নভেরা হোসেনের একগুচ্ছ কবিতা

গত ২০ সেপ্টেম্বর ছিলো কবি নভেরা হোসেনের জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার কবিকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


 

নীরবতা

সন্ধ্যার অন্ধকারে তোমাকে ভীষণ ম্লান মনে হয়। বৃক্ষের শরীরে যত ক্ষত, লোকালয়ে যত লোক
সব কোলাহল হয়ে নীরব।
এই সন্ধ্যা, স্মৃতির শহর একা একা হেঁটে যায় মিনারের পথ ধরে।
লাল লাল বটবৃক্ষ, পুস্তকের সারি। এখানে তুমি নিদারুণ , পড়ে আছো শত শত মলাটের আড়ালে।
একটা অক্ষর, একজন শব্দ  গ্রাস করে রাখে। তুমিও হতে চাও অমলিন যেকোন নদীর তলদেশে…

লুসিফার

তোমার জানালায় কৃকলাস ম্রিয়মাণ
জলপাই গাছ, সকালের রোদ, শিশুর চিৎকার
ছিঁড়ে ফেলছে কুয়াশাচ্ছন্ন রাতের পৃথিবীকে
কবিতা এবং দীর্ঘশ্বাসের বার্তা
কখনও কখনও লোকালয়ে অশ্রু জমিয়ে দেয়
না পাওয়া যত আর্তি
তোমাকে জলে ডোবায়, আগুনে পোড়ায়
পোড়ো বৃষ্টি ও নাস্তিতে
রোদে পুড়ে, জলে ভিজে হও শাণিত
যেন এক তলোয়ার
ছিঁড়ছে কাচের পর্দা
সময়ের বাঁকানো দাঁত—
দাও গেঁথে পোড়া চোখ লুসিফার
ভূতগ্রস্ত অস্থিতে

২.
সে ছিল সবুজ পোশাকে ঢাকা
পায়ে সমতল চপ্পল
এবং সে ছিল না যখন বইয়ের স্তূপ
ভেঙে পড়ছিল হৃদপিণ্ডের অলিন্দে
অলিতে-গলিতে
আহা আমাদের শহরেও ভোর হয়
দুপুরে গন্ধ ছড়িয়ে সাদা ভাত
পড়ে থাকে গোলাপি ডিশে,
পুড়ে পুড়ে চিলের ডানা
ছাই হয়ে আসে—
থাকো তুমি মিনারে, বৃষ্টির ফোঁটায়
স্রোতে ভাসা গাঙচিল নদীর আকাশ
থাকো তুমি মজ্জায়
মরীচিকায়…

 

সাইকো সাইকো

শহরে অবরোধ
গ্রামে
বন্দরে—
বড় বড় ট্রাক আগুনে পুড়ছে
অস্থি পুড়ছে
মজ্জা পুড়ছে
সিনেপ্লেক্সে গেরিলা ছবির প্রিমিয়ার শো
প্যারিসে শোক মিছিল
বগুড়ায় লাঠি মিছিল
আগুন জ্বলছে কাভার্ড ভ্যানে
ট্রেনের কম্পার্টম্যান্টে
করোটিতে ফুলের মুকুট
জরায়ুতে ডাবল গ্রেনেড
সাইকো সাইকো
আলফ্রেড হিচকক

 

 

বৃষ্টির নির্জনতা

১.
ঝিররঝির নয় ক্যাটস অ্যান্ড ডগ
একটা সাদা বাস মুষল বৃষ্টিতে
ছাতা হাতে পুলিশ, গোলাপি স্কার্ট নারী
রোজ নিয়ম করে বৃষ্টি নামে
আজকাল মরম্নভূমিতেও অনেক বৃষ্টি হচ্ছে
ইশারা খাজ্জানের দোতলায়
নীল মুখ মেয়ে কফি হাতে বসে
পাশের দরজায় মিশরীয় যুবক
মুখোশের আড়ালে ঢাকা পড়া চোখ
আলতামিরার গুহাচিত্র এখন ওল্ড ফ্যাশন
সিগারেট হাতে নারী তেহরানের দেয়ালে দেয়ালে
চেন্নাই ট্রেন খুব লেট করছে
তূর্ণা নিশীথাও
এরা কখনো পরস্পরকে ক্রশ করবে না
দুর থেকে কেটে চলে
হাতের কব্জি
তর্জনীয় ঝড়

২.
রোদ ভাল লাগে না
বৃষ্টি? তাও বেশিক্ষণ না
তোমার লম্বা হাত যখন পিঠ ছুঁয়েছে
ভাল লাগছিল
চুল ছুঁতেই ভাল লাগল না
অপেক্ষার শেষে যে দ্রাক্ষাফল ঠোঁটে নেই
ঠোঁট ভিজে যায়
তুমি ভেজো না আমিও না
বেশিক্ষণ তোমাকে ভাল লাগে না
বেশিক্ষণ আমাকেও ভাল লাগে না…

আমি জেগে আছি

তুমি ঘুমাতে যাচ্ছো
আমি যাচ্ছি না
অনেকে জেগে থাকছে
অনেকে বারুদ পোড়াচ্ছে
কেউ কেউ আগুনে ঘি ঢালছে
ঘিয়ে আগুন—
একজন নিবিড় মনে কেটে চলেছে স্রোতহীন জলধারা
অনেকে ঘুমাতে পারছে না
কেউ কেউ ব্যাংকের ভল্ট ভাঙছে
কবিতা লিখছে কোনও একজন
তুমি ঘুমাচ্ছো
আমি জেগে আছি…

 

অশ্বখুর

গ্লাসিয়ার কাটতে কাটতে দূর্বা ঘাস
বিছানায় রেশম কুশন ছাড়া তুমি আনকাম্ফর্ট্যাবল
বেনসনের ধোঁয়া উড়িয়ে কপালের চুল সরাতেই
এক ঝলক ঝড়ো হাওয়া
দুহাত পেছনে সরিয়ে সোজা ঢুকে পড়লে
দরজার লক খুলে
উহ্‌ একটা পাথরের চাঁই
তুমি বুঝতেই পারলে না
বৃষ্টি ঝরছিল অনেক কাল
তোমার অশ্বখুর ভেঙে ফেলল
শির ম্যাথম্যাটিক্সের আন্তর্জাল

তোটক যুবক

চোখে প্রগলভতা
গলায় মোলায়েম ধ্বনি
একরাশ ক্রিসেনথিমাম হাতের মুঠোয়
এখান থেকে বাস ধরে সোজা শাহবাগ
ওখান থেকে ট্রেনে শিমুলপুর,
বিনয় মজুমদার এই মাত্র স্নান সারলেন
মধ্যাহ্নে সাদা ভাত, কলার মোচা
এক নলা খেয়ে আরেক নলা পুষু বিড়ালকে
মার্জারাড়্গী দোহারা মেয়ে
বারান্দায় শঙ্খ হাতে
তোটক তাল কাটছে
হাত ছুঁতে চাইলে এখনই
রেইন কোট ভিজে সপসপ
কথা না বলেও অনেক কথা বলা হয়ে গেল
শোনবার জন্য তুমিও আজ অপেক্ষায় নেই…

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত