নাসির আলী মামুন : ক্যামেরা হাতে নক্ষত্রলোকে

আজ ১ জুলাই আলোকচিত্র শিল্পী নাসির আলী মামুনের জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


।।মইনুদ্দীন খালেদ।।
ফ্রেমবন্দি করে মানুষ নিজের মুখের রূপের পরিমাপ নিয়ে থাকে। আয়নায় নিজেকে দেখার এই তৃষ্ণা সহজে মেটে না। আয়না আবিষ্কারের আগে জলের দর্পণে নিজেকে চিত্রার্পিত দেখে মানুষ একদিন অভিভূত হয়েছিল। তাই মানুষের আত্মমুগ্ধতার ইতিহাস কালের পাড়হীন সময় থেকে উত্সারিত। আরও অনেক পরে, মহাকালের হিসাবে এইতো সেদিন, ক্যামেরা আবিষ্কারের কথা শুনে আত্মমুগ্ধ মন আবার সচকিত হয়ে উঠল। ক্যামেরায় যারা ছবি তুলতে শুরু করল তাদেরকে প্রথমে তো মানুষ জাদুকরই মনে করত। নিজের রূপের হুবহু নকল পেতে ক্যামেরাম্যানের নির্দেশে সেই মানুষ কয়েক মুহূর্ত শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ করে স্থির হয়ে রইল, আবার ছবির যন্ত্রের মানুষটির নির্দেশে তাকে হাসতেও হলো।
আলোকচিত্র মানুষের ইতিহাসকে প্রত্যক্ষ ও প্রসন্ন করেছে। ছবি পাঠ করে বিশ্বসংসার সম্বন্ধে জানার আগ্রহ সুগম পথ খুঁজে পায়। একজন আলোকচিত্রকর তাঁর সময়ের প্রয়োজন মেটান এবং তাঁর চিত্ররাশি ভবিষ্যতের আর্কাইভ রচনা করে দিয়ে যায়। নাসির আলী মামুন এই কাজটি করে চলেছেন তাঁর কিশোরকাল থেকে। নানাপথের বিচিত্র মহামানবেরা তাঁর কৈশোরকে চঞ্চল করে তোলে। পত্রিকার পাতায় কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, বৈজ্ঞানিক, আবিষ্কারক, এমনই ভিন্ন ভিন্ন ভুবনের মানুষগুলোর মুখ দেখে সেদিন তাঁর মনে হতো এঁরা বোধহয় এই পৃথিবীরই মানুষ নয়। যদি তাদের ছুঁয়ে দেখা যেত। আরাধ্যের সন্ধানে মামুনের মন অভিযাত্রিক হলো। তাঁর জানা ছিল মানুষ যতই নির্মোহ হোক না কেন, তার মোহ কখনো মরে না নিজেকে দেখার; তার মোহ বুঝি তাকে বাঁচায় মানুষের পূজা আর ভালোবাসার আশায়।
নাসির আলী মামুন ক্যামেরা হাতে নুয়ে, বেঁকে, হাঁটু মুড়ে, বসে মহামানবদের ছবি তুলছেন প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে। এই ক্যামেরার শিল্পী আসলে ভক্তের মন নিয়ে তাঁর পূজনীয়দের চিত্রাঞ্জলি দেয়ার বাসনাজালে জড়িয়ে রেখেছেন তাঁর প্রতিকৃতিসমগ্রতে। মামুনের গন্তব্য মূলত মানুষের মুখ। ইতিহাসে অক্ষয় আলোর পথের মহামানবদের মুখচ্ছবি তিনি আলোয়-আঁধারে বুনেছেন। এই মহামানবদের মুখের বিভার সঙ্গে মামুনের ক্যামেরার লেন্স বেয়ে আসা অদৃশ্য আলো পরস্পর সংলাপ বিনিময় করেছে। মহাজনদের মুখের আলো শিল্পিত পরিমার্জনায় নতুন জ্যামিতিক বিন্যাসে উপস্থাপন করেছেন এই আলোর শিল্পী।
কতগুলো মনীষাপ্রদীপের আলোয় সন্তপ্ত হয়েছে মামুনের ক্যামেরা? এ প্রশ্নের ঠিক ঠিক উত্তর মামুনেরও জানা নেই, হাজার, দেড় হাজার! না, তার চেয়েও বেশি। মামুন ওই মানুষের জ্যোতির্ময় মুখাবয়ব দিয়ে একটি জাদুঘর গড়ে তুলছেন, তাঁর এই চিত্রাগারের নাম ফটোজিয়ম। তাঁর এই প্রতিকৃতি সংগ্রহশালা যথার্থই আন্তর্জাতিক মানের। কারণ তা কোনো এককেন্দ্রিক হিসাব মেনে করা হয়নি। পশ্চিম অগ্রাহ্য করেছে যে মানবতাবাদী বাউলকে, তাঁকেও বিখ্যাত বৈজ্ঞানিকের পাশে বিনম্র শ্রদ্ধায় উপস্থাপন করেছেন মামুন। যে সব আলোকিত মুখ নিয়ে মামুন এ প্রদর্শনী করছেন তাতে এমন এক বৈশ্বিক পরিধি রয়েছে যে তা দেখে ক্যামেরাশিল্পীর আলোর তর্পণে কোনো সংকীর্ণতা বা বিভেদের মানসিকতার প্রমাণ নেই।
যে মানুষেরা তারার মতো জ্বলজ্বল জ্বলছে তাঁরাই মামুনের ঠিকানা, শিল্পের বিষয়। এই গোল পৃথিবীর কত দ্রাঘিমাংশ আর অক্ষাংশের কাটাকাটি বিন্দুতে দাঁড়িয়ে যে এই ক্যামেরাশিল্পী ল্যান্সের অক্ষরেখায় মেপেছেন মানুষের মুখ তা ভাবলে বিস্মিত হতে হয়। আমার জানামতে, পৃথিবীর আর কোনো ফটোগ্রাফার, কোনো ভেদরেখা গ্রাহ্য না করে, পূর্ব ও পশ্চিমের এত কীর্তিমান মানুষের ছবি তুলেছেন। স্বদেশ ও বিদেশের বিখ্যাতদের একই মালায় গেঁথে মামুন শুধু সর্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গিরই পরিচয় দেননি, পশ্চিমের আধিপত্যবাদিতা ও ঔপনিবেশিকতার প্রতি অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তাঁর এই নক্ষত্রগ্রন্থিস্বরূপ আলোকিত মানুষের চিত্রমালা মানুষের সৃজনের-অর্জনের এক ইতিবাচক হিসেব।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মাদার তেরেসা, ভাসানী, কমরেড রবি নিয়োগী; কবি সাহিত্যিকদের মধ্যে জসীম উদ্দীন, আল মাহমুদ, আহসান হাবীব, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, নির্মলেন্দু গুণ, শঙ্খ ঘোষ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, ইয়েবতেশেংকা, হুমায়ূন আহমেদ; বৈজ্ঞানিকেরা হলেন স্টিফেন হকিন্স, আবদুস সালাম। নোবেল লরিয়েটদের মধ্যে আছেন গুন্টার গ্রাস, অমর্ত্য সেন, মোহাম্মদ ইউনূস। ফেরদৌসী মজুমদার, সেলিম আল দীন, আকরাম খান, মমতাশঙ্কর প্রমুখ একই পঙিক্ততে বিবেচনায় নিয়েছেন মামুন। গর্ভাচেভ, মাহাথির মাহমুদ, বিল ক্লিনটন, এসব রাষ্ট্রনায়কের মুখের অভিব্যক্তিতে প্রতাপ ও কূটনীতির দোলাচল যেমন বুঝতে চেয়েছেন এই ক্যামেরার শিল্পী, ঠিক তেমনি স্বদেশের কাজী মোতাহার হোসেন, আহমদ শরীফ, সরদার ফজলুল করিম প্রমুখের মুখের বিবেকের আলো আর কামরুল হাসান, এস এম সুলতান ও সুফিয়া কামালের ব্যক্তিত্বের শিল্পিতা ও মানবিকতা পরস্ফুিট করতে চেয়েছেন একান্ত নিজস্ব নিয়মের ফটোগ্রাফিতে।
নাসির আলী মামুনের নিজস্বতা কোথায়? এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে বুঝতে চেষ্টা করা যাক কেন মুখই মুখরিত করে রাখে অথবা আবিষ্ট করে রাখে তাঁর চেতনালোক। তাঁর ছবির সব মানুষই বিস্ময়করভাবে ক্ষমতাধর। সবাই তাঁরা ইতিহাসে ও মানুষের ইতিবোধে ঠাঁই পাবেন কি-না তা আজও মীমাংসিত হয়নি। কেন না অনেক ব্যক্তিত্ব এখনো ইতিহাসের শোধনাগারে আছেন। ষাটোর্ধ মামুন সমকালীন পৃথিবীর পঞ্চাশ বছরে যাঁদের শরণাপন্ন হয়েছেন, ক্যামেরার দাক্ষিণ্য দেয়ার দুর্গম পথ পাড়ি দিয়েছেন, তাঁরা অনেকে বেঁচে আছেন সক্রিয় কর্মকাণ্ডে এবং অনেকেই চলে গেছেন পৃথিবী ছেড়ে। তবে তাঁদের অনেকের কীর্তি মানুষের মনের সচল মুদ্রা হয়ে টিকে আছে। কোনো বিশেষ বৌদ্ধিক, রাজনৈতিক বা কূটচালের হিসেব মামুনের মন আক্রান্ত করেনি। তাঁকে জাদুর মতো টেনেছে ওইসব প্রতাপশালী ও সৃজনশীল মানুষেরা। নক্ষত্রের টান তিনি অমান্য করেননি; বরং ক্যামেরা হাতে নক্ষত্রগ্রন্থিতে ভ্রাম্যমান থেকেছেন। এ এক অপার বিস্ময়বোধ। প্রতিটি নক্ষত্রের আলাদা আকাশ। মামুনের মনে ভক্তি উথলিয়ে ওঠে। মামুন যেন ভাবেন এঁরা ঐশ্বরিকভাবে ইশারাময়। তাই আদিম মানুষের মতো ক্যামেরা হাতে সেই সব নক্ষত্রকে প্রণতি জানান এই আলোকচিত্রকর। আমাদের রক্তবীজের মধ্যে প্রাণপ্রতিমাকে ভক্তি জানানোর যে গূঢ়ৈষণা আছে তা-ই যেন ফটোগ্রাফির ভাষায় প্রকাশ পেয়েছে মামুনের আলোকচিত্রে। সব ছবিতে অবশ্যই নয়; তবে অনেক ছবিতেই তিনি ভক্তিমায়নের পথ অনুসরণ করেছেন। বিষয়টা অসংগত নয়, বরং স্বাভাবিক। কারণ, তিনি তো জ্যোতির্ময় বা কীর্তিমানেরই মুখের শিল্পিত মানচিত্র প্রণয়ন করতে চান। মানুষের মুখ ঘিরে জ্যোতির্বলয় রচনা না করলেও মামুনের ভক্তিপ্রবণ মনের আলোকরশ্মি ক্যামেরার ল্যান্স গলিয়ে ওইসব মুখে যুক্ত হয়েছে। সব শিল্পই তো শিল্পীর নিজস্ব মনের তাপে ও চাপে জন্ম নেয় । এই ছবিগুলো নিরপেক্ষ ডকুমেন্ট নয়; মামুনের নিজস্ব বয়ান। তাঁরই মানসিক অবস্থার রূপায়ণ।
মামুনের স্বকীয়তার বা তাঁর মনোলোকের নিজস্ব মুদ্রার বিষয়টি এবার ব্যবচ্ছেদ করার চেষ্টা করা যেতে পারে। তাঁর যে নক্ষত্রমণ্ডলী বা প্রতিমামণ্ডলী মানুষের মুখ দিয়ে রচিত হয়েছে তা সুনির্দিষ্টভাবে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট প্রসারিত করে দেখায়। ভালো-মন্দ জনে জনে, এমনকি ভিন্ন ভিন্ন কালেও তা আলাদা। আমরা তো জেনেই গেছি ভালো ও মন্দের ভেদরেখা টানার সময় এখনো আসেনি, কাজটি দুঃসাধ্যপ্রায়। ভালোমন্দের বিচিত্র প্রেক্ষিত ও প্রেক্ষাপট আছে মাত্র। তার সুনির্দিষ্ট ধরন নেই, ধারণা আছে মাত্র। মামুন কোনো বিশ্বাস থেকে ফটোগ্রাফিশিল্পের সাধনা করছেন না। বিশাল বিশাল অন্ধকারাচ্ছন্ন বাতাবরণের মধ্যে কোনো ব্যক্তিত্বের দাপট, কোনো ব্যক্তিত্বের রূপের স্নিগ্ধতা, আবার কারও বা মমতাময়ী মুখচ্ছবি, কখনো বা মানব-মানবীর বিবেকের অপরাজেয় দর্পিত অবয়ব এবং আছে মুখের বলিরেখায় বৈদগ্ধ্যের পুরাতাত্ত্বিক ভাষ্য। মামুন তাঁর সাদা-কালো ছবিতে নিকষ কালোর বিপরীতে মহামানবকে ডাগর করে, তীক্ষ্ম করে, প্রখর করে প্রকাশ করেছেন। একথাই খাটে তাঁর বেশির ভাগ ছবির ক্ষেত্রে; অবশ্য ব্যতিক্রম আছে।
দুই আকাশের দুই নক্ষত্রের ছবির বিশ্লেষণে বিষয়টা বোঝা যায়। ছবি তো আলোর ব্যাকরণ। লম্বমানতার (verticality) শর্ত মেনে মুখের এক পাশ ঘোর অন্ধকারে ঢেকে আর কালো কোট থেকে সফেদ পাঞ্জাবি-আবৃত দু’হাতের প্রসারণ দেখিয়ে মামুন বঙ্গবন্ধু চরিত্রের অনম্য রূপ ধারাল করে আলোকচিত্রায়িত করেছেন। এ ছবির গভীরে কাজ করছে দুর্দমনীয় মানুষের অভিব্যক্তি।
অপরদিকে, মাদার তেরেসার বিপরীতে কালো প্রেক্ষাপট থাকলেও তাঁর ঈষত্ আনত করুণাময়ী রূপ, তাঁর ধ্যানস্থ মুখ, প্রার্থনাপ্রতীম-দুই হাত আর শুভ্র শাড়ি শুশ্রূষার উত্স হয়ে উঠেছে যেন। এই ছবির সঙ্গে মিলিয়ে আমরা শুনতে পারি গান, ‘জীবন যখন শুকায়ে যায় করুণাধারায় এসো।’
আরও ছবির আরও বিশ্লেষণ দিলেও বোঝা যাবে, ছবি কিন্তু যন্ত্র তোলে না, তোলে মানুষের মন। মামুনের ছবি মন্ময়ধর্মী (subjectivity) বৈশিষ্ট্যে মর্মরিত।
একেক শিল্পের একেক ধরন। দু’চোখের আলো এক চোখে পুঞ্জীভূত করে লক্ষ্যকে সুচিহ্নিত করে ছবি তুলতে হয়। ক্যামেরায় এক চোখে দেখে মানুষ, কিন্তু অন্য চোখ ওই চোখকে চাক্ষুষমানতার শক্তি জোগায়। পরিণামে চোখ, মন, আর লেন্সের কৃেকৗশলের সমন্বয়ে পরিমেয় অপরিমেয় উচ্চতায় উত্তীর্ণ হয়ে শিল্প জন্ম লাভ করে। এই অভিযানে মামুন নিজের পথ নিজেই রচনা করেছেন। ছবি তো পরিণামে আলো আর কালোর বুনট—সহস্র চিহ্ন মাত্র। কত কম চিহ্নে চিহ্নিত হতে পারে এবং তার পরিবেশন যেন হয় স্পষ্টতর ভাষায় সে রকম ভাবনার কারণেই কালো প্রেক্ষাপটে সুমিত চিহ্নে ব্যক্তিত্বের জ্যামিতি প্রণয়ন করেছেন মামুন।
.

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত