স্থাপত্যশৈলীতে মুঘল কেল্লা

আজ ১ আগষ্ট কবি ও কথাসাহিত্যিক শুভশ্রী সাহার জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


দীর্ঘ মুঘল সাম্রাজ্য ভারতবর্ষে ১৫২৬ থেকে ১৮৫৭ পর্যন্ত রাজত্ব করেছিল এবং ভারতের স্থাপত্যের ইতিহাসে মুঘল যুগের অবদান ছিল সম্ভবত শ্রেষ্ঠ।  এই স্থাপত্য শৈলী,  ইসলামিক পারসিয়ান তুর্কী আরবিক এবং তিমুরিদ মধ্য এশিয়ার যাবতীয় বিশেষত্ব নিয়ে গড়ে উঠেছিল। তার সাথে ছিল ভারতীয় নান্দনিক সুষমান্বিত চিত্রকলা, রঙের ব্যবহার এবং হিন্দু শৈলী। কালের বিবর্তনে উদ্ভুত ব্যবস্থা,  মুসলিমদের তৈরি দূর্গ ও  দূর্গ প্রাচীরের উপর  যথেষ্ট প্রভাব ফেলেছে এবং পাঁচশত  বছরের অধিক সময় ধরে  সুলতানি ও মুঘল এ দুটি ধারায় দূর্গ স্থাপত্যের উন্নয়ন ও বিকাশ ঘটেছে। দুর্গ নির্মাণ প্রতিরক্ষা মূলক কাজের জন্যে বেশি করে গুরুত্ব পেতো অন্যান্য নির্মাণ থেকে।  দেওয়াল, বুরুজ প্রবেশ পথ সেখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ ও  প্রতিরক্ষার উপর নির্মাণ করে  বানাতে হতো। আবার কিছু দুর্গ  বাসস্থান, এবং গৌরব গাঁথা এবং নান্দনিক উৎকর্ষতার জন্যে বানানো হত।
মধ্যযুগ হতে শুরু করে, মুঘল দুর্গগুলি এপার এবং ওপার সমান্তরাল ধারায় বানানো হত, মাঝখানে থাকত চত্ত্বর বা বিরাট উঠোন। তাতে ভারতীয় শৈলীর জায়গা থাকত। উপরে থাকত বিরাট বড় উল্টোনো বাটির মত  গম্ভুজ  এবং  চারটি স্তম্ভ দিয়ে । সামনে এগিয়ে এসে নলাকৃতি থাম এবং বারান্দা দিয়ে সুসজ্জিত।  বারান্দার গুলির গায়ের লিন্টন পর্যন্ত হিন্দু এবং উপরের অর্ধচন্দ্রাকৃতি অংশে মুসলিম নকশা, চিত্র শৈলী অনেক সময় আরবিক হস্তলিপি দিয়েও শোভা বর্ধন করত। মুঘল আমলে দূর্গে প্রধানত প্রতিরক্ষার উপর আগে জোর দেওয়া হত। তাই দূর্গ প্রাকার, উচ্চতা, পরিখা এবং প্রধান তোরণ মজবুত সকরে তৈরী করা হত। এই সমস্ত দূর্গ গুলি  তাদের নির্মান শৈলী, নকশা  এবং লাল পাথর বালি পাথর বা মার্বেল পাথর দিয়ে তৈরী হবার জন্যে বিখ্যাত ছিল।
যে সমস্ত পাথর ব্যবহার হত সে গুলি বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন রকমের ব্যবহার হত।  জিপসাম এবং চুন দিয়ে প্লাস্টার করা হত।যেখানে  ছাদ, নালী এবং খাল থেকে জল বেরোনোর ভয় থাকত সেখানে চুনের প্লাস্টার করা হত।
দেওয়াল বা দুর্গ প্রাকার অধিক উচ্চতা সম্পন্ন হতো।বাইরে থেকে আরো বড় দেখাতো।  পাথর ই ছিল একমাত্র বস্তু যা দিয়ে দুর্গ বানানো হত। প্রাকারের মূল পাঁচিল টি মাটির তৈরি করে দুই পাশে পাথর দিয়ে দেওয়াল তুলেআরো মজবুত করা হত। এই প্রাকার গুলি র উচ্চতা  ৩৬ থেকে ৪০ মিটার আর চওড়ায় ২১  M- 25m পর্যন্ত হত। মূল তোরণ খুব ই সুসজ্জিত এবং সুরক্ষিত রাখা হত।  এগুলি লম্বায় ২৫ ফিট  এবং চওড়ায়  ১৩ ফিট করা হত। হাতিদের প্রবেশ করা জন্য যেমন সু বন্দোবস্ত ছিল তেমনি লোহার পাত বসানো হত হাতিদের দ্বারা যাতে বহিরাক্রমণ না করা  যায়। প্রাকারের বাইরের দিকে বুর্জ বা বুরুজ নির্মাণ করানো হত। সেগুলি আকৃতিতে অর্ধচন্দ্রাকৃতি হতো এবং দুতলা বা তিনতলা শক্ত গ্রাণাইট পাথরে তৈরি হত এক একটি তলা লোহার ক্লাম্প দিয়ে অথবা সিমেন্ট দিয়ে সামনে ঝুলিয়ে রাখা হত যাতে শত্রুরা আক্রমণ করলে বুরুজ থেকে প্রতিহত করা যায়। অনেক সময় কামান থাকত সারি সারি বুরুজে সাজানো যাতে সহজেই কামান চালনা করা যায়।
দুর্গের চতুর্দিকে পরিখা কাটার ব্যবস্থা ছিল। পরিখা গুলি গভীর এবং হিংস্র জন্তু দ্বারা সুরক্ষিত থাকত যাতে বহির্দেশীয় কোন আক্রমণ না ঘটতে পারে।
দুর্গের মধ্যে বসবাসের জন্যেও বিভিন্নমহল তৈরী হত যেমন শীশ মহল, মোতি মহল ইত্যাদি।। এদের শৈল্পিক  উৎকর্ষতা অসাধারণ।  বিভিন্ন রকম ফুল পাতা  আলপনা সোনা রুপার নকশা ব্যবহার করা হত দেওয়ালের বৃহৎ শয়ন কক্ষে।ছোট ছোট কাঁচের টুকরো  মুল্যবান রত্ন দিয়ে সুরম্য কক্ষ সাজানো হত। পোর্সিলিনের  আলোকবাতি ব্যবহার করা হত। ব্যক্তিগত ব্যবহার এবং আমীর ওমরাহদের নিয়ে বসার জন্যে থাকত লম্বা লম্বা সোনা রুপোর পিলার/ স্তম্ভ দিয়ে  তোলা হত হল ঘর। দেওয়ান ই খাস এই রকম ব্যক্তিগত অতিথিদের জন্যে সুরক্ষিত থাকত। হাওয়া সরাবরাহের জন্যে থাকত পর্যাপ্ত গবাক্ষ।  জল সরাবরাহের জন্যে থাকত বাউলি। বাউলি অর্থে stepped well সিঁড়ি বেয়ে গিয়ে জল তুলতে হত। গরম কালে জলতল নেমে গেলে  দূর্গের মধ্যে যাতে পর্যাপ্ত জল সরাবরাহ অব্যাহত থাকে তার জন্যে এই উন্নত ধরণের টেকনোলোজির ব্যবহার করা হয়েছিল। প্রথম মুঘল সম্রাট হুমায়ুন বাউলি নির্মাণ করেন। মাটির নির্মিত পাইপ দিয়ে জল সরাবরাহ করা হত। এই সমস্ত মহল গুলির নির্মিয়মান শৈলী মুঘল যুগে সবচেয়ে উন্নত মানের ছিল। ইরান ইরাক ইস্পাহান মধ্য এশিয়ার চিত্র কলা, ঘর সাজানোর জিনিষ দিয়ে মহল গুলি সাজানো হত। হিন্দু বেগম দের জন্যে মন্দির ও মুসলিম বেগমদের জন্যে মসজিদ নির্মান করা হত মহলের ভেতরেই।
দুর্গের মধ্যে দর্শনীয় ছিল বাগান গুলি। বাগান গুলি আয়তাকার ঈষৎ লম্বাটে গড়নের। তার মধ্যে ঝরণা এবং ফুলের বাগিচা থাকত। এই ধরণের বাগান গুলি আয়তাকার প্রাঙ্গনের মধ্যে চার ভাগে ভাগ করে ছোট ছোট সুসজ্জিত খাল ধারা যুক্ত থাকত। তাজমহলের মধ্যে বাগিচা এই শৈলীর উৎকৃষ্ট প্রমান। মুঘল স্থাপত্যের সমালোচনায় ফার্গুসন মন্তব্য করেছেন, মুঘল স্থাপত্যে প্রচুর গম্ভুজ ব্যবহার ছিল যা হিন্দু স্থাপত্য রীতির ধারক বলা যায় না। অপর দিকে এডোয়ার্ড ও গ্যালেট মনে করেন  মুঘল স্থাপত্য রীতি ছিল বিদেশী ও ভারতীয়দের সংমিশ্রণ। ঐতিহাসিক হেভেল এর বিরুদ্ধাচরণ করে মন্তব্য করেছেন  ভারতবর্ষ চিরকাল নিজের সংস্কৃতির ধারক  ও বাহক। তাই বলা যায় মুঘল স্থাপত্য শিল্পের অনুকরণ  ভারতীয় বিভিন্ন শিল্পে  অনুকরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ  ছিল।
মুঘল যুগের দূর্গ নির্মানের পরিকল্পনা প্রথম বৃহৎ ভাবে মুঘল সম্রাট আকবরের সময় থেকেই দেখা যায়। বাবর যেটুকু সময় পেয়েছিলেন রাজত্বের, বিজিত অংশে শান্তি বজায় রাখতেই চলে যায়।হুমায়ুন আফগান দের দ্বারা পরাজিত হয়ে পুনরায় দিল্লী অধিকার করেন। মুঘল স্থাপত্য রীতিতে দুর্গ নির্মান  শুরু হয় আকবরের সময় থেকে। আগ্রা দুর্গ ও ফতেপুর সিক্রি তার শিল্প অনুরাগের পরিচয় দেয়।  উভয় রীতিতেই পারস্য ও আরবিক শিল্প কলার প্রভাব সুস্পষ্ট।  ফার্গুসনের মতে ফতেপুর সিক্রি এক মহান ব্যক্তির মনের প্রতিবিম্ব। বুলন্দ দরোয়াজা আকবরের বিজিত নেতৃত্ত্বের আকাশ চুম্বী প্রকাশ। ফতেপুর সিক্রির সৌধ গুলির মধ্যে  যোধাবাই প্রাসাদ, দেওয়ান ই খাস, দেওয়ান ই আম, , বুলন্দ দরোয়াজা এগুলি সুবিখ্যাত। শাহজাদা সেলিমের জন্ম এখানে হয় ববলে একটি খাজা  মৈনুদ্দিন চিস্তির দরগা নির্মাণ  করেন কৃতজ্ঞতা  হিসেবে।  ফতেপুর সিক্রির আশে পাশে বেলে পাথরের আধিক্য থাকার জন্যে এখানকার অট্টালিকা  লাল রঙের। প্রাসাদ প্রাঙ্গণে জ্যামিতিক ভাবে সজ্জিত বেশ কিছু স্বতন্ত্র চাতাল দেখতে পাওয়া যায়, যা আরব ও মধ্য এশিয়ায়  তাঁবু আকৃতির বিন্যাসের অনুকরনে বানানো।  সমগ্র ফতেপুর সিক্রি এইভাবে, আকবরের দুদার্ন্ত  শিল্প ভাবনা ও তার মাধ্যমে বিভিন্ন অঞ্চলের স্থাপত্য কলার সংমিশ্রণ ঘটানোর ক্ষমতা  তুলে ধরে এবং স্বতন্ত্র  স্থাপত্যধারার প্রচলন করে।
কিন্তু প্রাসাদ টি  নিকটবর্তী একটি ঝিলের উৎস মুখ বন্ধ  করে দেয় এবং জল সরাবরাহ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে বলে এবং রাজপুতানার কাছাকাছি হওয়ায়  শত্রুদ্বারা আক্রমণের ভয় ও ছিল তাই  প্রাসাদটিকে  ১৫৮৫ সালে বর্জন করা হয়।
আগ্রা দুর্গ রাঙ্গা  বেলে পাথরের তৈরি। দুর্গের প্রাংগনের আয়তন ২.৫ কিমি। দুর্গের অভ্যন্তরে অনেক প্রাসাদ মিনার মসজিদ আছে।  এগুলি পঞ্চদশ  শতক থেকে শুরু করে ঔরঙ্গজেবের সময় পর্যন্ত চলতে থাকে। জাহাঙ্গীর এবং শাজাহানের সময়  দুর্গের বহু নতুন স্থাপনা হয়।  এর অভ্যন্তরে বিখ্যাত স্থাপনা গুলি দেখা যাক।–
খাস মহিল
শীশ মহল
মুহাম্মান বুর্জ
মোতি মসজিদ
দেওয়ান ই আম
দেওয়ান ই খাস
নাগিনা মসজিদ
এই স্থাপত্য গুলি তিমুরিদ পারসিক  শিল্পকলা এবং ভারতীয় শিল্পকলার মিশ্রণ
১৫২৬ সালে দিল্লী জয়ের পর সম্রাট বাবর আগ্রা দুর্গে অবস্থান করেন।  ১৫৩০ সালে এই দুর্গেই হুমায়ুনের রাজ্যাভিষেক হয়।  ১৫৪০ সালে হুমায়ুন যুদ্ধে পরাস্থ হলে দুর্গ পুনরায় শের শাহের  দখলে থাকে। পরে হুমায়ুন আগ্রা দুর্গ দখল করে এর সংস্কারে ব্রতী হন।আগ্রা দুর্গ  বর্তমানে ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটে অবস্থান করছে।
১০৮০ তে ইতিহাসে প্রথম এই দুর্গের কথা বলা হয়। তখন বাদল গড় বলে পরিচিত ছিল। এই দুর্গের ভেতরের যাবতীয় স্থাপনা, অলঙ্করণ সব ই মুঘল আমলে করা।   দুর্গের চারদিকে ছিল পরিখা, যা এখন পরিত্যক্ত অবস্থায়। তবে মুঘল আমলে সেখানে ছিল কুমির সহ হিংস্র জলজ প্রানী। পরিখার পর ছিল বাগান।সেখানেও ছিলভয়ংকর জীবজন্তু আত্মরক্ষার জন্যে।  আট বছর  অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয়েছিল প্রায় চারহাজার শ্রমিক কে। বিশাল বড় এই দুর্গের পরিধি।  দুর্গের ভেতরে খাস মহল শিশ মহল  মহম্মদ বুর্জ, দেওয়ান ই খাস, দেওয়ান ই আম, মোতি মসজিদ,  মিনা মসজিদ  ও নাগিনা মসজিদ করান। শাহজাহানের মার্বেল পাথরের প্রতি আসক্তি ছিল বলে তার নির্মিত সব স্থাপত্যই প্রায় মার্বেলের তৈরি।
প্রধান গেটের নামছিল আকবরি গেট। প্রধান ফটক ছিল সু উচ্চ এবং দেওয়ালে ছিদ্র যুক্ত। শত্রুর জন্যে গরম তেল ঢালার জন্যে। অনেক টা পথ আংশিক খাড়াই যেগুলি আজকের মতে সমতল সিঁড়ি যাতে রাজা মহারাজারা ঘোড়া বা হাতি নিয়ে যাতায়াত করতে পারেন সহজেই।মেইন  কম্পাউন্ডএর পাশে এক শ্বেত পাথরের প্রাসাদ যেটি জাহাঙ্গীর মহল বা  দেওয়ান ই খাস নামে পরিচিত। সম্রাট এই পিলার যুক্ত বৃহৎ  কক্ষে খাস আদমীদের নিয়ে বসতেন। সাথে থাকত আমীর ওমরা হ রা। ওখানেই শোভা বর্ধন করত বিখ্যাত ময়ূর  সিংহাসন। পাশে আছে মোতি মসজিদ।  বিভিন্ন বেগম দের থাকবার জন্যে তৈরি হত মহল।  দেওয়াই ই আম লাল রঙের প্রাসাদ।  এখানে বসে সম্রাট তার প্রজাদের সঙ্গে দেখা করতেন অভাব অভিযোগ সগুনতেন। এর স্থাপত্য কলা ও নির্মাণ শৈলী ছিল অনন্য।
জাহাঙ্গীরের আমলে আগ্রা দুর্গএর বিন্যাস ও স্থাপনা ঘটে। জাহাঙ্গীর মহল বলে একটি দুর্গ নির্মাণ হয় মধ্যপ্রদেশে,  অঞ্চল টির শাসক  ভিড় সিং দেহ , নগরের প্রথম সফরের সময়  জাহাঙ্গীরের  উষ্ণ অভ্যর্থনার প্রতীক হিসেবে  নির্মাণ করেন। এর প্রবেশ দ্বার,  অর্চা খিলান ঐতিহ্যময় ইন্দো আরবিক স্থাপত্যকে মনে করায়।  কাঠামো টি তিনতলা এবং  চওড়া প্রাঙ্গন, ঝুলন্ত ব্যালকনি বারান্দা দিয়ে সুসজ্জিত। ফিরোজা কালার ব্যবহার করা হয়েছে স্থানে স্থানে। এই দুর্গে গম্বুজগুলি তিমুরিদ শিল্পকলার মতোই সুসজ্জিত।
মুঘল সাম্রাজ্যের  স্থাপত্যের স্বর্ণ যুগ বলা হয় শাহজাহানের সময় কালকে। এই মুঘল সম্রাট তার দীর্ঘ রাজত্বকালে বহু সংখ্যক দুর্গ,  কিলা মসজিদ প্রাসাদ ও প্রাসাদ সংরক্ষন করেন। শিল্পপ্রেমী, নান্দনিক মুঘল সম্রাটের ঐতিহাসিক স্থাপত্য গুলির মধ্যে একটি পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্য তাজ মহল। তাজ মহল স্মৃতি হলেও এর সৌন্দর্য পৃথিবী বিখ্যাত।  তার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ  দুর্গ গুলি হলো, লাল কেল্লা, / বা কিলা ই মুবারক
তাজ মহল,  লাহোর দুর্গ, এবং অসংখ্য মসজিদ।
লাল কেল্লা সপ্তদশ শতাব্দীতে প্রাচীর বেষ্টিত  পুরানো দিল্লীর  শহরে মুঘল সম্রাট শাহজাহান কর্তৃক  নির্মিত হয়।  ১৬৩৮ খ্রীষ্টাব্দে সম্রাট শাহজাহান এই কেল্লাটির নির্মান কার্য শুরু করেন শেষ হয় ১৬৪৮ সালে।এর  আসল নাম কিলা ই মুবারক( ঈশ্বরের আশীর্বাদ ধন্য)  কারণ এই দুর্গেই সম্রাট পরিবার বর্গ নিয়ে বসবাস করতেন। যমুনার জলেই।পুষ্ট হতোদুর্গ প্রাকারের পরিখা গুলো। দুর্গের উত্তর পূর্ব কোণ সালিমগড় দুর্গ নামে অপ্র একটি দুর্গের সাথে সং্যুক্ত। এই দুর্গ টি আরো পুরোনো। ১৫৪৬ সালে  শাহ সুরি এই প্রতিরক্ষা  দুর্গ টি  নির্মাণ করেন। লাল কেল্লা  শাহজাহানের সময় স্থাপত্যের একটি উৎকৃষ্ট  নিদর্শন। প্রকৃত পক্ষে লালকেল্লা ছিল  দিল্লি ক্ষেত্রের  নতুন রাজধানী শাহজাহানবাদের নতুন রাজপ্রাসাদ।
দুর্গ টি ছিল  মসৃণ ও দৃঢ়। দুটি প্রধান দরোজা। দিল্লি গেট ও লাহোর গেট। এই গেট ধরে এগোলে  লম্বা আচ্ছাদিত বাজার পথ পড়ে। এর নাম চট্টাচক।এটি ধরে সোজা এগোলেই  উত্তর ও দক্ষিনের  পথ পাওয়া যায়।  এই পথে বিভিন্ন বেগমদের মহল সামরিক ক্ষেত্র এবং সম্রাটের প্রাসাদ পাওয়া যায়। পথের দক্ষিন প্রান্তে অবস্থিত দরজা হল দিল্লি গেট।
লাল পাথরের বেলে পাথর ব্যবহার হয়েছিল বলে এর নাম লাল কিলা। দিল্লী গেটের বাইরে  একটি বড় মুক্তাঙ্গন রয়েছে। এটি তে এককালে সম্রাট ঝরোখা দর্শন দিতেন। ঝরোখা বলে একটি উন্মুক্ত জানলার মত বা ঝোলানো অংশ বা সিংহাসন ধরণের কিছু বোঝানো হত।এর স্তম্ভগুলি সোনায় চিত্রিত ছিল এবং সোনা ও রুপোর রেলিং  দিয়ে সাধারণ কে সিংহাসন থেকে দূরে রাখা হত।
দেওয়ান ই খাস ছিল শ্বেত পাথরে মোড়া মুল্য বান আসবাব পত্র দিয়ে সজ্জিত। ছিল সোনা রুপোর ফুল আলপনা নকশা দিয়ে  দেওয়াল সাজ। এই সব নকশায় কিন্তু পরের দিকে হিন্দু প্রভাব বেশি দেখতে পাওয়া যায়।
লাল কিলার ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। এই কিলাতেই ভারতেরশেষ স্বাধীন মুঘল সম্রাট ১৮৫৭ সালের সেপাহী বিদ্রোহে অংশ গ্রহন করে রেঙ্গুনে নির্বাসিত হন। ভারতের স্বাধীনতা দিবসে প্রধান মন্ত্রী লাহোর গেটের সামনে দাঁড়িয়ে বার্তা পাঠিয়ে দিয়ে অখন্ড ভারতের সার্বভৌমত্বের বার্তা দেন। বসবাসকারী মহল গুলি ছিল অপেক্ষাকৃত দূরে। দুর্গের পুর্ব প্রান্ত ঘেষে দুটি কক্ষের সারির উপর অবস্থিত।  এই সারি গুলি উচ্চ বেদির উপর করে প্র্থক রাখা শুধু নয়, যমুনা নদীকে দৃশ্যমান করা হয়েছিল।  কক্ষ গুলি নহর ই বেহিস্ত ( স্বর্গোদ্যানের জলধারা) নামে পর‍স্পরের সাথে যুক্ত ছিল। এই জলধারা  প্রত্যেক কক্ষের মাঝ বরাবর প্রসারিত ছিল। যমুনা নদী থেকে শাহ বুর্জ বলে একটি মিনারে জল তুলে  এই জলধারা প্রাসাদের ভেতরে আনা হত। ইসলামি শিল্পকলা দিয়ে তৈরি হলেও কিন্তু প্রচুর  হিন্দু শিল্পী কাজ কর
তেন নির্মাণের সময়। বার্নিয়ে, তেভার্নিয়ে মানুচি এরা প্রত্যেকে দিল্লী ভ্রমণ লিপিবদ্ধ করলে হিন্দু শিল্পীদের কথাও উল্লেখ করেছেন।
প্রাসাদের সর্ব দক্ষিণে ছিল জেনানা মহল।  ছোট কক্ষটির নাম ছিল মুমতাজ মহল,  এবং অপরটির নাম রঙ মহল। বর্তমানে এগুলি দুর্গের সংগ্রহ শালায় পরিণত হয়েছে।
হামামের পশ্চিমে রয়েছে মোতি মসজিদ। এটি  অনেক পরে সম্রাট আওরঙ্গজেব নির্মান করেন ব্যক্তিগত ভাবে ব্যবহারের জন্যে। মসজিদ টি পুরোপুরি শ্বেত পাথরের এবং তিন গম্বুজ ওলা।
লাহোর দুর্গের উল্লেখ যোগ্য সম্প্রসারণ  ঘটেছিল সম্রাট শাহজাহানের সময়। লাহোর মুঘল যুগে রাজনৈতিক দিক থেকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যদিও লাহোর দুর্গের কাজ আকবরের আমলে শুরু হয় এবং মোট একুশ টি স্থাপনা আছে এই দুর্গে, তার কাজ শেষ হয় সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে। শাহজাহান, বিখ্যাত নওলাখা প্যাভেলিয়ন এবং শিশমহল, পরিমহল, সামার প্যালেস , খালিওয়াত খানা, পিতার নির্মিত লাল বুর্জ ও কালা বুর্জের নির্মাণ সম্পূর্ন করেন।  সম্রাট আকবর লাহোর দুর্গের সম্প্রসারণ এর কাজ শুরু করেন, দুর্গে ইন্দো পারসিক এবং ভারতীয় শৈলীর ধরণে সজ্জিত করেন।তিনি সুউচ্চ দুটি গেট নির্মান করেন যার নাম ছিল আকবরী গেট।
জাহাঙ্গীর তার জীবনের শেষ দিক লাহোর দুর্গেই অতিবাহিত করেন। জাহাঙ্গীর  মামুর খানের দায়িত্বে কাজ কর্মের সুবিধার জন্যে মক্তব খানা ( clerk’s  quarters)তৈরী করেন। মোতি মসজিদের সামনে মক্তব খানা নির্মান করেন খাজা জাহান মোহাম্মদ দোস্ত। দর্শকদের জন্যে নির্মিত হলের মধ্যে দিয়ে প্রাসাদ যাওয়ার জন্যে মাঝে পড়ত মক্তব খানা। তিনি কালা বুর্জ ও লাল বুর্জ নির্মান শুরু করেন।  বিরাট বড় দেওয়ালের গায়ে তিনি চিত্র শিল্প  অঙ্কনের জন্যে নির্দেশ দেন। দেওয়াল টি ইটালিয়ান গ্লেজড টানি দিয়ে নির্মিত, রঙিন মোজাইক  এবং জল রঙের প্রচুর ছবি। সেই সব ছবি সোর্ড ফাইটিং, হাতির লড়াই, নৃত্য রতা নারী, দেওয়ান ই খাসে সম্রাটের ছবি, রাজপুতদের হোলি খেলার ছবিতে, মোট ১৩১টি প্যানেল করে সাজানো।এই দেওয়াল চিত্র উত্তর ও পশ্চিম দিক করে সাজানো।
খিলাত খানা  শাহ জাহান তৈরি করেন।  শাহ বুর্জ প্যাভেলিয়নের পুর্ব দিকে। খিলাত খানায় দুর্গের গণমান্য আমীর ওমরাহ্ দের স্ত্রীরা থাকতেন। এই স্থাপনা টির  পিলার এবং  দরজার ফ্রেম, মেঝে সব ই ছিল মার্বেলের তৈরী সুদৃশ্য সাদা। লাল বুর্জ  প্রাসাদ টি জাহাঙ্গীরের আমলে শুরু হলেও শেষ হয় পুত্র শাহজানের সময়। অষ্ট কোণ বিশিষ্ট প্রাসাদ।এটিকে গ্রীষ্ম কালীন আবাস স্থল।ব্যবহার করতেন সম্রাট গন। এর জানলা গুলি রাভী নদীর দিকে খোলা থাকায় উত্তরে ঠান্ডা বাতাস প্রবেশ করত ঘরে। খিলাত খানা সংলগ্ন অংশেই চতুষ্কোণ নির্মিত করা হয় স্ম্রাটের শাহজাহানের নিজস্ব ঘোরাফেরার স্থান হিসেবে। খোয়াবাগ ছিল সম্রাটের নিজস্ব বেডরুম যেখানে সম্রাট এসে উঠতেন তার সন্তানদের নিয়ে। পাঁচটি বড় বড় কক্ষ ছিল।ঘুমোবার। মার্বেলের তৈরি,  বিভিন্ন জল রঙে আঁকা চিত্র। মণি মুক্তো দিয়ে  পাথর দিয়ে সাজানো হত সমস্ত কক্ষ গুলি। কক্ষ সংলগ্ন বারান্দা দিয়ে বাগান এবং রাভী নদী দেখা যেত। প্রত্যেক সম্রাটের নিজস্ব চত্ত্বর টি ঘিরে পারসিয়ান স্টাইলে ফোয়ারা ও বাগিচা থাকত। দেওয়ান ই আম, দেওয়ান ই খাস খুব সম্ভবত সব দুর্গেই থাকত একটি করে।
এই দুর্গের সব চেয়ে বেশি স্থাপনা মুঘল সম্রাট শাহজাহানের সময় ঘটে।মোতি মসজিদ নির্মান করা হত লাহোর দুর্গের পশ্চিম দিকে। সবচেয়ে উল্লেখ যোগ্য দুই প্রাসাদ ছিল নওলাখা প্যাভিলিয়ন এবং শীশ মহল। শীশ মহল নির্মিত হয়েছিল শাহজাহানের সময়,  লাহোর দুর্গের  উত্তর পশ্চিম দিকে। সাদা মার্বেলের উপর আয়না কারি করা হয়েছিল সারা হল।জুড়ে। এবং ছাদে ছিল ধারে ধারে জল রঙের চিত্র সকল। শীশ মহল লাহোর ফোর্টের  মুকুটের মতন ছিল। ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্যে সম্রাট নির্মান করেছিলেন।  গ্রীষ্ম কালীন প্রাসাদ তৈরি করেছিলেন  যেটি সমস্ত গ্রীষ্মে এমন নিপুন ভাবে ভেন্টিলেটর দিয়ে ঠান্ডা বাতাস আনার কাজ করত।এ ছাড়া কক্ষগুলির মেঝে ঠান্ডা করার জন্য দুটি লেয়ার দিয়ে তৈরি করা হত। প্রথম।লেয়ার টির মাঝখানে জল থাকত, যেটি রাভী নদী থেকে পাম্প করে আনা হত এবং  প্রাসাদের বেয়াল্লিশ টি ঝরনা থেকে গোলাপজল ছড়ানো।  ১৬৩৩ খ্রীষ্টাব্দে, লাহোর ফোর্টের সবচেয়ে সুন্দর আকর্ষণীয় প্রাসাদ টি তৈরি হয়।  সাদা দুগ্ধ শোভিত মার্বেল এবং তার চারধারে দামী দামী পাথর দিয়ে সজ্জিত এই স্থাপনা। রাজস্থান,  পাঞ্জাব থেকে পাথর,  চীন থেকে স্ফটিক , তিব্বত থেকে ফিরোজা আফগানিস্তান ও শ্রীলঙ্কা থেকে এসেছিল নীলকান্ত মনি। নীল ও ফিরোজা রঙের বহুল ব্যবহার দেখা যায়  মুঘল আমলের ষোড়শ শতকের প্রথমার্ধে।  প্রায় কুড়ি ধরনের পাথর এই দুর্গ নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে। এর আকৃতি বাঁকানো ধরনের।
শাহজাহানের মত শখ  সৌখিনতা তার পুত্র পরবর্তী মূঘল।সম্রাট আওরঙ্গজেবের ছিল না। তিনি উদার নির্মাণ  শৈলী কে বাদ দিয়ে পুরানো গতানুগতিক নির্মাণ পছইওন্দ করতেন। তার আমলে দুর্গ অপেক্ষা  মসজিদ অধিক নির্মান হয়েছিল। তিনি ১৬৭৪ খ্রীষ্টাব্দে  পশ্চিম দিকে প্রধান ফটক আলমগিরি গেট নির্মান করেন। এর মুখোমুখি ছিল  হুজুরি বাগ এবং বাদশাহী মসজিদ। ঢাকা জিলায় সম্রাট আওরঙ্গজেব  ১৬৭৮ খ্রীষ্টাবে বুড়িগঙ্গার ধারে লালবাগ দুর্গ তৈরি করেন। এই দুর্গ গুলির সৌন্দর্য অপেক্ষা প্রতিরক্ষাকে  বেশি  প্রাধান্য দেওয়া হত। এগুলি নদীর উপর নির্মাণ করা হত যাতায়াতকারীদের সুবিধার জন্যে। হাজীগঞ্জ সোনাকান্দা ইদ্রাকুপুরের নদী দুর্গ গুলি বিশেষ ভাবে উল্লেখ যোগ্য। মুঘিলদের নির্মিত মসজিদ   গুলির মধ্যে লালবাগ ফোর্ট মসজিদ , জিনাত উল মসজিদ, মতি মসজিদ, আওরঙ্গজেব গ্রেট মসজিদ,শাহজাহান মসজিদ বিশেষ উল্লেখ যোগ্য।
মুঘল আমলে অসংখ্য স্থাপনার মধ্যে দুর্গ মসজিদ সমাধিধারের কথা ঐতিহাসিক গণ উল্লেখ করেছেন। এদের মুল যে কাঠামো মোটামুটি এক ই বেসিক আইডিয়া এবং আর্কিটেক্ট এর উপর নির্ধারিত ছিল। তাজমহল তৈরির স্থপতিই   আহমদ লহরী লাল কেল্লার নকশা নির্মান করেছিলেন।ভিত্তি চারটে মিনার প্রবেশ  প্রাসাদ এই ছিল নির্মাণকাজের ক্রম। কয়েক শো কর্মচারী, দেযহ বিদেশ থেকে আনা পাথ র দিয়ে কাজ করা হত। কাজের সময় পাঁচ সাতশো হাতি মাল বওয়ার কাজে লাগানো হত। নওলাখা প্রাসাদ করতে তখনকার দিনেই নয় লক্ষ টাকা খরচ হয়েছিল বলে এর নাম নওলাখা মসজিদ।দুর্গ গুলি পাথরের তৈরি বলে গিরি দুর্গ এবং নিরি দুর্গ যে গুলি প্রতিরক্ষার জন্যে নির্মিত করা হয়েছিল। গ্রাণাইট মার্বেল , লাল পাথর, চুনা পাথর ব্যবহার করা হত। দুর্গ নিয়ে অনেক কাহিনী প্রচলিত আছে। দুর্গ প্রাকারে নাকি মানুষের জীবন বলিদান না দিলে শক্ত হত না। দুর্গের ভেতরে তাদের আত্মা বসবাস করে দুর্গ কে রক্ষা করতো। এর সত্যতা
স্বীকার করেছেন। হিন্দু বেগমের জন্যে এবং মুসলিম বেগমের জন্যে আলাদা প্রাসাদ তৈরি করা হত। আকবর নিজে যোধাবাইএর জন্যে আলাদা করে মন্দির তৈরি করিয়ে দিয়েছিলেন।
এই সব দুর্গ গুলির স্থাপত্য নির্মাণের ধারা আলোচনা করলে দেখা যায় প্রথম।দিকের  দুর্গ গুলি, তিমুরিদ স্টাইল এবংবেশির  ভাগ ই পারসিক স্টাইল। নকল করলেও পরের দিকে ভারতীয় সংস্কৃতিকে আপন করে নেয়। দুর্গ গাত্রে

ভারতীয় ছবি, নকশা মোজাইক টলির বহুল ব্যবহার করা হয়। এই ধরণের স্থাপনা জাহাঙ্গীরের সময় থেকে বেশি প্রতীয়মান হয় বেশি। জাহাঙ্গীর যে ধারার সংমিশ্রণ ঘটান তার পুত্র সম্রাট শাহজাহান সেই পথেই সেই ধারাকেই এগিয়ে রাখেন।

গ্রন্থ সূত্র— মধ্যযুগের ভারত — অনিরুদ্ধ রায়
বেঙ্গল রিপোর্ট
বাংলাদেশ প্রতিদিন
mughal architecture n gardens
by George  Michell Amit pasricha
[লেখাটি মায়াজম থেকে পুনঃপ্রকাশ করা হলো]

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত