পিতা

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com
একটা গল্প বলব? আগের দিনের পুরনো গল্প?

-রূপকথা?

-না রূপকথা না, তবে রূপকথার প্রায় কাছাকাছি। শুধু এ গল্পটায় রাজা-রাণী নেই, রাজকন্যা নেই, সহস্র দল, চম্পক দলও নেই, রাক্ষস, খোক্কস আর পাতালপুরের প্রসঙ্গও নেই। খুব কমন একটা গল্প। কোন নতুনত্বও নেই।

-তো আছেটা কী গল্পে?

-আছে। একটা চরিত্র আছে চৌধুরী মাহাতাব হোসেন নাম। রাজা না হলেও রাজ রক্তের বংশধর বলা যায়।

-রাজরক্ত? তবেই হল, বর্বর নিশ্চয়ই। নাকি এই লোকটার চরিত্র ভালো?

-আরে না না চরিত্র ভালো না। আর ভালো হলে আগ্রহ ভরে সে গল্প কি কেউ শুনতে চাইবে? লম্পট আর ভোগী পুরুষের গল্প জমাট রসালো হয়, একটা পত্নী ডজনখানেক উপপত্নী। ওমুক -তমুক সেবাদাসী

-ও বুঝেছি প্রচুর বিনোদন

-হু হু। বিনোদন আরো আছে। তার দহলিজ ভরা আশরাফ লোকের জমাটি আসর, ইরান তুরানের মাখো মাখো অবৈধ প্রেমের গল্প, বাড়তি আছে রুবাই, সুরা আর সাকী।

-ইশ এসময়ে এসে এইসব মধ্যযুগীয় চাপাবাজি ঠিকঠাক যাবে তো?

-আরে যাবে যাবে, গল্প কবিতা উপন্যাসে সব যায়।

-ধুর আর প্যাঁচ দিও না
এবার কাহিনিটা ঠিকঠাক বলো

-কাহিনি আর নতুন কি? সবাই জানে, চরিত্রটাও সবাই চেনে। সিনেমা নাটকে কত দেখেছে।

-আচ্ছা বুঝেছি।
তা সেই খারাপ লোকটার মেজাজ-মর্জি কেমন?

-ওটাও ট্রেডিশনাল, পূর্বপুরুষের রক্তের সাথে হুবহু মিল। আর থাকবে না ই বা কেন? কত কি আছে তার। পিতৃপুরুষের বিরাট বিরাট ভূ-সম্পত্তি, মনোহরগঞ্জের মাছের আড়ৎ, পাটের গুদাম, বরফকল, চট্টগ্রাম বন্দরে স্টিমার, লোহা-লক্করের ডিপো, আরো কত কী! কতশত মানুষের পেটে ভাত জোটে তার দয়ায়…!

-দয়া? তার মানে মমতাও আছে নিশ্চই?

-হে হে হে এত পয়সাওয়ালা প্রতাপশালী রাজরক্তের মানুষের কি মমতা থাকে? কোন গল্পে পেয়েছ? পাওনি। তারও নাই ।

-পরিবারের জন্যও না ?

-আর পরিবার!
ওহ আচ্ছা আচ্ছা পরিবারের কথা জানতে চাইছ? তাহলে সে গল্পটাই বলি কেমন। প্রশ্ন না করে চুপচাপ শোন এবার…।

২.
তার পরিবারের একমাত্রর বংশধর রুকসারা মালিহা। ডাকনাম খুকি। তার মায়ের নাম মফিদা। এ গল্পে খুকি ও খুকির মায়ের চরিত্রটা খুব ইম্পর্ট্যান্ট। খুকির জন্মের ইতিহাসটা বিরাট লম্বা। খুকির মাকে চৌধুরী মাহতাবের বিয়ে করতে হয়নি, কাঁচা পয়সায় নগদ কিনেছিল। সেই কারণে এই কন্যার পিতৃ পরিচয়টা বেশ গোলমেলে। এগার বছর বয়সে মফিদা প্রথম মনোহরগঞ্জের এই বিশাল বাংলো বাড়িতে আসে। সেদিন তার বুকের ভেতর ছিল প্রচণ্ড ভয়। কাঁপছিল খুব। কাঁপলেই বা কী? তার তাড়ি খেয়ে পড়ে থাকা পাঁড় মাতাল বাপ তাকে বেঁচে দিয়েছে এই মাহতাব বাবুর পেয়াদার কাছে।

মফিদা অন্দর মহলে ঢুকতেই একটা রাতজাগা পাখি চিৎকার করে কেঁদে উঠেছিল , সেই অশুভ পাখিটা হয়ত হুতোম পেঁচা হবে। এত বিশ্রী ভাবে অন্য কোন পাখি ডাকে না। ভীরু অনুঢ়া মফিদা তার অবাধ জীবনের সকল মুক্তির আয়োজন জলাঞ্জলি দিয়ে মাহতাব মঞ্জিলে শুরু করলো নতুন জীবন।

বছর খানেক কেটে যায় মফিদার কোন ঘটনা ছাড়াই, ঠ্যাঙ্গা স্বাস্থ্যের জন্য প্রথম বছর কারো নজরেই পড়েনি সে। বাড়ি ভর্তি চাকর- বাকর। কেউ আড়তে যায়, কেউ যায় গুদাম ঘরে, কেউ আবার বরফ কলে কাজ করে। ভেতর বাড়ির অবস্থাও এক। গিন্নিমার সেবাদাসী ছাড়াও আছে মাছ কাটা, বাসন মাজা, আর কাপড় কাঁচার আলাদা আলাদা লোক। মফিদা জানতো তাকে কিনেছে বিলাস বাড়ির পরিচ্ছন্নতার জন্য। সে বিশ্বাস থেকেই নাবালিকা মফিদা ঘুরে বেড়ায় ভেতর বাড়ির এখানে সেখানে। ভয় কি তার, যে কাজের জন্য তাকে কিনেছে, সে কাজতো সে করেই। সকাল বিকাল নাকে মুখে কাপড় বেঁধে ফাতেমা খালার সাথে উঠান ঝাড় দেয়, গাছের গোড়ায় পানি দেয়, দুপুর রোদে উঠানকোণে শুকায় শত রকম আচার। বিনিময়ে পায় পেট ভরে ভাত আর গতরের কাপড়।

তাই তো তার আর চিন্তা কী?

চিন্তা ছিলও না, তবে এই ভরা পেটের ভাতই তার চিন্তা ডেকে আনে।

কেমন?

চৌধুরী মাহতাবের ভাতের অনেক গুণ, মফিদার পেটে পরতেই পাল্টে গেলো তার রূপ। বুক আর পিঠ হয় কেমন কেমন হয়ে যায়। ঝাঁকড়া চুল হয় অবাধ্য। তার চলনে বলনে থমকে দাঁড়ায় আড়তে যাওয়া, গুদামে যাওয়া, আর বরফ কলে যাওয়া মজুরগুলো। তাদের আকারে ইঙ্গিতে প্রলোভন। মফিদা ভয় পায়। বার বার গায়ের আঁচল টানে। গিন্নীমার কাছে ঘুর ঘুর করে। নালিশ জানায়। বলে –

মাইজি ওরা আমারে গিলে খায়। মাইজি ওরা আঁচল ডানে, রাইতে ঠিলা দেয় ঘরে।

আঞ্জুমান শোনে সব, কিন্তু কোন প্রতিউত্ততর দেয় না। আঞ্জুমানের মনে ও শরীর দুটোতেই ভারী। শুধু মেজাটাই শুকানো খরখরে। কেউ কিছু বলেলেই খ্যাক করে জ্বলে উঠে। শারীরিক ও মানসিক ভাবে অতৃপ্ত আঞ্জুমান দু’ এক কথার বেশি কারো সাথেই কথা বলার উৎসাহ পায় না। কিন্তু এই মেয়েটা জানি কেমন, আঞ্জুমানের জন্যই তার সব ছোকছোকানি টান, পাত্তা না দিলেও পায়ে পায়ে ঘোরে সর্বক্ষণ। মাইজি মাইজি করে তালা লাগায় কান। ফাঁক-ফোকর পেলেই ছুটে আসে কাছে, ঘ্যানর ঘ্যানর করে-

মাইজি পান সাজাই? মাইজি বিলি কাটি মাথায়, তেল লাগাই?

আঞ্জুমান রা করে না। আঞ্জুমানের খাস দাসী ছিল ফিরোজা, সেই ছ ‘বছর বয়সে এসেছিলো এবাড়ি, গতরে মাংস আসতেই এখন মাহাতাবের পেয়ারী, জলসা ঘরের রাণী। মাগীটা একবার ফিরে ও দেখেনা এদিকে আর। সবাইকে চেনা আছে তার। ঘর আর পর দুটোই। আঞ্জুমা চায় না এ ঘর থেকে তার মেয়ের বয়সি আর কেউ ওপাশের জলসা মহলে যাক, ঘেন্না হয়।

আঞ্জুমানের ঘেন্নায় কিছুই হয় না। মফিদার জীবনের চিত্রনাট্যও লেখা হয় এ ঘর থেকেই। সেদিন মাহাতাব আঞ্জুমানের ঘরে এসেছিল মনিরাম পুরের জমি নিয়ে কথা বলতে ঐদিকে আঞ্জুমানের বাপের বাড়ি, কথা চলাকালিন সময়ে হুট করে ঘরে ঢোকে মফিদা, তার মাইজি কে ডাকতে এসেছিল-
মাইজি মাইজি…! একটা মুহূর্তের জন্য শুধু, তারপর ছিটকে বের হয়ে যায় ঘর থেকে, মাহতাব কে সে যমের চেয়ে বেশি ভয় পায়

৩.
এর আগে ভেতর বাড়ির আঙ্গিনায় বা ছাদের কার্ণিশে দুই একবার চোখাচোখি হয়েছিল তাদের, তখন মফিদাকে দেখে পেয়াদার উপর বেশ বিরক্ত হয়েছিল মাহতাব, এই হাড় কংঙ্কালে নারী শরীর কেউ পয়সা খরচ করে কিনে? দেখলেই কেমন উড়ে আসা পতঙ্গের মত লাগে রংহীন অনাকর্ষণীয়।

কিন্তু আজ এ কোন নারীকে সে দেখলো, ঝকঝকে রঙ্গিন প্রজাপতি যেন। নরম পাখির মতো পালক জড়ানো সারা গায়। হেঁটে যাওয়ার সময় মনে হলো কাঠ গোলাপের গন্ধ এল নাকে। কেমন হবে এর অস্ফূট অনাবৃত রূপ।

মাহতাব মাতাল হয় এ নারীর রূপে। এর স্পর্শ চাই তার ঘ্রাণও চাই। জলসা ঘরে আজ আর নৃত্যগীতি নয়, লালস মদের উৎসব হবে শুধু। মাহতাব লাল চোখে পেয়াদা ডাকে। সে রাতেই, হ্যাঁ অভিশপ্ত সে রাতেই ঘুমন্ত মফিদাকে তুলে আনা হয় মাহাতাবের বিছানায়। জান্তব চিৎকারে মফিদার কুমারীত্ব বিসর্জন পর্ব চলে। কিশোরী মফিদা হাত ছোড়ে, পা ছোড়ে চিৎকার করে কাঁদে, অভিশাপ দেয়, নখের আঁচর কাটে রক্তাক্ত হয়, রক্তাক্ত করেও। মাহাতাব শুধু সুখের উল্লাসে বিরক্ত হয়।

অশ্লীল কদর্য উৎসব গালিও দেয় কিছু-
“মাগী দাসী হয়েও তোর এত তেঁজ কেনো, মাগী মাগী মাগী”

তৃপ্ত মাহতাব বিকৃত আনন্দ লাভের বাসনা ষোলকলায় পূর্ণ করে, ক্লান্ত চোখের এবার আরাম প্রয়োজন, হাঁক ছেড়ে কামলা ডাকে। নে, এবার তোদের পালা, তবে সাবধান! মেরে ফেলিস না যেন, শত হলেও নগদ পয়সায় কেনা!

রাত ভোর হয়। পৈশাচিক উৎসব শেষে আড়তে যওয়া, গুদামে যাওয়া, বরফ কলে যাওয়া মজুরগুলোও ক্লান্ত হয় একসময়। ঘুমিয়ে পড়ে তারা। মফিদার নিথর দেহটা এখন আঞ্জুমানের বিছানায়, মরেনি সে, বেঁচে আছে। জ্ঞান ফেরার পর খনখনে কণ্ঠে একটু কেঁদেছিল শুধু, দূর থেকে সে কান্না রাতে গুঙ্গিয়ে ওঠা কুকুরের ডাকের মতো মনে হচ্ছিল।

নিঃসন্তান আঞ্জুমান এই প্রথম মাইজি থেকে মা হয়ে ওঠে। মফিদাকে সন্তান স্নেহে বুকে আগলে ধরে। সদ্য ঋতুমতি হয়ে ওঠা মফিদার শরীর বদলে গেছে, একমাস, দুইমাস তিনমাস যায়, মফিদার কেমন কেমন লাগে। আঞ্জুমানের যোগাড় করে আনা গাছ লতাপাতা আর শিকড় বাকরের রস তার জঠরের পাপটাকে নষ্ট করতে ব্যর্থ হয়। ছোট্ট জরায়ুতে নতুন ভ্রুণ। কী ভয়ংকর সে অনুভুতি। একেই বলে মাতৃত্ব। কার ঔরসে জন্ম নেওয়া এই ভ্রুণ কেউ জানেনা। মফিদা হাল ছেড়ে দেয়। আঞ্জুমান হাল ধরে, দেখতে চায় এর শেষটা কোথায়? মফিদাকে যত্ন করে মাছ খেতে দেয়, দুধ খেতে দেয়, বানিয়ে দেয় চালতার আচার, তেঁতুেলর চাটনি।

প্রবল বর্ষণমুখর এক সন্ধ্যায় কালো কালো চোখ, নয়ন ভুলানো রূপ আর একমাথা চুল নিয়ে ভূমিষ্ঠ হয় এক দেবকন্যা। এত সুুন্দর চোখ, পটলচেরা, এ চোখে কি কোন পাপ থাকতে পারে?

আঞ্জুমান নেকরার পুটলিটার দিকে তাকিয়ে আছে। তার গা শিরশির করছে আতঙ্কে। এমুখ তার দীর্ঘ ষোল বছরের পরিচিত মুখ। হুবহু দানব মাহাতাব চৌধুরীর মুখ।

মাহতাব চৌধুরী দুটো সংবাদ একসাথেই পায়, একটা হচ্ছে বুকে ব্যথাও নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে তার একমাত্র বৈধ স্ত্রী আঞ্জুমানের মৃত্যু হয়েছে, আর দ্বিতীয়টা হচ্ছে তার দাসী এক অনিন্দ্য সুন্দর কন্যা সন্তান জন্ম দিয়েছে।

সদ্য প্রসূত বাচ্চাটার প্রচণ্ড ক্ষুধা, তার সাথে প্রচণ্ড তেজও, যখনই বাচ্চাটার ক্ষুধা পায় কেমন যেন ফুঁসে ওঠে রাগে। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে মফিদা। তার ঘাড়ের পেছনটা, শিড়দাড়াটা এমন কেন? কাউকে বলে দিতে হয় না দেখলেই বোঝা যায় এর গায়ে মাহতাবের রক্ত।

বাচ্চাটা পাঁচ বছরে পড়েছে। সবাই খুকিই ডাকে। দাসী-বাঁদির বাচ্চারা যেভাবে বড় হয় খুকিও তেমন করেই বাড়ছে। ফুটফুটে সুন্দর মেয়েটা সারা বাড়ি ছুটে বেড়ায় আর খেলে। তেমনি একদিন খেলতে খেলতে রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া একটা বল ছুড়তে ছুড়তে যাচ্ছিল। হঠাৎ বলটা মাহাতাবের গায়ে গিয়ে লাগে। অন্ধরাগে মাহতাব ফুঁসে ওঠে চিৎকারে বলে,
“বান্দির বাচ্চা বান্দি তোর এত সাহস!”
মাহতাবের চিৎকারে খুকি হাসে। তার রাগের সাথে সাথে চক্রবৃদ্ধি হারে খুকির উচ্ছ্বাসও বাড়ে। মুহূর্তেই তালজ্ঞান হারিয়ে ফেলে মাহতাব।

তারপর একটা গগন বিদারী চিৎকার!


মফিদা তৎক্ষনাৎ ছুটে আসে সে বীভৎস চিৎকারে। উঠানে ধানমাড়াই করা কামলারাও আসে। পাতকুয়ার ভেতর থেকে অজ্ঞান খুকিকে যখন তারা উদ্ধার করে তখন খুকির বাঁ চোখটা মাছের চোখের মত গলে গেছে একদম।

খুকির বয়স আরো বেড়েছে, বাঁ চোখের কোটরটা গর্তের মত লাগে। আশে-পাশের কোন বাচ্চারা তার সাথে খেলে না। সঙ্গহীন খুকী একা একা কাঁদে, একচোখের কান্না কী বীভৎস আর কুৎসিত কেউকি তা জানে, জানে না হয়তো।

খুকির খুব পড়ার ইচ্ছে। মাহতাবের দেয়া মক্তবের পাশে সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নোংরা কাপড়ে মাটিতে বসে থাকে। কত কি শিখে আলিফ জবর অ্যা, বা জবর ব্যা।
একদিন হুট করে খুকির গ্রামে আসে কলকাতা থেকে এক আধপাগল বুড়ো মাস্টার। যে খুকীর দিকে কেউ ফিরেও দেখে না ভয়ে! সেই খুকীই তার নজর কাড়ে। কী নিঃসঙ্গ আর একা একটা শিশু। মনোহর গঞ্জে কি কাজে এসেছিল ভুলে যায় সে বরং খুকিই তার একমাত্র ধ্যান জ্ঞান হয়ে ওঠে। খুকীকে সে গোপনে নামতা শেখায়, ইংরেজি পোয়েম পড়ে শোনায় হেলেদুলে, গলা কাঁপিয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বেইমানির ইতিহাস ব্যাখ্যা করে। সারাবেলা মাস্টারের সাথেই কাটে খুকির আর রাতের বেলায় যখন ঘরে ফিরে তখন তার মাকে আবৃত্তি করে শোনায় টুইঙ্কাল টুইঙ্কাল লিটল স্টার। মফিদা অন্ধকার ঘরে ভাঁড়ার ঘর থেকে চুরি করে আনা মোমের আলো জ্বেলে দেয় খুকির সামনে, সে আলোয় খুকি খড়ি দিয়ে দেয়ালে লেখে-

“ঝিকি মিকি কর তুমি আকাশের পরে বিস্ময়ে দেখি আমি ছোট তারাটিরে”।

পাগলা মাস্টার খুকীর জীবনটাই পাল্টে দেয়। বিভিন্ন চ্যারিটি ফান্ড নির্ভর প্রতিষ্ঠানে চিঠি লেখে। অবশেষে একটা প্রতিষ্ঠান রাজী হয় খুকীর পড়াশোনার দায়িত্ব নিতে। নতুন করে রচিত হয় খুকীর ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। যতটা ভালো ছাত্রী হলে পত্রিকায় ছবি ছাপা হয় খুকি তারচেয়েও বেশি ভাল। খুকীর পরিচয় এখন- রুখসারা মালিহা।

প্রকৃতির রূপ বদলের সাথে সাথে বদলেছে অনেক কিছু। বদলেছে মাহতাব মঞ্জিলের জৌলুস। হাবাগোবা মফিদা সময়ের প্রয়োজনে এখন বেশ চতুর। মাহাতাব চৌধুরী ক্ষয়রোগে আক্রান্ত, অসুস্থ মাহাতাব চৌধুরীর শুশ্রূষা করতে মফিদা ছাড়া কেউই আসে না। মফিদাকে এই বড়ির গিন্নীর মত লাগে প্রায়। অবিশ্বাস্য দক্ষতায় মফিদা এই রাজসংসার দেখছে। খুকিও আসে মাঝে মাঝে মাকে দেখতে। এই মাকে তার অচেনা লাগে। মফিদার সাথে খুকীর অবস্থানটাও এ বাড়িতে বদলছে। এখন আর কেউ তাকে প্রকাশ্যে জারজ সন্তান বলে গালি দেয় না।কামলাগুলো তাকে দেখলে আর গা টেপাটেপিও করে না।

সব কিছু ঠিক হয়ে যাচ্ছিল বড্ড দ্রুত । এমন কি বিক্রমপুরের এক হাকীমের দাওয়াই খেয়ে মাহতাব চৌধুরীও সুস্থের পথে, যেদিন তিনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেন সেদিনই সবাই দেখে মাহতাব মঞ্জিলের নিচে একটা থ্যাতলানো মগজ ছিটকে যাওয়া নারীর লাশ

লাশটা মফিদার ছিল।

যখন মফিদার মরার কথা ছিল তখন সে মরেনি, মরেছে এই মধ্যবয়সে। খুকির ধারণা মাহাতাব চৌধুরী তার অসুস্থতার সুযোগে সুযোগ নেয়া এই দাসীর অতিরিক্ত আধিপত্য মেনে নিতে পারেনি। এমনকি কেউ তাকে করুণা করেছে এ লজ্জা হজম করাও তার জন্য কঠিন। একারণেই মাহতাব নামের পিশাচটা বাড়ির ছাদ থেকে ধাক্কা দিয়ে খুন করেছে তার মাকে। একথা কেউ বিশ্বাস করেনা বরং তাকে পাগল প্রমাণ করে ছাড়ে মাহতাব।

হ্যাঁ খুকি পাগল। খুকি একা একা খোঁজে তার মাকে এখানে সেখানে সবখানে। খুকী আর হোস্টেলে ফেরে না। মফিদাকে খুঁজে বেড়ায় এখানে সেখানে। রাতের অন্ধকারে এক টুকরো মোম জ্বেলে খুকি তার অশরীরি মাকে শোনায় “ টুইঙ্কাল টুইঙ্কাল লিটল স্টার হাউ আই ওয়ান্ডার হোয়াট ইউ আর”।
এভাবে খুঁজতে খুঁজতে একদিন ঠিক সে তার বিস্মিত ছোট তারাটিকে খুঁজে বের করবে। কোথায় আছে সেই তারাটা? লজ্জিত কলঙ্কিত তারাটা! খুঁজে পায়না কেন খুকি? খুকি কাঁদছে। এক চোখ দিয়ে পানি পড়ছে তার। আরেক চোখে গর্ত! কি বীভৎস আর অসহায়ের কান্না।

৫.
আরো একজন কাঁদছেন চৌধুরী মাহাতাব। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ সরওয়ার কামাল মাহাতাবের চৌধুরীর হাতের উপর একটা হাত রাখে। সান্ত্বনার হাত।
– ভাই কাঁদবেন না প্লিজ। ধৈর্য ধরেন। বুঝতে হবে আপনার মেয়ে সিজোফ্রেনিক রোগী। বংশগত কারণ ছাড়াও মস্তিস্কে আঘাত পেলে এ রোগ হয়। আপনার খুকি ছোটবেলায় খেলতে গিয়ে কুয়োয় পরেছিল সে সময় সে শুধু তার চোখটাই হারায়নি সাথে হারিয়েছে অনেক পুরনো স্মৃতি। এখন সে নিজের মতো করে তৈরি করেছে নিজের হারিয়ে ফেলা স্মৃতি। সে স্মৃতি ভয়ঙ্কর আর একাকিত্বের। সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত পেশেন্ট কখনো কখনো ট্রমায় চলে যায়। নিজের ভিতরে অলৌকিক সব গল্প, চরিত্র তৈরি করে। শত্রুকে মিত্র মনে করে মিত্রকেও শত্রু। আপনার কপাল খারাপ। আপনার কন্যা আপনাকে শত্রু মনে করছে। আপনার মত এমন হৃদয়বান একটা মানুষকে সে কি করে মধ্যযুগের বর্বর চরিত্রে কল্পনা করে ভেবে পাইনা।

মাহাতাব চৌধুরীর ফ্যাকাশে মুখ, অধৈর্য হয়ে বলে আর শুনতে চাই না আপনাদের পুরনো কথার পুনরাবৃত্তি। আর পারছি না। সেই দশ বছর বয়স থেকে ওর ট্রিটমেন্টের জন্য যা যা বলেছেন করেছি। dis-organized thinking, thought blocking শুনতে শুনতে আমিই পাগল হয়ে যাচ্ছি। যে যা বলেছে তাই শুনেছি, সাইকোথেরাপি দিতে বলেছে দিয়েছি, জাগরীতে নিতে বলেছে নিয়েছি। কাউন্সলিংয়ের জন্য যত জায়গায় ধর্না দিতে বলেছে দিয়েছি। আর কত বলবেন?

আমার আর কিছুই চাই না। আমার ছোট্ট খুকীকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিতে না পারলে আপনারা কেমন ডাক্তার।

জানেন, এই মেয়েটা জন্মের সময় ওর মা মারা যায়। সেই থেকে এই স্নেহের পুটলিটাকে আমি বুক দিয়ে আগলে রাখছি। অ্যাক্সিডেন্টে চোখটা হারানোর পর মেয়েটা আমার আধ পাগলা হয়ে গেল। যে মেয়ে আমার গায়ের গন্ধ ছাড়া ঘুমোতে পারতো না সেই আজ আমাকে দেখলেই আতঙ্কে শিউরে ওঠে। আমাকে পিশাচ মনে করে এই লজ্জা আমি কোথায় রাখি বলেন। মফিদা নামের কোন এক মহিলাকে সে তার মা মনে করে এখানে সেখানে তাকে খুঁজে বেড়ায়। বসার ঘরে আমার স্ত্রী আঞ্জুমানের একটা ছবি আছে সেদিকে ফিরেও দেখে না। ভাই আমি সরকারি কলেজের মাস্টার মেয়ের চিকিৎসার জন্য এত টাকা কই পাবো। বাপ দাদার রেখে যাওয়া সহায় সম্পত্তি ভিটেসহ বিক্রি করেছি। তবুও মেয়ে আমাকে পিশাচ ভাবে। ওর এই ভাবাভাবি যে কতটা যন্ত্রণার দেয় আমায় তা কেমন করে বোঝাই। মাঝে যে কটা বছর সুস্থ ছিল সে কটা বছর সে নিজের মতো পড়াশুনা করেছে। ইতিহাসে তার আগ্রহ বেশি ছিল। এই ইতিহাসই তার কাল। রাজা মহারাজাদের হাবিজাবি কাহিনি পড়তে পড়তে ওর মধ্যেও তৈরি হয়েছে ডিলিউশন। আমার তিনরুমের কলোনিবাড়িকে সে রাজবাড়ি মনে করে। সারা রাত ঘুমায় না বিড়বিড় করে টুইঙ্কল টুইঙ্কল ছড়া কাটে। হেলুসিনেশনের মধ্যে মফিদা নামের ঐ কাল্পনিক মহিলার জন্য কাঁদে। তাকে আমি কোথায় পাব বলতে পারেন।

খুকিকে যদি সুস্থ করতে না পারেন তাহলে মফিদাকে এনে দেন। না হয় কোন একদিন দেখবেন আমিও খুকির মত সিজোফ্রেনিক হয়ে রাস্তায় রাস্তায় কেঁদে কেঁদে মফিদাকে খুঁজছি।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞের চেম্বারে বসে মাহাতাব চৌধুরী কাঁদছেন। এই কান্না অসহায়ের কান্না। ব্যর্থতার কান্না। সন্তানের জন্য এক পিতার হৃদয় নিংড়ানো ভালবাসার কান্না।

আমার গল্পটা শেষ হলো, রূপকথা নয় প্রায় রূপকথার কাছাকাছি ।

 

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত