নারীকথা পুষ্টিবিদের কলমে

আমাদের দেশে অধিকাংশ মহিলারা একটি রোগে ভোগেন, সেই রোগটির নাম ‘নিজেকে অবহেলা করা’। যারা এবেলা ওবেলা সেজেগুজে এফবিতে ছবি দিচ্ছেন, যারা মাসে একবার বিউটি পার্লারে গিয়ে গুচ্ছের পয়সা খরচা করছেন, তাঁদের অনেকেও কিন্তু এই রোগের শিকার। চল্লিশোর্ধ্ব মহিলারা বেশিরভাগই ভুগছেন ব্যথা বেদনা, ওজন বেড়ে যাবার সমস্যায়, বা ডায়েবেটিসে। অথচ এই বিষয়ে তাঁরা কী কী সাবধানতা অবলম্বন করেছেন, জানতে চাইলে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন অর্থাৎ কিছুই করেননি।

এবার আসি কী করা উচিত সেই বিষয়ে।

প্রথমত ভালো খাবার খেতে হবে।
দ্বিতীয়ত সঠিক সময়ে খেতে হবে।

মনে রাখবেন এই দুটির কোনো বিকল্প নেই, হবেওনা কখনো। পরিচিত মানুষের অনেকেই পুষ্টিবিদ শুনলেই বলেন “আমাকে একটা ডায়েট চার্ট বানিয়ে দিও তো।” আমার বেশ হাসি পেয়ে যায়, ডায়েট চার্ট ব্যক্তিবিশেষের জন্য বানাতে হয় এর কোনো সাধারণ ফর্মুলা নেই। সেই মানুষটির বয়স, উচ্চতা, ওজন, কোনো অসুখে ভুগছেন কি না, জীবনযাত্রার মান, পরিশ্রম কেমন করে থাকেন, খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদি, বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে তবে যথাযথ খাদ্য তালিকা বানানো সম্ভব। বানাতে সময় লাগে। খবরের কাগজে তারকাদের যে খাদ্যতালিকা ছাপা হয়, ভুলেও সেসব অনুসরণ করবেন না। হিতে বিপরীত হতে পারে।

এবার আসি প্রথম নিয়মে অর্থাৎ ভালো খাবার। ভালো খাবার মানে সুষম খাদ্য, প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, ফ্যাট, ভিটামিন, মিনারেলস এবং জল এইসব জিনিসের সঠিক পরিমাপ। মনে রাখবেন প্রাতরাশ দিনের সবচেয়ে জরুরি এবং গুরুত্বপূর্ণ আহার। প্রাতরাশে প্রোটিনের উপস্থিতি একান্ত জরুরি, থাকা চাইইই চাই। সবচেয়ে ভালো হয় ডিম খেলে। যারা ডিম খান না, তাদের এক গ্লাস বা
এক বড় কাপ দুধ খেতে হবে, ছানাও চলতে পারে। সেই সাথে খান রুটি তরকারি, বা ইডলি/ ধোসা বা ব্রাউন পাঁউরুটি মাখন। বাজারের কচুরি আলুরদম খেতে ভালো লাগে কিন্তু মাসে একদিনের বেশি খাবেন না। তার থেকে বাড়িতে লুচি করে খান বা পরোটা তবে ওই, সপ্তাহে একদিনের বেশি নয়। খেতে পারেন ওটস বা কিনোয়া বা চাউমিন, বানিয়ে ফেলুন মুখরোচক ভাবে কারণ বিস্বাদ খাবার বেশিদিন কেউই খেতে পারেন না।
এই সব খাবারের পরিমাণ নির্ভর করবে ব্যক্তিবিশেষের ওপরে।

প্রাতঃরাশে অবশ্যই থাকুক ফল। দিনে অন্তত দুটি ফল খাওয়া জরুরি, তার মধ্যে একটি থাকুক প্রাতঃরাশে। কলা, আম, জামরুল, সবেদা, আপেল পেয়ারা যার যেমন পছন্দ। তবে সময়ের ফল, মরশুমি ফল খাবেন।

এবার আসি দুপুরের খাবারে, প্রাতরাশের থেকে কম পরিমাণে হলেও খেতে হবে সুষম খাবার। আমাদের বাঙালি মহিলারা ভাত খান, সাথে থাকুক ডাল, সবজি, মাছ বা মাংস। ভাতের বদলে দুটি ছোট রুটিও চলতে পারে। বিকেলে অনেকেই কিছু খান না, শুধু চা বিস্কুট। প্রসঙ্গক্রমে বলি বিস্কুট একটি সরল শর্করা (simple carbohydrate)। যত কম খাওয়া যায় ততই ভালো। বিকেলে অন্য কিছু খেতে চাইলে খান সামান্য মুড়ি, বা চিঁড়েভাজা অথবা ছোলা মটর সেদ্ধ, শসা ইত্যাদি।

রাতের খাবারে থাকুক রুটি বা ভাত (পরিমাণে কম) সাথে সবজি ডাল মাছ মাংস্ যেমন ভালোবাসেন।

এবার আসি দ্বিতীয় কথাটিতে অর্থাৎ সময়ে খাওয়া। ব্রেকফাস্ট সেরে ফেলুন আটটা থেকে নটার মধ্যেই। মোট কথা ঘুম থেকে ওঠার দু ঘণ্টার মধ্যেই প্রাতরাশ সম্পন্ন করা চাই। তার আগে চা বিস্কুট প্রায় সবাই খান, খেয়ে ফেলুন। দুপুরের খাবার দেড়টার মধ্যে আর রাতের খাবার নটায় হলে সবচেয়ে ভালো, দশটার বেশি কখনওই হওয়া উচিত নয়। এই পর্যন্ত পড়ে অনেকেই ভাবছেন

আমার বাড়িতে রাত এগারোটার আগে খাওয়া সম্ভব নয়, বা
আমি তো এরকমই খাই তাহলে মোটা হচ্ছি কেন? বা
সবাইকে দিয়ে সকাল ন’টায় ব্রেকফাস্ট!! অসম্ভব।

তাদের বিনীত ভাবে জানাই, আপনার বাড়ির সবাই রাত এগারোটায় খান বলে আপনিও তাই খাবেন এমন কোনো কথা নেই। নিজেকে অবহেলা করবেন না। কাল যদি আপনার অম্লশূলে ধরে অর্থাৎ অল্পতেই অম্বল হয়ে যায়, তাহলে মুঠোমুঠো অম্বলের ওষুধ খেয়েও আরাম পাবেন না। সময়ে খেয়ে নিন। মনে রাখুন প্রতিদিন, নিয়মিত, এক সময়ে, সুষম পুষ্টিকর খাবার খাওয়া সুস্থ জীবনের চাবিকাঠি।

ডায়েট মেনে চলা মানে না খেয়ে থাকা নয়। ভালো করে খান, মাছ, মাংস, সবজি, দুধ, ছানা, দই, সময়ের ফল সবই। বাদ দিন কোল্ড ড্রিংক্স, সম্পূর্ণ বাদ। মিষ্টি যারা খুব ভালোবাসেন তারা সপ্তাহে একটি দুটি খেতে পারেন।
আরেকটি জিনিস পরিত্যাগ করুন, নামি কোম্পানির ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট এবং হেলথ ড্রিংক। অনেক মহিলারাই এগুলি খেয়ে ভাবেন নিজেদের যত্ন নিচ্ছেন, ধারণাটি ভুল। মহিলাদের জন্য ভিটামিন ডি এবং ক্যালসিয়াম অত্যন্ত জরুরি। সপ্তাহে দুদিন খান ঘি বা মাখন এক চামচ। প্রতিদিন খাদ্য তালিকায় থাকুক দুগ্ধজাত দ্রব্য, সবুজ শাকসবজি, ডিমের সাদা অংশ। প্রতিদিন মাছ খান, পারলে মাছের তেল। এই একটি ফ্যাট জাতীয় খাবারে আপনি মোটা হবেন না, বরং ত্বকের চিকণ ভাব বজায় থাকবে, সাথে চুলের চকচকে ভাবও। সূর্যের আলো ভিটামিন ডি এর সবচেয়ে ভালো উৎস। তাই রোদ গায়ে লাগলে কালো হবার ভয় পাবেন না। প্রতিদিন আধ ঘণ্টা রোদে বসার বা হাঁটার চেষ্টা করুন।

চল্লিশ পেরিয়েই যারা দাঁতের সমস্যায় ভুগছেন, তাদের এবং অন্য সব মহিলাদের বলি, খাবার খান চিবিয়ে। চিবোন ডাঁটা, মাছের এবং মাংসের হাড়, বাদাম, আখ। এতে দাঁতের গোড়া মাড়িতে শক্ত হয়ে বসে, পড়ার সম্ভাবনা কমে। দিনে দুবার দাঁত মাজুন, যেকোন কিছু খাবার পরে মুখ ভালো করে ধুয়ে নিন।

প্রতিদিন খাদ্যতালিকায় রাখুন একটি লেবুজাতীয় ফল, কমলা/ মৌসম্বি /পাতিলেবুও হবে।কয়েকটি বাদাম (আমন্ড, চিনেবাদাম, কাজু যেকোনো), রাখুন গোলমরিচ। গুঁড়ো মশলার বদলে মশলা নিজে গুঁড়ো করে নিলে ভালো। আস্ত জিরে, আস্ত ধনে, গোলমরিচ, শুকনো লংকা, আস্ত গরমমশলা কিনে মিক্সিতে গুঁড়ো করে ছোট কাচের শিশিতে ভরে ফ্রিজে রেখে দিন। বাজার চলতি প্যাকেটের গুঁড়ো মশলার থেকে অনেক খাঁটি আর নিরাপদ মশলা পাবেন, স্বাস্থ্যও ভালো থাকবে। এর জন্য মাসের প্রথম রবিবার আধ ঘণ্টা সময় দিতে পারেন।
সকালে উঠেই এককাপ হাল্কা গরম জলে এক টুকরো পাতিলেবু চিপে এক চামচ মধু দিয়ে খান। প্রোটিন জাতীয় খাবার বয়সের সাথে খাওয়া কমানো উচিত, এটি জনপ্রিয় ধারণা বটে কিন্তু এর সারবত্তা নেই। সব বয়সেই প্রোটিন জরুরি। আপনার অস্থিমজ্জা, রক্ত, হরমোন সবই প্রোটিন দিয়ে তৈরি। , তবে প্রাণীজ প্রোটিনের কোনো বিকল্প নেই।

নিয়মিত ব্যায়াম করুন, হাঁটুন, কোন খেলাদূলায় যোগ দিতে পারেন বা নাচতেও পারেন। সবচেয়ে ভালো ব্যায়াম হোল নাচ, এর জন্য নৃত্যপটীয়সী হবার দরকার নেই। প্রিয় কোন গান বা বাজনা চালিয়ে ঘরের মধ্যেই আধ ঘন্টা নেচে নিন, দুচারজন বান্ধবীকে যদি ডেকে নিতে পারেন তাহলে সময় আরও সুন্দর কেটে যাবে, নাচ শেষে জমিয়ে আড্ডাও হবে। বন্ধু না পেলে একাই অভ্যাস করে নিন। যারা খেলাধূলা ভালোবাসতেন, তারা সাঁতার, বা ব্যাডমিন্টন যেকোন কিছুতে যোগ দিতে পারেন। শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন, সব খাবার খান কিন্তু খুব অল্প পরিমাণে, পেট ভরে নয়, বরং সামান্য খিদে রেখে।

মুঠোমুঠো ওষুধ খাবার অভ্যাস ত্যাগ করুন, সামান্য মাথা ধরলেই মাথাব্যথার ওষুধ, গুরুপাক ভোজনের আগে পরে অম্বলের ওষুধ, একেবারেই খাবেন না। যদি মনে হয় কোন বিশেষ খাবারে আপনার হজমের অসুবিধা হচ্ছে, সেই খাবারটি পরিত্যাগ করুন বরং। দীর্ঘদিন যদি অম্বলের সমস্যা হয়, ডাক্তার দেখিয়ে নিন, নিজে ডাক্তারি করে বোতল বোতল জেলুসিল, পাতা পাতা র‍্যান্ট্যাক একেবারে নয়। ওষুধের দোকানে বলে ওষুধ নিয়ে বা সামান্য পেটখারাপে অ্যান্টিবায়োটিক খাবেন না। খুব গুরুতর কিছু না হলে, এবং ডাক্তারের পরামর্শ ব্যতীত কখনওই অ্যান্টিবায়োটিক খাবেন না, এতে গুরুতর রোগে পরবর্তীকালে অ্যান্টিবায়োটিক শরীরে কাজ নাও করতে পারে, সুতরাং সাধু সাবধান।

সৃষ্টিশীল কাজে মেতে থাকুন, লিখুন, আঁকুন, বাগান করুন, গান করুন শখ ও রুচি অনুযায়ী। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিন। মন ভালো থাকলেই শরীর ভালো থাকবে। শারদীয়ার শুভেচ্ছা সবাইকে।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত