নিঃসঙ্গতায় আপোসহীনতায় রবীন্দ্রনাথ

মুহিত হাসান

রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে রচিত কষ্টকল্পনাময় ও গাঁজাখুরি বয়ানের বাজার এখন রমরমা। তাঁকে বহুগামী থেকে পরকীয়ামত্ত—সবরকমের উদ্ভট বিশেষণে বিকৃত করার রীতিমতো হিড়িক পড়েছে বহুজনের মধ্যেই। বাঙালি দুনিয়ার যে প্রান্তেই থাকুক না কেন, তাঁর মনন যে ক্রমে কীটদষ্ট হচ্ছে ও ভাবন-ক্ষমতা শূন্যের কোঠায় পৌঁছাচ্ছে—এহেন অসাড় কাণ্ডকারখানা তারই ইঙ্গিতবাহী নয় কি? মন থেকে চিন্তাশীলতা ও যৌক্তিক বিচারবোধের প্রস্থান ঘটছে, তাই রবীন্দ্রনাথের নিঃসঙ্গতাকে অনুভবের চেষ্টাও অনুপস্থিত। কাদম্বরী (কখনও কখনও আনা তড়খড় বা ওকাম্পোকে নিয়েও) বিষয়ে বেশ কয়েকটি কাল্পনিক বয়ান আউড়ে পণ্ডিত সেজে অনেক চালবাজ যেন বলতে চান, ‘দ্যাখো ব্যাটা রবি কেমন লম্পট!’—এরা না জানেন ইতিহাসের পরম্পরা, না বোঝেন সাহিত্য। রবীন্দ্রনাথের জীবনের প্রাথমিক পর্বে পিতা দেবেন্দ্রনাথের এক দোর্দণ্ডপ্রতাপ ছায়া উপস্থিত ছিল। পিতামহ দ্বারকানাথের উদ্যমী-সৃষ্টিশীল জগতের সাথে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় তখন ক্ষীণ, দেবেন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিক ভাবসাধনার আবহই তাঁকে ঘিরে রয়েছে। ঠাকুরবাড়ির রুদ্ধ পরিবেশে একটি প্রতিভাবান কিশোর ভৃত্যশাসিত, তাঁর মন চাইছে একটুখানি খোলা হাওয়া। কাদম্বরীর সঙ্গে তাঁর বেড়ে ওঠার সময়টুকু তাই তাঁর জন্যে এক ভিন্ন আবহের আগমনী বার্তা নিয়ে আসে। এই প্রথম একজন সত্যিকারের অবসরের সহমর্মী সঙ্গী পাওয়া হলো তাঁর, যিনি উদগ্র নন, বরং আন্তরিক ও সংবেদনশীলা—আবার পরিশীলিত তর্কে ও ব্যঙ্গেও কম যান না। তাঁর সঙ্গ পাবার ফলে রবীন্দ্রনাথ নিজেকে একটু একটু করে সৃজনক্ষমতায় দীপ্ত ও ব্যাপ্ত করার সুযোগও পেয়ে গিয়েছিলেন বলা চলে। এই সম্পর্ককে যতটা শরীরি-আখ্যান ও প্রেমকাহিনির ছাঁচে ফেলে দেখবার চেষ্টা করা হয়—ততটা তাঁদের মধ্যেকার পারস্পরিক জানাশোনার বিষয়টি বা কাদম্বরীর স্নেহশীলতার ও সুহূদসুলভ আচরণের দৃষ্টান্তগুলোকে স্মরণে রেখে বিচার করা হয় না। নিছক স্থূল শরীরি বোধের বাইরে যে বন্ধুত্ব বলে একটা শব্দ রয়েছে, তা যেন আমরা ভুলে না যাই।
যাহোক, রবীন্দ্রনাথের জীবনে নিঃসঙ্গতার উপস্থিতির এখানেই সমাপ্তি, তা অবশ্য নয়। আরো পরে বিলেত-ভ্রমণ, বিবাহ ও পূর্ববঙ্গে আগমনের মাঝ দিয়ে বিবিধ বিচিত্র পরিমণ্ডল ও ব্যক্তির সাথে তাঁর পরিচয় ঘটল বটে, কিন্তু নিঃসঙ্গতা তাঁকে মৃত্যু অবধি ছাড়েনি। পিতা দেবেন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিক-চেতনার আবরণে নিজেকে ঢেকে নিয়ে তিনি বায়বীয় তৃপ্তি পেতে পারতেন, কিন্তু সে পথ ধরে কিছুদূর হাঁটলেও শেষ পর্যন্ত আর সে যাত্রাকে রবীন্দ্রনাথ দীর্ঘায়িত করেননি। পূর্ববঙ্গে আগমনের কিছুদিন পরই সেই চেতনাকে ছুটি দিয়ে বরং নিজের অগোচরেই পিতামহ দ্বারকানাথের আপোসহীন ও উদ্যোগী কর্মকাণ্ড হতে প্রেরণা নিয়ে ভিন্ন কিছু করার রাস্তাকেই বেছে নিলেন। এবং দ্বারকানাথকে যেমন জীবদ্দশায় নতুন কিছু করার জন্যে কম গঞ্জনা সইতে হয়নি, তেমনি  রবীন্দ্রনাথের ভাগ্যেও প্রায় একইরকম (কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার থেকেও বেশি) তিক্ত অভিজ্ঞতা জুটল। ইচ্ছা করলে তিনি জনপ্রিয়তার চূড়ান্তে ওঠা প্রায় সমবয়সী বিবেকানন্দের মতো নিজেও কিছু ভাবাবেগমাখা আনুগত্যের স্বাদ পেতে পারতেন। কিন্তু সন্ন্যাসী বিবেকানন্দের বদলে তিনি আকৃষ্ট হলেন ব্যতিক্রমী বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর দিকেই। তাঁদের অনুপম বন্ধুত্ব যেন দ্বারকানাথ ও রামমোহন রায়ের মধ্যেকার নিবিড় সম্পর্কের স্মৃতিকেই ফিরিয়ে আনে। পিতামহ ও পৌত্র দুজনেই প্রশ্রয় দিলেন বিজ্ঞানচেতনা ও যুক্তিকে (যদিও কবি হিসেবে রবীন্দ্রনাথের অতিমানবিক ভাবমূর্তি বিষয়টি অনেকখানি আড়ালে রাখে)। ফলত, দ্বারকানাথের বেলায় কথা রটেছিল তিনি নাকি ‘মদের কারবারি’—রবীন্দ্রনাথের বেলায় বলা হতে লাগল, ‘বিলাসী জমিদার’। অজস্র পূতিগন্ধময় বাক্যবাণের দ্বারা বিদ্ধ হওয়ার মাঝেই ক্রমে ক্রমে আরো একা হতে হলো তাঁকে। জীবনের শেষ সময় অব্দি বহু পারিবারিক বিপর্যয় তাঁকে বিধ্বস্ত করেছে, পত্নী থেকে শুরু করে সন্তানদের—এমনিক অতিপ্রিয় দৌহিত্রের মৃত্যু পর্যন্ত অবলোকন করতে হয়েছে। বহু উদ্যোগে-কর্মে জড়িয়েছেন ঠিকই, কিন্তু মনের মধ্যে থেকে সেই নিঃসঙ্গতার আবহ দূর হয়নি। কিন্তু কোনোরকমের আপোস করে সেটাকে দূরও করতে চাননি।
এমনকি তাঁর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সময়—পূর্ববঙ্গে বসবাসের দিনগুলিতেও তাঁর মনে নিঃসঙ্গতার মেঘ জমে রয়েছে—এমন নিদর্শন পাই ১৮৯৩ সালে সাজাদপুর থেকে প্রমথ চৌধুরীকে লেখা এক পত্রে : ‘আমি বন্ধুদের থেকে ক্রমশই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্চি। কেন বলতে পারিনে। নিশ্চয় আমারই দোষ।…ক্রমেই বিশ্বাস হচ্চে অন্যের সহূদয়তা ও সহানুভূতির উপর নির্ভর করে সর্ব্বদা দোদুল্যমান হওয়ার চেয়ে নিজের মধ্যে নিমগ্ন হয়ে নিভৃত হয়ে থাকায় সুখ না হোক্ স্বস্তি আছে।’ তবে এই স্বস্তিও ঠিক তাঁকে চূড়ান্তভাবে সন্তুষ্ট করে না, তাঁকে খুঁজতে হয় পরিত্রাণের নিদান, কারণ : ‘তবু হাজার হোক্, মানুষ ত আর কাজ করবার যন্ত্র নয়, মানুষের হূদয়টাই তার কাছে সব চেয়ে প্রার্থনীয়, সেই অন্য হূদয়ের সংসর্গ উত্তাপের অভাবে আমি যে কাজে নিযুক্ত আছি তারও উত্সাহ অনেক কমে এসেছে।’
তাই বলে পরিত্রাণ পাবার জন্যে তিনি জনরুচির কাছে আত্মসমর্পণ করতে রাজি নন, তিনি চান আন্তরিক সংসর্গ, বাহবামিশ্রিত ভিক্ষা নয়—‘পাব্লিক নামের অকৃতজ্ঞ জীবের চরণতলে যে তৈল যোগান যেত সেইটে নিজের নাসারন্ধ্রে প্রয়োগ করে কিছুকাল নিদ্রা দেবার জন্যে অত্যন্ত ইচ্ছা করচে।’ রবীন্দ্রনাথের এই আপোসহীনতা তাঁর নিঃসঙ্গতাকে বেগবান করেছে ঠিকই, কিন্তু এতে করে তিনি সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন নিজ ব্যক্তিসত্তার নির্লিপ্ততা ও বিশালত্বের নমুনা। তিনি দুর্জনের প্রশংসা কি সান্নিধ্য অপেক্ষা নিঃসঙ্গতাকেই অধিক গ্রহণীয় মনে করেছিলেন। তাদের নিন্দারও কোনো তোয়াক্কা তিনি করতে চাননি। প্রমথ চৌধুরীকে তাই সতর্ক করে তারিখবিহীন আরেকটি চিঠিতে লিখেছেন : ‘আমি দেখেছি, যত রাজ্যের বাজে লোকের কথায় তোমাকে উদ্বেজিত করে—তুমি বাজে লোককে কিছু বেশি নাই দিয়ে থাক—তার একটা কারণ তুমি তাদের মধুর বচনের মায়া এখানো ছাড়াতে পারোনি ও তাদের দুর্ব্বাক্যকে এখনো ভয় করো।’ সেইসাথে, মিথ্যাকে সরাসরি মিথ্যা বলে চিহ্নিত করার মধ্যে সাহিত্যের মাহাত্ম্য নিহিত, এবং তা না করাটাই যে প্রতারণার সমান—তাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন : ‘মিথ্যার গায়ে হাত বুলিয়ে তাকে বাপুবাছা সম্বোধন করে আর চলেব না… যেখানে সয়তানের সঙ্গে লড়াই, যে সয়তানের হাজার কণ্ঠ এবং হাজার বাহু, সেখানে দেখেত পাই বড় বড় সব সাহিত্যিক গুণ্ডারা কেবল পোষা কুকুরের মতো ল্যাজ নাড়চে আর সেই বৃদ্ধ পাপের পঙ্কিল পা আদর করে চেটে দিচ্চে।’
পরিশেষে একটা প্রশ্ন সংগত কারণেই উঠতে পারে, রবীন্দ্রনাথ এতরকম বিষম আঘাত পেলেন তাঁর দীর্ঘ জীবনে—এমনকি বেদনায় ভারী শবের বোঝা উঠল তাঁর কাঁধে—বহুজনের ঘৃণ্য কটুক্তির মুখে পড়তে হলো—আর ক্রমে ক্রমে সবার মাঝে থেকেও একা হতে থাকলেন—অথচ তাঁর আপোসহীনতার একটুও কমতি হলো না জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত, এবং সৃষ্টিযজ্ঞেও পড়ল না ন্যূনতম ছেদ!—এইরকম প্রায় অসম্ভব কাণ্ডকে কী করে সম্ভব করলেন তিনি? এর উত্তর পাওয়া যায় প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছে লেখা তাঁর অন্য একটি চিঠিতে, এর প্রাপক ছিলেন কবি অমিয় চক্রবর্তী। ১৯১৭ সালের ২০ আগস্টে লেখা মিতায়তনের ওই পত্রে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন : ‘সংসারে যারা কেবলি হার মানে এবং হাল ছাড়ে তুমি তাদের দলে যেয়ো না। পৃথিবীর অধিকাংশ দুঃখই হেসে উড়িয়ে দেওয়া চলে। অন্ধকারে প্রত্যেক ছায়াটাকেই ভূত বলে মনে হয়—মনটা অন্ধকার করে থাকলে আমাদের ভাগ্যলক্ষ্মীকে অকারণে বা অল্পকারণেই অপদেবতা বলে কেবলি ভ্রম হতে থাকে। খুব জোরে হাসতে শিখেল তারই আলোয় অন্তত সংসারের মিথ্যে ভূতগুলো দৌড় মারে। খুব গলা ছেড়ে ওই হাসেত পারাটা পৌরুষ।’ পত্রাংশটি থেকে বোঝা যায়, নিঃসঙ্গতা রবীন্দ্রনাথকে আক্রান্ত করেছিল ঠিকই, কিন্তু কাবু করতে পারেনি। গলা ছেড়ে হেসে লড়াইয়ে নেমেছেন তিনি, কিন্তু আপোস করে চুপচাপ কৃত্রিম সুখ পেতে চাননি। নিন্দুকের কথার জবাব দিয়েছেন কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে, আর সৃষ্টিকর্মের দ্বারা পূরণ করেছেন নিঃসঙ্গতার কারণে তৈরি হওয়া শূন্যস্থানকে। এখানেই কার্যত তাঁর ডামাডোলবিহীন জয়।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত