ক্যান্সার

আজ ০৮ নভেম্বর কথাসাহিত্যিক স্বকৃত নোমানের শুভ জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


আপনারা যারা ঢাকা-ময়মনসিংহ অথবা গুলিস্তান-গাজীপুর রোডে যাতায়াত করেন, তারা দেখে থাকবেন, ক্যান্সারাক্রান্ত শিশুপুত্রকে বুকে নিয়ে মাঝবয়সী একটা লোক সাহায্য প্রার্থনা করছে_ ‘আমি ভিক্ষুক না ভাই, বড় বিপদে পইড়া আপনেগর কাছে হাত পাতছি। আমার একটা মাত্র পোলা। কিন্তু কপাল মন্দ ভাই, পোলাডার ব্রেইন ক্যান্সার। ডাক্তার কইছে, অপারেশান করন লাগব। দশ লাখ টেকা লাগব। আমি সামান্য সিএনজি ড্রাইভার ভাই, এত টেকা জোগাড় করা আমার পক্ষে সম্ভব না, তাই আপনেগর কাছে হাত পাতছি। এই মাসুম বাচ্চাডার মুখের দিকে চাইয়া যে যা পারেন কিছু সাহায্য করেন ভাই। আল্লা আপনেগর ভালো করব। দিবেন ভাই, দিবেন? কত টাকা কত দিকে চইলা যায়, দু-এক টাকা দিয়া সাহায্য করেন ভাই।’
ফুটফুটে ছেলেটার ব্রেইন ক্যান্সার শুনে আপনারা আঁতকে ওঠেন, মানিব্যাগ বের করে পাঁচ-দশ টাকা, নিদেনপক্ষে দুই টাকা হলেও সাহায্য করেন। লোকটার কথা আপনারা অবিশ্বাস করেন না। অবিশ্বাস করবেন কী করে, লোকটার হাতে তো ডাক্তারি সার্টিফিকেট আছে। গাজীপুর মহানগরীর সবচেয়ে বড় প্রাইভেট হাসপাতাল লাইফ কেয়ারের ডাক্তার আফসার আহমেদের স্বাক্ষর করা সার্টিফিকেট। ভালো করে খেয়াল করলে দেখবেন, সার্টিফিকেটে কম্পিউটারে কম্পোজ করা বাংলায় স্পষ্ট লেখা_ মো. নিজাম উদ্দিন, পিতা :মো. জসিম উদ্দিন, ঠিকানা :বোর্ডবাজার, গাজীপুর, বয়স :৭ [সাত], রোগের ধরন :ব্রেইন ক্যান্সার।
ছেলেটি আদৌ ক্যান্সারের রোগী কি-না, আপনারা সন্দেহ করতে পারেন। ব্রেইনের ক্যান্সার তো আর মাথা দেখে বোঝা যায় না। ওপরে সবই ঠিকঠাক, ভেতরে মরণব্যাধি ক্যান্সার। সার্টিফিকেটটি আসল না নকল, এই সন্দেহও অমূলক নয়। হাসপাতালের কম্পাউন্ডার বা কম্পিউটার অপারেটরকে টাকা দিয়ে এমন একটি নকল সার্টিফিকেট বানানো হয়নি, তার কি নিশ্চয়তা?
কিন্তু একবার ভেবে দেখুন, ক্যান্সার না হলে নিজের সন্তানকে ক্যান্সারের রোগী বানিয়ে কোনো বাবা এভাবে আপনাদের কাছে হাত পাততে পারে? সন্তানকে নিয়ে বাবার এমন নির্দয় ধান্দাবাজি অবিশ্বাস্য, ভাবাই যায় না। অতএব জসিম উদ্দিনের কাতরকণ্ঠে আপনাদের দিল ভিজে যায়, নিজাম উদ্দিনের চাঁদমুখটা দেখে আহত বোধ করেন। জসিমের হাতে টাকা দিতে গিয়ে মনে মনে বলেন, আহারে, এটুকু ছেলের কত বড় রোগ! আল্লা তাকে সুস্থ করুক।
রোগটা অনেক বড় বটে। কত মানুষ এই রোগে মারা যায়। ডাক্তার বলেছেন, ওষুধে কাজ হবে না, অপারেশন না করালে বড়জোর দুই বছর, তারপর নিশ্চিত মৃত্যু। বাধ্য হয়ে জসিম সিএনজি ড্রাইভিং ছেড়ে আপনাদের কাছে হাত পাতছে। সিএনজি চালিয়ে ক’টাকা পায়। নিজের সিএনজি নয়, ভাড়া নেওয়া। রোজ মহাজনকে দিতে হয় পাঁচশ’, গ্যাসে খরচ হয় আরও পাঁচশ’। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সিএনজি চালিয়ে চৌদ্দ-পনেরশ’র বেশি ইনকাম করা যায় না। দ্রব্যমূল্যের যে ঊর্ধ্বগতি, চার-পাঁচশ’ টাকায় কি আর সংসার চলে? তার ওপর ভাড়া বাসায় থাকে, বোর্ডবাজারের পেছনের বস্তিতে। গ্যাস-বিদ্যুৎসহ মাসে ছয় হাজার টাকা ভাড়া।
নিজামের মতো আরেকটা ছেলে থাকলে হয়তো আপনাদের কাছে হাত পাতার মতো এই লজ্জাজনক কাজটি করত না জসিম। নিজাম তার বহু আদরের ধন, আল্লার কাছ থেকে খুঁজে নেওয়া। বহু চেষ্টার পর আল্লাহ তার ওপর রহম করেছেন। বিয়ের পাঁচ বছরেও সন্তানের বাপ হতে পারেনি জসিম। কত ডাক্তারের চেম্বারে চেম্বারে ঘুরেছে, কিছুতেই কিছু হয় না। জসিমের বউ হনুফা বলল, ‘ডাক্তারি চিকিসসায় এসব সমস্যার সমাধান অয় না, তুমি কবিরাজের কাছে যাও।’ বাধ্য হয়ে জসিম কবিরাজের কাছে যায়। গাজীপুরের বিখ্যাত মালেক কবিরাজ। দেখে-শুনে কবিরাজ বলল, ‘ধ্বজভঙ্গ রোগ, ধাতু দুর্বল। সন্তানের আশা বৃথা।’
কবিরাজের কথামতো গোপন অঙ্গে ‘রুগ্নে খরাতিন’ তেল কম মাখেনি, শাহি হালুয়া কম খায়নি, তবু কোনো আশার আলো দেখল না জসিম। হনুফা সারাক্ষণ মন খারাপ করে থাকে, সুখের সংসারে অসুখ দানা বাঁধতে থাকে। যে সংসারে বালবাচ্চা নেই, সেই সংসারে কি আর শান্তি থাকে? দিকদিশা না পেয়ে হনুফাকে নিয়ে ঢাকার মোহাম্মদপুরে হাঁটাপীর হায়দার বাবার আস্তানায় যায় জসিম। হাঁটাপীর তো কোনো কথা বলেন না, তার খাসখাদেম খোকন বলল, বাবার সঙ্গে দু’দিন হাঁটতে হবে, তবেই মনের মকসুদ হাসিল হবে।
হাঁটাপীর হাঁটেন। মোহাম্মদপুর থেকে কল্যাণপুর। কল্যাণপুর থেকে শ্যামলী-আসাদগেট-নিউমার্কেট-ধানমণ্ডি হয়ে আবার মোহাম্মদপুর। কখনও মোহাম্মদপুর থেকে নিউমার্কেট-বকশীবাজার-গুলিস্তান-গোলাপশাহর মাজার-পুরানা পল্টন-শাহবাগ হয়ে ফার্মগেট। ফার্মগেট থেকে কাওরান বাজার, পান্থপথ হয়ে আবার মোহাম্মদপুর তার আস্তানায়। মাসে একদিন করে ছয় মাসে মোট ছয় দিন বউকে নিয়ে হাঁটাপীরের সঙ্গে হাঁটল জসিম। না, মুশকিল তবু আসান হলো না।
হাঁটাপীরের সঙ্গে হাঁটা বন্ধ করার বছর দেড়েক পর হঠাৎ একদিন হনুফার বমি বমি ভাব। হনুফা তো আনন্দে আত্মহারা, জসিম তার চেয়েও বেশি। সেদিনই এক ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে হনুফার আলট্রাসনোগ্রাফি করাল। রিপোর্ট পেল পরের দিন। ডাক্তার বলল, সুখবর, আপনি বাবা হতে চলেছেন।
হনুফা বলল, ‘লও হাঁটাপীরের দরবারে যাই। তার উসিলায় আমাগর মনের মকসুদ হাসিল অইল, টেকাপয়সা মানত কইরা আইয়ি।’
জসিম বলল, ‘ধুত্তরি হাঁটাপীর। এই ভালা খবরের পিছনে হাঁটাপীরের কোনো হাত নাই। তার লগে হাঁটছি ত দেড় বছর আগে। কই, দেড় বছরের মাঝে ত কোনো সুখবর পাইলাম না। হোন বউ, জন্ম-মৃত্যুতে মানুষের হাত নাই, এর চাবি খোদার হাতে।’
হনুফা আর কথা বাড়াল না। কথা বাড়িয়ে লাভ কী। স্বামী যা বলে তা-ই ঠিক। তবে তার মনে একটা গোপন আশঙ্কা থেকেই গেল। যদি হাঁটাপীরের বদ্দোয়ায় পেটের সন্তানটা নষ্ট হয়ে যায়! ডেলিভারির সময় যদি কোনো অঘটন ঘটে! ডেলিভারির আগ পর্যন্ত এমন একটা আশঙ্কা প্রায়ই তার মনে ঘুরপাক খেয়েছে, নিরাপদ ডেলিভারির পর আশঙ্কাটা কেটে যায়। নিজাম যখন দুধছাড়া হলো, হাঁটাপীরের কথা আর মনেই থাকল না তার।
নিজামের সাত বছর বয়সে, সে তখন নার্সারি ক্লাসে পড়ছে, হঠাৎ একদিন তার প্রচণ্ড মাথাব্যথা উঠল। নাপা, প্যারাসিটামলেও সারল না। ব্যথাটা টানা দু’দিন লেগে থাকল। দু’দিনে বেচারা নাওয়া-খাওয়া তো দূরে থাক, ঠিকমতো ঘুমাতে পর্যন্ত পারল না। দু’দিন পর প্রচণ্ড জ্বর। পাড়ার ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল জসিম। ডাক্তার বললেন, তেমন কিছু নয়, ঠাণ্ডা লেগেছে। তিন বেলা নাপা সিরাপ খাওয়ান, ঠিক হয়ে যাবে।
ঠিক হয়ে গেল বটে, এক সপ্তাহর মধ্যে নিজাম পুরোপুরি সুস্থ। হাসে, খেলে, খায়-দায়, ঘুমায়, স্কুলে যায়। কিন্তু মাসখানেক পর আবারও প্রচণ্ড মাথাব্যথা। ব্যথার চোটে তার চিৎকার-চেঁচামেচিতে সারাপাড়া অস্থির। ছেলেকে গাজীপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে গেল জসিম। দেখেশুনে ডাক্তার প্রেসক্রিপশন লিখে দিলেন। দামি সব ওষুধ কিনে খাওয়ানো হলো। না, কিছুতেই ব্যথা সারল না। দিন দিন ব্যথা বরং আরও বাড়ে। অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল হনুফা, হাঁটাপীরের কথা মনে পড়ল। তার বদ্দোয়া কি-না! জসিম বলল, হ, তোমারে কইছে! হাঁটাপীরের আর কাম নাই, হাঁইটা হাঁইটা খালি মাইন্ষেরে বদ্দোয়া দেয়।
কিন্তু মায়ের মন কিছুতেই বুঝ মানে না। সদর হাসপাতালের এত বড় ডাক্তার দেখানো হলো, ওষুধও তো ঠিকমতো খাওয়ানো হচ্ছে, রোগ সারবে না কেন? নিশ্চয়ই হাঁটাপীরের বদ্দোয়া! বউয়ের জোরাজুরিতে বাধ্য হয়ে জসিম হাঁটাপীরের আস্তানায় যায়, খাসখাদেম খোকনের হাতে পাঁচশ’ টাকার দুটি নোট তুলে দেয়। বউ-বাচ্চা নিয়ে সারা বিকেল হাঁটাপীরে সঙ্গে হেঁটে রাতে গাজীপুর ফেরে।
হাঁটাপীরের কী কেরামতি, পরদিন ভোরে ঘুম থেকে জেগে নিজাম পুরোপুরি সুস্থ। আর মাথাব্যথার কথা বলল না। আগের মতো আবার হাসল, খেলল, স্কুলে গেল। হনুফা বলল, দেখলা? আমি তো আগেই কইছিলাম, তুমি গুরুত্ব দিলা না। পীর-দরবেশগরে তাচ্ছিল্য করা চলে না।
জসিম বলল, ‘হ, ভুলডা আমারই অইছে। তোমার কথা আগেই হোনা উচিত আছিল। আল্লা আমার পোলারে ভালা রাহুক। দরকার অইলে আবার যামু বাবার ডেরায়, টেকাপয়সা যা লাগে খরচ করমু।’
মাস দু’য়েকের মধ্যে আর মাথাব্যথার কথা বলল না নিজাম। সবই ঠিকঠাক। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল তার মা-বাবা। হঠাৎ একদিন স্কুলের পিয়ন একটা রিকশায় করে নিজামকে বাসায় দিয়ে গেল। দু’হাতে মাথা চেপে ধরে চিৎকার করে নিজাম, মুখে কিছু বলে না। হনুফার বুঝতে বাকি থাকে না, মাথাব্যথাটা আবার উঠেছে। দ্রুত পাড়ার ডিসপেন্সারিতে নিয়ে গেল। ডাক্তার বলল, ব্যাপারটা কী বুঝতে পারছি না। এটুকু ছেলের এমন মাথাব্যথা হবে কেন? এক কাজ করুন, বড় ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান। রোগ না বুঝে উল্টাপাল্টা ওষুধ দেওয়া ঠিক হবে না।
পরদিন জসিম ছেলেকে লাইফ কেয়ার হাসপাতালে নিয়ে গেল। গাজীপুরের সবচেয়ে বড় প্রাইভেট হাসপাতাল। সেদিন সিরিয়াল মিলল না, মিলল পরদিন। ডাক্তার বলল, সিটিস্ক্যান করাতে হবে, নইলে রোগ বোঝা যাবে না।
হাজার পনের টাকা জমা ছিল জসিমের, পরদিনই সিটিস্ক্যান করিয়ে নিল। রিপোর্ট দেখে জসিমকে চেম্বারে ডেকে নিলেন ডাক্তার। একা। বললেন, মনকে শক্ত করুন। আমি ডাক্তার মানুষ, অনেক হার্ড কথাও আমাকে শোনাতে হয়। আপনার ছেলের ব্রেইন ক্যান্সার হয়েছে। ইমিডিয়েটলি অপারেশন করাতে হবে। নইলে বাঁচানো ডিফিকাল্ট হয়ে পড়বে।
আপনাদের কাছে হাত না পেতে আর উপায় কী জসিমের? দশ লাখ টাকা কি বাড়ির কাছের কথা! সারাজীবন সিএনজি চালিয়েও তো এত টাকা জোগাড় করতে পারবে না সে। অনেক ভেবেচিন্তে হনুফাকে পথে নামিয়ে দিল। ছেলেকে কোলে নিয়ে হনুফা গাজীপুর মহানগরীর অলিগলি ঘুরে বেড়ায়, ছেলের চিকিৎসার জন্য সাহায্য চায়। পায়ও। সকালে বের হয়, ফেরে দুপুরে। রান্নাবাড়া করে খেয়েদেয়ে আবার বের হয়, ফেরে সন্ধ্যায়। সকাল-বিকেল ঘুরে তিন-চারশ’ টাকা হয়ে যায়। আর জসিম সকাল থেকে রাত ১০টা-১১টা পর্যন্ত সিএনজি চালায়, ইনকাম বাড়ানোর চেষ্টা করে। বাড়েও। কোনো কোনো দিন দু’হাজার পর্যন্ত ওঠে।
একদিন হনুফার প্রচণ্ড জ্বর, সিএনজিটাও নষ্ট। টায়ার পাল্টাতে হবে, পেছনের দুটো টায়ারই ফেটে গেছে। অসুস্থ বউকে ঘরে রেখে ছেলেকে কোলে নিয়ে বের হলো জসিম। বোর্ডবাজার বাসস্ট্যান্ডে প্রচুর গাড়ি। মহাখালী টু শ্রীপুরের একটা বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে। নিজামের মাথাটা কাঁধে এলিয়ে বাসে উঠল জসিম। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আপনাদের উদ্দেশে নিজের পরিচয় আর ছেলের ভয়াবহ ক্যান্সারের বর্ণনা দিতে গিয়ে আচমকা কেঁদে ফেলল। হেঁচকি তোলা কান্না। কান্না থামাতে চায়, পারে না। চোখের জলে বুক ভেসে যায়। বাপের কান্না দেখে ছেলেও কঁকিয়ে ওঠে। বাঁ হাতটা ছেলের পিঠে রেখে ডান হাতটা বাড়িয়ে দেয় জসিম। টাকা পড়তে থাকে। পাঁচ, দশ, বিশ, পঞ্চাশ। সংরক্ষিত মহিলা সিটে বসা বোরখা পরা এক মহিলা একশ’ টাকার একটা নোট গুঁজে দেয়। টাকায় টাকায় ভরে ওঠে জসিমের মুঠো। টাকাগুলো বুকপকেটে ঢুকিয়ে বাস থেকে নেমে অশ্রুসিক্ত চোখে আরেকটা বাসে ওঠে জসিম। ঢাকা টু ময়মনসিংহের বাস। আগের বাসে বলা কথাগুলো নতুন করে আবার বলে। তার কান্না দেখে আপনারাও গলে যান, মানিব্যাগ বের করে পাঁচ-দশ টাকা তুলে দেন।
বোর্ডবাজার থেকে চৌরাস্তা, চৌরাস্তা থেকে বোর্ডবাজার_ সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত প্রায় পঁচিশ-ত্রিশটা বাস ঘুরল জসিম। দুপুরে বাসায় ফিরে টাকা গুনতে বসল। খুচরা পয়সা বাদ দিয়ে নগদ দেড় হাজার টাকা। এত টাকার কথা শুনে জ্বর নিয়ে উঠে বসে হনুফা, শুকনো ঠোঁটে হাসি ফোটে। বাসায় দুপুরে রান্নাবাড়া হয়নি, হোটেল থেকে ভাত-মাংস আনে জসিম। খেয়েদেয়ে নিজামকে কোলে নিয়ে আবার বের হয়। বাসে-বাসে ঘুরে ছেলের ক্যান্সারের বর্ণনা দেয়, সকালের মতো কাঁদার চেষ্টা করে। কাঁদেও। তবে সকালের মতো বুকভাঙা কান্নাটা আসে না। তবু টাকা কম পড়ল না। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে গুনে দেখল বারোশ’। তার মানে একদিনেই সাতাশশ’।
আশার আলো দেখতে পায় জসিম। তার ভয় ছিল, টাকার অভাবে বুঝি ছেলেটাকে বাঁচাতে পারবে না। টাকার জন্য রোজ কী পরিশ্রমই না করে। সেই সকালে সিএনজি নিয়ে বের হয়, ফেরে রাত ১১টায়। ছেলের অসুখের পর থেকে মসজিদে গিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, মোনাজাত ধরে কান্নাকাটি করে_ ‘খোদা, তুমি আমার জীবনের বিনিময়ে অইলেও আমার পোলারে ভালা করো। খোদা, তুমি রহমানুর রহিম। আমার জীবনের গুনাখাতা মাফ করো, আমার নিজামরে তুমি ফানা দেও মাবুদ।’
পরদিন জসিম সিএনজি নিয়ে বেরোবার প্রয়োজন বোধ করে না। মহাজনকে ফোন করে বলে দেয়, টায়ার নষ্ট, নতুন টায়ার ছাড়া গাড়ি বের করা যাবে না। মহাজন খিস্তি-খেউড় করে, সে কানে তোলে না। নিজামকে কোলে নিয়ে বাসা থেকে বের হয়। বোর্ডবাজার বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে বাস ধরে। বোর্ডবাজার থেকে চৌরাস্তা, চৌরাস্তা থেকে বোর্ডবাজার। ‘ভাই, আমি ভিক্ষুক না, সিএনজি চালাই। এই যে দেহেন আমার পোলাডা, ব্রেইন ক্যান্সার। অপারেশান করাতে দশ লাখ টেকা লাগব। কত টাকা কত দিকে চলে যায়, ছেলেটার মুখের দিকে চাইয়া দু-চার টাকা দান করেন ভাই। আল্লা আপনেগর ভালা করব ভাই। দেন ভাই, দয়া করেন ভাই।’
জসিম কাঁদতে থাকে। কখনও চোখ ভেজে, কখনও ভেজে না। টাকা পড়তে থাকে। কোনোদিন এক হাজার, কোনোদিন দেড় হাজার, কোনো কোনোদিন দুই হাজার। একদিন এক প্রাইভেট কারের মালিক জানালা খুলে এক হাজার টাকার দুটি নোট বের করে দিল।
তার পরদিনই জসিম ছেলেকে নিয়ে শ্রীপুর টু মহাখালীর বাসে চড়ে উত্তরা চলে যায়, আবদুল্লাপুর টু গুলিস্তানের বাসে উঠে আপনাদের কাছে হাত পাতে। পায়ও প্রচুর, আটশ’ টাকা। দুপুরে হোটেলে ঢুকে ছেলেকে নিয়ে কাচ্চি বিরিয়ানি খায়। অফিস ছুটির সময় উত্তরার এক অফিসের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, কেঁদেকেটে ছেলের অসুখের কথা বলে। স্যুট-টাই পরা অফিসাররা পঞ্চাশ-একশ’ টাকার নোট বাড়িয়ে দেয়। নোট যত বাড়ে জসিমের চোখের পানি তত কমে। চোখ দুটি ভেজানোর জন্য সে বহু চেষ্টা করে, হেঁচকি তুলে কাঁদে, ঘন ঘন চোখ মোছে, কিন্তু চোখে পানি আসে না। তাতে অবশ্য কান্নার কোনো ক্ষতি হয় না। দুঃখী বাবার বুকফাটা কান্না দেখে আপনাদেরও বুক ফাটে, টাকা দেন, মাসুম বাচ্চাটার আশু রোগমুক্তির জন্য দোয়া করেন।
হনুফার জ্বর সারে, ছেলেকে নিয়ে সে আগের মতো বেরোতে চায়। জসিম বলে, ‘দরকার নাই, তুমি বাড়িত থাক। মাইয়ালোকের বেশি বাইরে যাওন ঠিক না।’
হনুফা বাসায় থাকে। রাঁধে-বাড়ে আর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে খোদার কাছে ছেলের জীবন ভিক্ষা চায়। নিজামকে কোলে নিয়ে বাসে বাসে ঘোরে জসিম। বোর্ডবাজার, চৌরাস্তা, চেরাগ আলী, টঙ্গী, আবদুল্লাহপুর, মাওনা, নরসিংদী, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহের নানা বাসে উঠে ছেলের অপারেশনের জন্য টাকা ভিক্ষা চায়। নামাজের সময় পর্যন্ত পায় না। সিএনজিটা মহাজনকে ফেরত দিয়েছে। বলে দিয়েছে, ছেলে সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত সে আর চালাতে পারবে না।
সংসারের ব্যয় কমিয়ে, গ্রামের বাড়ির বসতভিটাটা বেচে দিয়ে বছরখানেকের মধ্যে প্রায় সাত লাখ টাকা জোগাড় করল জসিম। বউয়ের গয়নাগাটি বেচে আরও এক লাখ। এবার ছেলের অপারেশনটা করিয়ে নিতে পারে। গত এক বছরে অবশ্য নিজামের একবারও মাথাব্যথা ওঠেনি। জসিম ভাবল, তাহলে কি রোগটা সেরে গেল! না, তা কী করে হয়! আপনা-আপনি কি কখনও রোগ সারে! মরণব্যাধি ক্যান্সার ছেলের মাথাটা কুরে কুরে খাচ্ছে, এখন হয়তো ব্যথা-বেদনা হচ্ছে না। ডাক্তার দু’বছরের সময় দিয়েছে, দু’বছর পর নিশ্চয়ই আবার ব্যথাটা উঠবে।
লাইফ কেয়ার হাসপাতালে গিয়ে আফসার ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করল জসিম। ডাক্তার বললেন, এখানে তো অপারেশন হবে না ভাই, আপনি বরং ঢাকার ভালো কোনো হসপিটালে যান। বিএসএমএমইউতে ভালো নিউরোলজিস্ট আছে। টাকাও বেশি লাগবে না, অপারেশনটাও ঠিকমতো হবে। নো টেনশন।
একটা ট্যাক্সিক্যাব ভাড়া করে শাহবাগ বিএসএমএমইউতে এলো জসিম, ডাক্তারের সিরিয়াল পেল কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। সিটিস্ক্যানের পুরনো রিপোর্টটা বাতিল করে দিয়ে নতুন করে আবার সিটিস্ক্যান করাতে বললেন ডাক্তার। ল্যাবএইড থেকে সিটিস্ক্যান করিয়ে আনল জসিম। রিপোর্ট দেখে ডাক্তার বললেন, কে বলেছে আপনার ছেলের ব্রেইন ক্যান্সার? কোন ডাক্তার? তার বিরুদ্ধে তো কেস করা উচিত। ছেলের তো কোনো প্রবলেমই নেই, হান্ড্রেট পার্সেন্ট ওকে।
জসিমের খটকা লাগে। এত নাম করা হাসপাতালের এত বড় ডাক্তার, অথচ রোগ ধরতে পারছে না! নিশ্চয়ই কোনো ঘাপলা আছে। পাড়ার ডিসপেন্সারির ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে এবার সে ল্যাবএইড হাসপাতালে নিয়ে যায় নিজামকে। এই হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে টাকা একটু বেশি লাগবে, তবে আসল রিপোর্ট পাওয়া যাবে।
ল্যাবএইডের ডাক্তার আবারও সিটিস্ক্যান করলেন। রিপোর্ট দেখে বললেন, অল বোগাস, সব ওকে। আপনার ছেলের কিচ্ছু হয়নি। যান, বাড়ি ফিরে যান।
মুখে হাসি ফোটে জসিমের। দুই বড় হাসপাতালের নাম করা দুই ডাক্তার কি আর মিথ্যা বলছেন? ছেলের ক্যান্সার হলে গত এক বছরে একবারও মাথাব্যথা উঠত না? নিশ্চয়ই লাইফ কেয়ারের আফসার আহমেদ ভুয়া ডাক্তার। সব তার টাকা খসানোর ধান্দা।
ছেলেকে কোলে নিয়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসে জসিম। মিরপুর রোডে তীব্র যানজট। সারি সারি গাড়ি। নড়চড় নেই। স্থির হয়ে থাকা গাড়িগুলোর দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে জসিম। কী যেন ভাবে। তারপর নিজামকে কোল থেকে নামিয়ে হাসপাতালের সামনের একটা ডিসপেন্সারিতে গিয়ে এক শিশি গ্গি্নসারিন কেনে। ছিপি খুলে হাতে মেখে চোখে ডলে জসিমকে কোলে নিয়ে দ্রুত সে একটা বাসে ওঠে। তার অশ্রুসিক্ত কান্না দেখে, এতটুকু ছেলের এই জটিল রোগের কথা শুনে আপনারা যে যা পারেন দান করতে দেরি করেন না। বিএসএমএমইউ এবং ল্যাবএইডের রিপোর্টগুলো আগুনে পুড়িয়ে দেয় জসিম, লাইফ কেয়ার হসপিটালের আফসার ডাক্তারের দেওয়া সার্টিফিকেটটা নিজামের গলায় ঝুলিয়ে দেয়। ধানমণ্ডি, বারিধারা, বনানী, উত্তরা, আবদুল্লাহপুর, বোর্ডবাজার, চৌরাস্তা, মাওনা, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ_ ছেলেকে কোলে নিয়ে একেক দিন একেক জায়গায় যায় জসিম। সদয় হয়ে আপনারা মুক্তহস্তে দান করেন, আর মনে মনে ডাক্তার আফসার আহমেদকে ধন্যবাদ জানায় জসিম।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত