদয়। এবারে দেবী গেলো তার মাস্টারপ্ল্যানে। স্বর্গে গিয়ে দুই নর্তক-নর্তকীর সাথে পরিকল্পনা সাজালো সে। ইন্দ্রের রাজসভার এই দুই নর্তক-নর্তকী মানুষ রূপে জন্ম নিবে পৃথিবীতে। নর্তক ‘অনিরুদ্ধ’ চাঁদ ও তার স্ত্রী সনকার ঘরে জন্ম নিলো লখিন্দর হয়ে। আর নর্তকী ‘ঊষা’ জন্ম নিলো আরেক পরিবারে বেহুলা হয়ে।

পরিণত বয়সে এই লখিন্দর পড়লো অনিন্দ্যসুন্দরী বেহুলার প্রেমে। দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে হলো তাদের। কিন্তু বিয়ের সানাইয়ের সাথে সাথে চাঁদ সওদাগরের কানে ভাসছে দেবী মনসার হুমকি ধ্বনিও। বিয়ের রাতেই তার সন্তান মারা যাবে বলে হুমকি দিয়ে রেখেছিলো মনসা।

চাঁদ সওদাগর তাই শ্রেষ্ঠ সব কারিগরদের ডেকে আনলো। তাদের আদেশ দিলো লোহার বাসর ঘর তৈরি করতে। পুরো নিশ্ছিদ্র হবে সেই ঘর। এক ঢোকা এবং বের হবার দরজা ছাড়া আর কোনোকিছুরই প্রবেশ কিংবা বের হবার পথ থাকবে না। কাজ শুরু করে দিলো রাজকারিগরেরা। এদিকে দেবী মনসা স্বপ্নে দেখা দিলো এক কারিগরের। তাকে হুমকি দিলো বাসরঘরে একটা ছোট্ট ছিদ্র রাখবার। তা নাহলে তার বংশ নির্বংশ করে দিবে সে। ভয় পেয়ে কারিগর ঘুম ভেঙ্গে উঠে রাতের আঁধারে সেই কাজ সেরে রাখলো।

যথারীতি বাসর ঘরে সেই ছিদ্র দিয়ে সাপ ঢুকে পড়লো। তার বিষাক্ত ছোবলে মারা গেলো লখিন্দর। চাঁদ সওদাগর শোকে পাথর হয়ে গেলো। অক্ষম আক্রোশে ফুঁসতে থাকলো সে।

নদীতে ভেলায় চড়িয়ে ভাসিয়ে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হলো লখিন্দরকে। ঠিক এই সময়ে সবাইকে চমকে দিয়ে ভেলায় চড়ে বসলো বেহুলাও। সবার সব বাধা উপেক্ষা করে নির্বিকার বসে রইলো সে ভেলায়। লখিন্দরের সাথে সেও যাবে অজানার দিকে। অগত্যা তাকে সহই ভাসিয়ে দেয়া হলো ভেলা।

তারা প্রায় ছয় মাস ভেলায় করে যাত্রা করে নদীপথে। মৃত স্বামীর পাশে বসে নির্বিকার বেহুলা দেখে দূরপাড়ের সব গ্রাম, সেখানকার জীবনচিত্র (মূল কাব্যে মধ্যযুগের বাংলার জীবনচিত্রের এক নিদারুণ বর্ণনা পাবেন এখানে সবাই)। পার হয় অচেনা সব হাটবাজার। আর একান্তমনে জপ করে চলে দেবী মনসার নাম। দেবী মনসা যদি দয়াপরবশ হয়ে দেখা দেয় একটু! বেহুলাকেও বিস্ময় নিয়ে দেখে দূরপাড়ের মানুষেরা। লখিন্দরের লাশ পচে যাওয়া শুরু করলেও তার পাশেই বসে থাকে বেহুলা। ধীরে ধীরে এই মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষটার কথা ছড়িয়ে পড়ে গ্রাম-গ্রামান্তরে। কোনো গ্রামের পাশ দিয়ে তাকে যেতে দেখা যাচ্ছে শুনলেই নদীর পাড়ে ভিড় জমায় সবাই একনজর দেখার জন্যে।

মৃত লখিন্দরকের নিয়ে নদীতে বেহুলার ভেলাযাত্রা

একবার এক গ্রামের নদীতীরে গিয়ে ঘটলো আশ্চর্য এক ঘটনা। বেহুলা দেখলো এক বুড়ি মহিলা কাপড় কাচতে এসেছে নদীর ঘাটে। সাথে তার ছোট্ট একটা ছেলে। ছেলেটার দুরন্তপনায় কাজে ভীষণ অসুবিধা হচ্ছিলো বুড়িটার। একপর্যায়ে আচমকা তাকে চড় দিয়ে মেরে ফেললো বুড়ি মহিলা। নির্বিঘ্নে কাপড় কাচার কাজ শেষ করলো। এরপরে ছোট্ট ছেলেটাকে আবার মরা থেকে জীবন্ত করে তুললো। তাকে নিয়ে ফিরে চললো বাড়ির দিকে। এসব দেখে হতভম্ব বেহুলা। তবে সাথে সাথেই আবার মনটা খুশিতে ভরে উঠলো। তার লখিন্দরকে এই বুড়িই বাঁচাতে পারবে আবার!

ভেলা তীরে ভিড়িয়ে সে পাগলের মতো খুঁজে চললো সেই বুড়িটাকে। কিন্তু কেউ তার হদিস দিতে পারে না। পরে খুঁজতে খুঁজতে এক জঙ্গলের কিনারায় দেখা মিললো তার। গিয়েই বেহুলা বুড়ির পায়ে পড়ে মিনতি জানালো লখিন্দরকে বাঁচিয়ে তুলতে। বুড়ি তখন তার পরিচয় দিলো। সে আসলে দেবী মনসার পালক মাতা। নাম ‘নিতা’। বেহুলার অনবরত দেবী মনসার জপ শুনে নিতা দয়াপরবশ হয়ে নদীর পাড়ের ঐ ঘটনার মাধ্যমে বেহুলাকে টেনে এনেছে তার কাছে। সে তার মেয়ের কাছে বেহুলাকে নিয়ে যাবে এই ঘটনার একটা সমাপ্তি টানতে।

ঐশ্বরিক ক্ষমতাবলে সত্যি সত্যিই দেবী মনসার কাছে উপস্থিত হলো বেহুলা। এরপরেই পায়ে লুটিয়ে পড়ে বেহুলা যতোভাবে সম্ভব বুঝালো মনসাকে, সে যাতে তার শ্বশুর চাঁদের সাথে সকল দ্বন্দ্বের অবসান ঘটায়। একপর্যায়ে মন গললো মনসার। সে রাজি হলো এক শর্তে। কী সেই শর্ত? কী আর! চাঁদ সওদাগরের পুজো লাগবে দেবী মনসার উদ্দেশ্যে। বেহুলা একটু দমে গেলো। তার দমে যাওয়া দেখে বাঁকা হাসি হাসলো দেবী মনসা। সেই হাসি দেখে এবারে দৃঢ়চিত্তে ঘোষণা করলো বেহুলা, চাঁদ সওদাগরের থেকে মনসাপুজো আদায় করবে সে। তবে বিনিময়ে শুধু লখিন্দরকে ফিরিয়ে দিলেই হবে না। চাঁদ সওদাগরের বাকি ছয় সন্তান আর ডুবে যাওয়া সেই নৌকাগুলো অর্থ-সম্পদসহ ফিরিয়ে দিতে হবে। মনসার এতে আপত্তি কী! তাই এই চুক্তি করে বেহুলা চললো পৃথিবীর দিকে ফিরে।

আবার কোনো কোনো বর্ণনায় আছে, বেহুলাকে স্বয়ং ইন্দ্রের রাজসভায় নিয়ে হাজির করেছিলো নিতা। সেখানে একজন মানুষকে একটা মৃত লাশ কোলে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ইন্দ্র অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিলো পুরো কাহিনী। বেহুলা শুনালো তার পুরো গল্প। ইন্দ্রের কাছে দাবী জানালো তার স্বামী লখিন্দরের জীবন ফিরিয়ে দেয়ার। ইন্দ্রের রাজসভার দেবতারা বললো, বেহুলা যদি দেবতাদের তুষ্ট করতে পারে, তবে তারা চিন্তা করে দেখবে। বেহুলা তখন তার অসাধারণ নৃত্যশৈলী দিয়ে মুগ্ধ করেছিলো ইন্দ্র ও তার রাজসভার দেবতাদের। ইন্দ্র তখন দেবী মনসাকে ডেকে অনুরোধ করলো এই ঘটনার একটা চূড়ান্ত পরিণতি টানার। মনসা তখন বেহুলাকে বলে, চাঁদ সওদাগর যদি তার পুজো করে, তবে সে যা কিছু কেড়ে নিয়েছিলো সব ফিরিয়ে দিবে চাঁদকে। (মৃত সঙ্গীকে পুনর্জীবিত করতে প্রেমের টানে স্বর্গ পর্যন্ত ধাওয়া করার ব্যাপারটা অবশ্য যুগে যুগেই ব্যবহৃত হয়েছে পৌরাণিক সাহিত্যে। ব্যবিলনীয় কাব্যে দেবী ইশতার গিয়েছিলো তার মৃত সঙ্গীকে পুনর্জীবিত করতে পাতালে, গ্রিক পুরাণে হেডিসের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলো অর্ফিয়াস তার প্রেমিকা ইউরিদাইসকে ফিরে পেতে। আর বাংলা সাহিত্যে এই থিমটা আমরা খুঁজে পাই মনসামঙ্গল কাব্যে বেহুলা-লখিন্দরের প্রেম কাহিনীতে।)

যাই হোক, বেহুলা উপস্থিত হলো চাঁদ সওদাগরের বাড়িতে। তাকে দেখে চমকালো সবাই। বেহুলা একে একে বললো তার ছয় মাসের ভেলাযাত্রার কথা, মনসা দেবীর মাতা নিতার কথা, বেহুলার স্বর্গে আরোহণের কথা, দেবরাজ ইন্দ্র ও দেবী মনসার সাথে সাক্ষাতের কথা। এরপরে সে তাকালো চাঁদ সওদাগরের দিকে। বললো, দেবী মনসা সবকিছু আবার ফিরিয়ে দিবে বলেছে। চাঁদ সওদাগরের হারানো ধন-সম্পদ, ছয় বড় সন্তান আর কনিষ্ঠ সন্তান লখিন্দর।

চাঁদ সওদাগরের মুখ ক্ষণিকের জন্যে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিলো। কিন্তু এগুলো পাবার বিনিময়ে তাকে কী করতে হবে, সেটা শুনে মুহূর্তেই সেই উজ্জ্বল মুখ দপ করে নিভে গেলো। ভীষণ আঁধার ঘনালো তাতে। সে একটুও ভাংবে না। শিবের পুজোই করে যাবে সে। দেবী মনসার কাছে নতি স্বীকার করবে না।

অনেক কাকুতি-মিনতি করলো বেহুলা। কিন্তু চাঁদ সওদাগরের মন গলে না। তখন বেহুলা বললো, দেবী মনসার উদ্দেশ্যে একটা ফুল ছুঁড়ে দিলেই হবে। সেটার দিকে ঘুরে তাকানোরও প্রয়োজন নেই। দেবী মনসা ওটাকেই চাঁদ সওদাগরের আত্মসমর্পণ হিসেবে ধরে নিবে বলেছে।

অতঃপর রাজি হলো চাঁদ সওদাগর। মনসার দিকে না তাকিয়ে বাঁ হাতেই পুজোর ফুল ছুঁড়ে দিলো সে। শিব ভক্তের আত্মসমর্পণ ঘটলো দেবী মনসার নিকট। প্রচলন ঘটলো সমাজে দেবী মনসার পূজার।

আর কী আশ্চর্য! একে একে চাঁদ সওদাগর ফিরে পেলো তার সাতটা বাণিজ্যের নৌকা। তার চেয়েও বড় ব্যাপার বাড়িতে ফিরে এসেছে তার সন্তানেরা জীবিত হয়ে। বেহুলাও ফিরে পেয়েছে তার স্বামী লখিন্দরকে। আবারো ফিরে এসেছে চাঁদ সওদাগরের সুখের জীবন।

কিন্তু দেবী মনসা? সে হয়তো চাঁদ সওদাগরকে তার একনিষ্ঠ ভক্ত বানাতে পারেনি, কিন্তু তাকে অসহায় আত্মসমর্পণ তো করিয়েছে! আর বেহুলার মতো ভক্তের মাধ্যমে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছে তার পুজো। ভক্তসমাজে জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছে তার।

.

তথ্যসূত্রঃ
[১] লাল নীল দীপাবলি কিংবা বাংলা সাহিত্যের জীবনী – ডঃ হুমায়ুন আজাদ
[২] https://www.britannica.com/topic/mangal-kavya
[৩] http://en.banglapedia.org/index.php?title=Mangalkavya
[৪] https://cedar.wwu.edu/cgi/viewcontent.cgi?article=1004&context=cedarbooks
[৫] https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%AE%E0%A6%A8%E0%A6%B8%E0%A6%BE
[৬] https://en.wikipedia.org/wiki/Manasamangal_K%C4%81vya

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত